বিতর্ক পিছু ছাড়ছে না জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের (ডিপিএইচই) প্রধান প্রকৌশলী আব্দুল আউয়ালের। অনিয়ম, দুর্নীতি ও ঘুষ বাণিজ্যের অভিযোগের মধ্যেই এবার আদালতের রায় অমান্য এবং তথ্য গোপন করে ২০ বছর পর চার প্রকৌশলীর চাকরি নিয়মিত করে নতুন বিতর্কের জন্ম দিয়েছেন তিনি।
প্রশ্ন উঠেছে, আদালতের রায়, সরকারি বিধিমালা এবং সরকারি কর্ম কমিশনের মতামতের পরও কিভাবে চার প্রকৌশলীর চাকরি প্রকল্পে যোগদানের তারিখ থেকে ভূতাপেক্ষিকভাবে নিয়মিত হলো? শুধু তা-ই নয় এই নিয়মিতকরণের ফলে স্বয়ং প্রধান প্রকৌশলীসহ অন্য কর্মকর্তাদের চেয়েও সিনিয়র হয়ে গেছেন ওই চার কর্মকর্তা। এতে করে অন্যান্য সব কর্মকর্তাদের মধ্যে ক্ষোভ বিরাজ করছে।
খোঁজ নিয়ে জানা যায়, ওই চার কর্মকর্তাকে ২০০০ সাল থেকে নিয়মিত করা হয়েছে। অন্যদিকে প্রধান প্রকৌশলী নিয়মিত হয়েছেন ২০০৭ সালে অর্থাৎ বিতর্কিত এই নিয়মিতকরণের ফলে প্রধান প্রকৌশলীর চেয়েও সাত বছরের সিনিয়র হয়ে গেছেন ওই চার কর্মকর্তা। ফলে বিষয়টি নিয়ে ভবনে হাস্যরস তৈরি হয়েছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক কর্মকর্তা বলেন, টাকা পেলে এই প্রধান প্রকৌশলী সবই করতে পারেন। চার কর্মকর্তাকে নিয়মিত করে নিজের চেয়ে জ্যেষ্ঠ বানিয়ে তিনি তার পরিচয় দিয়েছেন।
নথিসূত্রে জানা যায়, নিরাপদ পানি সরবরাহ নিশ্চিত করতে ১৯৯৮ সালে বিশ্বব্যাংকের সহায়তায় ‘আর্সেনিক মিটিগেশন ওয়াটার সাপ্লাই’নামে একটি প্রকল্প হাতে নেয় সরকার। প্রকল্পটি শেষ হয় ২০০৬ সালে। প্রকল্প শেষ হওয়ার পরই রাজস্ব খাতে অন্তর্ভুক্তির দাবিতে হাইকোর্টে রিট করেন ওই প্রকল্পে কর্মরত চার সহকারী প্রকৌশলী মো. আলিম উল বাহার, সেলিম হোসেন ভূঞা, বেগম শরীফ মোসা. ফেরদৌসী ও মো. জিয়াউল হক।
ওই রিটের প্রেক্ষিতে ২০১৬ সালে হাইকোর্ট রায়ে বলা হয়েছে, অন্য কোনো কারণে অযোগ্য না হলে, আইন অনুযায়ী এবং প্রযোজ্য ক্ষেত্রে তাদের রাজস্ব খাতে অন্তর্ভুক্তির বিষয়টি দ্রুত নিষ্পত্তি করতে হবে। কিন্তু সরকার ওই রায়ের বিরুদ্ধে আপিল করে। আপিল বিভাগ হাইকোর্টের রায় পুরোপুরি বহাল না রেখে বরং স্পষ্ট করে দেয় যে চার প্রকৌশলীর চাকরি নিয়মিতকরণের বিষয়টি ১৭ বিএলসি (এড) ৯১-এ নির্ধারিত নীতিমালার আলোকে নিষ্পত্তি করতে হবে। অর্থাৎ আদালত সরাসরি নিয়মিত করার নির্দেশ না দিয়ে বিদ্যমান আইন ও বিধিমালা অনুসরণ করেই সিদ্ধান্ত নিতে বলেছে। এরপর ২০২২ সালে বিষয়টি নিয়ে সরকারি কর্ম কমিশনের (পিএসসি) মতামত চায় স্থানীয় সরকার বিভাগ।
সরকারি কর্ম কমিশন (পিএসসি) স্পষ্ট জানিয়ে দেয়, উন্নয়ন প্রকল্প হতে রাজস্ব বাজেটে স্থানান্তরিত পদের পদধারীদের নিয়মিতকরণ ও জ্যেষ্ঠতা নির্ধারণ বিধিমালা-২০০৫ অনুযায়ী এই চার কর্মকর্তাকে নিয়মিত করার কোনো আইনগত সুযোগ নেই। কারণ, বিধিমালায় বলা আছে, শুধু ১৯৭২ সালের ৯ এপ্রিল থেকে ১৯৯৭ সালের ৩০ জুনের মধ্যে শুরু হওয়া প্রকল্পের কর্মকর্তারাই এই সুবিধা পাবেন। কিন্তু নথি ঘেঁটে এই চার প্রকৌশলী প্রকল্পে যোগ দিয়েছেন ২০০০ সালে পিএসসির ওই মতামতের ভিত্তিতে ২০২৩ সালের ৯ জানুয়ারি স্থানীয় সরকার বিভাগও জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরকে চিঠি দিয়ে জানিয়ে দেয় এই চার কর্মকর্তাকে নিয়মিত করার আইনগত কোনো সুযোগ নেই। অর্থাৎ আদালতের নির্দেশনা, পিএসসির মতামত এবং মন্ত্রণালয়ের অবস্থান তিনটিই ছিল নিয়মিতকরণের বিপক্ষে। প্রশ্ন উঠেছে এখানেই। এসব নথি থাকা সত্ত্বেও কিভাবে আবার সেই চার কর্মকর্তার চাকরি নিয়মিত করার প্রস্তাব পাঠালেন প্রধান প্রকৌশলী?
অভিযোগ রয়েছে, ডিপিএইচইর প্রধান প্রকৌশলী আব্দুল আউয়াল তথ্য গোপন করে স্থানীয় সরকার বিভাগে নতুন প্রস্তাব পাঠান। আর সেই প্রস্তাবের ভিত্তিতেই গত ১১ জুন এই চার কর্মকর্তাকে নিয়মিত করে নতুন প্রজ্ঞাপন জারি করে স্থানীয় সরকার বিভাগ। সেখানেও নেওয়া হয়েছে মিথ্যার আশ্রয়। প্রজ্ঞাপনে বলা হয়েছে, ‘মাননীয় হাইকোর্ট বিভাগের ১৪০৩/২০০৬ নম্বর রিট পিটিশনের রায়, আপিল বিভাগের সিভিল পিটিশন ফর লিভ টু আপিল নম্বর-১২৬৪/২০১৬-এর রায়, আইন ও বিচার বিভাগের মতামত, জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের মতামত, অর্থ বিভাগের মতামত, স্থানীয় সরকার বিভাগের ১০/০৪/২০১৮ তারিখের ১৮২৫ নং প্রজ্ঞাপন ও ২৮/১০/২০১৮ তারিখের ৪৪৮ নং প্রজ্ঞাপনের আলোকে এবং বাংলাদেশ সরকারি কর্ম কমিশনের সুপারিশের আলোকে জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর কর্তৃক বাস্তবায়িত ‘বাংলাদেশ আর্সেনিক মিটিগেশন ওয়াটার সাপ্লাই (সমাপ্ত) প্রকল্প’হতে রাজস্ব বাজেটে আত্তীকৃত চারজন সহকারী প্রকৌশলীর চাকরি প্রকল্পে যোগদানের তারিখ হতে নির্দেশক্রমে নিয়মিত করা হলো’অর্থাৎ চার কর্মকর্তার চাকরি প্রকল্পে যোগদানের তারিখ থেকেই ভূতাপেক্ষি কিভাবে নিয়মিত করা হয়। এর ফলে শুধু চাকরি নিয়মিতই নয়, ২০০৬ সালের পর থেকে বিভিন্ন সময়ের বেতন-ভাতা, জ্যেষ্ঠতা এবং অন্যান্য সরকারি সুবিধা পাওয়ার পথও খুলে যায়।
অথচ অভিযোগ রয়েছে, প্রকল্প শেষ হওয়ার পর দীর্ঘ ২০ বছর তারা কোনো দায়িত্ব পালন করেননি। সবাই যুক্ত ছিলেন অন্য পেশায়। অন্যদিকে, অভিযোগ রয়েছে এই নিয়মিতকরণের পেছনে বড় অঙ্কের আর্থিক লেনদেন হয়েছে। প্রধান প্রকৌশলী আব্দুল আউয়াল অর্থের বিনিময়ে তথ্য গোপন করে চার কর্মকর্তার নাম প্রস্তাব করেন। এ বিষয়ে বক্তব্য জানতে চাইলে বিষয়টি নিয়ে তিনি লুকোচুরি শুরু করেন। পরে বিষয়টি জানতে চার সহকারী প্রকৌশলীর সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগ করা হলেও তারা কথা বলতে রাজি হননি। কেউ পারিবারিক সমস্যার কথা বলেছেন, কেউ ফোন কেটে দেন।
এদিকে আইন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আপিল বিভাগ সরাসরি চাকরি নিয়মিত করার নির্দেশ দেননি। বিদ্যমান বিধিমালার আলোকে সিদ্ধান্ত নিতে বলেছেন। যদি সেই বিধিমালায় নিয়মিতকরণের সুযোগ না থাকে, তাহলে সেই সীমার বাইরে নেওয়া প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের আইনগত ভিত্তি প্রশ্নের মুখে পড়তে পারে।
এছাড়া দুদকের সাবেক এক মহাপরিচালক বলছেন এই সিদ্ধান্তে সরকারের বিপুল অঙ্কের আর্থিক দায় তৈরি হতে পারে। তিনি বলেন, আদালতের ব্যাখ্যা, পিএসসির মতামত ও সরকারি বিধিমালা উপেক্ষা করে এমন সিদ্ধান্ত হলে সেটি ক্ষমতার অপব্যবহার বা দুর্নীতির ইঙ্গিত বহন করে।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









