বাংলাদেশের রাজনীতিতে নির্বাচন, রাষ্ট্র সংস্কার, সংবিধান, ক্ষমতার ভারসাম্য কিংবা জুলাই সনদ—প্রায় প্রতিটি ইস্যুতেই রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে রয়েছে স্পষ্ট মতভেদ। সরকার ও বিরোধী দল সংসদের ভেতরে-বাইরে একে-অন্যের কঠোর সমালোচক। কিন্তু আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ এবং জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে সংঘটিত হত্যা ও মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগের বিচার প্রশ্নে তৈরি হয়েছে এক ধরনের বিরল রাজনৈতিক ঐকমত্য। দলভেদে বক্তব্যের ভাষা ও কৌশলে পার্থক্য থাকলেও আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে বিচার প্রক্রিয়া সম্পন্ন হওয়া এবং আদালতের সিদ্ধান্তের ভিত্তিতে দলটির ভবিষ্যৎ নির্ধারণের পক্ষে অবস্থান নিয়েছে প্রায় সব প্রধান রাজনৈতিক শক্তি।
চব্বিশের জুলাই-আগস্টের গণ-অভ্যুত্থানে ছাত্র-জনতা, নারী, শিশু, শ্রমজীবী, পেশাজীবীসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের ওপর হামলা ও প্রাণহানির ঘটনায় আওয়ামী লীগ, যুবলীগ, ছাত্রলীগ এবং তৎকালীন আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যদের বিরুদ্ধে তদন্ত চলছে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে। সেই প্রেক্ষাপটে অন্তর্বর্তী সরকার নির্বাহী আদেশে আওয়ামী লীগ ও এর অঙ্গ সংগঠনের কার্যক্রম স্থগিত করে। বর্তমানে দলটি রাজনৈতিক দল হিসেবে নিষিদ্ধ হবে কি না, সেটি বিচারাধীন বিষয়। আর এ প্রশ্নেই দেশের রাজনৈতিক অঙ্গনে তৈরি হয়েছে এক ব্যতিক্রমী সমীকরণ।
রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকদের মতে, আওয়ামী লীগ প্রশ্নে এই ঐকমত্য কোনো নির্বাচনি সমঝোতা নয়; বরং জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের ঘটনাবলির বিচার নিশ্চিত করার দাবিকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা একটি রাজনৈতিক অবস্থান। একই সঙ্গে তাঁরা মনে করেন, আদালতের বাইরে রাজনৈতিক সিদ্ধান্তের পরিবর্তে বিচারিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে বিষয়টির নিষ্পত্তি হলে সেটি হবে অধিক গ্রহণযোগ্য ও টেকসই।
আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের চিফ প্রসিকিউটর মো. আমিনুল ইসলাম সম্প্রতি সাংবাদিকদের বলেন, আওয়ামী লীগের শাসনামলে দল হিসেবে বিভিন্ন অপরাধ সংঘটিত হয়েছে বলে তদন্তে উঠে এসেছে। তাঁর ভাষ্য, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল আইন-১৯৭৩ এবং সন্ত্রাসবিরোধী আইন-২০০৯ এ দুটি আইনই আওয়ামী লীগের আমলে প্রণীত। ফলে বিদ্যমান আইনেই দলটির বিচার সম্ভব।
এক সময় আওয়ামী লীগ নিষিদ্ধের দাবির পরিবর্তে বিচার প্রক্রিয়ার ওপর জোর দেওয়া বিএনপিও এখন দলটির বিরুদ্ধে আরো কঠোর অবস্থানের ইঙ্গিত দিচ্ছে। বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য সেলিমা রহমান বলেন, আওয়ামী লীগের ঝটিকা কর্মসূচিকে তাঁরা গুরুত্ব দিচ্ছেন না। অন্যদিকে দলের যুগ্ম মহাসচিব সৈয়দ এমরান সালেহ প্রিন্সের অভিযোগ, প্রতিষ্ঠা বার্ষিকীকে কেন্দ্র করে আওয়ামী লীগের কিছু কর্মসূচি এবং সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে নেতা-কর্মীদের বক্তব্যে উসকানিমূলক প্রবণতা দেখা গেছে। তাঁর ভাষায়, ‘আওয়ামী লীগ ইস্যুতে আমরা সবাই ঐক্যবদ্ধ।’
সরকারও আওয়ামী লীগের ভবিষ্যৎ নির্ধারণে আদালতের ভূমিকাকেই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হিসেবে দেখছে। তথ্য ও সম্প্রচার উপদেষ্টা জাহেদ-উর-রহমান বলেছেন, আওয়ামী লীগ দল হিসেবে নিষিদ্ধ হবে কি না, সেটি আদালতের বিচারিক সিদ্ধান্তের মাধ্যমেই নির্ধারিত হবে। মানবতাবিরোধী অপরাধে দলটির সম্পৃক্ততা প্রমাণিত হলে পরবর্তী আইনি পদক্ষেপ নেওয়া হবে। এদিকে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদও সম্প্রতি আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক বিচার দাবি করে বলেছেন, এ-সংক্রান্ত তদন্ত এগিয়ে চলছে এবং রাজনৈতিক দল হিসেবে আওয়ামী লীগকে বিচারের আওতায় আনার প্রক্রিয়া চলছে।
আওয়ামী লীগ বিরোধী অবস্থানে সবচেয়ে সরব রাজনৈতিক শক্তিগুলোর একটি জামায়াতে ইসলামী। দলটির নেতৃত্বাধীন ১১-দলীয় জোট সম্প্রতি রাজধানীতে সমাবেশ করে জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের ঘটনায় গুম, খুন ও গণহত্যার বিচার দাবি করেছে। জামায়াতের কেন্দ্রীয় প্রচার ও মিডিয়া সেক্রেটারি অ্যাডভোকেট মতিউর রহমান আকন্দ এদিনকে বলেন, আইনগতভাবে আওয়ামী লীগের কোনো কার্যক্রম পরিচালনার সুযোগ নেই। আদালতের বিচারিক প্রক্রিয়াই দলটির ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করবে। জোটের শরিক বাংলাদেশ খেলাফত মজলিশের যুগ্ম মহাসচিব আতাউল্লাহ আমিনও অন্য দলের নেতাদের মতোই মনে করেন। তিনি বলেন, একটি নিষিদ্ধ সংগঠনকে মাঠে দেখতে তাঁরা চান না। সরকারের উচিত আরো শক্তিশালী আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া।
জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) যুগ্ম সদস্য সচিব জয়নাল আবেদীন শিশির বলেন, আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে চলমান সাংগঠনিক তৎপরতার পেছনে বিদেশে পাচার হওয়া অর্থ ব্যবহারের চেষ্টা রয়েছে বলে তাঁদের ধারণা। তাঁর দাবি, জনগণ থেকে শুরু করে বিএনপি, জামায়াত এবং এনসিপি—সবাই আওয়ামী লীগ প্রশ্নে একই অবস্থানে রয়েছে। এই রাজনৈতিক ঐকমত্যকে আরো স্পষ্টভাবে সামনে এনেছেন এবি পার্টির চেয়ারম্যান মজিবুর রহমান। দুই দিন আগে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক স্ট্যাটাসে তিনি বলেন, ‘আওয়ামী লীগ ইস্যুতে বিএনপি, জামায়াত, এনসিপি, গণতন্ত্র মঞ্চ—আমরা সবাই ভাই ভাই।’ তাঁর মতে, সংস্কার, জুলাই সনদ কিংবা নির্বাচন নিয়ে মতপার্থক্য থাকলেও আওয়ামী লীগের বিচার প্রশ্নে বিরোধী রাজনৈতিক শক্তিগুলোর অবস্থান অভিন্ন।
মজিবুর রহমান আরো বলেন, জুলাই গণ-অভ্যুত্থানের সময় রাজনৈতিক মত ও পথের বিভাজন ভুলে সবাই রাজপথ, কারাগার ও হাসপাতালে একসঙ্গে ছিলেন। তাঁর মতে, গণ-অভ্যুত্থানের রাজনৈতিক লক্ষ্য বাস্তবায়নের স্বার্থে এ ঐক্য অন্তত কয়েক বছর ধরে রাখা প্রয়োজন। আওয়ামী লীগ প্রশ্নে এই ঐকমত্যের মধ্যেও কৌশলগত পার্থক্য রয়েছে।
জামায়াত, এনসিপি ও কয়েকটি দল শুরু থেকেই আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক নিষিদ্ধকরণের দাবি জানিয়ে আসছে। অন্যদিকে বিএনপি প্রথম থেকেই বিচারিক প্রক্রিয়ার ওপর জোর দিলেও এখন দলটির বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থাকে আরো দ্রুত এগিয়ে নেওয়ার পক্ষে অবস্থান নিয়েছে। অর্থাৎ লক্ষ্য এক হলেও সেই লক্ষ্য অর্জনের রাজনৈতিক কৌশলে পার্থক্য রয়েছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, আওয়ামী লীগ প্রশ্নে বর্তমান পরিস্থিতির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো— এটি ক্ষমতাসীন ও বিরোধী উভয় শিবিরের মধ্যে বিরল একটি অভিন্ন অবস্থান তৈরি করেছে। নির্বাচনকালীন সরকার, সংবিধান সংশোধন, রাষ্ট্র সংস্কার, স্থানীয় সরকার ব্যবস্থা কিংবা অর্থনৈতিক নীতি— এসব বিষয়ে যেখানে দলগুলোর অবস্থান পরস্পরবিরোধী, সেখানে আওয়ামী লীগের বিচার এবং দলটির রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ আদালতের মাধ্যমে নির্ধারণের প্রশ্নে বড় ধরনের মতৈক্য দেখা যাচ্ছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক কাজী মোহাম্মদ মাহবুবুর রহমানের মতে, ৫ আগস্টের আগে যে রাজনৈতিক শক্তি তৎকালীন শাসনব্যবস্থার বিরুদ্ধে আন্দোলন করেছে, তাদের সঙ্গে সেই শাসনব্যবস্থার বিরোধ সহজে শেষ হওয়ার নয়। তাঁর ভাষায়, আইনের যথাযথ প্রয়োগ এবং বিচার প্রক্রিয়া যত এগোবে, অভিযুক্ত রাজনৈতিক শক্তির সাংগঠনিক সক্ষমতা তত দুর্বল হবে।
বিশ্লেষকদের মতে, আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক বক্তব্য যতই কঠোর হোক, শেষপর্যন্ত দলটির ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করবে আদালতের রায়। কারণ কোনো রাজনৈতিক দলকে স্থায়ীভাবে নিষিদ্ধ করা বা তার সাংগঠনিক অস্তিত্বের বিষয়ে সিদ্ধান্ত দেওয়ার সাংবিধানিক ও আইনগত কর্তৃত্ব আদালতেরই। ফলে রাজনৈতিক দলগুলোর বক্তব্যে যতই ঐকমত্য থাকুক না কেন, এখন সবার দৃষ্টি আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের বিচারিক কার্যক্রমের দিকেই। সেই বিচারই নির্ধারণ করবে আওয়ামী লীগ কেবল একটি স্থগিত রাজনৈতিক দল হিসেবেই থাকবে, নাকি আইনগতভাবে আরো কঠোর পরিণতির মুখোমুখি হবে।
একই সঙ্গে সেই রায় বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক বাস্তবতা ও দলীয় রাজনীতির নতুন সমীকরণও নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। কারণ আদালতের সিদ্ধান্তই নির্ধারণ করবে—আওয়ামী লীগ কেবল সাময়িকভাবে স্থগিত থাকবে, নাকি দল হিসেবে স্থায়ী কোনো আইনি পরিণতির মুখোমুখি হবে। সেই রায়ই দেশের রাজনৈতিক সমীকরণেও নতুন বাস্তবতা তৈরি করতে পারে।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









