বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন সরকার গত ১৭ ফেব্রুয়ারি দায়িত্ব নেওয়ার পর প্রশাসনকে গতিশীল করতে ১৮০ দিনের বিশেষ কর্মসূচি ঘোষণা করা হয়। নির্বাচনী ইশতেহার বাস্তবায়ন, উন্নয়ন প্রকল্পের গতি বাড়ানো, নীতিনির্ধারণে সমন্বয় তৈরি এবং মাঠ প্রশাসনকে আরো কার্যকর করার লক্ষ্য নিয়ে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও বিভাগে বিশেষ নির্দেশনাও পাঠানো হয়।
তবে ছয় মাসের মূল্যায়নে সরকারের নীতিনির্ধারকদের ধারণা, প্রশাসনের বিভিন্ন স্তরে এখনো কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন আসেনি। বিশেষ করে উন্নয়ন প্রকল্প, নীতিগত সিদ্ধান্ত, বাজেট বাস্তবায়ন ও ফাইল নিষ্পত্তির ক্ষেত্রে ধীরগতি রয়ে গেছে।
একাধিক মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা বলেন, প্রশাসনের কিছু অংশ এখনো আগের কর্মসংস্কৃতি থেকে পুরোপুরি বের হতে পারেনি। ফলে সরকারের অগ্রাধিকারমূলক কর্মসূচির বাস্তবায়ন বিলম্বিত হচ্ছে।
কর্মকর্তারা বলেন, নীতি নির্ধারণ যতদ্রুত হচ্ছে, বাস্তবায়নের গতি ততটা নয়। কোথাও সমন্বয়ের ঘাটতি, কোথাও সিদ্ধান্ত গ্রহণে অনীহা, আবার কোথাও প্রশাসনিক জড়তা কাজ করছে। আর কয়েক দিনের মধ্যে সরকারের ১৮০ দিনের বিশেষ কর্মসূচির মেয়াদ শেষ হতে চলেছে। এ সময়ের অভিজ্ঞতা পর্যালোচনার ভিত্তিতে সরকারের শীর্ষ পর্যায় মনে করেন, কেবল বদলি, পদায়ন বা কিছু প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত দিয়ে প্রশাসনে কাঙ্ক্ষিত গতি আনা সম্ভব নয়। এ প্রেক্ষাপটে প্রশাসনের গুরুত্বপূর্ণ পদগুলোতে দক্ষতা, সততা, পেশাদারত্ব ও মেধাকে অগ্রাধিকার দিয়ে নতুন করে দায়িত্ব বণ্টনের প্রস্তুতি চলছে।
জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রী আব্দুল বারী বলেন, প্রশাসনে কাঙ্ক্ষিত গতি ফিরিয়ে আনতে সরকার বদ্ধপরিকর। ১৮০ দিনের বিশেষ কর্মসূচি শেষ হওয়ার পর প্রশাসনকে নতুনভাবে সাজানোর পরিকল্পনা রয়েছে। তিনি বলেন, বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও বিভাগে পেশাদার ও দক্ষ কর্মকর্তাদের অগ্রাধিকার দিয়ে পদায়ন করা হবে। প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনাও সেদিকেই। প্রতিমন্ত্রী আরো বলেন, অতীতে প্রশাসনে মেধার যথাযথ মূল্যায়ন হয়নি। দীর্ঘসময় ধরে রাজনৈতিক বিবেচনা প্রাধান্য পাওয়ায় একটি ভারসাম্যহীন পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। বর্তমান সরকার সেই অবস্থা থেকে বেরিয়ে এসে একটি মেধাভিত্তিক প্রশাসনিক কাঠামো গড়ে তুলতে চায়। পোস্টিং, প্রমোশন কিংবা নিয়োগ- কোনোটিই যেন অযৌক্তিক প্রভাবের শিকার না হয়, সেটাই আমাদের লক্ষ্য। তিনি এও স্বীকার করেন, দীর্ঘদিনের প্রশাসনিক বাস্তবতা এক দিনে পরিবর্তন করা সম্ভব নয়।
জনপ্রশাসন বিশেষজ্ঞ মোহাম্মদ ফিরোজ মিয়া মনে করেন, শুধু বদলি বা পদায়ন দিয়ে প্রশাসনের কাঠামোগত সমস্যা দূর হবে না। সবচেয়ে বড় বিষয় হলো, প্রকৃত অর্থে দক্ষ ও সৎ কর্মকর্তাদের চিহ্নিত করা। তিনি বলেন, যোগ্য কর্মকর্তাকে বেছে নেওয়ার কাজটিও দক্ষ মানুষের হাতে থাকতে হবে। কর্মকর্তাদের মূল্যায়নে বার্ষিক গোপনীয় প্রতিবেদন, কর্মদক্ষতা, দুর্নীতির অভিযোগ, মাঠ প্রশাসনের অভিজ্ঞতা এবং প্রয়োজনে গোয়েন্দা সংস্থার তথ্যও বিবেচনায় নেওয়া যেতে পারে।
জানা গেছে, প্রশাসন পুনর্গঠনের দ্বিতীয় ধাপে কয়েকটি বিষয়কে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। এর মধ্যে রয়েছে কর্মদক্ষতা, দুর্নীতিমুক্ত কর্মজীবন, মাঠ প্রশাসনের অভিজ্ঞতা, সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের সক্ষমতা এবং রাজনৈতিক নিরপেক্ষতা। জনপ্রশাসন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, কর্মকর্তাদের বার্ষিক গোপনীয় প্রতিবেদন (এসিআর), অতীতের দায়িত্ব পালনের রেকর্ড, বিভিন্ন সংস্থার মূল্যায়ন এবং প্রয়োজনীয় ক্ষেত্রে গোয়েন্দা তথ্যও পর্যালোচনা করা হচ্ছে। এসব তথ্যের ভিত্তিতে গুরুত্বপূর্ণ পদগুলোর জন্য সম্ভাব্য কর্মকর্তাদের একটি তালিকা প্রস্তুত করা হয়েছে। জনপ্রশাসন উপদেষ্টা, জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রী, মন্ত্রিপরিষদ বিভাগের শীর্ষ কর্মকর্তা এবং প্রধানমন্ত্রীর মধ্যে এ তালিকা নিয়ে আলোচনা হতে পারে। এরপর ধাপে ধাপে মন্ত্রণালয়, বিভাগ, অধিদপ্তর এবং মাঠ প্রশাসনে নতুন পদায়নের সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে।
জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়, মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ এবং সরকারের উচ্চপর্যায়ের একাধিক দায়িত্বশীল কর্মকর্তার সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বিভিন্ন ব্যাচের কর্মকর্তাদের মূল্যায়ন করা হচ্ছে কর্মদক্ষতা, সততা, অতীতের প্রশাসনিক ভূমিকা এবং নীতিনিষ্ঠার ভিত্তিতে। কারা মাঠ প্রশাসনে সফল, কারা নীতি বাস্তবায়নে দক্ষতা দেখিয়েছেন, কার বিরুদ্ধে দুর্নীতি বা রাজনৈতিক পক্ষপাতের অভিযোগ রয়েছে- এসব তথ্যও পর্যালোচনা করা হচ্ছে। একই সঙ্গে আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে বিতর্কিত কর্মকাণ্ডে যুক্ত বা বিশেষ সুবিধাভোগী হিসেবে চিহ্নিত কর্মকর্তাদের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব থেকে দূরে রাখার চিন্তাও রয়েছে। কয়েকজন অবসরপ্রাপ্ত অভিজ্ঞ কর্মকর্তাকে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দিয়ে প্রশাসনের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে আনার বিষয়টিও বিবেচনায় রয়েছে। সরকারের দায়িত্বশীল একটি সূত্র জানিয়েছে, ১৮০ দিনের কর্মসূচি শেষ হওয়ার পর প্রশাসনে দ্বিতীয় ধাপের পুনর্বিন্যাস শুরু হতে পারে। এবার মূল বিবেচনা হবে মেধা, সততা ও কাজের সক্ষমতা। ইতোমধ্যে সম্ভাব্য কর্মকর্তাদের তালিকা প্রস্তুতের কাজ অনেক দূর এগিয়ে নেওয়া হয়েছে।
সরকারি সূত্রগুলো জানায়, আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে পদোন্নতি না পাওয়া বা দীর্ঘদিন গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বের বাইরে থাকা কয়েকজন অভিজ্ঞ কর্মকর্তাকে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগের বিষয়েও আলোচনা চলছে। প্রয়োজনে তাদের বিভিন্ন মন্ত্রণালয়, কমিশন কিংবা স্বায়ত্তশাসিত প্রতিষ্ঠানে দায়িত্ব দেওয়া হতে পারে। নীতিনির্ধারকদের ভাষ্য, প্রশাসনে অভিজ্ঞতা ও তারুণ্যের সমন্বয় ঘটিয়ে কার্যকর নেতৃত্ব তৈরি করাই এ উদ্যোগের উদ্দেশ্য। কেননা, সরকারের উচ্চপর্যায়ের একাধিক বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান কর্মকর্তাদের উদ্দেশে বলেছেন, অতীতের বিভাজন ভুলে প্রশাসনকে পেশাদার ভিত্তিতে পরিচালনা করতে হবে। রাজনৈতিক আনুগত্যের পরিবর্তে দক্ষতা, সততা ও জনস্বার্থকে অগ্রাধিকার দিতে হবে।
সরকারের একাধিক পর্যায়ের কর্মকর্তারা বলছেন, প্রশাসনের ধীরগতির পেছনে শুধু ব্যক্তি নয়, দীর্ঘদিনের প্রশাসনিক সংস্কৃতিও দায়ী। অভিযোগ, গত এক দশকের বেশি সময় ধরে পদোন্নতি, পদায়ন ও গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব দেওয়ার ক্ষেত্রে রাজনৈতিক বিবেচনার প্রভাব ছিল। এর ফলে অনেক ক্ষেত্রে যোগ্যতার চেয়ে আনুগত্য বেশি গুরুত্ব পেয়েছে বলে মনে করেন সংশ্লিষ্টরা। নীতিনির্ধারকদের মতে, এই সংস্কৃতির প্রভাব এখনো পুরোপুরি কাটেনি। অনেক কর্মকর্তা সিদ্ধান্ত গ্রহণে ঝুঁকি নিতে চান না, আবার কেউ কেউ অতীতের প্রশাসনিক ধারা থেকেই বের হতে পারছেন না। ফলে নীতিগত সিদ্ধান্ত দ্রুত হলেও বাস্তবায়নের গতি সেই তুলনায় ধীর হয়ে পড়েছে।
জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে ৮১ জন কর্মকর্তা জ্যেষ্ঠ সচিব ও সচিব পদমর্যাদায় দায়িত্ব পালন করছেন। তাদের মধ্যে প্রায় ২০ জন চুক্তিভিত্তিক নিয়োগে রয়েছেন। সাম্প্রতিক সময়ে খাদ্য, পরিবেশ, কৃষি বিপণন, ট্রেড মার্কস, নার্সিং ও মিডওয়াইফারি অধিদপ্তর, জাতীয় যুব উন্নয়ন ইনস্টিটিউট, গভর্ন্যান্স ইনোভেশন ইউনিট, জাতীয় মুক্তিযোদ্ধা কাউন্সিল, জাতীয় পরিচয়পত্র নিবন্ধন অনুবিভাগ এবং উপানুষ্ঠানিক শিক্ষা ব্যুরোসহ একাধিক দপ্তরে নতুন মহাপরিচালক নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া এনটিআরসিএ, বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ, জাতীয় গৃহায়ণ কর্তৃপক্ষ এবং জন্ম ও মৃত্যু নিবন্ধন কার্যালয়ের মতো গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানের নেতৃত্বেও পরিবর্তন এসেছে। সরকারের সংশ্লিষ্ট সূত্র বলছে, এসব নিয়োগ প্রশাসনের দ্বিতীয় ধাপের পুনর্বিন্যাসেরই অংশ। নীতিনির্ধারকরা বলেন, প্রশাসনে গতি ফেরাতে এবার ব্যক্তি পরিবর্তনের পাশাপাশি কর্মসংস্কৃতির পরিবর্তনেও গুরুত্ব দেওয়া হবে। সেই বাস্তবতার মধ্যেই নতুন সরকার প্রশাসনের দ্বিতীয় ধাপের পুনর্গঠনের পথে হাঁটছে। আগামী কয়েক সপ্তাহে সচিবালয় থেকে মাঠ প্রশাসন- বিভিন্ন স্তরে যে সিদ্ধান্তগুলো নেওয়া হবে, সেগুলোই বলে দেবে প্রশাসনে গতি ফেরানোর প্রতিশ্রুতি কতটা বাস্তব রূপ পাচ্ছে।
এদিকে কার্যক্রম নিষিদ্ধ ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে থাকা প্রশাসন ও পুলিশ ক্যাডারের কর্মকর্তাদের বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠাচ্ছে সরকার। বেশ কয়েকজন কর্মকর্তাকে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানোর বিষয়টির পর্যালোচনা চলছে, যা প্রশাসনের ভেতরে কিছুটা উদ্বেগ ও অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে বলে জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। একই সঙ্গে বিগত সরকারের সময়ে বিভিন্ন দায়িত্বে থাকা কর্মকর্তাদের মধ্যে ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগ ও আতঙ্কও তৈরি হয়েছে। প্রশাসনের কর্মকর্তাদের অবসরে পাঠানোর প্রক্রিয়া জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের নিয়োগ, পদোন্নতি ও বদলি (এপিডি) অনুবিভাগের মাধ্যমে সম্পন্ন হয়। সম্প্রতি বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানো কর্মকর্তাদের বিষয়ে জানতে এপিডি অনুবিভাগের অতিরিক্ত সচিব মো. আকনুর রহমানের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি এ বিষয়ে কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি। এ-সংক্রান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ার সঙ্গে সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে যোগাযোগ করার পরামর্শ দেন তিনি।
কর্মকর্তাদের বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানোর বিষয়ে জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রী মো. আব্দুল বারী দৈনিক এদিনকে বলেন, সরকার বিধি অনুযায়ী সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠিয়েছে। এক্ষেত্রে আইনের কোনো ব্যত্যয় ঘটেনি। তবে যাদের বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানো হয়েছে, তাদের কার্যক্রম ও সার্বিক বিষয় পর্যালোচনা ও মূল্যায়নের ভিত্তিতেই এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। তবে এ ধরনের সিদ্ধান্তের কারণে অন্য সরকারি কর্মকর্তাদের উদ্বিগ্ন বা শঙ্কিত হওয়ার কারণ নেই।
বিতর্কিত একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জেলা প্রশাসকের দায়িত্ব পালন করা ৩২ কর্মকর্তাকে গত ২৭ জুলাই বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠায় সরকার। এ কর্মকর্তাদের সবাই আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে যুগ্ম সচিব পদে পদোন্নতি পেয়েছিলেন। এছাড়া চলতি বছরের ১ মার্চ চাকরি আইন, ২০১৮-এর ৪৫ ধারা মোতাবেক প্রাক্তন কৃষি সচিব ড. মোহাম্মদ এমদাদ উল্লাহ মিয়াকে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠায় সরকার। এর আগে গত বছরের ২০ ফেব্রুয়ারি চাকরির বয়স ২৫ বছর হওয়া ২২ জন সাবেক ডিসিকে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠায় অন্তর্বর্তী সরকার। বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানো সবাই বিসিএস প্রশাসন ক্যাডারের কর্মকর্তা।
এদিকে চলতি আগস্টে শেষ হচ্ছে মন্ত্রিপরিষদ সচিব ড. নাসিমুল গনি ও জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব মো. এহছানুল হকের দুই বছরের চুক্তিভিত্তিক নিয়োগের মেয়াদ। গুরুত্বপূর্ণ এ দুই পদে ফের চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দেওয়া হবে, নাকি কর্মরত কর্মকর্তাদের মধ্য থেকে পদোন্নতি দিয়ে দায়িত্ব দেওয়া হবে এ নিয়ে প্রশাসনে চলছে নানা আলোচনা। একই সঙ্গে বর্তমান মন্ত্রিপরিষদ সচিবের চুক্তির মেয়াদ বাড়ানো এবং জনপ্রশাসন সচিব পদে নতুন মুখ আনার বিষয়টিও আলোচনায় রয়েছে। এদিকে প্রশাসনের শীর্ষ পর্যায়ে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগের সংখ্যা বাড়তে থাকায় নিয়মিত কর্মকর্তাদের মধ্যে অসন্তোষও তৈরি হয়েছে।
প্রশাসনে নির্বিচারে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দিয়ে কর্মকর্তাদের মধ্যে অসন্তোষ রয়েছে। বর্তমানে প্রশাসনে মন্ত্রিপরিষদ সচিব, জনপ্রশাসনের সচিবসহ চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ পাওয়া সিনিয়র সচিব, সচিব ও সচিব পদমর্যাদার কর্মকর্তার সংখ্যা ২২। এর বাইরে সম্প্রতি নির্বাচন কমিশনের অতিরিক্ত সচিবসহ গ্রেড-২ পদমর্যাদার আরো ১২টি গুরুত্বপূর্ণ পদেও এক বছরের জন্য চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দেওয়া হয়। ফলে প্রশাসনের শীর্ষ পর্যায় থেকে বিভিন্ন রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থা পর্যন্ত চুক্তিভিত্তিক নিয়োগের পরিধি উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের পর অন্তর্বর্তী সরকার ২০২৪ সালের ১৭ আগস্ট অবসরে যাওয়া পাঁচ অতিরিক্ত সচিবকে দুই বছরের জন্য চুক্তিভিত্তিক সচিব হিসেবে নিয়োগ দেয়। তাদের মধ্যে নাসিমুল গনি ও এহছানুল হকও ছিলেন। পরদিনই তাদের সিনিয়র সচিব পদমর্যাদা দেওয়া হয়। পরে প্রশাসনিক প্রয়োজনে বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও বিভাগে তাদের পদায়ন করা হয়। তখন নাসিমুল গনি রাষ্ট্রপতির কার্যালয়ের জন বিভাগের সিনিয়র সচিব এবং এহছানুল হক সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগের সিনিয়র সচিব হিসেবে দায়িত্ব পান। চলতি বছরের ১৬ ফেব্রুয়ারি ড. নাসিমুল গনিকে দেশের ২৬তম মন্ত্রিপরিষদ সচিব হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়। এর আগে ১৪ ফেব্রুয়ারি তৎকালীন মন্ত্রিপরিষদ সচিব শেখ আব্দুর রশীদের চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ তার আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে বাতিল করা হয়।
ড. নাসিমুল গনি ১৯৮২ ব্যাচের প্রশাসন ক্যাডারের কর্মকর্তা। ২০০৯ সালে তিনি বিশেষ ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওএসডি) হন। চার বছর ওএসডি থাকার পর ২০১৩ সালে তাকে অবসরে পাঠানো হয়। পরে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগের মাধ্যমে তিনি প্রশাসনে ফিরে আসেন। অন্যদিকে, গত বছরের ১২ অক্টোবর এহছানুল হককে সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগ থেকে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে সিনিয়র সচিব হিসেবে বদলি করা হয়। এর আগে ২১ সেপ্টেম্বর জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিবের দায়িত্ব চালিয়ে আসা মো. মোখলেস উর রহমানকে পরিকল্পনা কমিশনের সদস্য (সিনিয়র সচিব) হিসেবে বদলি করা হয়েছে (বিএনপি সরকার এসে তার চুক্তি বাতিল করে)। নাসিমুল গনি এবং এহছানুল হকের দুই বছরের চুক্তিভিত্তিক নিয়োগের মেয়াদ আগামী ১৬ আগস্ট শেষ হচ্ছে।
বর্তমানে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ পাওয়া কর্মকর্তাদের মধ্যে রয়েছেন মন্ত্রিপরিষদ সচিব ড. নাসিমুল গনি, প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব এ বি এম আব্দুস সাত্তার, জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব মো. এহছানুল হক, নির্বাচন কমিশন সচিবালয়ের সিনিয়র সচিব আখতার আহমেদ, জাতীয় নদী রক্ষা কমিশনের চেয়ারম্যান (সিনিয়র সচিব) মকসুমুল হাকিম চৌধুরী, পরিকল্পনা কমিশনের সদস্য (সিনিয়র সচিব) ড. মো. নেয়ামত উল্লাহ ভূইয়া, ভূমি মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব এ. এস. এম. সালেহ আহমেদ, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সিনিয়র সচিব মনজুর মোর্শেদ চৌধুরী, বাংলাদেশ হাওর ও জলাভূমি উন্নয়ন অধিদপ্তরের মহাপরিচালক (সচিব) সি এম ইউসুফ হোসাইন, ধর্মবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সচিব মুন্সী আলাউদ্দিন আল আজাদ, মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা বিভাগের সচিব আবদুল খালেক, ভূমি আপিল বোর্ডের সচিব মো. আব্দুল্লাহ আল বাকী, স্বাস্থ্যসেবা বিভাগের সচিব মো. কামরুজ্জামান চৌধুরী, ভূমি সংস্কার বোর্ডের চেয়ারম্যান (সচিব) এ. জে. এম. সালাহউদ্দিন নাগরী, শিল্প মন্ত্রণালয়ের সচিব আব্দুন নাসের খান, কৃষি মন্ত্রণালয়ের সচিব রফিকুল আই মোহাম্মদ, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. দেলোয়ার হোসেন, বস্ত্র অধিদপ্তরের মহাপরিচালক (সচিব) ড. মো. আবদুস সবুর, ঢাকা পরিবহন সমন্বয় কর্তৃপক্ষের নির্বাহী পরিচালক (সচিব) মোহাম্মদ মসিউর রহমান, কমিউনিটি ক্লিনিক স্বাস্থ্য সহায়তা ট্রাস্টের ব্যবস্থাপনা পরিচালক এ. কে. এম. ফজলুজ্জোহা, রাষ্ট্রপতির প্রেস সচিব মো. সরওয়ার আলম এবং বাংলাদেশ ওয়াক্ফ প্রশাসকের কার্যালয়ের ওয়াক্ফ প্রশাসক সাফিজ উদ্দিন আহমেদ।
চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ এখন সচিব পর্যায়ের বাইরেও বিস্তৃত হয়েছে। গত ২৩ জুলাই জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের পৃথক প্রজ্ঞাপনে নির্বাচন কমিশন সচিবালয়ের অতিরিক্ত সচিবসহ ১২টি গুরুত্বপূর্ণ পদে এক বছরের জন্য চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দেওয়া হয়। নির্বাচন কমিশনের অতিরিক্ত সচিবের পদ ছাড়া বাকি ১১টি পদে গ্রেড-২ পদমর্যাদা দেওয়া হয়েছে। নির্বাচন কমিশন সচিবালয়ের অতিরিক্ত সচিব হিসেবে দায়িত্ব পেয়েছেন সামসুল আলম। এছাড়া বাংলাদেশ শ্রমিক কল্যাণ ফাউন্ডেশনের মহাপরিচালক হিসেবে সালাহউদ্দিন সরকার, বোয়েসেলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক হিসেবে মোহাম্মদ রাশেদুল হক, বাংলাদেশ বনশিল্প উন্নয়ন করপোরেশনের চেয়ারম্যান হিসেবে মোহাম্মদ মোসাদ্দেক হোসেন বুলবুল, বিআইডব্লিউটিসির চেয়ারম্যান হিসেবে এ টি এম আবদুল বারী ড্যানী, বাংলাদেশ জাতীয় সমাজকল্যাণ পরিষদের নির্বাহী সচিব হিসেবে কামরুজ্জামান, বাংলাদেশ ইস্পাত ও প্রকৌশল করপোরেশনের চেয়ারম্যান হিসেবে আবদুল খালেক, বাংলাদেশ চিনি ও খাদ্যশিল্প করপোরেশনের চেয়ারম্যান হিসেবে শামসুজ্জামান (সুরুজ), বাংলাদেশ জলবায়ু পরিবর্তন ট্রাস্টের ব্যবস্থাপনা পরিচালক হিসেবে কাজী রওনাকুল ইসলাম (টিপু), বাংলাদেশ তাঁত বোর্ডের চেয়ারম্যান হিসেবে জাকির সিদ্দিকি, বিসিকের চেয়ারম্যান হিসেবে বেনজীর আহমেদ এবং বাংলাদেশ জুট করপোরেশনের চেয়ারম্যান হিসেবে মামুন হাসান নিয়োগ পান। সংশ্লিষ্টদের অধিকাংশই বিএনপির রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত বলে রাজনৈতিক অঙ্গনে আলোচনা রয়েছে। এসব নিয়োগের পর প্রশাসনের একাংশের কর্মকর্তাদের মধ্যেও অসন্তোষ দেখা দেয় বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









