উইম্বলডনের সেন্ট্রাল কোর্টে তখন নিঃশ্বাস বন্ধ করে অপেক্ষা করছেন দর্শকরা। লিন্ডা নোসকোভা ৬-২, ৫-২ ব্যবধানে এগিয়ে। ক্যারোলিনা মুখোভার বিপক্ষে ছিল পাঁচটি চ্যাম্পিয়নশিপ পয়েন্ট। কিন্তু হঠাৎ চাপের কাছে নতি স্বীকার করেন তিনি। ম্যাচ গড়ায় তৃতীয় সেটে।
শেষ পর্যন্ত ষষ্ঠ চ্যাম্পিয়নশিপ পয়েন্টেই আসে কাঙ্ক্ষিত মুহূর্ত। নোসকোভার দুর্দান্ত সার্ভ র্যাকেটেই ছুঁতে পারেননি মুখোভা। বল গড়িয়ে যায় ঘাসের কোর্টে, আর মাত্র ২১ বছর বয়সেই উইম্বলডনের শিরোপা জিতে নেন নোসকোভা।
এই প্রত্যাবর্তনকে কিংবদন্তি জন ম্যাকএনরো আখ্যা দেন, ‘সেন্ট্রাল কোর্টের ইতিহাসে দেখা অন্যতম সেরা প্রত্যাবর্তন’ হিসেবে।
শিরোপা জয়ের পর পরিবারের সদস্যদের ধন্যবাদ জানান নোসকোভা। এরপর বাবার দিকে তাকিয়ে বলেন, ‘আর একজনকে ধন্যবাদ জানাতে চাই—আমার মা। তোমাকে ছাড়া আমি এখানে দাঁড়াতে পারতাম না।’
চোখে জল নিয়ে ডান হাতে চুমু এঁকে আকাশের দিকে তুলে ধরেন তিনি। মুহূর্তেই দাঁড়িয়ে অভিবাদন জানায় পুরো স্টেডিয়াম। ২০২৪ সালের উইম্বলডন শুরুর আগের রাতেই ক্যান্সারে মারা যান নোসকোভার মা ইভানা। ব্যক্তিগত সেই শোককে সঙ্গী করেই টুর্নামেন্টে খেলেছিলেন তিনি। এবার শিরোপা জিতে সেই জয় উৎসর্গ করলেন মায়ের স্মৃতির প্রতি।
‘ছোট ট্রফি নয়, বড়টাই চাই’
২০২৪ সালের জানুয়ারিতে চেক সংবাদমাধ্যম *আইস্পোর্ট*-কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে ইভানা বলেছিলেন, তার মেয়ে মানসিকভাবে অত্যন্ত দৃঢ়। িতিনি বলেছিলেন, ‘সে তার বাবার মতো। চাপের মুহূর্তেও নিজেকে নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারে।’
ফাইনালেও সেই দৃঢ়তারই পরীক্ষা দিতে হয়েছে নোসকোভাকে। দ্বিতীয় সেটে ম্যাচ শেষ করার সুযোগ থাকলেও পরপর কয়েকটি ভুলে ম্যাচ হাতছাড়া হওয়ার উপক্রম হয়। ৫-৩ ব্যবধানে এগিয়ে সার্ভ করতে গিয়ে দুটি ডাবল ফল্ট করেন, ফুটওয়ার্কে ছন্দ হারান, এমনকি হতাশায় চিৎকারও করে ওঠেন।
দ্বিতীয় সেট হারানোর পর কোর্ট ছেড়ে ড্রেসিংরুমে যান তিনি।
পরে নোসকোভা বলেন, ‘বাথরুমে গিয়ে মুখে ঠান্ডা পানি দিলাম। বের হওয়ার সময় ট্রফিগুলোর দিকে তাকিয়ে মনে হলো—ছোটটা নয়, বড়টাই নেব। এত দূর এসে হারতে চাইনি।’কোর্টে ফিরে প্রথম সার্ভিস গেমেই তিনটি ব্রেক পয়েন্ট বাঁচান। এরপর মুখোভাকে ব্রেক করে ম্যাচের নিয়ন্ত্রণ নিজের হাতে নেন। সেখান থেকে আর ফিরে তাকাতে হয়নি।ম্যাকএনরো বলেন, ‘তার মানসিক দৃঢ়তা, চরিত্র আর লড়াই করার ক্ষমতা সত্যিই অসাধারণ।’
চেক টেনিসের গৌরবময় ধারার নতুন নাম
রয়্যাল বক্সে বসে নোসকোভার এই জয় উপভোগ করেন চেক কিংবদন্তি পেত্রা কভিতোভা ও মার্টিনা নাভ্রাতিলোভা। নোসকোভার আবেগঘন বক্তব্যের সময় দুজনকেই অশ্রুসিক্ত দেখা যায়।
এই জয়ের মধ্য দিয়ে ২০১১ সালে ২১ বছর বয়সে উইম্বলডন জেতা পেত্রা কভিতোভার পর সবচেয়ে কম বয়সী চ্যাম্পিয়ন হলেন নোসকোভা। পাশাপাশি টানা চার বছরে তৃতীয় চেক নারী খেলোয়াড় হিসেবে উইম্বলডনের শিরোপা জিতলেন তিনি।
ফাইনালের আগে নোসকোভা মজা করে বলেছিলেন, চেক বিয়ারই হয়তো তাদের সাফল্যের রহস্য। তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, আসল রহস্য লুকিয়ে রয়েছে দেশটির শক্তিশালী তৃণমূল কাঠামো, দক্ষ কোচিং এবং দীর্ঘদিনের টেনিস ঐতিহ্যে।
নাভ্রাতিলোভা বলেন, ‘চেক প্রজাতন্ত্রের ছোট ছোট শহরেও টেনিস ক্লাব আছে। ভালো কোচিং, নিয়মিত প্রতিযোগিতা আর ছোটবেলা থেকেই ম্যাচ খেলার সুযোগ—এসবই নতুন প্রজন্মকে বড় খেলোয়াড় হিসেবে গড়ে তুলছে।’ সেই ঐতিহ্যের সর্বশেষ উজ্জ্বল সংযোজন এখন লিন্ডা নোসকোভা।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









