সার্বিক অর্থনীতির উন্নয়ন নির্ভর করে অন্যান্য খাতের মতো জ্বালানি খাতের ওপর। এক সময় গ্যাস মজুত সম্পর্কে বিশেষজ্ঞরা বলেছিলেন, ‘গ্যাস উৎপাদন যথাযথ থাকলে মজুত থাকবে বহু সময়।’ কিন্তু হঠাৎ করে গ্যাস উৎপাদন কমে যাওয়ায় বাসাবাড়ি ও ফিলিং স্টেশনে সংকট তীব্র হয়ে উঠেছে। কয়েকটি স্থানে সিএনজি ফিলিং স্টেশনে গ্যাস সরবরাহ পুরোপুরি বন্ধ হয়ে গেছে- অটোরিকশা, ট্রাক ও প্রাইভট চালকেরা বিপাকে পড়ছেন। ঘরের রান্না যথাসময়ে হচ্ছে না। নিভু নিভু করে গ্যাসের চুলা জ্বলছে। গ্যাসের প্রেসার কম থাকায় পণ্য বিক্রিতে ভাটা পড়েছে।
সিএনজি চালকেরা জানিয়েছেন, প্রতিদিন মহাজনকে এক হাজার দুইশত টাকা জমা দিতে হয়- সেখানে গ্যাস লাগে চারশ টাকার মতো।
বাংলাদেশে জ্বালানি ক্ষেত্রের মৌল উৎপাদন প্রাকৃতিক গ্যাস। বহু বছরব্যাপী এ ক্ষেত্রের সচল ও সক্রিয় ভূমিকা চাহিদামাফিক হচ্ছে না। প্রয়োজনীয় বিদ্যুৎ উৎপাদন ও যানবাহন চলাচল গ্যাসের উপর নির্ভরশীল। দৈনন্দিন রান্না, গৃহস্থালীতে গ্যাস সরববাহের প্রভাব সুদুরপ্রসারী। বাসাবাড়ি, সিএনজি ফিলিং স্টেশনে গ্যাস অপ্রতুল। গ্যাস সরবরাহ বিঘ্ন ঘটছে, স্বাভাবিক জীবনযাত্রায় গতি মন্থর হয়ে পড়েছে। দিনের বেলা চুলা জ্বলছে না। সিএনজি স্টেশনে গ্যাস সরবরাহ যথাযথ নেই। ফিলিং স্টেশনে শতশত গাড়ির ভিড়, সময় ক্ষেপণ হচ্ছে, কর্মঘণ্টা কমে যাচ্ছে নিম্ন মধ্যবিত্ত ও মধ্যবিত্ত পরিবারের। সার্বিক অর্থনীতির গতিশীলতা অবনতিশীল পর্যায়ে পৌঁছেছে। সড়ক পরিবহন ও বাসাবাড়িতে গ্যাস না থাকায় জন ভোগান্তি বাড়ছে। লাখ লাখ পরিবার বাসাবাড়িতে রান্নার কাজে গ্যাস ব্যবহার করে; সকাল-দুপুর গ্যাসের চাপ থাকে না বললেই চলে। রাতে গ্যাস মাঝে মধ্যে আসলেও তা ধীর গতিসম্পন্ন। মধ্যরাতে রান্নার কাজ করা কষ্টসাধ্য ও ভোগান্তিপূর্ণ।
এমতাবস্থায় কর্মজীবী ও শিক্ষার্থীদের সকালে নাস্তা ও দুপুরে খাবার নিয়ে যাওয়া সম্ভব নয়। দূর্বিষহ জীবনযাপনের সাথে বাড়ছে বাড়তি খরচের উটকো ঝামেলা। এলপিজি সিলিন্ডার, ইলেকট্রিক ইনডাকশন চুলা, রাইস কুকার চালাতে যথেচ্ছ বিদুৎ ব্যবহার করতে হচ্ছে- বাড়ছে খরচের হিসাব। প্রতিটি পরিবারে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খরচ বেড়েই যাচ্ছ। হঠাৎ কলকারখানা বন্ধ হয়ে যাওয়ায় অনেক পরিবারে আয়ের উৎস কমে গেছে, যা নিম্নবিত্ত ও মধ্যবিত্ত পরিবারের মড়ার উপর খাঁড়ার ঘায়ের মতো। অটোরিকশা, বাস, প্রাইভেট কার, সিএনজিচালিত যানবাহনে মানুষ যাতায়াত করে। এই খাতের জীবিকা নির্বাহকারীরা প্রচণ্ড ঝুঁকির মধ্যে বাস করছে। দীর্ঘ অপেক্ষার সময় কাটছে ফিলিং স্টেশনগুলোতে।
সরকার ফিলিং স্টেশন খোলা রাখার সময় নির্দিষ্ট করে দিয়েছে। কিন্তু এ সময় ফিলিং স্টেশনে গ্যাসের চাপ কম থাকছে। সিএনজিচালিত যানবাহন চালকদের আয় কমে এসেছে। চালকদের অধিকাংশ সময় স্টেশনে কাটাতে হচ্ছে। মালিককে নির্দিষ্ট টাকা দিয়ে উপার্জনের পরিমাণ কমে যায়। পারিবারিক খরচ দিন দিন বেড়েই চলেছে।
গ্যাস সংকট কেন হচ্ছে এর অনুসন্ধানে কিছু তথ্য বেড়িয়ে এসেছে, যা উদ্বেগের। এজন্য অভ্যন্তরীণ পরিকল্পনা না থাকা, বৈশ্বিক পরিস্থিতি ও প্রাকৃতিক সম্পদের সীমাবদ্ধতাকে দায়ী করা যায়। বাংলাদেশে প্রধান গ্যাস ক্ষেত্রের মধ্যে রয়েছে- তিতাস, হবিগঞ্জ, কৈলাশটিলা। এই সমস্ত স্থানে উৎপাদন কমেছে। একইভাবে দেশের সর্বত্র গ্যাস চাহিদা বেড়েছে। নতুন যে সব গ্যাস ক্ষেত্রের সন্ধান মিলেছে এ সব জায়গায় অবকাঠামোগত ও উন্নয়ন প্রক্রিয়া সম্পন্ন হতে সময় লাগবে। তরলীকৃত গ্যাস এলএনজি আমদানির উপর নির্ভর করতে হচ্ছে। অন্যদিকে যুদ্ধ, বিশ্ববাজারের অস্থতিশীল অবস্থা আমদানির অন্তরায়। আন্তর্জাতিক বাজারে মূল্যবৃদ্ধি ও আমাদের অর্থায়নঘাটতি আমদানির নিশ্চয়তা কমিয়ে দিচ্ছে।
দীর্ঘমেয়াদী অনুসন্ধান ও খনন কাজ না হওয়ায় গ্যাস সংকট তীব্র হয়ে উঠেছে। স্থলভাগ ও বঙ্গোপসাগরের তলদেশে গ্যাস উত্তোলন বৃদ্ধি করা ছাড়া বিকল্প পথ নেই। সাগরে তেল-গ্যাস অনুসন্ধান ও উত্তোলন ব্যবস্থা জোরদার করার উদ্যোগ নেই। কুপ খননে লক্ষ্যমাত্রা অর্জিত হয়নি। অপচয় ও সিস্টেম লস হচ্ছে বিতরণ লাইনে ছিদ্র, পুরনো পাইপলাইন ব্যবহারের কারনণ। আসাধু সরকারি কর্মচারীদের সহায়তায় অবৈধ লাইন সংযোগ দেওয়ায় সিস্টেম লস ব্যাপারটি এখন নিত্যদিনের ঘটনা। অগ্রাধিকার ক্ষেত্রের ভারসাম্যহীনতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে। জাতীয় গ্রীডে যে গ্যাস মজুত থাকে তা থেকে বিদ্যুৎ কেন্দ্র, সার, কলকারখানা ও বাসায় গ্যাস সরবরাহ করা দুঃসাধ্য। এক সমীক্ষা থেকে জানা গেছে, পারিবারিক ক্ষেত্রে গ্যাস বা বিদ্যুতের ব্যবহার আগের থেকে দশ শতাংশ থেকে ত্রিশ শতাংশ পর্যন্ত বেড়েছে। পেট্রোল ও ডিজেলের ওপর নির্ভরতা বৃদ্ধি পাওয়ায় যাতায়াত ভাড়া বৃদ্ধি পেয়েছে। পৃথিবীব্যাপী যে মূল্যস্ফীতি ঘটেছে তা থেকে বাংলাদেশ পিছিয়ে নেই। কাঁচামাল সরবরাহ বৃদ্ধি পাওয়া জনগণ বিপাকে পড়েছে।
গ্রামে গ্যাস সরবরাহ না থাকায় লাকড়ি, কাঠ ও গাছের গুড়ি দিয়ে রান্নার কাজ করছে গৃহিণীরা। এতে জনস্বাস্থ্যের ক্ষতি হচ্ছে। রোগ-ব্যাধি বাড়ছে। খড়ি বা লাকড়ি ব্যবহার করায় বায়ুদূষণ বাড়ছে। এর সঙ্গে রোগের প্রাদুর্ভাব ঘটছে। বায়ুদূষণের কারণে শ্বাসকষ্ট ক্রমাগত বৃদ্ধি পাচ্ছে। গ্যাস সংকট উত্তরণে করণীয় ও টেকসই সমাধান খুঁজতে হবে। বঙ্গোপসাগরে দ্রুত অনুসন্ধানমূলক কাজ শুরু করতে আন্তর্জাতিক তেল কোম্পানির সাথে প্রয়োজনীয় শর্তে সমঝোতা চুক্তি সম্পন্ন করা প্রয়োজন। গ্যাস ক্ষেত্রগুলো পুনর্খনন, আবিষ্কার অব্যাহত রাখতে হবে। সম্ভাবনাময় এলাকায় গভীর কূপ খনন জোরদার করতে হবে। বাসাবাড়ি ও পাইপলাইনে গ্যাস সরবরাহ বন্ধ থাকলে এলপিজির বাজার সম্প্রসারণের পরিকল্পনা নেওয়ার বিষয় ভাবতে হবে। এলপিজি গ্যাস সিলিন্ডারের মূল্য সাধারণ নাগরিকের ক্রয় ক্ষমতার মধ্যে রাখা আবশ্যক। বাজার তদারকির জন্য সৎ ও যোগ্য জনবল নিয়োগ অপরিহার্য। এ সব প্রতিষ্ঠানকে ট্যাক্সের চাপ থেকে মুক্ত রাখার বিষয় অগ্রাধিকার যোগ্য। সিএনজি স্টেশনে অটো-এলপিজি রাপান্তরের কাজের বিষয় কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ জরুরি।
গাস সরবরাহ ক্ষেত্রে প্রিপেইড মিটার সংযোজনের পাশাপাশি গ্যাস সরবরাহ যথাযথ ও সরকারি মূল্যমাফিক আয় হচ্ছে কিনা তদারকি করতে হবে। প্রিপেইড মিটার শতভাগ অপচয় নিয়ন্ত্রণ করতে বাধ্য। অধিকাংশ ক্ষেত্রে পুরনো পাইপলাইনে গ্যাস সরবরাহ করা হচ্ছে। ঝুঁকি সরবরাহ লাইনে নতুন সংযোগ না দিলে গ্যাস অপচয় বন্ধ হবে না। পাশাপাশি নবায়নযোগ জ্বালানির ব্যবহার না করলে আমরা যে তিমিরে আছি সে তিমিরেই থাকবো। সৌর শক্তির উৎপাদন ও ব্যবহার বৃদ্ধি পেলে বিদ্যুতের চাপ কমবে।
প্রাকৃতিক গ্যাস সীমিত সময়ের জন্য থাকে, এক সময় মজুত নিঃশেষ হয়ে যায়। অপচয় রোধ ও আমদানি বাড়ানো ছাড়া গ্যাস সংকট মোকাবেলা করা অসম্ভব। আমলতান্ত্রিক জটিলতা অনেক ক্ষেত্রে কাজের গতি মন্থর করে। অবৈধ সংযোগ উচ্ছেদ ও প্রিপেইড মিটারের অধিক ব্যবহার গ্যাস সংকট কাটাতে সাহায্য করতে পারে। উপরোক্ত আলোচিত বিষয় বাস্তবায়ন শুধুমাত্র সরকারি সংস্থা বা কর্মকর্তাদের কর্মপরিকল্পনার ওপর নির্ভর করে না, নির্ভর করে সাধারণ গ্রাহকদের ওপরও।
বিদ্যুৎ ও গ্যাসের অপচয় হয় বেশি। খালি ঘরে ফ্যান-লাইট চালু থাকে। অনেকক্ষেত্রে অহেতুক গ্যাসের চুলা জ্বালিয়ে রাখা হয়- এ গুলো অপচয়। অপচয় রোধে অপব্যবহার বন্ধ করতেই হবে। নবায়নযোগ্য জ্বালানি উৎপাদন ও আমদানি গ্যাস সংকট দূর করবে। এজন্য প্রয়োজন সমন্বিত উদ্যোগ।
লেখক: প্রাবন্ধিক ও গবেষক


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









