বাংলাদেশের একমাত্র সমুদ্রসৈকত, যেখানে একই স্থান থেকে সূর্যোদয় ও সূর্যাস্ত উপভোগ করা যায়, সেই কুয়াকাটা আজ প্রকৃতির নির্মম আঘাতে বিপন্ন। পূর্ণিমার অস্বাভাবিক জোয়ার, বৈরী আবহাওয়া এবং উত্তাল বঙ্গোপসাগরের অব্যাহত ঢেউয়ে ভয়াবহ ভাঙনের মুখে পড়েছে দেশের অন্যতম জনপ্রিয় এই পর্যটনকেন্দ্র। কয়েক দিনের ব্যবধানে সৈকতের বিস্তীর্ণ অংশ সমুদ্রগর্ভে বিলীন হয়েছে।
জোয়ারের পানি এখন আগের যে কোনো সময়ের তুলনায় অনেক গভীরে প্রবেশ করছে, আর প্রতিটি ঢেউ যেন উপকূল থেকে কেড়ে নিচ্ছে আরো কিছু ভূমি। সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, জিরো পয়েন্টসংলগ্ন সমুদ্রসৈকত জামে মসজিদ, শতবর্ষী শ্রীশ্রী রাধাকৃষ্ণ মন্দির, ট্যুরিস্ট পুলিশের পুলিশ বক্সসহ একাধিক গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা এখন সরাসরি ভাঙনের ঝুঁকিতে। স্থানীয়দের আশঙ্কা, দ্রুত কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া না হলে আগামী কয়েকটি জোয়ারই এসব স্থাপনার অস্তিত্বের জন্য বড় হুমকি হয়ে উঠতে পারে।
সরেজমিন দেখা গেছে, পূর্ণিমার জোয়ারের তীব্র ঢেউয়ে সৈকতের বিভিন্ন অংশ থেকে বিপুল পরিমাণ বালু সরে গিয়ে কয়েক ফুট গভীর গর্তের সৃষ্টি হয়েছে। কোথাও কোথাও ঢেউ সরাসরি বালিয়াড়িতে আঘাত করছে। সৈকতের পূর্ব ও পশ্চিম অংশে ক্ষয়ের মাত্রা সবচেয়ে বেশি। জোয়ারের সময় ঢেউ এতটাই ভেতরে চলে আসছে যে আগে যেখানে পর্যটকেরা হাঁটতেন, সেখানে এখন পানি আর গভীর খাদ।
জিরো পয়েন্টের পূর্ব পাশে অবস্থিত সমুদ্রসৈকত জামে মসজিদের সামনের বিস্তীর্ণ বালুচর ইতোমধ্যেই বিলীন হয়ে গেছে। একই অবস্থা শ্রীশ্রী রাধাকৃষ্ণ মন্দিরের সামনেও। ট্যুরিস্ট পুলিশের অস্থায়ী পুলিশ বক্সের নিচের মাটিও ধসে যেতে শুরু করেছে। স্থানীয়দের ভাষ্য, আর কয়েক দফা এমন জোয়ার হলে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ রূপ নিতে পারে।
স্থানীয়দের দাবি, গত কয়েক বছর ধরে বর্ষা মৌসুমে সৈকতে ভাঙন দেখা দিলেও এবারের মতো ভয়াবহ পরিস্থিতি আগে কখনও দেখা যায়নি। স্থানীয় ব্যবসায়ী মো. ইব্রাহিম হেসেন বলেন, প্রতিটি জোয়ারের সঙ্গে সৈকত যেন একটু একটু করে হারিয়ে যাচ্ছে। কয়েক মাস আগেও যেখানে হাজারো পর্যটক ছবি তুলতেন, আজ সেখানে বড় বড় গর্ত। মসজিদ, মন্দির, পুলিশ বক্স—সবকিছুই এখন সমুদ্রের খুব কাছাকাছি চলে এসেছে। দ্রুত স্থায়ী ব্যবস্থা না নিলে একসময় পুরো এলাকাই ঝুঁকির মধ্যে পড়ে যাবে।
ঢাকা থেকে পরিবার নিয়ে কুয়াকাটায় ঘুরতে আসা মো. আশিকুর রহমান বলেন, কুয়াকাটার সৌন্দর্যের কথা অনেক শুনেছি। কিন্তু এখানে এসে সৈকতের ভয়াবহ ভাঙন দেখে সত্যিই বিস্মিত হয়েছি। এমন একটি আন্তর্জাতিক সম্ভাবনাময় পর্যটনকেন্দ্রকে এভাবে ধ্বংস হতে দেওয়া উচিত নয়। দ্রুত দীর্ঘমেয়াদি উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন। কুয়াকাটা শ্রীশ্রী রাধাকৃষ্ণ মন্দির তীর্থযাত্রী সেবাশ্রমের সাধারণ সম্পাদক প্রকৌশলী নিহার রঞ্জন মণ্ডল বলেন, প্রতি বর্ষা মৌসুমে পানি উন্নয়ন বোর্ড জিও ব্যাগ ফেলে সাময়িকভাবে ভাঙন ঠেকানোর চেষ্টা করে। কিন্তু ঢেউয়ের শক্তির কাছে সেসব ব্যবস্থা খুব বেশি কার্যকর হয় না।
কুয়াকাটার জন্য সমুদ্র উপকূল রক্ষায় আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর স্থায়ী প্রকল্প বাস্তবায়ন এখন সময়ের দাবি। ট্যুর অপারেটরস অ্যাসোসিয়েশন অব কুয়াকাটা (টোয়াক) এর সভাপতি রুমান ইমতিয়াজ তুষার বলেন, গত এক দশকে কুয়াকাটাকে কেন্দ্র করে শত শত কোটি টাকার বিনিয়োগ হয়েছে। অসংখ্য হোটেল, রিসোর্ট, রেস্তোরাঁ, পরিবহন ও ক্ষুদ্র ব্যবসা গড়ে উঠেছে। তিনি বলেন, সৈকতই যদি না থাকে, তাহলে পর্যটন শিল্পও টিকে থাকবে না। এতে শুধু ব্যবসা নয়, হাজারো মানুষের জীবিকা হুমকির মুখে পড়বে। তাই এখন আর অস্থায়ী নয়, স্থায়ী সমাধান প্রয়োজন।
কলাপাড়া পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. শাহ আলম জানান, কুয়াকাটা সমুদ্রসৈকত সংরক্ষণ, ভাঙন প্রতিরোধ এবং উপকূলকে টেকসই করতে প্রায় ৭৫৯ কোটি টাকা ব্যয়ে একটি দীর্ঘমেয়াদি প্রকল্পের প্রস্তাব সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে। তার ভাষায়, প্রকল্পটি অনুমোদন হলে আন্তর্জাতিক মানের প্রযুক্তি ব্যবহার করে উপকূল সংরক্ষণ, ভাঙন প্রতিরোধ এবং পর্যটন এলাকার স্থায়িত্ব নিশ্চিত করা সম্ভব হবে। পাশাপাশি ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় জরুরি ভিত্তিতে অস্থায়ী সুরক্ষা কার্যক্রমও চলমান রয়েছে।
পটুয়াখালী-৪ আসনের সংসদ সদস্য এবিএম মোশাররফ হোসেন বলেন, কুয়াকাটা শুধু পটুয়াখালীর নয়, দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পর্যটন সম্পদ। সৈকত সংরক্ষণ ও পর্যটন অবকাঠামোর উন্নয়নে সরকার গুরুত্ব দিয়ে কাজ করছে। দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা বাস্তবায়নে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়গুলো সমন্বিতভাবে কাজ করছে।
উপকূল বিশেষজ্ঞদের মতে, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি, পূর্ণিমা ও অমাবস্যার অস্বাভাবিক জোয়ার এবং ঘন ঘন বৈরী আবহাওয়া কুয়াকাটার জন্য বড় হুমকি হয়ে উঠছে। প্রতি বছর অস্থায়ীভাবে জিও ব্যাগ ফেলে ভাঙন ঠেকানোর চেষ্টা করা হলেও তা দীর্ঘস্থায়ী সমাধান দিতে পারছে না। তাদের মতে, আধুনিক উপকূল প্রতিরক্ষা অবকাঠামো, বিজ্ঞানভিত্তিক সৈকত ব্যবস্থাপনা, নিয়মিত ড্রেজিং, পরিবেশসম্মত তীর সংরক্ষণ এবং দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা বাস্তবায়ন ছাড়া কুয়াকাটাকে রক্ষা করা কঠিন হবে।
কুয়াকাটা বাংলাদেশের পর্যটন খাতের অন্যতম প্রধান চালিকাশক্তি। প্রতিবছর লাখো দেশি-বিদেশি পর্যটক এই সৈকতে ভ্রমণ করেন। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে হাজারো মানুষের কর্মসংস্থান, স্থানীয় ব্যবসা, ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য। কিন্তু প্রকৃতির অব্যাহত আঘাতে যদি এই সৈকত ধীরে ধীরে হারিয়ে যেতে থাকে, তবে ক্ষতিগ্রস্ত হবে শুধু একটি পর্যটনকেন্দ্র নয়, ক্ষতিগ্রস্ত হবে দক্ষিণাঞ্চলের অর্থনীতি, পর্যটন শিল্প এবং বাংলাদেশের একটি অনন্য প্রাকৃতিক ঐতিহ্য। তাই স্থানীয়দের একটাই দাবি, অস্থায়ী নয়, এখনই বাস্তবায়ন হোক স্থায়ী ও টেকসই উপকূল সুরক্ষা প্রকল্প।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









