দেশের সাড়ে ১৭ কোটি মানুষের প্রায় পাঁচ শতাংশই মাদকে আসক্ত। আর ‘নতুন সিনথেটিক ও আধা সিনথেটিক মাদকের বিস্তার’ এ সমস্যাকে আরো তীব্র করছে। বিশেষত, মেথামফেটামিন ও ক্যাফেইনের মিশ্রণে তৈরি জীবননাশী মাদক ইয়াবার মারাত্মক আসক্তিতে অগণিত জীবন ধ্বংস করছে। থাই ভাষায় ‘ইয়াবা’ শব্দের অর্থ ‘পাগল করা ওষুধ’। দেশের লাখ লাখ মানুষ ‘ক-শ্রেণির’ নিষিদ্ধঘোষিত এই মাদকে আসক্ত এবং এই সংখ্যা দিন দিন বেড়েই চলেছে।
জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের রেজিস্ট্রার মো. আরিফুজ্জামান বলেন, ইয়াবায় আসক্তি এখন ‘খুবই সাধারণ’ বিষয়। অনেক ব্যবহারকারী অন্যান্য মাদকও গ্রহণ করে। যেমন গাঁজা, বুপ্রেনোরফিন ইনজেকশন, হেরোইন ও ওমোরফোন বড়ি। সেগুলোসহ ইয়াবার ব্যবহার ‘উল্লেখযোগ্য হারে বাড়ছে’।
বিশ্বব্যাংকের হিসাবে, বাংলাদেশ নিম্ন মধ্যম আয়ের দেশ। দক্ষিণ এশিয়ার এই দেশ জলবায়ু পরিবর্তনের মারাত্মক ঝুঁকিতে রয়েছে। বিভিন্ন বৈশ্বিক সূচকেও এ কথা বলা হয়েছে। দেশের বহু তরুণ তাঁদের ভবিষ্যৎ নিয়ে দুশ্চিন্তায় ভুগছেন। এসব উত্থান–পতন ব্যক্তিগত জীবনেও জটিলতা তৈরি করে মাদকাসক্তি বাড়াচ্ছে।
সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার আমলে ২০১৮ সালে মাদকের বিরুদ্ধে কঠোর অভিযান শুরু হয়েছিল। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, তা সত্ত্বেও ইয়াবাসহ অন্যান্য মাদকাসক্তি বেড়েই চলেছে। গত জুনে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ জানান, দেশের সাড়ে ১৭ কোটি মানুষের প্রায় পাঁচ শতাংশ মাদকে আসক্ত। আর ‘নতুন সিনথেটিক ও আধা সিনথেটিক মাদকের বিস্তার’ এ সমস্যাকে আরো তীব্র করছে। চলতি মাসে জাতীয় সংসদে মাদকসংক্রান্ত কিছু অপরাধের জন্য মৃত্যুদণ্ডের বিধান রেখে বিল অনুমোদন করা হয়েছে।
মাদক ও অপরাধ বিষয়ক জাতিসংঘের দপ্তরের (ইউএনওডিসি) তথ্য অনুসারে, নব্বইয়ের দশকের শেষের দিকে ইয়াবা সেবন ‘তরুণদের সংস্কৃতির’ অংশ হয়ে ওঠার আগে এশিয়ার কিছু অংশে এটা ট্রাকচালকদের মতো পেশাজীবীরা সেবন করতেন। ২০০৭ সালে বাংলাদেশে ১২ লাখ ইয়াবা বড়ি জব্দ করা হয়েছিল বলে জানিয়েছে ইউএনওডিসি।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক মাদকাসক্ত তরুণ বলেন, ‘গত কয়েক বছরে দেশে আফিম বা হেরোইন পাওয়া কঠিন হয়ে গেছে। ইয়াবা অন্য সব মাদককে পুরোপুরি হটিয়ে দিয়েছে। ঢাকায় রাস্তায় তরুণদের সহজেই এই বড়ির প্যাকেট বিক্রি করতে দেখা যায়। মোহাম্মদপুর এলাকায় দেখা যায়, অল্প বয়সী ছেলেরা বড়ির ছোট প্যাকেট উঁচু করে ধরে আছে; আর রিকশাচালকরা হাত বাড়িয়ে সেটি নিয়ে নিচ্ছেন।’
ওই মাদকাসক্ত তরুণ বলেন, ‘ইয়াবা আগে ব্যয়বহুল ছিল। এখন সস্তায় ইয়াবা পাওয়ায় আসক্তি বাড়ছে, যা মুখ ও দাঁতের ‘পুরোপুরি বারোটা বাজিয়ে দেয়’। অন্যদিকে ‘(একজন ব্যবহারকারীর) চোখের দিকে তাকালেই আপনি বুঝতে পারবেন যে তারা পাগল হয়ে গেছে।’ তিনি জানান, এই বড়ি নিয়মিত সেবন করলে স্ট্রোক হতে পারে। অনেকে দাঁত হারায় বা তাদের ‘খিঁচুনি‘ হতে শুরু করে।
থাইল্যান্ড, মিয়ানমার ও লাওসের সীমান্ত যেখানে মিলেছে, তা ‘গোল্ডেন ট্রায়াঙ্গল’ নামে পরিচিত। বিশেষজ্ঞ ও চিকিৎসকরা বলছেন, সেখান থেকে বাংলাদেশে ছড়িয়ে পড়া সস্তা ইয়াবায় যারা আসক্ত হন, তারা নানা রোগে ভুগে মৃত্যুর দিকে এগিয়ে যাওয়া ছাড়াও ছাড়াও হিংস্র ও অপরাধপ্রবণ মানুষে পরিণত হন।
মানসিক রোগ বিশেষজ্ঞ মো. আরিফুজ্জামান, কিছু ব্যবহারকারী মাদক নেওয়ার পর ‘মস্তিষ্কের দুর্বলতার’ কারণে তাঁরা তুলনামূলকভাবে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হন। বন্যা, আগুন ও কোভিড-১৯ মহামারি সংকটের মতোই এটিও মারাত্মক।
আরিফুজ্জামান বলেন, আসক্ত কিছু ব্যক্তি মাদকের খরচ জোগানোর অন্য কোনো উপায় না পেয়ে নিজেরাই কারবারি (ডিলার) হয়ে যান। আবার অনেকে বিষণ্ণতা, উদ্বেগজনিত মানসিক ব্যাধি কিংবা মানসিক ভারসাম্যহীনতার (সাইকোসিস) মতো সমস্যায় ভুগছিলেন, যা থেকে মুক্তি পেতে তারা মাদকের দিকে ঝুঁকে পড়েন। ক্ষতিকর।
তার মতে, ‘কোনো মাদক সহজে পাওয়া গেলে সেটাই বেশি সংখ্যক মানুষ সেবন করে। তাই মাদক নির্মূল করতে এর সহজলভ্যতা কমাতে হবে। এ ছাড়া মাদকের ব্যবহার কমাতে মানসিক স্বাস্থ্যসেবার উন্নতি করতে হবে।‘
তথ্যসূত্র: দ্য আইরিশ টাইমস


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









