একবিংশ শতাব্দীতে উন্নয়নশীল দেশে নগরায়ন ঘটবে-এটা স্বাভাবিক। নগরায়ন ঘটার সাথে পরিকল্পিত সুয়েরেজ ব্যবস্থা, প্রকৃতি প্রদত্ত গাছগাছালি ও মানুষের জীবন যাপনের মান উন্নীত হওয়া জরুরি। ঢাকা দেশের রাজধানী, ক্রমশঃ বাসযোগ্যতা হারাচ্ছে- ইট কাঠ পাথরের বহুতল ভবনের ভীড়ে মানুষের মানবিকতার অবসান, কর্মসংস্থানের অভাব, স্ফীত জনবসতি ঢাকার নিত্যসঙ্গী।
নগর উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের নকশা, যথাযথ প্রকৌশল তত্ত্বাবধান, গ্যাস, বিদুৎ, পানির ব্যবহার যথাযথ সরবরাহ ব্যবস্থা সঠিক করা হয়নি, ঢাকা, চট্টগ্রাম বরিশাল, কুমিল্লা, রাজশাহী,রংপুর সহ দেশের বৃহৎ এলাকা এক ভুতুড়ে নগরীতে পরিনত হয়েছে। হঠাৎ বৃষ্টি, বন্যা হলে স্বাভাবিকভাবে জলাবদ্ধতার কবলে পড়তে হয় নগরবাসীকে। সম্প্রতি বৃষ্টিপাতের কারণে নিউ মার্কেট এলাকার দোকান পাট বনানীর রাস্তাঘাট ও কবর স্থান, উত্তরা, গুলশান সহ বিভিন্ন এলাকার জীবন প্রবাহ থমকে গেছে।
কেনাবেচা বন্ধ থেকেছে। যান চলাচল ও স্বাভাবিক জীবনযাত্রা বাধাগ্রস্থ হয়েছে। বানিজ্যিক নগরী চট্টগ্রাম এলাকার বিপুল এলাকা এখন পর্যন্ত জলমগ্ন রয়েছে।
বাংলাদেশের বিশাল এলাকার নিত্য ব্যবহার্য দ্রব্যাদি চট্টগ্রাম থেকে বিভিন্ন কন্টেনারের মাধ্যমে বিশেষ যানবাহন ট্রেন, ট্রাক ও বাসের মাধ্যমে আসে।নগরায়ন অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ঘটায়।
নাবায়ন পরিকল্পনা মাফিক না হওয়ায় বিশৃঙ্খল অবস্থা মারাত্মক সংকট তৈরী করে। জলাবদ্ধতা প্রধান বাঁধা।
বর্ষা মৌসুমে স্বাভাবিক চলাচল, অর্থনীতি ও জনস্বাস্থ্যের উপর জলাবদ্ধতা প্রত্যক্ষ প্রভাব বিস্তার করে। টেকসই ভবিষ্যৎ নির্মানে অপরিকল্পিত নগরায়নের বিপত্তি দূর করতে না পারলে উন্নয়ন যথাযথ হয় না। শহর গুলোতে দীর্ঘমেয়াদী ও সুদূর দৃষ্টি গ্রাহ্য পরিকল্পনা গড়ে ওঠেনি। পরিবেশ অনুকূলে না থাকায় রাস্তায় ধোয়া উদগীরণ, পরিবেশ দুষন বেড়েছে। জীবন যাত্রা ভারসাম্যহীন হয়ে পড়ছে দিন দিন। যত্রতম ভবন উঠছে। প্রশস্ত রাস্তা নেই- ঢাকা ও চট্টগ্রামকে বহুতল ভবনের শহর বলা শ্রেয়। খোলা জায়গা নেই- পানি জমে থাকলে তা বের হবাব পথ বন্ধ থাকছে। জলাশয়, পয়ঃনিষ্কাশ ব্যবস্থা, উচু সড়কের অভাব ও সবুজায়ন নেই।
চারদিকে ধূলি, গ্যাস বিচ্ছুরিত নগরচিত্র দেখতে পাওয়া যায়। সুনির্দিষ্ট জোনিং ব্যবস্থা ছাড়া জলাশয় ভরাট করে বাড়ি ঘর ভরাট করে আকাশ স্পর্শ করার প্রতিযোগীতা তীব্র করা হয়েছে। নদী খালবিল ও পুকুর নেই, যা আছে সেখানের উচু স্থান থেকে নীচুতে পানি প্রবাহ নেমে যাবার পথ নেই।কংক্রিট, ইমারতের নগরী দিন দিন ঝুঁকিপ্রবন হয়ে উঠছে। রাজধানী শহর ঢাকায় ধারন ক্ষমতার চেয়ে দুই/তিন গুন মানুষ বাস করছে।
প্রকৃতিতে পানি নিষ্কাশন জন্য পুকুর ও সমুদ্র যাওয়ার গতি প্রবাহ থাকে। নগর বাসীরা তা বন্ধ করে দিয়েছে। প্রাকৃতিক এই ধারাবাহিকতা বহু আগেই ছিন্ন হয়ে গেছে। কংক্সিটের রাস্তায় পানি জমে থাকে, নীচে যাওয়ার পথ নেই। জলাশয় ময়লা আবর্জনায় ভরা। বুড়ি গঙ্গা এখন আগের মতো স্রোতস্বিনি নেই। নেকলকারখানা ও চিকিৎসা বর্জ্য বিভিন্ন উপাদানে ভরপুর। কৃত্রিম বন্যা বা বৃষ্টিতে পানি সমুদ্র যাবে সে পথ দীর্ঘদিন বন্ধ হয়ে আছে। আধুনিক নগর গড়ে তোলার পেছনে এখন মনযোগী হতে হবে।জলাবদ্ধতায় যানবাহন চলাচল বন্ধ থাকায় কলকারখানার শ্রমিক, পেশাজীবীরা নির্দিষ্ট সময়ে কর্মক্ষেত্রে যেতে পারেন না। উৎপাদন ক্ষতিগ্রস্থ হয়, ব্যবসার ক্ষতি ও সম্পদ নষ্ট হওয়ার আশংক সৃষ্টি হয়।
নোংরাও দুষিত পানিতে রোগ ব্যধি বৃদ্ধি পায়। ডায়রিয়া জন্ডিস টাইফয়েড ও পানিবাহিত রোগের বিস্তার ঘটে। পরিষ্কার পানিতে এডিস মশার প্রজনন বৃদ্ধি পায় চিকুনগুনিয়া, ডেংগুর প্রাদুর্ভাব ঘটে। রাস্তায় পানি জমে পিচের ঢালাই নষ্ট হওয়ায় রাস্তার স্বাভাবিক চেহারার পরিবর্তন হয়ে এবড়ো থেবড়ো গর্ত হয়।ভবনের বেসমেন্ট নষ্ট হয়ে যায়। কাঠামোগত স্থায়িত্ব দূর্বল হয়ে পড়ে। ড্রেন ও রাস্তার পানি দূষিত হয়। তীব্রগন্ধ, মশা পোকামাকড়, মাছি, সংক্রামক জীবাণু ও প্রাণির আধিক্য বাড়ে। এসব সমস্যা দূরীকরনে নতুনভাবে ভাবতে হবে, জলাশয় উদ্ধার ও খনন কাজ দ্রুত গ্রহণ করা আবশ্যক।
মহল খাল দখল করে ইমারত নির্মান করেছে, এগুলো পূনউদ্ধারে ব্যবস্থা গ্রহন করতে হবে। খালের পাড় বাধাই, ভরাট খালে জমে থাকা বর্জ্য উদ্ধারের ব্যবস্থা করতে হবে ব্যক্তি, রাজনীতি, দল ও মতের ঊর্ধ্বে থেকে। নদীর সাথে খালের ও সমুদ্রের চলাচল ব্যবস্থা চালু করার জন্য বাস্তবমুখী পরিকল্পনা না করতে পারলে জন ভোগান্তি কমবে না। উন্নত দেশের মতো স্পঞ্জ সিটি তৈরীর পরিকল্পনা গ্রহন করতে হবে।পানি শোষনের ব্যবস্থা গ্রহণ করতে পারলে রাস্তাঘাট সহজে ডুববে না। কংক্সিট ফুটপাতের পরিবর্তে পানি ভেদ্য পেভমেন্ট ব্যবহার অগ্রাধিকার দেয়া প্রয়োজন। রুফ টপ বা ছাদ বাগানে পর্যাপ্ত বৃক্ষরাজি সংযোজন বাধ্যতামূলক করা প্রয়োজন। শহর গুলোতে কৃত্রিম জলাধার নির্মান বিষয় ভাবতে হবে। পুরোন ড্রেনেজ ব্যবস্থার পরিবর্তে করে ১ আধুনিক, ড্রেনেজ ব্যবস্থা .....২ ভৌগলিক ব্যবস্থা অনুযায়ী ড্রেনেজ ম্যাপ নির্মাণ বিষয়ে ব্যবস্থা নেয়া এ মুহূর্তে সারাবিশ্বের সাথে তাল মিলিয়ে বাংলাদেশকে চলতে হবে। ড্রেনের স্পেস বাড়িয়ে ধারণ ক্ষমতা বৃদ্ধি ও আধুনিকায়তন করলে পানি নিম্নমুখী খাল ও নদীতে যাবে।সংযোগ করার পরিকল্পনা বিয়ে প্রকল্প গ্রহন ও শক্তিশালী পাম্প স্টেশন স্থাপন জলাবদ্ধতা দূরীকরণে সহায়ক হতে পারে।
বর্জ্যকে শিল্পের মালামাল করে তোলা, বজ্র ড্রেনে না ফেলে অন্য কোন স্থানে রাখার ব্যবস্থাপনা প্রয়োজন। বর্জ্যকে শিল্পের কাচামাল করার ধারণা চালু করার বিকল্প নেই।নতুন উদ্ভাবনী বিবেচনা করা যেতে পারে যেখান থেকে বর্জ্য আসছে সেখানে এর সুষ্ঠু ব্যবহারের বিষয় ভাবনার উৎসমূল হবে।
পলিথিন ও চিকিৎসা বর্জ্য, ময়লা আবর্জনা গ্যাস ও অন্যান্য উৎপাদন সৃষ্টিতে কাজে লাগানোর ব্যবস্থা জলাবদ্ধতা পরবর্তী করণীয় বিবেচ্য হবে অপরিহার্য। ড্রেনে ছাকনী ও বিশাল বর্জ্য ধারণের ব্যবস্থা আটকে দেয়া নতুন উদ্ভাবন। ইতোমধ্যে ঢাকা চট্টগ্রামের ড্রেনেজ ব্যবস্থা নিয়ন্ত্রণ সিটি করপোরেশনের উপর দেওয়া হয়েছে। এটা বাস্তবমুখী পদক্ষেপ। ওয়াশা, সিটি করপোরেশন ও প্রকৌশল অধিদপ্তরের মধ্যে একটি সমন্বিত কর্ম পরিকল্পনা শহর সমূহের জলাবদ্ধতা দূর করতে পারে- সেদিকেই লক্ষ্য রাখতে হবে।
রাজউক ভবন ও স্থাপনা নির্মানে অনুমোদন করেছে কিনা দেখতে পারে স্থানীয় সরকার মন্ত্রনালয়। অনুমোদনহীন ভবন (আবাসন) অনুমোদনের সময় কর্তৃপক্ষের নিয়ম নীতিতে জলাধার ও উন্মুক্ত স্থান রাখা হয়েছে কিনা তার দেখভাল করা জরুরী। উন্নত বিশ্ব জলাবদ্ধতা নিরসনে যেসব পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে তা থেকে, আমাদের শিক্ষা নিতে হবে বিশেষ করে টোকিওতে মাটির নীচে বিশাল জলাধার সুরঙ্গ নির্মান করা হয়ে থাকে, সেখানে বৃষ্টির পানি জমা হয়, রাস্তাঘাট কিংবা জনবহুল এলাকায় বৃষ্টির পানি জলাধারে চলে যায়।
পরে বিশেষ পাম্পের মাধ্যমে পানি নদীতে প্রবাহিত করা হয়। সিঙ্গাপুরে পুরো শহর এলাকায় অতি বৃষ্টির পানি ধারনের বিশেষ ব্যবস্থা রাখা হচ্ছে। ড্রেনগুলোর দৃষ্টি নন্দন রূপ দেয়ার পাশাপাশি পানি থাকলে নগরের সৌন্দর্য বাড়তে পারে। চীনে স্পঞ্জ সিটির পাইলট প্রজেক্ট চালু আছে। একটি পরিকল্পিত নগর জনগনের কর্মস্পৃহা বাড়ায়, এতে জনভোগান্তি কমে, যানমালের সেদিকেই নিরাপত্তা বজায় থাকে-আমাদের অগ্রসর হতে হবে।
লেখক : প্রাবন্ধিক ও গবেষক


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









