চলমান বন্যায় আরো দুজনের মৃত্যু হয়েছে। এ নিয়ে টানা সাতদিনের অতিবৃষ্টি, পাহাড়িঢল ও পাহাড়ধসে দেশের আটটি জেলায় এখন পর্যন্ত প্রাণহানি বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৫৬ জনে, আহত হয়েছেন আরো ৩৯ জন। এরই মধ্যে পাঁচটি জেলায় চলমান বন্যা পরিস্থিতির উন্নতি হচ্ছে বলে জানিয়েছে বন্যা তথ্য কেন্দ্র। একই সঙ্গে রংপুরে বিভাগের তিন জেলায় তিস্তার পানি বিপৎসীমার ওপরে থাকায় স্বল্পমেয়াদি বন্যা হতে পারে বলে আশঙ্কা করছে সংস্থাটি। দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের জন্য ৩২৯টি আশ্রয়কেন্দ্র খোলা হয়েছে।
এসব কেন্দ্রে আশ্রয় নিয়েছেন ১০ হাজার ৮৫৪ জন। মন্ত্রণালয়টির মন্ত্রী আসাদুল হাবিব দুলু জানান, চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, বান্দরবান, খাগড়াছড়ি, রাঙামাটি, হবিগঞ্জ, মৌলভীবাজার ও সিলেট (একাংশ) জেলায় বন্যা দুর্গতদের মোট সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে এক লাখ ৫৫ হাজার ৩১১টি পরিবারের ছয় লাখ নয় হাজার ৪৪১ জন। তাদের জন্য এক কোটি ৭৫ লাখ টাকা তাৎক্ষণিক ও তিন হাজার ২৫০ মেট্রিক টন চাল বরাদ্দের পাশাপাশি শুকনা খাবার দেওয়া হয়েছে। অন্যদিকে, বন্যাকবলিত অঞ্চলে স্বাস্থ্যঝুঁকি এড়াতে সব চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীদের ছুটি বাতিল করেছে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়। সাপে কাটার ঝুঁকি মোকাবিলায় প্রয়োজনীয় অ্যান্টিভেনম ও জরুরি ওষুধ সব স্থানে পৌঁছে দেওয়া হচ্ছে। সরকারি ও বিভিন্ন বেসরকারি সংগঠনের পক্ষ থেকেও দুর্গতদের মাঝে শুকনো খাবার, বিশুদ্ধ পানি ও জরুরি ত্রাণসামগ্রী বিতরণ করা হচ্ছে।
আট জেলায় মৃত্যু ৫৬ জনের
সাতটি জেলায় বন্যার খবর জানিয়ে দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র তথ্য কর্মকর্তা মোহাম্মদ মাহবুবুর রহমান তুহিন জানান, বন্যাকবলিত জেলাগুলো হলো, খাগড়াছড়ি, রাঙামাটি, বান্দরবান, কক্সবাজার, চট্টগ্রাম, মৌলভীবাজার ও হবিগঞ্জ। আর ত্রাণমন্ত্রী এর সঙ্গে সিলেট জেলাকেও অন্তর্ভূক্ত করছেন। মন্ত্রণালয়ের সারসংক্ষেপে বন্যাপ্লাবিত উপজেলার সংখ্যা ৫৯টি বলা হলেও জেলা-ভিত্তিক তালিকার হিসাবে ৫৭ উপজেলা উল্লেখ করা হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত ইউনিয়ন ৩৩৪টি এবং পৌরসভা ১২টি।
মন্ত্রণালয়ের প্রতিবেদনের তথ্য অনুসারে, সবচেয়ে বেশি প্রাণহানি হয়েছে কক্সবাজারে। জেলাটিতে ৩১ জন মারা গেছেন। তাদের মধ্যে ১৮ জন স্থানীয় বাসিন্দা এবং ১৩ জন রোহিঙ্গা। সেখানে আহত হয়েছেন ২৪ জন এবং একজন নিখোঁজ রয়েছেন। চট্টগ্রামে ১৫ জনের মৃত্যু ও ১২ জন আহত হওয়ার তথ্য দেওয়া হয়েছে। বান্দরবানে ছয়জন, রাঙামাটিতে তিনজন এবং মৌলভীবাজারে একজন মারা গেছেন। খাগড়াছড়িতে একজন এবং বান্দরবানে দুজন আহত হয়েছেন।
চট্টগ্রামে গেলেন ত্রাণমন্ত্রী
বন্যাদুর্গতদের অবস্থা সরেজমিন দেখতে গতকাল মঙ্গলবার বিকেলে চট্টগ্রামের উদ্দেশে রওনা হন দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণমন্ত্রী আসাদুল হাবিব দুলু। আজ বুধবার থেকে দুর্গত এলাকা পরিদর্শন করবেন তিনি। এর আগে দুপুরে সচিবালয়ে বন্যা পরিস্থিতি নিয়ে আন্তঃমন্ত্রণালয় সভা শেষে সংবাদ সম্মেলনে তিনি বলেন, ‘দেশের আটটি জেলা বন্যাকবলিত হয়েছে। এসব জেলায় ৫৯টি উপজেলার ৩৬৮টি ইউনিয়ন ও ১২টি পৌরসভার ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলো মূল্যায়ন করে যতটুকু পেয়েছি, সেটা হচ্ছে— ছয় লাখ ৯৪১ জন। এ পর্যন্ত মৃত্যু হয়েছে ৫৬ জনের। তার বেশিরভাগই মারা গেছেন পাহাড়ধসে।
ত্রাণমন্ত্রী বলেন, ‘এক কোটি ৭৫ লাখ টাকা আমরা তাৎক্ষণিক বরাদ্দ দিয়েছি। তিন হাজার ২৫০ মেট্রিকটন চাল বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে, শুকনা খাবার দেওয়া হয়েছে এবং এর বাইরে প্রধানমন্ত্রী তার ত্রাণভাণ্ডার থেকে প্রত্যেক জেলায় ২০ লাখ টাকা অতিরিক্ত বরাদ্দ দিয়েছেন এবং এই কার্যক্রমগুলো, যেগুলো আশ্রয়কেন্দ্র রয়েছে- সেগুলোতে আমাদের তৈরি খাবার দেওয়া হচ্ছে, শুকনা খাবার পরিবেশন করা হচ্ছে। উদ্ধার কাজে সেনাবাহিনী, বিজিবি ও কোস্টগার্ডকে নিয়োজিত করেছি। আমাদের মন্ত্রণালয় থেকে তাদের উদ্ধার কাজ পরিচালনায় জরুরি ভিত্তিতে স্পিডবোট এবং রাবার বোট পাঠিয়েছি।’
আসাদুল হাবিব দুলু বলেন, ‘আজকের গুরুত্বপূর্ণ সভায় ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোকে পুনর্বাসনে সরকার কিছু গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নিয়েছে। আশ্রয়কেন্দ্রে রান্না করা খাবার সরবরাহ করা হচ্ছে। উদ্ধার অভিযানে সেনাবাহিনী, বিজিবি ও কোস্টগার্ড কাজ করছে। দুর্গত এলাকায় উদ্ধারকাজে সহায়তায় স্পিডবোট ও রাবার বোট পাঠানো হয়েছে।’ ত্রাণমন্ত্রী বলেন, ‘বন্যার পানি নামতে শুরু করায় এখন সরকারের প্রধান অগ্রাধিকার পুনর্বাসন কার্যক্রম। কৃষি খাতের ক্ষয়ক্ষতির মূল্যায়ন চলছে। সে অনুসারে সহায়তা দেওয়া হবে। স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় বন্যা-পরবর্তী রোগবালাই মোকাবিলায় প্রস্তুতি নিয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত সড়ক দ্রুত সংস্কারে সড়ক ও জনপথ বিভাগ, স্থানীয় সরকার বিভাগ এবং দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয় সমন্বিতভাবে কাজ করবে। কাঁচা সড়ক কাবিখা ও কাবিটা কর্মসূচির মাধ্যমে সংস্কার করা হবে।’
তিনি জানান, ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় খাদ্য মন্ত্রণালয়ের খাদ্যবান্ধব কর্মসূচি চালু থাকবে। এ বছরের বন্যাকে চট্টগ্রাম অঞ্চলের সাম্প্রতিক সময়ের সবচেয়ে ভয়াবহ বন্যাগুলোর একটি উল্লেখ করে ত্রাণমন্ত্রী জানান, প্রধানমন্ত্রী একাধিকবার সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করেছেন এবং সার্বক্ষণিক পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছেন। প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে তিনি আজ বুধবার থেকে দুর্গত এলাকা পরিদর্শন করবেন। তিনি বলেন, ‘রাস্তাঘাট যেগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, সড়ক ও জনপথ দপ্তর সেটা মেরামত করবে অল্প সময়ের মধ্যে। স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন যেসব সড়ক, সেটা তারা মেরামত করবে। আমাদের মন্ত্রণালয় থেকে যদি কাঁচা সড়ক থেকে থাকে, সেগুলোকে দ্রুত মেরামত করবো এবং খাদ্য মন্ত্রণালয় থেকে জরুরি ভিত্তিতে এসব জায়গাগুলোতে খাদ্যবান্ধব কর্মসূচি থাকবে।
ঢাকার জলাবদ্ধতা নিরসন ও ড্রেজিং প্রকল্পে দুর্নীতির অভিযোগ এবং বিপুল অর্থ ব্যয়ের পরও দৃশ্যমান উন্নতি না হওয়ার কারণ সম্পর্কে ত্রাণমন্ত্রী বলেন, দুর্নীতির বিষয়ে সরকারের অবস্থান ‘জিরো টলারেন্স’। আগের সরকারের সময় কী হয়েছে, সেটি আলাদা বিষয়। বর্তমান সরকার কোনো ধরনের দুর্নীতিকে প্রশ্রয় দেয় না। প্রধানমন্ত্রীর সুস্পষ্ট নির্দেশনা রয়েছে। মাঠপর্যায়ে নিবিড় তদারকি করা হচ্ছে। কোনো অনিয়ম পাওয়া গেলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। সভায় ছিলেন স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন, কৃষি, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদমন্ত্রী মোহাম্মদ আমিন উর রশিদ, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ প্রতিমন্ত্রী এম ইকবাল হোসাইন, পানিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী ফরহাদ হোসেন আজাদ এবং দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণসচিব মো. সাইদুর রহমান খান।
১০ হাজারের বেশি মানুষ আশ্রয়কেন্দ্রে
ত্রাণ মন্ত্রণালয় বিজ্ঞপ্তিতে জানিয়েছে, জেলা-ভিত্তিক হিসাবে সাত জেলায় ৩২৯টি আশ্রয়কেন্দ্রে বন্যা ও জলাবদ্ধতায় ক্ষতিগ্রস্ত ১০ হাজার ৮৫৪ জন আশ্রয় নিয়েছেন। এর মধ্যে চট্টগ্রামের ৭০টি আশ্রয়কেন্দ্রে তিন হাজার ১৪০ জন, রাঙামাটির ৪০টি কেন্দ্রে তিন হাজার ১৫৮ জন, বান্দরবানের ৫৪টি কেন্দ্রে দুই হাজার ৫৮৪ জন, মৌলভীবাজারের ১০টি কেন্দ্রে এক হাজার ৭৪৫ জন, খাগড়াছড়ির তিনটি আশ্রয়কেন্দ্রে ৩৪ জন এবং কক্সবাজারে তিনটি কেন্দ্রে ১৯৩ জন অবস্থান করছেন। হবিগঞ্জে দুটি আশ্রয়কেন্দ্র খোলার তথ্য থাকলেও সেখানে আশ্রিত মানুষের সংখ্যা প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়নি।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, চট্টগ্রামের মহানগরসহ ১৬টি উপজেলায় আংশিক জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়েছে। জেলার ১২২টি ইউনিয়ন বা এলাকা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। কক্সবাজারের ১০টি উপজেলার ৭১টি ইউনিয়ন ও চারটি পৌরসভা, রাঙামাটির নয়টি উপজেলার ৪৩টি ইউনিয়ন ও দুটি পৌরসভা এবং বান্দরবানের সাতটি উপজেলার ৩৪টি ইউনিয়ন ও দুটি পৌরসভা দুর্যোগের কবলে পড়েছে।
সাত জেলায় বরাদ্দ এক কোটি ৭৫ লাখ টাকা
দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, ৭ জুলাই থেকে ১৪ জুলাই পর্যন্ত বন্যাকবলিত সাত জেলার জন্য এক কোটি ৭৫ লাখ টাকা এবং তিন হাজার ২৫০ মেট্রিকটন চাল বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে চট্টগ্রামে সর্বোচ্চ ৬৫ লাখ টাকা ও এক হাজার ২০০ মেট্রিকটন, কক্সবাজারে ৩০ লাখ টাকা ও ৪৫০ মেট্রিকটন চাল, রাঙামাটিতে ২৫ লাখ টাকা ও ৫০০ মেট্রিকটন চাল, খাগড়াছড়ি ও বান্দরবানে পৃথকভাবে ২০ লাখ টাকা ও ৪০০ মেট্রিকটন করে চাল বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। মৌলভীবাজারে ১০ লাখ টাকা ও ২০০ মেট্রিকটন চাল এবং হবিগঞ্জে পাঁচ লাখ টাকা ও ১০০ মেট্রিকটন চাল বরাদ্দ হয়েছে। এছাড়া দেশের অন্য ৫৭টি জেলার জন্য জেলাপ্রতি পাঁচ লাখ টাকা এবং ১০০ মেট্রিকটন চালের সাধারণ বরাদ্দ রাখা হয়েছে। সব মিলিয়ে ৬৪টি জেলার জন্য চার কোটি ৬০ লাখ টাকা এবং আট হাজার ৯৫০ মেট্রিকটন চাল বরাদ্দ দেওয়ার তথ্য জানিয়েছে মন্ত্রণালয়।
নামছে পানি, কাঁদছে মানুষ
টানা অতি ভারি বৃষ্টি ও পাহাড়িঢলে চট্টগ্রামের মহানগরসহ ১৬টি উপজেলায় জলাবদ্ধতা ও বন্যা পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। আক্রান্ত এলাকাগুলো হলো- চট্টগ্রাম মহানগর, মীরসরাই, সীতাকুণ্ড, ফটিকছড়ি, রাউজান, রাঙ্গুনিয়া, হাটহাজারী, সাতকানিয়া, পটিয়া, চন্দনাইশ, লোহাগাড়া, সন্দ্বীপ, বোয়ালখালী, আনোয়ারা, বাঁশখালী ও কর্ণফুলী। এসব উপজেলার ১২২টি ইউনিয়ন বা এলাকা দুর্যোগের কবলে পড়েছে। বন্যায় সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বাঁশখালী ও সাতকানিয়া উপজেলা। পাহাড়ধস ও বন্যায় ১৩ জনের মৃত্যু এবং ১২ জন আহত হয়েছেন। ৪১৫টি আশ্রয়কেন্দ্রে বর্তমানে আশ্রয় নিয়েছেন ১৬ হাজার ৮২১ জন।
চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞা জানিয়েছেন, ৬৮৪ টন চাল এবং নগদ ৬২ লাখ ৫০ হাজার টাকা বিতরণ করা হয়েছে। চাহিদা ছিল ৬২২ টন চাল এবং এক কোটি ১৫ লাখ টাকার। আগামী কয়েকদিনও ত্রাণ বিতরণ করা হবে। এসব কার্যক্রম অব্যাহত আছে জেলা প্রশাসনের।
এদিকে বন্যার পানি চট্টগ্রাম জেলা থেকে ধীরে ধীরে নামতে শুরু করেছে। পানি কমার সঙ্গে সঙ্গে ভেসে উঠছে বন্যার রেখে যাওয়া ভয়াবহ ক্ষতচিহ্ন। কোথাও বসতঘর ধসে পড়েছে, কোথাও ভেঙে গেছে রাস্তাঘাট। বানের তোড়ে তছনছ হয়েছে বিস্তীর্ণ সবজিক্ষেত ও ফসলি জমি। ভেসে গেছে ঘের ও প্রকল্পের কোটি কোটি টাকার মাছ, ধ্বংস হয়েছে পোলট্রি খামার। চারদিকে এখন কেবল ক্ষয়ক্ষতির চিহ্ন আর বিপর্যস্ত জনপদের করুণ ছবি। এসব অবস্থা দেখে কাঁদছেন ক্ষতিগ্রস্ত মানুষজন।
সাতকানিয়া উপজেলায় গত সোমবার থেকে বন্যার পানি নামতে শুরু করায় সরকারি আশ্রয়কেন্দ্র ছেড়ে বাড়ি ফিরছেন দুর্গত মানুষজন। তবে ঘরে ফিরেও মিলছে না স্বস্তি।
বসতঘরজুড়ে জমে আছে কাদা ও ময়লা-আবর্জনা। পানিতে ভিজে নষ্ট হয়েছে আসবাবপত্র ও প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র। আবার কারও ঘর ধসে পড়েছে। থাকার কোনো পরিবেশও নেই। ভেঙে যাওয়া বসতঘর দেখে অনেকেই কান্নায় ভেঙে পড়েন। খাদ্য ও বিশুদ্ধ পানির সংকটও দেখা দিয়েছে। এতে চরম দুর্ভোগে পড়েছে বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলো।
সাতকানিয়া উপজেলা প্রশাসনের তথ্য অনুসারে, রবিবার পর্যন্ত উপজেলার সরকারি আশ্রয়কেন্দ্রগুলোতে প্রায় এক হাজার ৫০০ জন মানুষ আশ্রয় নিয়েছিলেন। বন্যার পানি কমতে শুরু করায় গতকাল মঙ্গলবার পর্যন্ত তাদের মধ্যে প্রায় এক হাজার ২০০ জন নিজ নিজ বাড়িতে ফিরে গেছেন। বাকিরা পানি কমলে ফিরে যাবেন।
সাতকানিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) খন্দকার মাহমুদুল হাসান বলেন, ‘বন্যার পানি কমতে শুরু করেছে। এই উপজেলার ১৮টি ইউনিয়নের ৮৫ শতাংশ এলাকা বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বেশ কয়েকটি ইউনিয়ন থেকে পানি কমে গেছে। কিছু কিছু এলাকায় এখনও পানি আছে। রাস্তাঘাট ডুবে আছে। পানি কমে আসায় লোকজন নিজ ঘরে ফিরতে শুরু করেছেন। বেশ কিছু মাটির ঘর ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এগুলোর তালিকা তৈরি করা হচ্ছে। আশা করছি, বৃষ্টি না হলে আগামী কয়েকদিনের মধ্যে সব এলাকা থেকে পানি কমে আসবে।’
বাঁশখালীতেও পানিবন্দি অবস্থায় আছেন হাজার হাজার মানুষ। এই উপজেলার ছনুয়া ইউনিয়নের বাসিন্দা সাঈফ আনোয়ার বলেন, ‘বন্যার পানি কমতে শুরু করেছে। কেউ কেউ বাড়িঘরে গিয়ে যে পরিবেশ দেখতে পাচ্ছেন, তাতে বসবাসের পরিবেশ নেই। অনেকেই গিয়ে দেখছেন, তার শেষ সম্বল বসতঘরটি পুরোপুরি ভেঙে গেছে। ঘরবাড়ি হারিয়ে অনেক দরিদ্র মানুষ কান্না করছেন। সরকারি ত্রাণ সহায়তা ছিল অপ্রতুল। দুর্গত এলাকার অনেক বাসিন্দা সরকারি সহায়তা চোখেও দেখেননি। বন্যার কারণে লোকজন কর্মহীন হয়ে পড়েছেন। ফলে যেসব মানুষ দিনে এনে দিনে খান, তাদের অবস্থা বেশি নাজুক।’উপজেলার গন্ডামারা ইউনিয়নের শফকত হোসাইন চাটগামী বলেন, ‘এখনও গন্ডামারা, ছনুয়াসহ বেশ কিছু ইউনিয়নে পানিতে তলিয়ে আছে। অনেক পরিবার বাড়িঘরের মায়া ছেড়ে আশ্রয়কেন্দ্রে যাননি।’
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. রুহুল আমিন বলেন, ‘বাঁশখালী উপজেলার ৩০ হাজারের মতো মানুষ এখনো পানিবন্দি আছেন। আগামী কয়েকদিন বৃষ্টি না হলে আশা করছি, পানি নেমে যাবে। অনেকেই নিজ বাড়িতে যেতে শুরু করেছেন। অনেকগুলো মাটির ও কাঁচাঘর বন্যার পানিতে ধসে গেছে। প্রাথমিক হিসেবে মনে হচ্ছে, চার হাজারের বেশি ঘর ধসে পড়েছে। সেগুলো নতুন করে নির্মাণ করতে হবে। আমাদের টিম মাঠে কাজ করছে। কতটি ঘর ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে তার তালিকা করা হচ্ছে।’
বান্দরবানে ক্ষতিগ্রস্ত লক্ষাধিক মানুষ
টানা সাতদিনের অতিভারি বর্ষণ, পাহাড়িঢল ও জলাবদ্ধতায় সৃষ্ট ভয়াবহ বন্যায় বান্দরবান জেলার প্রায় ৭০ শতাংশ এলাকা প্লাবিত হয়েছে। প্রাথমিক হিসাবে জেলার ৩৪টি ইউনিয়নের মধ্যে ২৯টি ইউনিয়নসহ বিস্তীর্ণ জনপদ বন্যাকবলিত হয়ে পড়েছে। এতে অন্তত ১২ হাজার ৫০০ পরিবার সম্পূর্ণ পানিবন্দি হয়ে পড়েছে এবং লক্ষাধিক মানুষ প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন।
দুর্গম পাহাড়ি এলাকার পূর্ণাঙ্গ তথ্য পাওয়া গেলে ক্ষয়ক্ষতির এই পরিমাণ আরও বাড়তে পারে বলে জানিয়েছে জেলা প্রশাসন। গতকাল মঙ্গলবার জেলা প্রশাসকের সম্মেলনকক্ষে সংবাদ সম্মেলনে বন্যার সার্বিক পরিস্থিতি তুলে ধরেন জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ সানিউল ফেরদৌস। সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, ৬ থেকে ১৩ জুলাই সোমবার পর্যন্ত জেলায় মোট ৫১৮ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। তবে গত ২৪ ঘণ্টায় বৃষ্টিপাত কম হওয়ায় (মাত্র ২ মিলিমিটার) সাঙ্গু ও মাতামুহুরী নদীর পানি দ্রুত কমতে শুরু করেছে।
বন্যার চরম সময়ে নদী দুটির পানি বিপৎসীমার সর্বোচ্চ ২ দশমিক ৫ মিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হলেও গতকাল মঙ্গলবার সকাল নয়টায় তা বিপৎসীমার বেশ নিচ দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছিল। চলতি বন্যায় পাহাড়ধসে পাঁচজন এবং পানিতে ডুবে আরও দুজনের মৃত্যু হয়েছে। জেলায় ছোট-বড় মিলিয়ে মোট ৪৭টি স্থানে ভূমিধসের ঘটনা ঘটেছে। পাহাড়ধস ও গাছ উপড়ে পড়ায় ২১টি স্থানে সড়ক যোগাযোগ বন্ধ হয়ে গেলেও সড়ক ও জনপথ বিভাগ, ফায়ার সার্ভিস এবং সেনাবাহিনীর যৌথ প্রচেষ্টায় সড়কগুলো পুনরায় চলাচলের উপযোগী করা হয়েছে।
প্রাথমিক হিসাবে সড়ক ও জনপথ বিভাগের ৬১ কিলোমিটার এবং এলজিইডি ও স্থানীয় সরকারের আওতাধীন আরও ৯০ কিলোমিটার সড়ক মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এ ছাড়া চারটি ছোট-বড় সেতু ও কালভার্ট ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, যার মধ্যে তিনটির সংস্কারকাজ এখনো চলমান। কৃষি বিভাগের প্রাথমিক তথ্যমতে, বন্যায় জেলার দুই হাজার ১০৪ হেক্টর কৃষিজমি ও বাগান ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং ৩৬৮ হেক্টর জমির ফসল সম্পূর্ণ নষ্ট হয়ে গেছে। এতে অন্তত ৫ হাজার ৩২৩ জন কৃষক চরম আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়েছেন।
বান্দরবানের ২২০টি আশ্রয়কেন্দ্রের মধ্যে ৬৭টিতে দুর্গত মানুষ আশ্রয় নিয়েছেন। বর্তমানে এসব আশ্রয়কেন্দ্রে ২ হাজার ৫৮২ জন অবস্থান করছেন।
ত্রাণ কার্যক্রম সম্পর্কে জেলা প্রশাসক জানান, দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয় থেকে ৪০০ টন চাল ও ২০ লাখ টাকা এবং প্রধানমন্ত্রীর ত্রাণ তহবিল থেকে আরও ২০ লাখ টাকা বরাদ্দ পাওয়া গেছে। সাতটি উপজেলায় এসব বরাদ্দ বিতরণ করা হয়েছে।
এছাড়া বান্দরবান পৌরসভার উদ্যোগে প্রতিদিন দুই বেলা করে এ পর্যন্ত প্রায় ৮০ হাজার ৫০০ জন দুর্গত মানুষের মাঝে রান্না করা খাবার বিতরণ করা হয়েছে।
ত্রাণ ও উদ্ধার কাজে জেলা প্রশাসনের পাশাপাশি পুলিশ, সেনাবাহিনী, বিজিবি, ফায়ার সার্ভিস, পৌরসভা, স্থানীয় স্বেচ্ছাসেবক, রাজনৈতিক কর্মী এবং বিভিন্ন বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা (এনজিও) একযোগে কাজ করছে।
তিনি জানান, বন্যার সময় থানচিতে ১৬৭ জন ও রুমায় ৩৭ জন পর্যটক আটকা পড়েছিলেন। সর্বশেষ আমিয়াখুমে আটকে পড়া চারজন পর্যটককে বিজিবির সহায়তায় নিরাপদে উদ্ধার করা হয়েছে। নিরাপত্তার স্বার্থে আজ বুধবার ১৫ জুলাই পর্যন্ত জেলার সব পর্যটনকেন্দ্র বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত বহাল রেখেছে প্রশাসন। সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, বন্যা-পরবর্তী সময়ে পানিবাহিত রোগ প্রতিরোধে জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের মাধ্যমে বিশুদ্ধ পানি ও পানি বিশুদ্ধকরণ ট্যাবলেট বিতরণ করা হচ্ছে।
এছাড়া ক্ষতিগ্রস্তদের ঘরবাড়ি মেরামতের জন্য জরুরি ভিত্তিতে এক হাজার ২০০ বান্ডিল ঢেউটিন এবং প্রতিটি পরিবারের জন্য ঘর নির্মাণ সহায়তা হিসেবে তিন হাজার টাকা করে নগদ বরাদ্দের আবেদন পাঠানো হয়েছে। দীর্ঘমেয়াদে পাহাড়ের পাদদেশে বিশেষ আশ্রয়ণ প্রকল্প বাস্তবায়ন, অবৈধ পাহাড় কাটা বন্ধে পরিবেশ অধিদপ্তরের সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং বান্দরবান পৌর এলাকার জলাবদ্ধতা নিরসনে মাকসি খাল পুনঃসংস্কারের উদ্যোগ নেওয়া হবে বলেও জানান জেলা প্রশাসক।
বন্যার পূর্বাভাস রংপুর বিভাগে
গতকাল মঙ্গলবার বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্রের সহকারী প্রকৌশলী (দায়িত্বরত কর্মকর্তা) নুসরাত জাহান জেরিন স্বাক্ষরিত ‘বৃষ্টিপাত ও নদ-নদীর পরিস্থিতি ও পূর্বাভাস'-এ জানানো হয়েছে,উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় সিলেট, সুনামগঞ্জ ও নেত্রকোনা জেলার নদীসংলগ্ন নিম্নাঞ্চলে বন্যা পরিস্থিতি স্থিতিশীল থেকে ধীরে ধীরে উন্নতি হতে পারে। একই সঙ্গে উত্তরাঞ্চলীয় নীলফামারী ও লালমনিরহাট জেলার তিস্তা নদীসংলগ্ন নিম্নাঞ্চলে বন্যা পরিস্থিতির উন্নতি হতে পারে। তবে ফের স্বল্পমেয়াদি বন্যার শঙ্কা রয়েছে রংপুর বিভাগের কয়েকটি জেলায়। কেন্দ্রটির বন্যা সতর্কবার্তায় বলা হয়েছে, দেশের নদ-নদীর পাঁচটি স্টেশনে পানি বিপৎসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। তিস্তা নদীর ডালিয়া (নীলফামারী); সুরমা নদীর ছাতক (সুনামগঞ্জ), কুশিয়ারা নদীর মারকুলি (সুনামগঞ্জ), ফেঞ্চুগঞ্জ (সিলেট) ও সোমেশ্বরী নদীর কলমাকান্দা (নেত্রকোনা) স্টেশনে পানি বিপৎসীমার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে।
রংপুর জেলায় তিস্তা নদীর কাউনিয়া স্টেশনে সাময়িকভাবে বিপৎসীমা অতিক্রম করতে পারে। এ কারণে নদীসংলগ্ন নিম্নাঞ্চলের কোথাও কোথাও স্বল্পমেয়াদি বন্যা পরিস্থিতির উদ্ভব হতে পারে। এছাড়া গাইবান্ধা ও কুড়িগ্রাম জেলায় তিস্তা, ধরলা ও দুধকুমার নদীসমূহ সতর্কসীমায় প্রবাহিত হতে পারে। এ কারণে নদীসংলগ্ন নিম্নাঞ্চল সাময়িকভাবে প্লাবিত হতে পারে।
বৃষ্টিপাতের পূর্বাভাস
বৃষ্টিপাতের পূর্বাভাসে বন্যা তথ্য কেন্দ্র জানিয়েছে, আগামী ৭২ ঘণ্টায় দেশের অভ্যন্তরে ও উজানে ভারতের আসাম, মেঘালয়, অরুনাচল ও পশ্চিমবঙ্গ প্রদেশে মাঝারি থেকে মাঝারি-ভারি বৃষ্টিপাতের পূর্বাভাস রয়েছে। এদিকে আবহাওয়া অধিদপ্তর পূর্বাভাসে জানিয়েছে, মৌসুমি বায়ু বাংলাদেশের উত্তরাংশে সক্রিয় এবং দেশের অন্যত্র মোটামুটি সক্রিয় ও উত্তর বঙ্গোপসাগরে মাঝারি অবস্থায় বিরাজমান রয়েছে। এ অবস্থায় দেশের সব বিভাগে আজ বুধবার বজ্রসহ বৃষ্টি হতে পারে। এ ছাড়া কোথাও ভারি বর্ষণ হওয়ার আশঙ্কা করছে অধিদপ্তর। দেশজুড়ে তাপমাত্রা তিন ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত বাড়তে পারে বলেও পূর্বাভাস দিয়েছে সংস্থাটি।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









