একের পর এক বিতর্কে অস্বস্তিকর পরিস্থিতিতে পড়েছে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী। সংসদে যাওয়ার মাত্র পাঁচ মাসের মধ্যে অন্তত সাতজন সংসদ সদস্যকে ঘিরে সৃষ্টি হয়েছে তীব্র বিতর্ক। সংসদে বেফাঁস মন্তব্য, ব্যক্তিগত সহকারীদের কর্মকাণ্ড, এমপির সঙ্গে এক তরুণীর ব্যক্তিগত ঘনিষ্ঠ মুহূর্তের ভিডিও এবং সর্বশেষ রাস্তা নিয়ে যশোর-৪ আসনে জামায়াতে ইসলামীর সংসদ সদস্য (এমপি) গোলাম রসুল ও তাঁর মেয়ে মাদ্রাসায় ঢুকে বিরোধে জড়ানোর পর এলাকাবাসী তাঁদের বাসভবনে হামলা ও ভাঙচুর চালিয়েছেন।
সংসদ সদস্য গোলাম রসুল ফেসবুক লাইভে এসে নিরাপত্তাহীনতার কথা জানানোর পাশাপাশি ক্ষমা চেয়ে মিলেমিশে থাকতে চেয়েছেন। এসব ঘটনা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে নতুন করে সমালোচনার ঝড় ওঠে। বহিষ্কারসহ কঠোর সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়ার পরও বিতর্ক যেন পিছু ছাড়ছে না জামায়াতের। দলীয় শৃঙ্খলা রক্ষায় কঠোর পদক্ষেপের পরও বিতর্ক থামানোর চ্যালেঞ্জে তারা।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে জামায়াত জোটের সংসদীয় সমন্বয়কারী হিসেবে কাজ করা দলের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল হামিদুর রহমান আযাদ দৈনিক এদিনকে বলেন, ‘সাতটি নয়, এ রকম দুই-তিনটি ঘটনা আছে। তবে কেউ অন্যায় করলে আমরা ছাড় দেব না। কোনো অনৈতিক কর্মকাণ্ডও প্রশ্রয় দেব না।’
জানা গেছে, গত ফেব্রুয়ারিতে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী এককভাবে যত আসন পেয়েছে, তা আগে আর কখনো পায়নি। এ নির্বাচনে জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থীরা এককভাবে ৬৮টি সংসদীয় আসনে জয় পেয়েছেন। জামায়াতসহ তার নেতৃত্বাধীন জোট মোট ৭৭টি আসন নিয়ে এবার প্রধান বিরোধী দল হিসেবে আগামী পাঁচ বছর সংসদে ভূমিকা রাখছে। কিন্তু দায়িত্ব নেওয়ার পাঁচ মাস না পেরোতে সংসদের ভেতরে-বাইরে দলীয় অন্তত সাত সংসদ সদস্যের (এমপি) কার্যকলাপে বিব্রতকর অবস্থায় পড়েছে জামায়াত। ইতিহাস গড়ে প্রথমবারের মতো সংসদে প্রধান বিরোধী দলের আসনে বসেছে জামায়াতে ইসলামী।
সংসদে এর আগে কখনো দ্বিতীয় বা তৃতীয় বৃহত্তমও হতে পারেনি দলটি। কিন্তু সেই অর্জনের আনন্দ স্থায়ী হয়নি বেশিদিন। প্রধান বিরোধী দলের আসনে বসার কয়েক মাসের মধ্যেই একের পর এক বিতর্কে চাপের মুখে জামায়াত। বিরোধী দলের নতুন ভূমিকায় দলটি রাজনৈতিকভাবে যেমন গুরুত্ব পেয়েছে, তেমনি বেড়েছে জন-আকাঙ্ক্ষা ও নজরদারিও। দলের সংসদ সদস্যের (এমপি) ভিডিওকাণ্ড, সরকারি বরাদ্দে স্বজনপ্রীতি এবং জোট রাজনীতিতে ভাঙন ইস্যুর মতন বহুমুখী চাপে এখন অনেকটাই বেকায়দায় দলটি।
বিশ্লেষকরা বলছেন, বিরোধী দলের চাপ সামলাতে হিমশিম খাচ্ছে ‘অপ্রস্তুত’জামায়াত। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে কঠোর অবস্থানে দলটির কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব। নৈতিকতার প্রশ্নে কাউকে ছাড় না দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন জামায়াত আমির। নেতাদের উদ্দেশে তার বার্তা, সাদা কাপড়ে দাগ লাগলে তা বেশি স্পষ্ট হয়। তাই সবাইকে সর্বোচ্চ সতর্ক থাকতে হবে। জামায়াতের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের একাধিক নেতা বললেন, সাম্প্রতিক ঘটনাগুলোকে বিচ্ছিন্ন হিসেবে দেখলেও এগুলো ধারাবাহিক রূপ নিলে ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে দলের দীর্ঘদিনের ‘নৈতিক ও স্বচ্ছ’ রাজনৈতিক ভাবমূর্তি। সে কারণেই কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব আগের যেকোনো সময়ের তুলনায় কঠোর অবস্থানে যাচ্ছে।
জামায়াতের কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদের এক সদস্য নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, প্রধান বিরোধী দল হওয়ার পর জনগণের প্রত্যাশা অনেক বেড়েছে। অন্য দলের ক্ষেত্রে যেটি ছোট ঘটনা হিসেবে বিবেচিত হয়, আমাদের ক্ষেত্রে সেটিই বড় বিতর্ক হয়ে যায়। কিছু ঘটনায় আমরা বিব্রত হয়েছি, বিশেষ করে গাজী নজরুলের ঘটনাটি দলের জন্য সবচেয়ে বড় ইমেজ সংকট তৈরি করেছে।
সবচেয়ে বড় ধাক্কা আসে সাতক্ষীরা-৪ আসনের জামায়াতদলীয় এমপি গাজী নজরুল ইসলামকে ঘিরে। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে তরুণীর সঙ্গে তার ঘনিষ্ঠ মুহূর্তের ভিডিও ছড়িয়ে পড়ার পর জোর সমালোচনার মুখে পড়ে দলটি। বিষয়টি আদর্শিক ও সাংগঠনিক শৃঙ্খলার পরিপন্থী উল্লেখ করে তাকে দল থেকে করা হয় বহিষ্কার। জামায়াতের রাজনীতিতে এটাই প্রথম দলের কোনো নেতার বড় ধরনের নারী কেলেঙ্কারির ঘটনা প্রকাশ্যে আসা, যা নিয়ে ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া দেখা গেছে মাঠপর্যায়ের নেতাকর্মীদের মধ্যে। জামায়াতের একাধিক দায়িত্বশীল নেতা জানালেন, গাজী নজরুল ইসলামের ঘটনা কেন্দ্র করে যে বিতর্ক তৈরি হয়েছে, সেটি দলের ভাবমূর্তিতে বড় ধরনের নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে। ফলে এটিকে শুধু একটি ব্যক্তিগত বিষয় হিসেবে না দেখে পর্যালোচনা করা হচ্ছে এর আইনগত, সাংগঠনিক ও রাজনৈতিক সব দিক।
সবশেষ রাস্তা নিয়ে যশোর-৪ আসনে জামায়াতে ইসলামীর সংসদ সদস্য (এমপি) গোলাম রসুল ও তাঁর মেয়ে মাদ্রাসায় ঢুকে বিরোধে জড়ানোর পর এলাকাবাসী তাঁদের বাসভবনে হামলা ও ভাঙচুর চালিয়েছেন। গতকাল মঙ্গলবার বেলা ১১টার দিকে এ ঘটনা ঘটে। পরে পুলিশ ঘটনাস্থলে গেলেও এমপি ও তাঁর পরিবারের সদস্যরা অবরুদ্ধ অবস্থায় আছেন। সংসদ সদস্য গোলাম রসুল ফেসবুক লাইভে এসে নিরাপত্তাহীনতার কথা জানানোর পাশাপাশি ক্ষমা চেয়ে মিলেমিশে থাকতে চেয়েছেন। পুলিশ ও স্থানীয় বাসিন্দাদের ভাষ্য, গোলাম রসুলের বাড়ির সামনে আল মাদ্রাসাতুশ শারইয়াহ ও মসজিদ আছে। ওই মাদ্রাসায় যাতায়াতের রাস্তা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে এমপির পরিবারের সঙ্গে মাদ্রাসার শিক্ষার্থী ও শিক্ষকদের বিরোধ চলছিল।
এমপির মেয়ে অনন্যা সোমবার মাদ্রাসার কয়েক শিক্ষার্থীকে ভয়ভীতি দেখান। এ নিয়ে বিরোধের সৃষ্টি হলে পুলিশের মধ্যস্থতায় মীমাংসা হয়। কয়েকজন বিক্ষোভকারী অভিযোগ করেন, মাদ্রাসাটি বন্ধ করে দেওয়ার হুমকি দেওয়া হয়েছে, যা স্থানীয় লোকজনের মধ্যে ক্ষোভ সৃষ্টি করেছে।
প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্য, গতকাল মঙ্গলবার সকালে গোলাম রসুল ও তাঁর মেয়ে মাদ্রাসায় গিয়ে শিক্ষক ও অভিভাবকদের সঙ্গে বিরোধে জড়িয়ে পড়েন। এ সময় রেক্সোনা নামের স্থানীয় এক নারীর মাথা ফাটিয়ে দেন অনন্যা। তিনি পরে নাসির উদ্দিন নামে এক অভিভাবকের ওপর চড়াও হন। এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে এলাকাবাসী বিক্ষুব্ধ হয়ে হয়ে ওঠেন। পরিস্থিতি বেগতিক দেখে সংসদ সদস্য ও তাঁর মেয়ে বাসভবনের মূল ফটক বন্ধ করে নিজেদের অবরুদ্ধ করেন।
কয়েকজন বিক্ষোভকারী অভিযোগ করেন, মাদ্রাসাটি বন্ধ করে দেওয়ার হুমকি দেওয়া হয়েছে, যা স্থানীয় লোকজনের মধ্যে ক্ষোভ সৃষ্টি করেছে। তাঁরা এ ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত এবং অভিযুক্ত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানান। এমন পরিস্থিতিতে সংসদ সদস্য গোলাম রাসুল ফেসবুক লাইভে এসে বলেন, মাদ্রাসায় যাতায়াতের রাস্তা নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে বিরোধ আছে। রাস্তাটি তাঁদের টাকা দিয়ে কেনা। সেটি সব সময় সচল রাখতে হবে। এটা নিয়ে তাঁর মেয়ের সঙ্গে মাদ্রাসার শিক্ষার্থী ও হুজুরদের কথা কাটাকাটি হয়। তিনি বলেন, ‘উদ্ভূত পরিস্থিতির জন্য আমি মর্মাহত। এই ভুলের জন্য আমি ক্ষমাপ্রার্থী। আমরা সবার সঙ্গে মিলেমিশে থাকতে চাই।’
এমপি গোলাম রসুল তাঁর মেয়েকে মানসিক রোগী দাবি করে বলেন, ভারতের হায়দরাবাদ ও দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে নিয়ে তাঁর চিকিৎসা করানো হয়েছে। নিরাপত্তাহীনতার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘আমি ভীত, সন্ত্রস্ত। নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছি। গানপাউডার এনে রেখেছে। যেকোনো সময় আমার বাড়িতে আগুন দেওয়া হতে পারে।’
এ বিষয়ে যশোর কোতোয়ালি থানার ওসি মাসুম খান বলেন, ‘পুলিশ সংসদ সদস্য ও তাঁর পরিবারকে নিরাপত্তা দিয়েছে। তিনি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কী বলেছেন, সেটা তাঁর ব্যক্তিগত বিষয়। এ বিষয়ে আমাদের কিছু জানা নাই।’
গত ২৭ মার্চ কুষ্টিয়া সদর উপজেলার হাটশ হরিপুর বড় মসজিদে জুমার খুতবার আগে এক আলোচনায় কুষ্টিয়া-৩ আসনের জামায়াত ইসলামীর সংসদ সদস্য আমির হামজা বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদমন্ত্রী এবং বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকুকে নিয়ে বক্তব্য দেন। ওই বক্তব্যে টুকুকে ‘নাস্তিক’ ও ‘ইসলামবিদ্বেষী’ হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়েছে বলে অভিযোগ ওঠে। পরে বক্তব্যটির ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে এবং বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রচারিত হয়। এ ঘটনায় গত ২ এপ্রিল সিরাজগঞ্জ জেলা আইনজীবী সমিতির সাধারণ সম্পাদক হুমায়ূন কবির কর্নেল একটি মানহানির মামলা দায়ের করেন। একই অভিযোগে পৃথক আরেকটি মামলা করেন সিরাজগঞ্জ জেলা বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ভিপি শামীম খান। মামলার অভিযোগে বলা হয়, ওই বক্তব্যের মাধ্যমে ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকুর ব্যক্তিগত, সামাজিক ও রাজনৈতিক সুনাম ক্ষুন্ন করা হয়েছে। এ অভিযোগে দণ্ডবিধির ২৯৬, ৫০০ ও ৫০৪ ধারায় মামলা দুটি দায়ের করা হয়।
নির্ধারিত তারিখে আদালতে হাজির না হওয়ায় গত ২১ এপ্রিল আমির হামজার বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করা হয়। পরে আদালত তার বিরুদ্ধে পত্রিকায় বিজ্ঞপ্তি প্রকাশেরও নির্দেশ দেন। পরবর্তীতে হাইকোর্ট থেকে আগাম জামিন নিয়ে নিম্ন আদালতে আত্মসমর্পণ করলে ১৪ জুন শুনানি শেষে আদালত দুটি মামলাতেই তার স্থায়ী জামিন মঞ্জুর করেন। বাজেট অধিবেশনের প্রথম দিন গত ৭ জুন সংসদের বাইরে থাকা মাল্টিমিডিয়ার রিপোর্টারদের সঙ্গে আমির হামজা বাজেট নিয়ে কথা বলেন। সেখানে তিনি বলেন, বাজেট ২০০ কোটি টাকা হওয়া উচিত। আরেকবার বলেন, বাজেট ছয় হাজার কোটি টাকা হওয়া উচিত। এবারের বাজেটের আকার ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকার। আমির হামজা পরে জানান, তিনি বলতে চেয়েছিলেন, ছয় লাখ কোটি টাকার বাজেট হওয়া উচিত। মুখ ফসকে ছয় হাজার কোটি বলে ফেলেছেন। আমির হামজার বক্তব্যেও অস্বস্তিতে পড়েছিলেন জামায়াত নেতৃত্ব।
বাজেট অধিবেশনে গত ১৭ জুন সংসদে দেওয়া বক্তৃতায় চাঁপাইনবাবগঞ্জ-২ আসনের জামায়াত ইসলামীর সংসদ সদস্য মু. মিজানুর রহমান এমপিদের সরকারি ফ্ল্যাটে ওয়াশিং মেশিন, মাইক্রোওভেন ও জানালার পর্দা চেয়ে বলেছিলেন, ‘আমরা বাজেটের ওপর কথা বলছি। সম্পূরক বাজেটও পাস হয়েছে। কিন্তু সংসদ সদস্যদের আবাসিক ফ্ল্যাটগুলোতে জানালা-দরজার পর্দাগুলো এখনো ঝোলানো হয়নি। আমরা শুনেছিলাম, আমাদের এই ফ্ল্যাটগুলোতে একটি করে ওয়াশিং মেশিন ও মাইক্রোওভেন দেওয়া হবে। এই পর্দা, ওয়াশিং মেশিন, মাইক্রোওভেন পাওয়ার জোর দাবি জানাচ্ছি।’ এই বক্তব্যের কারণে প্রথমে সামাজিক মাধ্যম, পরে সরকারি দলের সমালোচনার মুখে পড়ে জামায়াত। বিএনপির জোট শরিক বিজেপি চেয়ারম্যান আন্দালিব রহমান পার্থ টিপ্পনী কেটে বলেন, ‘তিনি জামায়াত এমপিকে ওভেন দিতে চান। প্রধানমন্ত্রীর তরফ থেকে ওয়াশিং মেশিন দেওয়া হলে সংসার সাজিয়ে দেওয়া হবে।’
গত ১৪ জুন নীলফামারী-৪ আসনের জামায়াত ইসলামীর এমপি আব্দুল মুনতাকিম বাজেট আলোচনায় দাবি করেন, মুক্তিযুদ্ধে তাঁর পরিবারের গৌরবোজ্জ্বল ভূমিকা আছে। তিনি বলেন, ‘আমার বাবা, আমার দাদা মুক্তিযুদ্ধে শহীদ। আমার আব্বারা (বাবা-চাচা) সাত ভাই; চারজনই মুক্তিযোদ্ধা। আমার দাদারা ১৯ জন; ১১ জনই মুক্তিযোদ্ধা। আমার পরিবারে ৪৭ জন মুক্তিযোদ্ধা। আমার মা মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক। আমি জুলাইযোদ্ধা।’ পরে জানা যায়, এমপি মুনতাকিমের জন্ম ১৯৮১ সালে। তাঁর বাবা জীবিত। এ বক্তব্যের কারণে সংসদের ভেতরে ও বাইরে তীব্র সমালোচনার মুখে পড়ে জামায়াত। সামাজিক মাধ্যমে ট্রল হয়। এমপি পরে ভুল স্বীকার করে বক্তব্য সংশোধনের জন্য স্পিকারকে চিঠি দেন।
এর আগে সরকারি অনুদান ও ত্রাণ বিতরণে জামায়াতের কয়েকজন সংসদ সদস্যের বিরুদ্ধে স্বজনপ্রীতি ও অনিয়মের অভিযোগও অস্বস্তিতে ফেলে দলটিকে। এরপরই দলের সেক্রেটারি জেনারেল মিয়া গোলাম পরওয়ারের স্বাক্ষরে দলীয় সব এমপির কাছে পাঠানো হয় লিখিত নির্দেশনা। সেখানে সরকারি অনুদান, ত্রাণ বা আর্থিক সহায়তা প্রদানের ক্ষেত্রে পরিবারের সদস্য, আত্মীয়স্বজন, শ্বশুরবাড়ির লোকজন, ব্যক্তিগত সহকারী (পিএ), ব্যক্তিগত সচিব (পিএস) কিংবা তাদের স্বজনদের জন্য কোনো ধরনের সুপারিশ বা বরাদ্দ না দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়।
নড়াইল-২ (সদরের একাংশ ও লোহাগড়া) আসনে জামায়াতের সংসদ সদস্য আতাউর রহমানের (বাচ্চু) ঐচ্ছিক তহবিল থেকে অনুদান প্রদানের জন্য সচিবালয় থেকে অনুমোদিত তালিকার দুই জায়গায় তার এক মেয়ের নাম পাওয়া গেছে। এই ঘটনাকে কেন্দ্র করে তার ব্যক্তিগত সহকারী (পিএস) আবু সালেহ মোহাম্মদ গোফরানকে বরখাস্ত করা হয়েছে। গত ২৮ জুন বাংলাদেশ জাতীয় সংসদের অফিসিয়াল প্যাডে সংসদ সদস্য আতাউর রহমানের স্বাক্ষরিত এক বিজ্ঞপ্তিতে এই তথ্য জানানো হয়।
এর আগে বাংলাদেশ সচিবালয়ের একটি চিঠি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়ে। চিঠিটি ছিল সংসদ সদস্য আতাউর রহমানের ঐচ্ছিক তহবিল থেকে অনুদান মঞ্জুরির পত্র। ওই চিঠিতে ২০২৫-২৬ অর্থবছরের জন্য নড়াইল-২ আসনের সংসদ সদস্যের ঐচ্ছিক তহবিলের ১ লাখ ৮৩ হাজার ৫০০ টাকা বরাদ্দের মধ্যে নড়াইল সদর উপজেলার জন্য ১০ জনের নামে ৮০ হাজার টাকা এবং লোহাগড়া উপজেলার ১১ জনের নামে ১ লাখ ৩ হাজার ৫০০ টাকা বরাদ্দের তালিকায় সংসদ সদস্য আতাউর রহমান বাচ্চুর নিজ মেয়ের দুই স্থানে নাম থাকা নিয়ে দেশজুড়ে সমালোচনা সৃষ্টি হয়। এই সমালোচনার মধ্যেই আবু সালেহ মোহাম্মদ গোফরানকে তার দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়।
গত জুনের মাঝামাঝি সময়ে ‘লোহাগাড়ার এমপি আরমান সাহেব, শাহজাহান চৌধুরী এখানে আসলে পায়ে গুলি করব’— এমন একটি অডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছিল। চট্টগ্রাম-১৫ (সাতকানিয়া-লোহাগাড়া) আসনের জামায়াতের সংসদ সদস্য শাহজাহান চৌধুরীকে লক্ষ্য করে এই হামলার পরিকল্পনার অডিও ফাঁস হওয়ার পর স্থানীয় রাজনীতি ও সাধারণ মানুষের মধ্যে ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছিল। ফাঁস হওয়া ওই অডিওতে সংসদ সদস্যের দীর্ঘদিনের ব্যক্তিগত সহকারী (পিএস) হিসেবে পরিচিত আরমান উদ্দিনের কণ্ঠ রয়েছে বলে স্থানীয়ভাবে দাবি করা হয়েছিল। এতে একজন নির্বাচিত সংসদ সদস্যের ওপর সহিংস হামলার পরিকল্পনার ইঙ্গিত থাকায় এলাকা জুড়ে উদ্বেগ দেখা দেয়। স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, অডিওতে কথোপকথন চালানো দুই ব্যক্তির মধ্যে একজন হলেন আরমান উদ্দিন।
অপর প্রান্তে থাকা ব্যক্তি হলেন বিএনপির যুবদলের রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত মো. তারেকুল হক। তিনি লোহাগাড়া সদর ইউনিয়নের রশিদার পাড়া এলাকার বাসিন্দা এবং অবৈধ বালু ব্যবসার সঙ্গে জড়িত বলে জানা গেছে। ফাঁস হওয়া অডিওতে তারেকুলকে আরও বলতে শোনা যায়, ‘লোহাগাড়ায় এমপি কেন আসবে? আসলে পায়ে গুলি করে জিজ্ঞেস করব কেন এসেছে। এখানে আরমান সাহেবের কথাই চলবে।’
জবাবে আরমান উদ্দিনকে বলতে শোনা যায়, ‘এমপিকে তো লোহাগাড়ায় না আসতে বলি। তারপরেও লোকজনের জ্বালায় আসে।’কথোপকথনের এক পর্যায়ে তারেকুল নামের ওই যুবদল নেতা আরো বলেন, ‘বাদশা খালেদের মতো অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে থাকব।’
জবাবে আরমান উদ্দিন বলেন, ‘এসব করলে পুলিশ আসবে, আর্মি আসবে, এমপি আসবে।’স্থানীয় বিভিন্ন সূত্রের দাবি, অডিওতে কথা বলা তারেকুল হক লোহাগাড়া এলাকায় অবৈধ বালু উত্তোলন ও পাহাড়ের মাটি কাটার সঙ্গে জড়িত একটি প্রভাবশালী চক্রের ঘনিষ্ঠ হতে পারেন।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









