অতিবৃষ্টি ও পাহাড়িঢলে টানা আটদিনের ভয়াবহ বন্যার পর চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, বান্দরবান, খাগড়াছড়ি ও রাঙামাটি জেলা থেকে পানি নেমে যাচ্ছে। ধীরে ধীরে বন্যা পরিস্থিতির উন্নতি হচ্ছে হবিগঞ্জ, মৌলভীবাজার ও সিলেট (একাংশ) জেলায়ও। দুই জেলার নদীসংলগ্ন নিম্নাঞ্চলে ফের বন্যার আভাস দিয়েছে বন্যা পূর্বাভাস ও সতর্কীকরণ কেন্দ্র। সতর্কবার্তায় বলা হয়, আজ বৃহস্পতিবার মৌলভীবাজার ও হবিগঞ্জ জেলার মনু ও খোয়াই নদীসংলগ্ন নিম্নাঞ্চল সাময়িকভাবে প্লাবিত হতে পারে।
একই সঙ্গে রংপুরে বিভাগের তিন জেলায় তিস্তার পানি বিপৎসীমার ওপর থাকায় স্বল্পমেয়াদি বন্যা হতে পারে বলে আশঙ্কা করছে সংস্থাটি। অন্যদিকে, উত্তর-পশ্চিম বঙ্গোপসাগর ও তৎসংলগ্ন উত্তর উড়িষ্যা-পশ্চিমবঙ্গ উপকূলীয় এলাকায় একটি লঘুচাপ সৃষ্টি হওয়ায় দেশের চারটি সমুদ্রবন্দরে তিন নম্বর সতর্কতা সংকেত জারি করেছে আবহাওয়া অধিদপ্তর। এর প্রভাবে ঝড়ো হাওয়া কমলে বৃষ্টি বাড়বে বলেও জানিয়েছে সংস্থাটি।
এদিকে বৃষ্টিপাত কমে যাওয়ায় প্লাবিত আটটি জেলায় এখন স্পষ্ট হয়ে উঠছে সড়ক, সেতু, বেড়িবাঁধ, কৃষিজমি, মৎস্য খামার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও বসতবাড়ির ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির চিত্র। তবে, এসব খাতে ক্ষতিগ্রস্ত মোট জেলার সংখ্যা ৪৩টি। কেবল মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ খাতেই প্রাথমিকভাবে ক্ষতির পরিমাণ প্রায় ৪০০ কোটি টাকা, চূড়ান্ত হিসাবে যা আরও বাড়তে পারে। কৃষিখাতে ক্ষয়ক্ষতির আর্থিক পরিমাণ এখনো নিরূপণ করা হয়নি। খামার, পুকুর, দীঘি মিলিয়ে অবকাঠামোগত ক্ষতি ৪৩ কোটি ৮২ লাখ ৪৩ হাজার টাকার। এর মধ্যে ১৬ কোটি ৭৪ লাখ টাকার জলযান ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এ ছাড়া মাছ, মাছের পোনা, চিংড়ি ও খামারের অবকাঠামো ভেসে গিয়েও বিপুল অঙ্কের ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে।
সাগরে ফের লঘুচাপ, ফিরছে ভারি বৃষ্টি
আবহাওয়াবিদ ওমর ফারুকের স্বাক্ষর করা সতর্কবার্তায় গতকাল বুধবার চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, মোংলা ও পায়রা সমুদ্রবন্দরগুলোকে সংকেত দেখাতে বলা হয়েছে। ওই সতর্কবার্তায় লঘুচাপের কথা তুলে ধরে বলা হয়েছে, এর প্রভাবে সমুদ্র বন্দর, উত্তর বঙ্গোপসাগর ও তৎসংলগ্ন বাংলাদেশের উপকূলীয় এলাকার ওপর দিয়ে ঝড়ো হাওয়া বয়ে যেতে পারে। তাই উত্তর বঙ্গোপসাগরে অবস্থানরত মাছ ধরার নৌকা ও ট্রলারগুলোকে উপকূলের কাছাকাছি এসে সাবধানে চলাচল করতে বলা হয়েছে। আবহাওয়াবিদ মো. ওমর ফারুক বলেন, ‘আগামী ২৪ ঘণ্টার জন্য এই সতর্কবার্তা। তবে পরের দিনও বঙ্গোপসাগরে সতর্ক থাকতে হবে।’ এ ছাড়া ঝড়ো হাওয়া কমলে বৃষ্টি বাড়বে বলেও জানিয়েছেন তিনি।
মৎস্য খাতেই ক্ষতি ৩৬৯ কোটি টাকা
চলমান বন্যা ও ও পাহাড়ধসে দেশের আটটি জেলায় এখন পর্যন্ত প্রাণহানি ঘটেছে ৫৬ জনের, আহত হয়েছেন আরো ৩৯ জন। বন্যাদুর্গতদের মোট সংখ্যা এক লাখ ৫৫ হাজার ৩১১টি পরিবারের ছয় লাখ নয় হাজার ৪৪১ জন। দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয়ের তথ্যানুসারে, এসব জেলার ৫৯টি উপজেলার ৩৩৪টি ইউনিয়ন ও ১২টি পৌরসভা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
এদিকে ৫ জুলাই রাত থেকে টানা কয়েকদিনের অতিভারি বৃষ্টি ও পাহাড়িঢলে দেশের ৪৩টি জেলার ফসলিজমি, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ খাত ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। সরকারি প্রতিবেদনের তথ্য বলছে, কেবল মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ খাতেই প্রাথমিকভাবে ক্ষতির পরিমাণ প্রায় ৪০০ কোটি টাকা, চূড়ান্ত হিসাবে যা আরও বাড়তে পারে। ৪২টি উপজেলার ৬০২টি ইউনিয়নের ৩০ হাজার ৩৬টি পুকুর, দীঘি, ঘের, খামার বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হয়েছে চট্টগ্রাম বিভাগে। বন্যায় এ বিভাগে ৩১৪টি ইউনিয়নে ১৯ হাজার ৬২৩টি পুকুর বা দীঘি এবং ৭৮৪টি চিংড়ি ঘের সম্পূর্ণ ভেসে গেছে। ভেসে যাওয়া মাছ, চিংড়ি ও পোনা, মৎস্য খাতের অবকাঠামো, জাল ও নৌকার ক্ষতিসহ সবমিলিয়ে চট্টগ্রাম বিভাগে মোট আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ ১৭৪ কোটি ২৯ লাখ ৮ হাজার টাকা।
অন্যদিকে, এই প্রাকৃতিক দুর্যোগে প্রাণিসম্পদ খাতে শুধু চট্টগ্রাম বিভাগেই সর্বমোট ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৩০ কোটি ১৫ লাখ ৪৪ হাজার টাকা। মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের প্রাথমিক প্রতিবেদন অনুসারে বন্যার পানি ও চারণভূমি প্লাবিত হওয়ায় গবাদিপশু ও হাঁস-মুরগির তীব্র খাদ্যসংকট, বাসস্থান ধ্বংস এবং নানাবিধ রোগবালাইয়ের কারণে খামারিরা চরম আর্থিক বিপর্যয়ের সম্মুখীন হয়েছেন।
চট্টগ্রাম বিভাগের চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, বান্দরবান, রাঙামাটি ও খাগড়াছড়ি ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এই জেলাগুলোর মোট ৩৬টি উপজেলা এবং ১৫৬টি ইউনিয়ন সরাসরি বন্যার কবলে পড়েছে। এছাড়া মৌলভীবাজার ও হবিগঞ্জ জেলার কয়েকটি উপজেলা বন্যার কবলে পড়েছে। দুর্যোগোত্তর পরিস্থিতি সামাল দিতে সরকারের প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর মাঠ পর্যায়ে নিবিড় কার্যক্রম পরিচালনা করছে বলে ভাষ্য অধিদপ্তরের। মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী সুলতান সালাউদ্দিন টুকু বলেন, ‘আমাদের যেই যেই জায়গায় বন্যা হয়েছে, আমাদের অফিসার যারা রয়েছেন মাঠ পর্যায়ে, তাদেরকে আমরা পুরো তালিকা করতে বলেছি, কোথায় কী ক্ষতি হয়েছে। সেই অনুসারে ক্ষয়ক্ষতি নিরূপণ করে পরবর্তীতে পদক্ষেপ নেব।’
১ লাখ ১৪ হাজার হেক্টর জমির ফসল আক্রান্ত
টানা অতিবৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলে ৪৩টি জেলায় বড় ধরনের ফসলিজমিরও ক্ষতি হয়েছে। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের প্রাথমিক প্রতিবেদনে দেখা গেছে, গত ৬ জুলাই থেকে ১৩ জুলাই পর্যন্ত এক সপ্তাহের ব্যবধানে এসব জেলায় মোট ১ লাখ ১৪ হাজার ৭২৩ হেক্টর ফসলি জমি প্লাবিত ও আক্রান্ত হয়েছে। এর ফলে দেশের ৫ লাখ ২৬ হাজার ৮৭৪ জন কৃষক সরাসরি আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়েছেন।
কৃষি বিভাগের সর্বশেষ হিসাব অনুযায়ী, আক্রান্ত জেলাগুলোর মধ্যে দেশের প্রায় সবকটি বিভাগের বিস্তীর্ণ অঞ্চল রয়েছে। জেলাগুলো হলো—চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, নোয়াখালী, সুনামগঞ্জ, মৌলভীবাজার, রাঙামাটি, খাগড়াছড়ি, বান্দরবান, সিরাজগঞ্জ, হবিগঞ্জ, নওগাঁ, খুলনা, বাগেরহাট, নড়াইল, ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ, গাজীপুর, নরসিংদী, মুন্সীগঞ্জ, মানিকগঞ্জ, কিশোরগঞ্জ, ঝিনাইদহ, মাগুরা, বরিশাল, ঝালকাঠি, পটুয়াখালী, বরগুনা, ভোলা, গাইবান্ধা, কুমিল্লা, চাঁদপুর, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, সিলেট, যশোর, কুষ্টিয়া, চুয়াডাঙ্গা, মেহেরপুর, পাবনা, ফরিদপুর, গোপালগঞ্জ, রাজবাড়ী, শরীয়তপুর ও মাদারীপুর। অধিদপ্তরের তথ্যমতে, চলতি মৌসুমে এই ৪৩টি জেলায় মোট ১৩ লাখ ৭৫ হাজার ৬৪৯ হেক্টর জমিতে বিভিন্ন ফসলের আবাদ হয়েছে, যার মধ্যে ১৩ লাখ ৭ হাজার ২৪৭ হেক্টর ফসলি জমি মাঠে দন্ডায়মান ছিল। আকস্মিক পানি বৃদ্ধিতে ১ লাখ ১৪ হাজার হেক্টরের বেশি জমির ফসল আক্রান্ত হয়েছে, যা মাঠের মোট ফসলের একটি বড় অংশ।
জাতীয় চিত্রে দেখা গেছে, সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হয়েছে আউশ ধান, আমন বীজতলা এবং গ্রীষ্মকালীন সবজির। জাতীয়ভাবে আউশ আবাদের ৭৯ হাজার ৫৫০ হেক্টর এবং আমন বীজতলার ১০ হাজার ৫০৪ হেক্টর জমি আক্রান্ত হয়েছে। এর ফলে ১ লাখ ৭২ হাজার ৬৪৯ জন আউশ চাষি এবং ১ লাখ ৭০ হাজার ২৬৭ জন আমন বীজতলা ক্ষতিগ্রস্ত চাষি চরম সংকটে পড়েছেন। এছাড়া ১৭ হাজার ৮৩৪ হেক্টর গ্রীষ্মকালীন সবজি আক্রান্ত থাকায় বিপাকে পড়েছেন দেশের ১ লাখ ৫৪ হাজার ১৩৬ জন সবজি চাষি। অন্যদিকে পাট চাষে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন ৩ হাজার ৭৬২ জন কৃষক, যেখানে ৭২৩ হেক্টর পাটখেত আক্রান্ত হয়েছে।
জেলা ভিত্তিক ক্ষয়ক্ষতির চিত্র বিশ্লেষণে দেখা যায়, চট্টগ্রামের ৩০ হাজার ২৩ হেক্টর আউশ আবাদ, ২ হাজার ৭২২ হেক্টর আমন বীজতলা এবং ১৭ হাজার ৮২৮ হেক্টর জমির গ্রীষ্মকালীন সবজি আক্রান্ত হয়েছে। এই জেলায় সম্ভাব্য ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকের সংখ্যা সবচেয়ে বেশি। কক্সবাজারে ৩ হাজার ৪৫০ হেক্টর জমির আউশ আবাদ, ৮৯৫ হেক্টর জমির আমন বীজতলা এবং ২ হাজার ৭২০ হেক্টর সবজিক্ষেত ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এ ছাড়া নোয়াখালীতে ৩১ হাজার ৪৯৬ হেক্টর জমির আউশ, ২ হাজার ৭৩২ হেক্টর জমির আমন বীজতলা এবং ১১ হাজার ৬৮৭ হেক্টর সবজিখেত আক্রান্ত হয়েছে। পাহাড়ি জেলা রাঙামাটিতে ৭ হাজার ৫৭৪ হেক্টর জমির আউশ এবং বান্দরবান জেলায় ১৩৫ দশমিক ৮ হেক্টর জমির গ্রীষ্মকালীন সবজি আক্রান্ত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে।
উপকূলীয় ও দক্ষিণাঞ্চলের জেলা বরগুনায় আউশ আবাদের বড় বিপর্যয় ঘটেছে। জেলাটিতে আবাদ হওয়া আউশের মধ্যে ৩২ হাজার ২৩৩ দশমিক ৫ হেক্টর জমি আক্রান্ত হয়েছে, যা এ অঞ্চলের জন্য একটি বড় আঘাত। পাশাপাশি জেলাটিতে ৭৬৩ দশমিক ৩৫ হেক্টর গ্রীষ্মকালীন সবজিও বন্যার পানিতে তলিয়ে গেছে। পাশের জেলা ঝালকাঠিতে ৯৫০ হেক্টর আউশ ও ৮৫০ হেক্টর আমন বীজতলা এবং পটুয়াখালীতে ৫২০ হেক্টর আউশ আবাদ আক্রান্ত হয়েছে। বরিশালের চিত্রও আশঙ্কাজনক, সেখানে ৫৪০ হেক্টর আউশ এবং ১ হাজার ৪৪০ দশমিক ৫ হেক্টর গ্রীষ্মকালীন সবজি আক্রান্ত হয়েছে। ভোলা জেলায় ৪৫০ হেক্টর আউশ জমির ফসল আক্রান্ত হয়েছে। বন্যা ও অতিবৃষ্টির হাত থেকে রেহাই পায়নি দেশের অন্যতম অর্থকরী ও মসলা জাতীয় ফসলও। সারাদেশে মোট ৭৫৩ হেক্টর মরিচের ক্ষেত আক্রান্ত হয়েছে। এর মধ্যে মেহেরপুর জেলায় সর্বোচ্চ ২১০ হেক্টর মরিচের জমি আক্রান্ত হয়েছে, আর পাবনায় আক্রান্ত হয়েছে ৯৪ হেক্টর জমি। এ ছাড়া চুয়াডাঙ্গায় ১০ হেক্টর এবং চাঁদপুরে ৬ হেক্টর মরিচক্ষেত পানির নিচে চলে গেছে।
অন্যদিকে মৌলভীবাজারে ৭৪৫ হেক্টর আদা ও ৬৪৮ হেক্টর হলুদ এবং রাঙামাটিতে ২৪০ হেক্টর ফলবাগান আক্রান্ত হয়েছে। বরিশালে ১৬৪ হেক্টর ও পটুয়াখালীতে ৩২ হেক্টর পানবরজ আক্রান্ত হয়েছে। দেশের অন্যান্য অঞ্চলের মধ্যে নওগাঁয় ৪ হাজার ৩৪০ হেক্টর আউশ আবাদ, ২৪৬ হেক্টর আমন বীজতলা এবং ১৭৪ হেক্টর জমির সবজি আক্রান্ত হয়েছে। যশোরে ৬৮২ হেক্টর জমির আউশ আবাদ, ৩১০ হেক্টরের বোনা আমন এবং ৪৫৩ হেক্টর জমির গ্রীষ্মকালীন সবজি আক্রান্ত হয়েছে। কুষ্টিয়ায় ১৫৫ হেক্টর জমির আউশ আবাদ ও ৯২ হেক্টর আমন বীজতলা আক্রান্ত হওয়ার খবর এসেছে।
ঢাকা বিভাগে ঢাকার ৩০ হেক্টর জমির আউশ আবাদ ও ৫৯ দশমিক ৫ হেক্টর জমির সবজি, নরসিংদীতে ২২ হেক্টর জমির আউশ ও ২৪৩ দশমিক ৭৫ হেক্টর জমির সবজি এবং মুন্সীগঞ্জে ৬৬ হেক্টর জমির গ্রীষ্মকালীন সবজি আক্রান্ত হয়েছে। ফরিদপুরে ৪৩ হেক্টর ও রাজবাড়ীতে ১৮০ হেক্টর জমির সবজি আক্রান্ত হয়েছে। শরীয়তপুরে শেষ মুহূর্তে ১৪০ হেক্টর জমির সবজি ও ৫০ হেক্টর বোনা আমন আক্রান্ত হওয়ার তথ্য পাওয়া গেছে। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর জানিয়েছে, এই ক্ষয়ক্ষতি নিরূপণ মূলত প্রাথমিক প্রতিবেদনের ওপর ভিত্তি করে তৈরি। অনেক এলাকায় এখনো পানিবন্দি অবস্থা রয়েছে। বন্যা পরিস্থিতি সম্পূর্ণ উন্নত হলে চূড়ান্ত ক্ষয়ক্ষতির সুনির্দিষ্ট পরিমাণ জানা সম্ভব হবে। ইতোমধ্যে ক্ষতিগ্রস্ত চাষিদের তালিকা তৈরি ও জরুরি কৃষি প্রণোদনা নিশ্চিত করতে মাঠ পর্যায়ের কর্মকর্তাদের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের সরেজমিন শাখার পরিচালক মো. ওবায়দুর রহমান মণ্ডল বলেন, ‘চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, বান্দরবান, রাঙামাটি আমাদের তো সাতটা (জেলা) ‘ব্যাডলি অ্যাফেক্টেড’। পানি নেমে গেছে কিছু জায়গায়। পুরোপুরি নেমে গেলে ক্ষতির পরিমাণটা নিরূপণ হবে। তারপর ওখানে পদক্ষেপটা আমরা নেব। সেটা আমনের প্রণোদনা হতে পারে, শাকসবজি হতে পারে। কৃষিসচিব রফিকুল ই মোহামেদ বলেন, ‘আমরা সবচেয়ে বেশি যেটা ক্ষতির পরিমাণ, যেটা নিরূপণ করা হচ্ছে, সেটা হলো আমাদের বীজতলা ক্ষতিগ্রস্ত। নতুন বীজতলা নির্মাণের ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। আমাদের এই পূর্বাঞ্চল যেটা বৃহত্তর চট্টগ্রাম অঞ্চল, ক্ষতির পরিমাণ বেশি। ওখানে একজন প্রতিমন্ত্রী আছেন দায়িত্ব নিয়ে। আর কালকে অপরাহ্নে কৃষিমন্ত্রী নিজে ওখানে অবস্থান নেবেন। কৃষকদের কাছে কাছে দাঁড়াবেন, পাশে দাঁড়াবেন। যার যা, যে যে প্রয়োজন, সব দেওয়া হবে। সরকার পাশে আছে, ক্ষতিগ্রস্ত প্রত্যেক কৃষকের পাশেই সরকার।’
ত্রাণ বিতরণে দুর্নীতি ও স্বজনপ্রীতির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা
দুর্যোগ ও ত্রাণমন্ত্রী আসাদুল হাবিব দুলু বলেছেন, ত্রাণ বিতরণে কোনো ধরনের দুর্নীতি ও স্বজনপ্রীতির অভিযোগ এলে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে। আমাদের একদম দ্ব্যর্থহীন কণ্ঠে বলা রয়েছে, কোনো রকম দুর্নীতি স্বজনপ্রীতিকে আমরা বরদাস্ত করব না।
গতকাল বুধবার দুপুরে চট্টগ্রামের বাঁশখালীর খানখানাবাদ ইউনিয়নে বন্যার্তদের ত্রাণ বিতরণ শেষে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে তিনি এসব কথা বলেন। মন্ত্রী বলেছেন, বিশেষ করে বন্যা প্লাবিত মানুষের ক্ষেত্রে কোনো রাজনীতি নাই। যারাই দুর্গত তাদের ত্রাণ দিতে হবে। আর এ ধরনের কোনো অভিযোগ যদি আসে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা গ্রহণ করব আমরা।
এর আগে খাল পরিদর্শন করে মন্ত্রী বলেন, ‘আমাদের প্রতিশ্রুতি ছিল, আমরা রাষ্ট্রক্ষমতায় গেলে বাংলাদেশের খালগুলোকে পুনঃখনন করব। শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান খাল কেটে যে বিপ্লব করেছিলেন। তখন খাদ্যে আমাদের ঘাটতি ছিল। এই খাল কাটার মাধ্যমে খাদ্য উদ্ধৃত্ত হয়েছিল। সেই খাদ্য বিদেশে রফতানি করা হয়েছিল। আজকে আমি সরেজমিন দেখলাম, খাল কাটার ফলে অনেকখানি পানি নিষ্কাশন হয়েছে। আমাদের উদ্দেশ্যটা হচ্ছে, বর্ষাকালে পানি নিষ্কাশন যেমন হবে, শুকনা মৌসুমে পানি ধরে রাখব আমরা। খালের পাড়ে আমরা কাজ লাগাব।’
তিনি আরো বলেন, ‘খালের বাকি অংশটা যাতে সামনের শুকনা মৌসুমে সম্পন্ন করা যায় সেজন্য আমি আমার মন্ত্রণালয় থেকেও বরাদ্দ দেব। খালটাকে আরো সুন্দর করার জন্য আমি নির্দেশনা দিয়ে গেলাম। আমাদের বাংলাদেশের ৫০টি জেলায় একটি মডেল খাল আমরা চিহ্নিত করব। আশা করি এই খালটাকেও আমরা মডেল খালের মধ্যে নিয়ে আসতে পারব। এরপর তিনি খানখানাবাদ ইউনিয়ন পরিষদ ভবনে বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের মাঝে ত্রাণ বিতরণ করেন।’
এ সময় জেলা প্রশাসক জাহিদুল ইসলাম মিঞা, দক্ষিণ জেলা বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক মিশকাতুল ইসলাম চৌধুরী পাপ্পাসহ অন্যরা ছিলেন। এদিকে বন্যা মোকাবিলায় মঙ্গলবার সচিবালয়ে আন্তঃমন্ত্রণালয়ের একটি সভা হয়েছে।
কক্সবাজারে ভয়াবহ চিত্র
টানা আট দিনের ভয়াবহ বন্যার পর কক্সবাজারে ধীরে ধীরে পরিস্থিতির উন্নতি হতে শুরু করেছে। বৃষ্টিপাত কমে যাওয়ায় প্লাবিত এলাকার পানি নামতে শুরু করলেও এখন স্পষ্ট হয়ে উঠছে সড়ক, সেতু, বেড়িবাঁধ, কৃষিজমি, মৎস্য খামার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও বসতবাড়ির ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির চিত্র। জেলা প্রশাসনের প্রাথমিক তথ্য অনুযায়ী, বন্যায় জেলার ২ হাজার ৪৮ কিলোমিটার সড়ক এবং ৭৯টি সেতু ও কালভার্ট ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হয়েছে চকরিয়া, মাতামুহুরী ও পেকুয়া উপজেলায়।
জানা গেছে, জেলার ৭১টি ইউনিয়নের মধ্যে ৬৯টি এবং পাঁচটি পৌরসভার মধ্যে চারটি বন্যাকবলিত হয়। এতে প্রায় ৪৯ শতাংশ এলাকা পানিতে তলিয়ে যায় এবং আড়াই লাখের বেশি মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েন।
জেলা প্রশাসনের হিসাবে, বন্যা ও পাহাড়ধসের ঘটনায় এখন পর্যন্ত ৩২ জনের মৃত্যু হয়েছে। নিহতদের মধ্যে ১৯ জন স্থানীয় বাসিন্দা এবং ১৩ জন রোহিঙ্গা। এ ছাড়া আহত হয়েছেন ২৪ এবং একজন এখনো নিখোঁজ রয়েছেন।
জেলা ত্রাণ ও পুনর্বাসন কর্মকর্তা মো. আজাদের রহমান জানান, দুর্যোগে ৪৫ হাজার ৪৩৬টি পরিবারের ২ লাখ ৩২ হাজার ৬৯৮ জন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। দুর্গত এলাকায় চাল, শুকনো খাবারসহ ত্রাণ বিতরণ অব্যাহত রয়েছে। এদিকে বন্যার পানি কমলেও বিশুদ্ধ পানির সংকট তীব্র আকার ধারণ করেছে। অনেক টিউবওয়েল পানির নিচে থাকায় ডায়রিয়া, চর্মরোগসহ পানিবাহিত রোগ ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। দুর্গম কয়েকটি এলাকায় এখনো পর্যাপ্ত ত্রাণ পৌঁছায়নি বলেও অভিযোগ রয়েছে।
অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) মো. শহিদুল আলম জানান, দুর্যোগ মোকাবিলায় ৬৪০টি আশ্রয়কেন্দ্র প্রস্তুত রাখা হয়েছিল। বর্তমানে ত্রাণ বিতরণ, চিকিৎসাসেবা ও পুনর্বাসন কার্যক্রম চলমান রয়েছে। এ ছাড়া ৮৮টি মেডিকেল টিম কাজ করছে। ইতোমধ্যে ৮ লাখ ২৫ হাজার পানি বিশুদ্ধকরণ ট্যাবলেট, ২১৫টি অ্যান্টিভেনম ভ্যাকসিন এবং ২ হাজার ৫০০টি জেরিক্যান বিতরণ করা হয়েছে।
প্রাথমিক হিসাবে, বন্যায় জেলার ৩ হাজার ৯১৮টি মৎস্য খামার ও ৪৫৩টি মাছের ঘের ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এতে প্রায় ৩৮ কোটি টাকার ক্ষতি হয়েছে। এ ছাড়া ৪৩ হাজার ২১০ জন কৃষক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন এবং প্রায় ৪ হাজার ২১১ হেক্টর কৃষিজমির ফসল নষ্ট হয়েছে। প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ১ হাজার ২৯০টি গবাদিপশু এবং প্রায় ৯৮ হাজার হাঁস-মুরগিও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। পানি উন্নয়ন বোর্ড জানিয়েছে, বাঁকখালী ও মাতামুহুরী নদীর পানি বিপৎসীমা অতিক্রম করায় জেলার ৪৪টি স্থানে বেড়িবাঁধ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলে জরুরি ভিত্তিতে মেরামতকাজ শুরু করা হবে।
জেলা প্রশাসক এম এ মান্নান বলেন, ক্ষয়ক্ষতির পূর্ণাঙ্গ তালিকা প্রস্তুত করা হচ্ছে। প্রয়োজন অনুযায়ী আরও ত্রাণ ও পুনর্বাসন সহায়তা দেওয়া হবে। কক্সবাজার আবহাওয়া অফিস জানিয়েছে, ৪ থেকে ১২ জুলাই পর্যন্ত নয় দিনে জেলায় ৮২৩ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড হয়েছে। বৃষ্টিপাত কমে যাওয়ায় বন্যা পরিস্থিতির উন্নতি শুরু হলেও ক্ষতিগ্রস্ত এলাকার স্বাভাবিক জীবনযাত্রা ফিরিয়ে আনতে সময় লাগবে।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









