দক্ষিণাঞ্চলের খাদ্য নিরাপত্তা জোরদার ও দুর্যোগকালীন সময়ে দ্রুত খাদ্যশস্য সরবরাহের লক্ষ্য নিয়ে বরিশালে নির্মাণ করা হয়েছিল সর্বাধুনিক প্রযুক্তির সাইলো (খাদ্যগুদাম)। সাড়ে তিনশত কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত এই বিশাল স্থাপনাটি হস্তান্তরিত হলেও এখনো পূর্ণাঙ্গভাবে চালু করা সম্ভব হয়নি।
একদিকে লোকবল সংকট আর দাপ্তরিক চিঠি চালাচালি, অন্যদিকে দীর্ঘদিন অব্যবহৃত থাকায় নষ্ট হতে বসেছে কোটি কোটি টাকার যন্ত্রপাতি, চুরি হয়ে যাচ্ছে কনভেয়ার বেল্টের মূল্যবান তার। এতে একদিকে সরকারের বিপুল অঙ্কের বিনিয়োগের কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে, অন্যদিকে ক্ষোভ তৈরি হচ্ছে স্থানীয় বাসিন্দাদের মাঝে।
দুর্যোগকালীন খাদ্য সংকট মোকাবিলায় বরিশাল নগরীর কীর্তনখোলা নদীর তীরে ত্রিশ গোডাউন সংলগ্ন প্রায় ৫ একর ২০ শতাংশ জায়গাজুড়ে স্টিল সাইলো স্থাপনের চুক্তি স্বাক্ষর হয় ২০২১ সালের জুন মাসে। মূল কাঠামো প্রস্তুত হয় ২০২৩ সালের আগস্ট মাসে।
প্রকল্প সূত্রে জানা গেছে, এখানে রয়েছে মোট ৮০ হাজার ঘনমিটার ধারণক্ষমতার ১৬টি সুবিশাল স্টিল বিন। এতে একসঙ্গে ৪৩ হাজার মেট্রিক টন চাল অন্তত তিন বছর গুণগত মান অক্ষুণ্ণ রেখে সংরক্ষণ করা সম্ভব। প্রয়োজনীয় কারিগরি পরীক্ষা-নিরীক্ষা শেষে ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান থেকে প্রকল্পটি খাদ্য অধিদপ্তরের কাছে বুঝিয়ে দেওয়া হয়। কিন্তু এক বছর পার হতে চললেও সচল হয়নি সবগুলো বিন।
সরেজমিন দেখা যায়, ১৬টি বিশাল বিনের মধ্যে চালু হয়েছে মাত্র একটি; যাতে সড়কপথে চাল এনে সংরক্ষণ করা হচ্ছে। তবে পর্যাপ্ত নিরাপত্তা না থাকায় ইতোমধ্যে চুরি হয়েছে কনভেয়ার বেল্টের তার। এ বিষয়ে জার্মানির আইটি ও তথ্য নিরাপত্তা পরামর্শক সংস্থা 'কিপডাটা'-এর কনসালটেন্ট দীপু হাফিজুর রহমান বলেন, 'এ ধরনের হাই-টেক স্টিল সাইলো অটোমেটেড সেন্সর, হিউমিডিটি কন্ট্রোল এবং কনভেয়ার সিস্টেমের ওপর নির্ভর করে। দীর্ঘদিন অলস পড়ে থাকলে এবং নিয়মিত পাওয়ার রান না দিলে ইলেকট্রনিক কন্ট্রোল বোর্ড ও সেন্সরগুলো স্যাঁতসেঁতে আবহাওয়ায় স্থায়ীভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। চালু করার আগেই যদি যন্ত্রাংশ সচল না রাখা হয়, তবে পরবর্তীতে চালুকরণের খরচ বহুগুণ বেড়ে যাবে।'
কারিগরি অবকাঠামো ও যন্ত্রাংশের দ্রুত ক্ষয় নিয়ে উদ্বেগ জানান বরিশাল কারিগরি প্রশিক্ষণ কেন্দ্রের (টিটিসি) চিফ ইনস্ট্রাক্টর মো. মাহমুদ হোসেন। তিনি বলেন, 'মেকানিক্যাল ও ইলেকট্রিক্যাল ইকুইপমেন্ট ব্যবহারের জন্য তৈরি করা হয়, বসিয়ে রাখার জন্য নয়। কনভেয়ার বেল্টের ক্যাবল চুরি হওয়া এবং যন্ত্রাংশ আন-অপারেটেড থাকা মানে পুরো অটোমেশন ব্যবস্থা ঝুঁকিতে পড়া। অবিলম্বে কারিগরি দল গঠন করে টেস্ট রান করা জরুরি।'
রাষ্ট্রীয় বিনিয়োগের অর্থনৈতিক ক্ষতি ও সার্বিক পরিকল্পনা নিয়ে হতাশা প্রকাশ করে অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক আকতারুজ্জামান খান বলেন, 'যেকোনো প্রকল্পের সুযোগ-ব্যয় থাকে। সাড়ে ৩০০ কোটি টাকা জনগণের করের টাকা। সময়মতো সেবা দিতে না পারা মানে রাষ্ট্রীয় অর্থের অবচয় ঘটা। দক্ষিণাঞ্চলের দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও খাদ্য শৃঙ্খলের যে সুরক্ষার কথা বলে এত বড় বিনিয়োগ করা হয়েছিল, তা বাস্তবায়ন না হওয়া উন্নয়ন অর্থনীতির বড় ঘাটতি।'
স্টিল রাইস সাইলোর সুপারিনটেনডেন্ট রাকেশ বিশ্বাস বলেন, 'ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান থেকে ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে সাইলোটি আমাদের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। তবে পরিচালনার জন্য নির্দিষ্ট অর্গানোগ্রাম অনুযায়ী প্রয়োজনীয় কারিগরি লোকবল ও জনবল এখনো পদায়ন করা হয়নি। বর্তমানে ট্রাকে করে আসা চাল একটি বিনে সংরক্ষণ করা হচ্ছে। পাশাপাশি নদী ড্রেজিং কাজ সম্পন্ন হলে এবং লোকবল পাওয়া গেলে পুরো কাজ পুরোদমে চালু করা সম্ভব হবে।'


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









