নিজেদের ক্লিন ইমেজের রাজনৈতিক দল ও তাকওয়াবান কর্মী দাবি করা জামায়াত নেতারা জড়িয়ে পড়ছেন বিতর্কিত কর্মকাণ্ডে। তৃণমূল থেকে শুরু করে কেন্দ্র, জেলা ও মহানগর থেকে শুরু করে ওয়ার্ড দায়িত্বশীল। বাদ যাচ্ছে না সংসদ সদস্যরা। বিতর্কিত কর্মকাণ্ডে নেতা-কর্মীদের পাশাপাশি জড়িয়ে যাচ্ছেন পরিবার কিংবা আত্মীয়স্বজনও। দেশজুড়ে আলোচনা-সমালোচনার মধ্যে নতুন করে সামনে আসছে বগুড়া জেলার জামায়াতের কর্মকাণ্ড।
সম্প্রতি জালিয়াতির মাধ্যমে সরকারি নথিতে রেলওয়ের একটি প্রাকৃতিক জলাশয়কে ‘ভিটা’ জমি দেখিয়ে দখল ও ভরাটের চেষ্টার অভিযোগ উঠেছে বগুড়া শহরে। অভিযোগ রয়েছে, জামায়াতের দুই নেতা-কর্মীর নেতৃত্বে প্রায় ৬৩ কোটি ৫০ লাখ টাকা মূল্যের ওই সরকারি জলাশয় ইজারা নিয়ে সেখানে বহুতল মার্কেটসহ বিভিন্ন বাণিজ্যিক স্থাপনা নির্মাণের পরিকল্পনা করা হয়েছে। স্থানীয়দের অভিযোগের ভিত্তিতে বগুড়া সিটি করপোরেশনের অভিযানে ভরাটের কাজ বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে।
একই সঙ্গে সংশ্লিষ্টদের আগামী সোমবার প্রয়োজনীয় কাগজপত্র নিয়ে হাজির হওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। অভিযুক্তরা হলেন- বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদের সদস্য অধ্যক্ষ শাহাবুদ্দিনের ছেলে ও ২০ নম্বর ওয়ার্ড জামায়াতের সাধারণ সম্পাদক আব্দুল হাকিম এবং জামায়াত কর্মী ছাইফুল ইসলাম। তারা নিজেদের বিরুদ্ধে আনা সব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।
জানা গেছে, বগুড়া সদরের চকবৃন্দাবন মৌজার ১ দশমিক ২৮ একর সরকারি জমিটি সরকারি রেকর্ডে পুকুর বা প্রাকৃতিক জলাশয় হিসেবে শ্রেণিভুক্ত। শহরের স্টেশন রোডসংলগ্ন গুরুত্বপূর্ণ এই জলাশয়ের বর্তমান বাজারমূল্য প্রায় ৬৩ কোটি ৫০ লাখ টাকা। কাগজে-কলমে ইজারার লাইসেন্স ১৭ জনের নামে থাকলেও পুরো কার্যক্রমের নেপথ্যে মূল ভূমিকা পালন করছেন ছাইফুল ইসলাম ও আব্দুল হাকিম। তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালে কৃষি লাইসেন্সের আওতায় জলাশয়টি ইজারা নেওয়া হয়। পরে সেটিকে বাণিজ্যিক লাইসেন্সের আওতায় এনে উন্নয়ন প্রকল্পের নামে বালু ফেলে ভরাটের উদ্যোগ নেওয়া হয়। স্থানীয় বাসিন্দারা এর প্রতিবাদ করলে এবং পরিবেশ অধিদপ্তর আপত্তি জানালে কৌশল পরিবর্তন করে জমিটির শ্রেণি পরিবর্তনের উদ্যোগ নেওয়া হয়।
গত বছরের ৫ নভেম্বর রেলওয়ের পক্ষ থেকে জেলা প্রশাসনের কাছে জমিটির শ্রেণি পরিবর্তনের আবেদন করা হয়। পরে জেলা প্রশাসনের রাজস্ব শাখার তদন্তে দেখা যায়, জায়গাটি এখনো প্রাকৃতিক জলাশয় হিসেবেই বিদ্যমান। তদন্ত প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, জলাশয়টি ভরাট হলে বগুড়া শহরের জলাবদ্ধতা আরও ভয়াবহ আকার ধারণ করতে পারে। এসব বিষয় বিবেচনায় নিয়ে জেলা প্রশাসন আবেদনটি নামঞ্জুর করে।
জেলা প্রশাসনের সেই সিদ্ধান্তের পর নতুন করে আরেকটি নথি সামনে আসে, যেখানে একই জমিকে 'ভিটা' হিসেবে দেখানো হয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, মূল আরএস খতিয়ানে জমির শ্রেণি 'পুকুর' থাকলেও পরবর্তী সময়ে ব্যবহৃত একটি মাঠ রেকর্ডে সেটিকে 'ভিটা' হিসেবে উপস্থাপন করা হয়েছে। অথচ জেলা প্রশাসনের সিদ্ধান্ত ও সরকারি নথির সঙ্গে এই কাগজের কোনো মিল পাওয়া যায়নি। এ ঘটনায় সরকারি নথি বিকৃতি ও জালিয়াতির অভিযোগ আরো জোরালো হয়েছে। স্থানীয়দের অভিযোগের পর বগুড়া সিটি করপোরেশনের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট পপি খাতুন ও জাহাঙ্গীর আলম অভিযান পরিচালনা করেন। এ সময় জলাশয়ের ওপর নির্মিত অবৈধ টিনের বেড়া অপসারণ করা হয় এবং বালু ফেলে ভরাটের কাজ বন্ধ করে দেওয়া হয়। পাশাপাশি আগামী ২৭ জুলাই সংশ্লিষ্টদের সব বৈধ কাগজপত্র নিয়ে উপস্থিত হওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট পপি খাতুন বলেন, ‘সুনির্দিষ্ট অভিযোগ ও প্রাথমিক প্রমাণের ভিত্তিতেই অভিযান পরিচালনা করা হয়েছে। জলাশয়ে বালু ফেলে ভরাট এবং ড্রেনের সীমানা অমান্য করে স্থাপনা নির্মাণের চেষ্টা পাওয়া গেছে। কাগজপত্র যাচাই শেষে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।‘
অভিযানের পরদিন ছাইফুল ইসলাম সংবাদ সম্মেলন করে দাবি করেন, জেলা প্রশাসন জমিটির শ্রেণি পরিবর্তন করে 'ভিটা' করেছে এবং সেই ভিত্তিতেই রেলওয়ে প্রায় ৭০ লাখ টাকা রাজস্ব আদায় করেছে। নথি জালিয়াতির অভিযোগ অস্বীকার করে তিনি বলেন, ‘আমরা কোনো অবৈধ কাজ করিনি। প্রয়োজন হলে সব কাগজপত্র সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে উপস্থাপন করব।’
অপর অভিযুক্ত আব্দুল হাকিম প্রথমে প্রয়োজনীয় তথ্য ও লিজগ্রহীতাদের তালিকা দেওয়ার আশ্বাস দিলেও পরে একাধিকবার মোবাইল ফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করেও তাঁর বক্তব্য পাওয়া যায়নি। বগুড়ার অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) ইমরুল কায়েস বলেন, ‘সরেজমিন তদন্তে জায়গাটি এখনো প্রাকৃতিক জলাশয় হিসেবে পাওয়া গেছে। আইন অনুযায়ী কোনো পুকুর বা জলাশয়ের শ্রেণি পরিবর্তন করে ভিটা করার সুযোগ নেই। কেউ যদি এমন কোনো কাগজের দাবি করেন, সেটি সঠিক নয়।’
রেলওয়ের লালমনিরহাট বিভাগের বিভাগীয় ভূসম্পত্তি কর্মকর্তা মনজুর আলম বলেন, ‘মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনা অনুযায়ী রেলওয়ের জমিতে কোনো ধরনের অবৈধ দখল বা স্থাপনা করতে দেওয়া হবে না। কোথাও অনিয়ম বা জালিয়াতির প্রমাণ পাওয়া গেলে বিধি অনুযায়ী কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









