কয়েক দিনের ভারি বৃষ্টি ও উজান থেকে নেমে আসা ঢলে দেশের দক্ষিণ-পূর্ব ও উত্তর-পূর্বাঞ্চলের কয়েকটি জেলা আবারও বন্যার কবলে পড়েছে। চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, ফেনী, বান্দরবান, মৌলভীবাজারসহ বিভিন্ন জেলায় ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। সবচেয়ে বেশি প্রভাব পড়েছে কৃষি, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ খাতে। মৎস্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, এবারের বন্যায় শুধু মৎস্য খাতেই ক্ষতির পরিমাণ প্রায় ৪০০ কোটি টাকা। পানির স্রোতে মাছ ও চিংড়ির পোনা ভেসে গেছে, ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বিভিন্ন এলাকার ঘের ও খামার।
অন্যদিকে কৃষি বিভাগ জানিয়েছে, বন্যায় দেশের ৪৩ জেলায় প্রায় ১ লাখ ১৫ হাজার হেক্টর জমির ফসল ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এর মধ্যে প্রায় ৬২ হাজার ৫০০ হেক্টর জমির আউশ ও আমনের বীজতলা পানিতে তলিয়ে গেছে। পাশাপাশি নষ্ট হয়েছে বিভিন্ন সবজির ক্ষেত। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন ৫ লাখের বেশি কৃষক। সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হয়েছে চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, রাঙামাটি, খাগড়াছড়ি, নোয়াখালী ও যশোরসহ ১৬ জেলায়। এসব এলাকায় প্রায় ১ লাখ ৭ হাজার ৪২৫ হেক্টর জমির ফসল নষ্ট হয়েছে।
বন্যার পানি কমতে শুরু করলেও এর বিরূপ প্রভাব এখনো রয়ে গেছে কৃষি ও প্রাণিসম্পদ খাতে। অনেক এলাকায় বীজতলা ও সবজি ক্ষেত নষ্ট হয়েছে। ক্ষতির মুখে পড়েছেন গবাদিপশুর খামারিরাও। কৃষি, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদমন্ত্রী মোহাম্মদ আমিন উর রশিদ জানান, ক্ষতি কাটিয়ে উঠতে সরকারি জমিতে নতুন করে বীজতলা তৈরির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। সেখান থেকে উৎপাদিত চারা ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের বিনামূল্যে দেওয়া হবে। সাবেক কৃষি সচিব আনোয়ার ফারুক বলেন, দুর্যোগ মোকাবিলায় সংশ্লিষ্ট সব বিভাগের মধ্যে সমন্বয় আরো বাড়াতে হবে। পাশাপাশি অর্থের অপচয় রোধ এবং আগাম সতর্কতামূলক ব্যবস্থা জোরদারের ওপর গুরুত্ব দিতে হবে। তিনি জলবায়ু সহনশীল কৃষি ব্যবস্থার উন্নয়নেরও পরামর্শ দেন।
আরো ঘনীভূত হতে পারে লঘুচাপ: বঙ্গোপসাগরে সৃষ্ট লঘুচাপটি আরো ঘনীভূত হওয়ার সম্ভাবনা দেখলেও নিম্নচাপের আশঙ্কা দেখছে না আবহাওয়া অফিস। এর প্রভাবে বৃষ্টি বাড়বে বলে জানিয়েছেন আবহাওয়াবিদ আফরোজা সুলতানা। বৃহস্পতিবার সকালে তিনি বলেন, ‘জুলাই মাসে বৃষ্টি কিন্তু মোটামুটি হয়। সব জায়গায়, কোথাও না কোথাও বৃষ্টি হবে। কিন্তু একটানা সারাদেশে একসঙ্গে যে দুই-তিন দিন বৃষ্টি, ওই বৃষ্টিটা হয়ত হবে না। বিক্ষিপ্তভাবে বৃষ্টি হবে।’ বৃহস্পতিবার আবহাওয়ার বিশেষ সতর্কবার্তায় বলা হয়, লঘুচাপের প্রভাবে সমুদ্র বন্দরগুলো, উত্তর বঙ্গোপসাগর ও তৎসংলগ্ন বাংলাদেশের উপকূলীয় এলাকায় ঝড়ো হাওয়া বয়ে যেতে পারে। তাই চট্টগ্রাম, কক্সবাজার, মোংলা ও পায়রা সমুদ্র বন্দরে ৩ নম্বর স্থানীয় সতর্ক সংকেত বহাল রাখা হয়েছে। সেই সঙ্গে উত্তর বঙ্গোপসাগরে অবস্থানরত মাছ ধরার নৌকা ও ট্রলারসমূহকে উপকূলের কাছাকাছি থেকে সাবধানে চলাচল করতে বলা হয়েছে। এদিকে, ঝড়ো হাওয়া বয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা থাকায় কয়েকটি নদীবন্দরেও সতর্কতা সংকেত জারি করেছে আবহাওয়া অধিদপ্তর।
নদীবন্দর সম্পর্কিত আবহাওয়ার বিশেষ সতর্কবার্তায় বলা হয়েছে, বৃহস্পতিবার ভোর ৫টা থেকে দুপুর ১টা পর্যন্ত খুলনা, বরিশাল, পটুয়াখালী, নোয়াখালী, কুমিল্লা, চট্টগ্রাম, কক্সবাজার এবং সিলেট অঞ্চলের ওপর দিয়ে দক্ষিণ বা দক্ষিণ-পূর্ব দিক থেকে ঘণ্টায় ৪৫ থেক ৬০ কিলোমিটার বেগে বৃষ্টি বা বজ্রবৃষ্টিসহ অস্থায়ীভাবে দমকা বা ঝড়ো হাওয়া বয়ে যেতে পারে। তাই এসব এলাকার নদীবন্দরগুলোকে ১ নম্বর সতর্ক সংকেত দেখাতে বলা হয়েছে। বৃহস্পতিবার সকালের নিয়মিত আবহাওয়ার বুলেটিনে বলা হয়েছে, মৌসুমি বায়ু বাংলাদেশের উপর মোটামুটি সক্রিয় এবং উত্তর বঙ্গোপসাগরে প্রবল অবস্থায় বিরাজ করছে।
এর প্রভাবে সকাল ৯টা থেকে পরবর্তী ২৪ ঘণ্টায় রংপুর, ময়মনসিংহ, খুলনা, বরিশাল, চট্টগ্রাম ও সিলেট বিভাগের অনেক জায়গায় এবং রাজশাহী ও ঢাকা বিভাগের কিছু কিছু জায়গায় অস্থায়ীভাবে দমকা হাওয়াসহ হালকা থেকে মাঝারি ধরনের বৃষ্টি বা বজ্রসহ বৃষ্টি হতে পারে। সেই সাথে সারাদেশের কোথাও কোথাও মাঝারি ধরনের ভারি থেকে ভারি বর্ষণ হতে পারে। এ সময় সারাদেশে দিন এবং রাতের তাপমাত্রা সামান্য কমতে পারে।
বৃহস্পতিবার সকাল ৯টা পর্যন্ত আগের ২৪ ঘণ্টায় পাবনার ইশ্বরদীতে দেশের সর্বোচ্চ ৩৫ দশমিক ৮ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা রেকর্ড করা হয়। আর সর্বনিম্ন তাপমাত্রা ছিল সিলেটে, ২৩ দশমিক ৩ ডিগ্রি সেলসিয়াস। এ সময় সিলেটের শ্রীমঙ্গলে দেশের সর্বোচ্চ ৪৬ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত নথিভুক্ত হয়েছে। এছাড়া সিলেটে ৩৫, নীলফামারীর ডিমলায় ২৪ ও ঢাকায় ৭ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করেছে আবহাওয়া অধিদপ্তর।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









