আত্মনির্ভরশীল জাতি তৈরির প্রত্যয়ে প্রবল বিশ্বাসী ও দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। এই চিন্তা থেকে ক্ষেত্রবিশেষ কর্মউদ্দীপনা ও চঞ্চল মনোভাব গড়ে তুলতে নৈতিক পদক্ষেপ গ্রহণ করা দরকার। তাই সবকিছুর উর্ধ্বে শিক্ষার বিস্তারই আনুষ্ঠানিক উন্নতি হিসেবে বিবেচিত। দেশে শিক্ষা ক্ষেত্রে নানা প্রতিবন্ধকতা, মেরুকরণ ও বহুগামিতা এবং খামখেয়ালি পথদির্দেশনা রয়েছে, যা বৈশ্বিক বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। এসব সংকট ও মৌলিক ঘাটতি এবং ক্ষতি পুষিয়ে নিতে না পারলে আমাদের জাতীয় মুক্তি ও উন্নতির সম্ভাবনা ক্ষীণ। পা বাড়ালেই আমাদের চারপাশের কালচে সমাজ, সবুজের মাঠ দেখা যায়।
আমরা তাতে গড়িয়ে জীবনকে বিপন্ন করছি। ফলত, মুক্ত ও উদার মনোভাবে বিস্তৃতি গড়ে ওঠা মন ভেঙেচুরে শেষ। সাম্প্রতিককালে জীবন ও ভাগ্যের উত্থানে বুঁদ গোটা জাতি। দ্রুত বৃদ্ধির নেশায় উন্মুখ এবং পরিবর্তনের হাওয়ায় উদ্বেল। কিন্তু তা কোন পথ ও নির্দেশনায় হবে- তাতেই বোঝার ভুল। ভুল ইশারা ও পথ মানুষকে বিভ্রান্ত করে এবং মনুষ্যত্বকে অঙ্কুরকেই বিনষ্ট করে। আমাদের এতো অধঃপতন হয়েছে কতটুকু মুক্ত ও সৃজনধর্মী একথায় ভাবার সময়ই নেই। শিক্ষা ও জ্ঞানের প্রধান বিকাশ ঠেকেছে আত্ম-অহামিকায়, যা মানুষকে ধ্বংস করে এবং জাতীয় বিপর্যয় ডেকে আনে। অথচ সমাজ ও দেশের ব্যাধি চূর্ণ না করে কোনো পরিবর্তনই জাতীয় মুক্তির পথ নয়। ন্যায়-নীতি ও আদর্শিক শিক্ষাই মুক্তির মূলমন্ত্র। একথা বিশ্বাস ও অবিশ্বাসের ধুম্রজালে বিধ্বস্ত।
বাংলাদেশের শিক্ষা ব্যবস্থায় ত্রুটি থাকলেও স্বাধীনতার পর শিক্ষার প্রসার ও অগ্রগতি বেশ প্রশংসনীয়। লক্ষ্য সাধনের জন্য নানা প্রদক্ষেপও ছিল। যদিও কোনো কোনো ক্ষেত্রে ব্যবস্থাগত ত্রুটি ও সীমাবদ্ধতা ছিল। ফলে নানা সংকট সৃষ্টি হয়েছে। বহুল জনগোষ্ঠীকে শিক্ষাদানের মধ্য দিয়ে জাতীয় মুক্তিই ছিল প্রগতিবাদী ও চিন্তাশীল মানুষের প্রধান বাসনা। তারা গ্রাম ও শহরের ব্যবচ্ছেদ কমিয়ে গোটা সমাজব্যবস্থাকে পরিবর্তনের চেষ্টা করেন। তৃণমূল ও গ্রাম পর্যায়ে শিক্ষাকে মানুষের কাছাকাছি পৌঁছে দেওয়ার প্রধান মাধ্যম ছিল প্রাথমিক শিক্ষার প্রসার ও স্কুলভিত্তিক কর্মসূচি গ্রহণ করা। তাতে ভর্তির হার বৃদ্ধি, নারীশিক্ষার সম্প্রসারণ, ডিজিটাল শিক্ষা উদ্যোগ এবং সরকারি-বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা বৃদ্ধি দেশের শিক্ষাব্যবস্থা নতুন উচ্চতায় পৌঁছেছে।
বাংলাদেশের বহু শিক্ষার্থী বিশ্বের খ্যাতনামা বিশ্ববিদ্যালয়ে উচ্চশিক্ষা গ্রহণের সুযোগ লাভ করেন। শিক্ষা গ্রহণের পর তারা বিভিন্ন আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানে দক্ষতার সঙ্গে কাজ করছেন। এসব অর্জন সত্যি আনন্দের ও সময়সাপেক্ষ সিদ্ধান্তের বহিঃপ্রকাশ। জনবহুল দেশে বৈদেশিক কর্মসংস্থান সৃষ্টি নতুনমাত্রার ইঙ্গিতও বটে। প্রতিটি মানুষের মৌলিক অধিকার প্রতিষ্ঠা এবং সার্বিক উন্নয়নের লক্ষ্য নিয়ে এগিয়ে চলছে দেশ। সাম্প্রতিক সময়ে দেশে-বিদেশে বাংলাদেশের মান ও আত্মমর্যাদাও বৃদ্ধি পেয়েছে কিন্তু থেমে আছে উদারপন্থাচর্চা ও মুক্তজ্ঞানের হিসেব। অথচ যা হচ্ছে জাতীয় মুক্তি ও সম্ভাবনার একমাত্র পথ।
সুষ্ঠু শিক্ষাব্যবস্থা একটি সম্ভাবনাময় জাতি তৈরি করে। তবে ইতিবাচক অগ্রগতির পাশাপাশি কিছু মৌলিক প্রশ্নও সম্মুখে আসে। বিশ্ব যখন গতিশীল তখন বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো আন্তর্জাতিক র্যাঙ্কিংয়ে কেন পিছিয়ে রয়েছে। সমানতালে এগিয়ে যাওয়ার ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধকতা কেন? সকল প্রতিকূলতার মধ্যে গবেষণা ও উদ্ভাবনের বিনিয়োগ তুলনামূলকভাবে কম কেন? উচ্চশিক্ষা বৈশ্বিক শ্রমবাজারের প্রত্যাশিত দক্ষতা অর্জনে সাফল্য সৃষ্টি করেনি। আন্তর্জাতিক ভাষাদক্ষতা, সমালোচনামূলক ভাবনা, মুক্তচিন্তা, গবেষণা-সংস্কৃতি এবং প্রযুক্তিগত সক্ষমতার ঘাটতি আন্তর্জাতিক গ্রহণযোগ্যতাকে সীমিত করছে।
বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থার বৈশ্বিক গ্রহণযোগ্যতা বিশ্লেষণে জানা যায়, বুর্দিয়ো, ফ্রেইরি এবং সেনের তাত্ত্বিক দৃষ্টিভঙ্গিকে সমন্বিতভাবে ব্যবহার করা হয়েছে। এর মাধ্যমে শিক্ষার সামাজিক বৈষম্য, জ্ঞানচর্চার প্রকৃতি এবং মানবিক সক্ষমতা বৃদ্ধির প্রশ্নকে একই বিশ্লেষণাত্মক কাঠামোর মধ্যে মূল্যায়ন করা সম্ভব হয়ে ওঠে। ফলে বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থার বর্তমান বাস্তবতা, সীমাবদ্ধতা এবং ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা সম্পর্কে একটি সমন্বিত ও গবেষণাভিত্তিক মূল্যায়ন উপস্থাপন করাও সহজতর। আমরা সঠিক ও গুণগত পরিবর্তনের দিকে ধাবিত না হয়ে আত্মকেন্দ্রিক ও তুষ্টজীবী উদ্ভিদের মতো নিজ ভূড়ির ওজন বৃদ্ধির চিন্তায় উন্মুখ ও শশব্যস্ত।
গবেষণা ও উদ্ভাবনের ক্ষেত্রে সীমাবদ্ধতা থাকা সমীচীন নয়। সময়ের সঙ্গে মননের ঢেউ তৈরি করতে না পারলে কোনো কালেও জাতির মুক্তি আসে না। আমাদের বহুমুখী সীমাবদ্ধতা রয়েছে। এগুলো উৎরে যাওয়ার সহজ মাধ্যম আন্তর্জাতিক অঙ্গনে প্রভাব ও জাতীয় অবস্থান সুদৃঢ় করা। স্বীকৃত বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো শক্তিশালী গবেষণা-সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠান তৈরি করা। কিন্তু আশাহীন কথা হলো, বাংলাদেশের অধিকাংশ বিশ্ববিদ্যালয়ে গবেষণার জন্য অর্থায়ন, আধুনিক গবেষণাগার, আন্তর্জাতিক জার্নালে প্রকাশনা এবং গবেষক তৈরির সুযোগ এখনো খুবই সীমিত। ফলে আন্তর্জাতিক উদ্ধৃতি, পেটেন্ট, উদ্ভাবন এবং বৈশ্বিক গবেষণা সহযোগিতায় বাংলাদেশের উপস্থিতি প্রত্যাশিত মাত্রায় এখনো পৌঁছাতে পারেনি। গবেষণা অবকাঠামো উন্নয়নের জন্য অতীতে নেওয়া বিভিন্ন উদ্যোগ ইতিবাচক ফল দিলেও দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ ও ব্যয় অপরিহার্য। জাতি হিসেবে আমাদের মানসিকতার সীমাবদ্ধতা যেমন রয়েছে তেমনি বিভিন্ন পর্যায়ে উত্তরণের সুযোগ একেবারেই কম। আমরা ক্রমাগত আলসে ও পরনির্ভরতায় আচ্ছন্ন। সময়োচিত পরিকল্পনা গ্রহণের অভাবও রয়েছে অনেক। ঠিক একই প্রক্রিয়া গ্রহণ না হলে মৌলিকত্ব তৈরি হবে না। স্থানীয় ও আন্তর্জাতিকভাবে মানুষের বসবাস তৈরি করতে হলে আত্মরক্ষার উপায় তৈরি করতে হবে। দৃশ্যমান প্রবণতা হবে বৈশ্বিক বাস্তবতার সঙ্গে শিক্ষার প্রসার ও টাইমিং অবজারভেশন।
ভাষাদক্ষতা ছাড়া জাতি বধির ও অন্ধ। সৃষ্টিগত বধির মানুষ তেমন সমস্যা তৈরি করে না যতটা তৈরি করে ভাষাগত দীনতা, অজ্ঞতা। পরস্পর ভাব ও জ্ঞান বিনিময় না হলে মৌলিকত্বের প্রমাণ ও উদ্ভাবন ঘটে না। অঞ্চল বিশেষে মানুষে মানুষে সম্পর্ক উন্নয়নে অবশ্যই ভাষাদক্ষতা বৃদ্ধি করতে হবে। ভাষাগত দক্ষতার সীমাবদ্ধতা বৈশ্বিক উচ্চশিক্ষা ও গবেষণার প্রধান ভাষা হচ্ছে ইংরেজি। অনেক বাংলাদেশি শিক্ষার্থী বিষয়ভিত্তিক জ্ঞান থাকা সত্ত্বেও একাডেমিক ইংরেজি, গবেষণাপত্র লেখা, উপস্থাপনা এবং আন্তর্জাতিক যোগাযোগে খুব পিছিয়ে রয়েছে। এদের দাঁড় করাতে হবে। স্বদেশী ভাষা ও আন্তর্জাতিক ভাষার মধ্যে আন্তঃমহাদেশীয় সম্পর্ক তৈরি করতে হবে। এসব সীমাবদ্ধতার ফলে বিদেশে উচ্চশিক্ষা, আন্তর্জাতিক গবেষণা প্রকল্প এবং বৈশ্বিক কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রে প্রতিযোগিতা কঠিন হয়ে উঠছে। লোকসমাজ ও অর্থনীতির মুক্তি দুটো সমান না হলে সময়ের সঙ্গে টিকে থাকা সহজতর নয়। সময় ও সৃষ্টিমুখী এবং কঠিন বাস্তবতাকে মোকাবেলা করা দরকার- তবেই ধেয়ে আসবে মুক্তি।
সামাজিক ও অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি রাষ্ট্রের অগ্রগতির মাধ্যম। সমস্যা ও সংকট উপড়ানোর জন্য রাষ্ট্রকে সমাজ ও আর্থিক মানদণ্ডে নজর রাখতে হবে। তবেই ভালো ফলাফল তৈরি হবে। এসব সংকট রাষ্ট্রকে কুক্ষিগত করে। আমাদের দৈনন্দিন জীবনে দুটোই মুক্তির প্রধান অন্তরায়। মানুষের মাঝে এসব প্রভেদ ও হীনদশা জাতিকে সম্মুখে এগিয়ে নিতে সহায়তা করেনি। অথচ দুটোই জাতির আত্মমুক্তির চালিকা শক্তি। সাধারণ মানুষের মধ্যে দুটো ভাবনা থাকলেও উত্তরণের উপায় সম্পর্কে সচেতন নয়- এখানেও প্রবল বৈষম্য বিদ্যমান।
পিয়ের বুর্দিয়োর সাংস্কৃতিক পুঁজি তত্ত্বের আলোকে জানা যায়, শিক্ষার্থীর পারিবারিক মুক্তি, পরিবেশ সচেতনতা, অর্থনৈতিক অবস্থা, ভাষাগত দক্ষতা এবং সাংস্কৃতিক সম্পদ তার শিক্ষাগত সাফল্যের ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধকতা তৈরি করে। কারণ, বাংলাদেশের শহর-গ্রামে বৈষম্য ও ডিজিটাল বিভাজন রয়েছে। যতটুকু ব্যবহার শেখা হচ্ছে, তা অপব্যবহারে মানসিকতায় বিবর্জিত। খারাপ কন্টেন্ট ও ভিউ নেশায় তারা বুঁদ। পাশাপাশি শিক্ষা-প্রতিষ্ঠানের মানের পার্থক্যও লক্ষণীয়। অন্যান্য বিষয়গুলো ঝাঁপিয়ে উঠলেও অর্থনৈতিক সীমাবদ্ধতায় আন্তর্জাতিক সুযোগের বাধা রয়েছে। ফলে সকল শিক্ষার্থী সমানভাবে বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় অংশ নিতে পারে না। অধিক জনগোষ্ঠীর সাফল্য ও সুযোগ সৃষ্টি না হলে মুক্তির পথ দেখানো কঠিন। পারিপার্শ্বিক অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে দেশে-বিদেশি শিক্ষার্থীদের উচ্চশিক্ষা অর্জনের নানা সুযোগ প্রদান করা দরকার তবেই পারস্পরিক সম্পর্ক ও বৈশ্বিক মানসিকতা তৈরি হবে। বাঙালির মিশ্র ভাবনা জাতিকে বহুদিকে ধাবিত করে। বহুকৌণিক চিন্তার ফলে ফলপ্রসু ফলাফল তৈরি হয় না- অবিশ্বাস ও অন্ধত্ব ভর করে। প্রজন্মকে আলোর উৎসের খোঁজ না দিয়ে দাবিয়ে রাখার চিন্তা খুবই হতাশাজনক। জাতির মাঝে যত বেশি শিক্ষা ও উদার মনোভাব তৈরি হবে ততই মুক্তি আসবে। দিনশেষে আমরা জাতীয় ও বহুমাত্রিক মুক্তি চাই।
দেশে বিশ্ববিদ্যালয় প্রতুল কিন্তু মানের দিকটি গৌণ। গবেষণা ও মুক্তচর্চা এবং উদার রাজনীতি চর্চার অভাবে বিশ্ববিদ্যালয়গুলো এখনো শিক্ষাবান্ধব হয়ে ওঠেনি। জাতি গঠনে কেন্দ্রবিন্দুই যখন সংকটে পতিত তখন অগ্রগতির চিন্তা করা অপ্রাসঙ্গিক। আরেকটি সমস্যা হলো সংকট ও সীমাবদ্ধতাকে বড় করে দেখা। সেখানে মানহীন ও রাজনৈতিক দৌরাত্ম্য বিদ্যমান থাকায় দেশপ্রেমিক তৈরি হয়নি। দেশপ্রেম না থাকলে সমন্বিত মুক্তি কল্পনা করা অসম্ভব। ফিলিপ জি. অল্টবাখের আন্তর্জাতিকীকরণ তত্ত্ব অনুযায়ী একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের বৈশ্বিক গ্রহণযোগ্যতা নির্ভর করে আন্তর্জাতিক গবেষণার সহযোগিতা, যৌথ ডিগ্রি, বিদেশি শিক্ষক-শিক্ষার্থী, একাডেমিক বিনিময় এবং আন্তর্জাতিক মাননিশ্চয়তা ব্যবস্থার সাবিক তত্বাবধানের ওপর। বাংলাদেশের কিছু বিশ্ববিদ্যালয় এক্ষেত্রে অগ্রগতি সাধন করলেও অধিকাংশ প্রতিষ্ঠানে আন্তর্জাতিকীকরণের গতি এখনো খুব ধীর। আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা বৃদ্ধি করেছি কিন্তু মান তৈরি করিনি। সেহেতু সূচক একেবারে নিম্নমানে পৌঁছে গেছে। বৈশ্বিক একাডেমিক নেটওয়ার্কে বাংলাদেশের অংশগ্রহণ খুবই সীমিত। শুধু শিক্ষা নয় পাশাপাশি দরকার দক্ষতা ও কর্মবাজার, যা জাতীয় সংকট মোকাবেলায় সহায়ক ভুমিকা রাখে। কিন্তু কর্মক্ষেত্রে এখনো পুরোপুরি সুযোগ সৃষ্টি হয়নি। বর্তমান বিশ্বে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, তথ্যপ্রযুক্তি, ডেটা বিশ্লেষণ, সবুজ প্রযুক্তি এবং আন্তঃবিষয়ক দক্ষতার চাহিদা দ্রুত বৃদ্ধি পেয়েছে। কিন্তু বাংলাদেশের অনেক উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানের পাঠ্যক্রম এখনো শিল্পখাত, বৈশ্বিক কর্মবাজার ও পরিবর্তিত চাহিদার সঙ্গে পুরোপুরি সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। সাক্ষাৎ প্রমাণিত, অনেকে স্নাতক ডিগ্রি অর্জন করলেও কর্মক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় ব্যবহারিক দক্ষতা অর্জন করতে পারেনি। নৈতিকভাবে যা হওয়ার কথা তা হয়নি। আমাদেরকে শিক্ষার পাশাপাশি শ্রমবাজারও দখল করতে হবে। আধুনিক ও প্রযুক্তিনির্ভর দক্ষতা বৃদ্ধি পেলে সহজেই অর্থনৈতিক মুক্তি আসবে। সমস্যা হলো যে, আমরা একটি করতে গিয়ে অন্যটি থেকে বিচ্যুত। ক্রমাগত সামষ্টিক সমৃদ্ধি ও মুক্তি ধোঁয়াশায় আচ্ছন্ন।
আদর্শবাদিতা ও লক্ষ্যাভিমুখীতার ক্ষেত্রে চ্যালেঞ্জই প্রধান লক্ষ্য। যে জাতি শত প্রতিকুলতায় চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করতে পারে তারা শুধু সভ্য নয়, সুপ্রতিষ্ঠিত। সাথে সাথে মনে রাখতে হবে, জাতীয় মুক্তি ও অগ্রগতি আনয়নে সৃষ্টিশীল চিন্তাই অগ্রগণ্য। এক্ষেত্রে প্রয়োজন গুণগত শিক্ষা ও মহৎ সমীকরণ। পাশাপাশি যে কোনো জাতির চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করার সক্ষমতা না থাকলে ধীরে ধীরে গ্রহণযোগ্যতা হারায়। বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থায় বৈশ্বিক গ্রহণযোগ্যতাই এখন প্রধান চ্যালেঞ্জ। বিভিন্ন বিশ্লেষণ ও গবেষণায় দেখা যায়, বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থা গত কয়েক দশকে প্রবেশাধিকার ও সম্প্রসারণের ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি রয়েছে। রুট লেভেলের শিক্ষা সেখানে প্রধান গুরুত্বপূর্ণ। ক্ষেত্র বিশেষ প্রাথমিক শিক্ষার সমাপ্তি ও হার বৃদ্ধি পেয়েছে। কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষার সম্প্রসারণ এবং উচ্চশিক্ষায় ভর্তির সুযোগ বৃদ্ধির বিষয়াদি অগ্রগতির গুরুত্বপূর্ণ দিক বিবেচনা করাও সংহত বলে মনে করি। সকল ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয়তা বৃদ্ধি পেলেও আন্তর্জাতিক মানের শিক্ষা নিশ্চিত করাই প্রধান কাজ। বিভিন্ন দেশের সঙ্গে সামঞ্জস্য বজায় রেখে একটি আধুনিক পদ্ধতি ও শিক্ষার গুণগত মান, গবেষণা, উদ্ভাবন এবং দক্ষতা উন্নয়নের ওপর সমান গুরুত্ব দিতে হবে। সাম্প্রতিক বিবেচনায় আন্তর্জাতিক মূল্যায়ন তেমন গ্রহণযোগ্য নয়। বাংলাদেশে শিক্ষায় প্রবেশাধিকারে অগ্রগতি হলেও গুণগত মানের প্রশ্নটি এখনও প্রশ্নাতীত। আমাদের প্রচার, প্রসার ও গোলার্ধভিত্তিক সংকট বিদ্যমান। সবকিছুর মধ্যে শিক্ষার সম্প্রাসারণ ও উপর্যুক্ত পরিবেশ তৈরি করা গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ হিসেবে রয়ে গেছে। স্তর বিন্যাসে রয়েছে আরো বড় চ্যালেঞ্জ। সবকিছু ছাপিয়ে উৎক্ষিপ্ত হওয়া সময়সাপেক্ষ ও বহুল প্রতীক্ষিত বিষয়।
লেখক: কলামিস্ট


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









