তিন মাস পর আবার বাড়ল রান্নার কাজে ব্যবহৃত তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাস বা এলপিজির দাম। সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত ১২ কেজির এলপিজি সিলিন্ডারের দাম ১ হাজার ৫২৮ টাকা থেকে ৭০ টাকা বাড়িয়ে ১ হাজার ৫৯৮ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। এদিকে মিয়ানমার থেকে পাইপলাইনের মাধ্যমে প্রাকৃতিক গ্যাস আমদানির প্রস্তাব দিয়েছে বাংলাদেশ। একই সঙ্গে এলএনজি আমদানির সম্ভাবনাও খতিয়ে দেখার বিষয়ে দুই দেশের মধ্যে ইতিবাচক আলোচনা হয়েছে।
১২ কেজি এলপিজির দাম বাড়ল ৭০ টাকা
গতকাল রবিবার এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি) দাম বৃদ্ধির এ তথ্য জানায়। এই নতুন দর গতকাল সন্ধ্যা ৬টা থেকেই কার্যকর হয়েছে। আগস্টের জন্য বেসরকারি এলপিজির প্রতি কেজির দাম খুচরা পর্যায়ে মূল্য সংযোজন করসহ (মূসক) ১৩৩ টাকা ১৫ পয়সা নির্ধারণ করা হয়। জুলাইয়ে এ দাম ছিল ১২৭ টাকা ৩০ পয়সা। সে হিসাবে প্রতি কেজিতে দাম বেড়ে দাঁড়ায় ৫ টাকা ৮৫ পয়সা। আগস্টের সমন্বয়ে ৫ দশমিক ৫ কেজির সিলিন্ডারের দাম ৭৩২ টাকা, ১২ দশমিক ৫ কেজির দাম ১ হাজার ৬৬৪ টাকা, ১৫ কেজির ১ হাজার ৯৯৭ টাকা এবং ১৬ কেজির ২ হাজার ১৩০ টাকা নির্ধারণ করা হয়। এ ছাড়া ১৮ কেজির সিলিন্ডারের দাম ২ হাজার ৩৯৭ টাকা, ২০ কেজির দাম ২ হাজার ৬৬৩ টাকা, ২২ কেজির দাম ২ হাজার ৯২৯ টাকা, ২৫ কেজির দাম ৩ হাজার ৩২৯ টাকা, ৩০ কেজির দাম ৩ হাজার ৯৯৫ টাকা, ৩৩ কেজির দাম ৪ হাজার ৩৯৪ টাকা, ৩৫ কেজির দাম ৪ হাজার ৬৬০ টাকা এবং ৪৫ কেজির দাম ৫ হাজার ৯৯২ টাকা নির্ধারণ করা হয়। যানবাহনে ব্যবহৃত অটোগ্যাসের দামও লিটার প্রতি ৭০ টাকা ৪০ পয়সা থেকে ৩ টাকা ২৭ পয়সা বাড়ানো হয়। নতুন দর নির্ধারণ হয় ৭৩ টাকা ৬৭ পয়সা।
বিইআরসি বিজ্ঞপ্তিতে জানায়, সৌদি আরামকোর আগস্ট মাসের প্রোপেন (বর্ণহীন, গন্ধহীন এবং সহজে তরলীকৃত জ্বালানি, যা প্রাকৃতিকভাবে গ্যাস প্রক্রিয়াজাতকরণ ও পেট্রোলিয়াম শোধনের মাধ্যমে পাওয়া) এবং বিউটেনের (বর্ণহীন ও অত্যন্ত দাহ্য হাইড্রোকার্বন গ্যাস) সৌদি সিপি (কন্ট্রাক্ট প্রাইজ) অনুযায়ী এ দাম ঠিক করা হয়। আগস্টে প্রোপেনের সৌদি সিপি প্রতি মেট্রিক টন ৬২০ ডলার এবং বিউটেনের দর ৬৪০ ডলার ধরা হয়। প্রোপেন ও বিউটেনের অনুপাত ৩৫:৬৫ ধরে গড় সৌদি সিপি প্রতি মেট্রিক টন ৬৩৩ ডলার বিবেচনায় নেওয়া হয়। জুলাইয়ে গড় সৌদি সিপি ধরা হয়েছিল প্রতি মেট্রিক টন ৫৯৩ ডলার। সে হিসাবে আগস্টে গড় সৌদি সিপি প্রতি মেট্রিক টনে ৪০ ডলার বেড়েছে। এলপিজি আমদানিতে জাহাজ ভাড়া ও ব্যবসায়ীর প্রিমিয়াম প্রতি মেট্রিক টন ১৮০ ডলার এবং প্রতি ডলারের গড় বিনিময় মূল্য ১২৩ টাকা ৬৯ পয়সা বিবেচনায় নিয়ে আগস্টের দাম নির্ধারণ করা হয় বলে বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়।
রেটিকুলেটেড পদ্ধতিতে তরল অবস্থায় সরবরাহ করা বেসরকারি এলপিজির কেজি প্রতি দাম মূসকসহ ১২৯ টাকা ৪০ পয়সা নির্ধারণ করা হয়। গ্যাসীয় অবস্থায় সরবরাহ করা এলপিজির দাম প্রতি ঘনমিটার ২৮৭ টাকা ৫০ পয়সা করা হয়। তবে সরকারি এলপিজির দাম অপরিবর্তিত রাখা হয়। ১২ দশমিক ৫০ কেজির সরকারি এলপিজি সিলিন্ডারের ভোক্তা পর্যায়ের দাম ৭৭৬ টাকা ৯৩ পয়সা বহাল থাকবে বলে জানানো হয়। এর আগে জুলাই মাসের জন্য ১২ কেজির এলপিজি সিলিন্ডারের দাম ৩৫৭ টাকা কমিয়ে ১ হাজার ৫২৮ টাকা করেছিল বিইআরসি। ওই সমন্বয়ে অটোগ্যাসের দাম লিটারপ্রতি ৭০ টাকা ৪০ পয়সা নির্ধারণ করা হয়েছিল। তারও আগে জুনে ১২ কেজির এলপিজি সিলিন্ডারের দাম ৫৫ টাকা কমিয়ে ১ হাজার ৮৮৫ টাকা করা হয়েছিল। ১৯ এপ্রিল দাম ২১২ টাকা বাড়িয়ে ১ হাজার ৯৪০ টাকা এবং ২ এপ্রিল ৩৮৭ টাকা বাড়িয়ে ১ হাজার ৭২৮ টাকা করা হয়। বিইআরসি সতর্ক করে বলেছে, এলপিজি মজুত ও বোতলজাতকরণ, পরিবেশক এবং খুচরা বিক্রেতাসহ কোনো পর্যায়েই কমিশন নির্ধারিত দামের বেশি দামে বোতলজাত এলপিজি, রেটিকুলেটেড এলপিজি বা অটোগ্যাস বিক্রি করা যাবে না।
মিয়ানমার থেকে পাইপলাইনে গ্যাস আমদানির প্রস্তাব
এদিকে গতকাল সকালে সচিবালয়ে বাংলাদেশে নিযুক্ত মিয়ানমারের রাষ্ট্রদূত এইচ ই ইউ কিয়াও সোয়ে মোয়ের সঙ্গে বৈঠকে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ পাইপলাইনে গ্যাস আমদানির প্রস্তাব প্রস্তাব দেন। বৈঠকে জ্বালানিমন্ত্রী বলেন, দেশের অভ্যন্তরে প্রাকৃতিক গ্যাসের চাহিদা মেটাতে বাংলাদেশ মিয়ানমার থেকে পাইপলাইনের মাধ্যমে গ্যাস আমদানিতে বিশেষ আগ্রহী। এর জবাবে মিয়ানমারের রাষ্ট্রদূত প্রস্তাবটিকে ইতিবাচকভাবে গ্রহণ করেন। পাশাপাশি এলএনজি আকারেও গ্যাস সরবরাহের সম্ভাবনা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনার আগ্রহ প্রকাশ করেন। এ প্রস্তাবেও ইতিবাচক সাড়া দেন জ্বালানিমন্ত্রী। বৈঠকে মিয়ানমার থেকে বাংলাদেশের চট্টগ্রাম পর্যন্ত পাইপলাইন নির্মাণের অতীতের প্রস্তাব নতুন করে আলোচনায় আনার বিষয়েও আগ্রহ প্রকাশ করা হয়।
দ্বিপক্ষীয় জ্বালানি সহযোগিতা আরো এগিয়ে নিতে দুই দেশের সংশ্লিষ্ট মন্ত্রী পর্যায়ের বৈঠকের প্রস্তাব দেন ইকবাল হাসান মাহমুদ। তিনি মিয়ানমারের জ্বালানিমন্ত্রীকে বাংলাদেশ সফরের আনুষ্ঠানিক আমন্ত্রণ জানানোর কথা বলেন। প্রয়োজনে নিজেও মিয়ানমার সফরে যাওয়ার আগ্রহ প্রকাশ করেন। আলোচনায় সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের চীন সফরের প্রসঙ্গ তুলে জ্বালানিমন্ত্রী বলেন, ওই সফরে চীন-মিয়ানমার-বাংলাদেশ করিডর গঠনের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল। এ ক্ষেত্রে দুই দেশের মধ্যে গ্যাস পাইপলাইন স্থাপিত হলে তা করিডর বাস্তবায়নে সহায়ক ভূমিকা রাখতে পারে। একই সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি বাণিজ্যিক সম্পর্ক এবং জ্বালানি সহযোগিতা সম্প্রসারণের বিষয়েও আলোচনা হয়। মন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের মধ্যে সহযোগিতার বহু সম্ভাবনাময় ক্ষেত্র রয়েছে। ‘প্রতিবেশী প্রথম’ নীতির আলোকে দুই দেশের সম্পর্ক আরো জোরদারে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের আন্তরিক আগ্রহের কথাও তিনি বৈঠকে তুলে ধরেন। এ সময় মিয়ানমারের রাষ্ট্রদূত বলেন, বাংলাদেশ-মিয়ানমার যৌথ কারিগরি কমিটির বৈঠকে বিষয়টি পর্যালোচনা করা যেতে পারে। বৈঠকে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত, জ্বালানিসচিব মোহাম্মদ সাইফুল ইসলাম এবং বিদ্যুৎসচিব মিরানা মাহরুখ উপস্থিত ছিলেন।
বাণিজ্য বাড়াতে চায় মিয়ানমার, রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে গুরুত্ব বাংলাদেশের : এদিকে বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের মধ্যে দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য সম্প্রসারণ, দীর্ঘদিন বন্ধ থাকা সীমান্ত বাণিজ্য পুনরায় চালু এবং রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসনসহ বিভিন্ন পারস্পরিক স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়ে আলোচনা হয়েছে। গতকাল রবিবার বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদিরের সঙ্গে বাংলাদেশে নিযুক্ত মিয়ানমারের রাষ্ট্রদূত কিয়াও সোয়ে মোয়ের বৈঠকে এসব বিষয় উঠে আসে। বৈঠকে দুই দেশের মধ্যে পণ্য আমদানি-রপ্তানি বৃদ্ধি, সরাসরি নৌপরিবহন যোগাযোগ জোরদার, এলএনজি আমদানি এবং পারস্পরিক বিনিয়োগের সুযোগ সম্প্রসারণ নিয়েও মতবিনিময় হয়।
আলোচনায় বাণিজ্যমন্ত্রী বলেন, প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে পারস্পরিক সম্মান, আস্থা ও অর্থনৈতিক সহযোগিতার ভিত্তিতে সম্পর্ক আরও শক্তিশালী করতে বাংলাদেশ প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। বাণিজ্য, পরিবহন, বিনিয়োগ ও সীমান্ত যোগাযোগসংক্রান্ত যেসব বিষয় অন্য মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে সম্পৃক্ত, সেগুলো আন্তঃমন্ত্রণালয় সমন্বয়ের মাধ্যমে পর্যালোচনা করা হবে। তিনি বলেন, ভৌগোলিক নৈকট্য ও বিদ্যমান সম্ভাবনাকে কাজে লাগিয়ে বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের মধ্যে বাণিজ্য আরও বাড়ানো সম্ভব। পারস্পরিক স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়গুলো আলোচনার মাধ্যমে সমাধান করে দুই দেশের অর্থনৈতিক সম্পর্ক আরও গতিশীল করা হবে।
মিয়ানমারের রাষ্ট্রদূত কিয়াও সোয়ে মোয়ে বলেন, দীর্ঘদিন ধরে স্থগিত থাকা সীমান্ত বাণিজ্য পুনরায় চালু করা গেলে উভয় দেশের ব্যবসায়ী ও সাধারণ মানুষ উপকৃত হবেন। প্রয়োজনে প্রাথমিকভাবে সীমিত পরিসরে এ কার্যক্রম শুরু করা যেতে পারে।বৈঠকে কৃষিপণ্য, মৎস্যপণ্য, চাল, ওষুধ এবং হিমায়িত খাদ্যসহ সম্ভাবনাময় বিভিন্ন পণ্যের বাণিজ্য বাড়ানোর সুযোগ নিয়েও আলোচনা হয়। পাশাপাশি ব্যবসায়ী পর্যায়ে যোগাযোগ বৃদ্ধি এবং বিজনেস-টু-বিজনেস (বি-টু-বি) কার্যক্রম জোরদারের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়।
আলোচনায় বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গাদের নিরাপদ, স্বেচ্ছামূলক, টেকসই ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসনের বিষয়টিও গুরুত্ব পায়। মিয়ানমারের রাষ্ট্রদূত জানান, প্রত্যাবাসনের জন্য পাওয়া তালিকা যাচাই-বাছাইয়ের কাজ চলছে। পরিস্থিতি অনুকূলে এলে এ বিষয়ে উদ্যোগ নেওয়া হবে। এ সময় বাংলাদেশের পক্ষ থেকে দ্রুত প্রত্যাবাসনের অনুকূল পরিবেশ সৃষ্টি এবং এ বিষয়ে দৃশ্যমান অগ্রগতির ওপর গুরুত্ব আরোপ করা হয়। বৈঠকে উভয় পক্ষ নিয়মিত প্রাতিষ্ঠানিক আলোচনা ও যৌথ কমিটির বৈঠক আয়োজনের বিষয়ে একমত হয়। একই সঙ্গে বাংলাদেশ ও মিয়ানমারের মধ্যে সরাসরি নৌ যোগাযোগ প্রতিষ্ঠা এবং এ সংক্রান্ত চুক্তি দ্রুত চূড়ান্ত করার প্রয়োজনীয়তার ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হয়।
বৈঠকে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. আতাউর রহমান খান, অতিরিক্ত সচিব (এফটিএ) আয়েশা আক্তার এবং মিয়ানমার দূতাবাসের কাউন্সিলর মিয়াত লুইন উপস্থিত ছিলেন।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









