ক্ষমতাচ্যুত শেখ হাসিনাকে নিয়ে ভারত দ্বিচারিতা করছে বলে অভিযোগ করেছেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ। তিনি বলেছেন, ভারত একদিকে শেখ হাসিনাকে রাজনৈতিক প্লাটফর্ম দিচ্ছে, আবার বাংলাদেশের সঙ্গে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্কের কথা বলছে—এই দুই বিপরীতমুখী অবস্থান একসঙ্গে চলতে পারে না। গতকাল শনিবার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে বিএনপিপন্থী শিক্ষকদের সংগঠন ‘সাদা দল’ ও ইউট্যাব আয়োজিত ‘ফ্যাসিস্ট সরকারের পতনে শিক্ষকদের ভূমিকা’ শীর্ষক আলোচনা সভায় এ কথা বলেন তিনি।
সালাউদ্দিন বলেন, ’ভারতকে পরিষ্কার বুঝতে হবে যে, আপনারা হাসিনা কার্ড খেলবেন আর একইসঙ্গে বাংলাদেশের মানুষের সাথে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক চাইবেন তা সম্ভব নয়। সম্পর্ক হতে হবে পারস্পরিক মর্যাদা এবং সার্বভৌমত্বের ভিত্তিতে।’
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ’শেখ হাসিনা ভারতের মাটিতে বসে বর্তমান সরকারের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করছেন এবং নানা উসকানিমূলক বক্তব্য দিচ্ছেন। ভারত সরকার তাকে বারবার মিটিং ও কথা বলার সুযোগ দিচ্ছে, যা একটি বন্ধুত্বপূর্ণ প্রতিবেশী দেশের কাছ থেকে কাম্য নয়।’
জুলাই গণ-অভ্যুত্থানে বিপুলসংখ্যক মানুষের প্রাণহানির প্রসঙ্গ টেনে এ বিএনপি নেতা, ’জাতিসংঘের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, শেখ হাসিনার নির্দেশে ১৪০০-এর বেশি মানুষকে হত্যা করা হয়েছে। আসমান থেকে হেলিকপ্টার দিয়ে গুলি করে শিশু ও নারীদের হত্যা করা হয়েছে। এমন একজন দণ্ডিত অপরাধী এবং মানবাধিকার লঙ্ঘনকারীকে ভারত কীভাবে একজন গণতান্ত্রিক নেতা হিসেবে আশ্রয় ও প্রশ্রয় দেয়, সেই প্রশ্ন বাংলাদেশের মানুষের।’
আওয়ামী লীগ সরকারের বিরুদ্ধে বিএনপির আন্দোলনের মধ্যে ২০১৫ সালের ১০ মার্চ ঢাকার উত্তরা থেকে নিখোঁজ হয়েছিলেন সালাহউদ্দিন। তখন তিনি যুগ্ম মহাসচিব হিসেবে দলের মুখপাত্রের দায়িত্ব পালন করছিলেন। নিখোঁজের ৬৩ দিন পর ওই বছরের ১১ মে মেঘালয়ের শিলংয়ের পুলিশ উদ্ভ্রান্ত অবস্থায় তাকে উদ্ধার করে হাসপাতালে ভর্তি করে। ভারতে প্রবেশ করলেও তার কোনো বৈধ কাগজপত্র সে সময় মেঘালয় পুলিশ না পাওয়ায় ‘ফরেনার্স অ্যাক্ট’-এ মামলা দিয়ে তাকে গ্রেপ্তার দেখায়। সেই মামলায় সেখানে তাকে কারাভোগও করতে হয়। জুলাই গণঅভ্যুত্থানের পর দেশে ফেরেন বিএনপি নেতা।
সালাহউদ্দিন বলেন, ’শেখ হাসিনা নিজেই স্বীকার করেছিলেন যে তিনি ‘ভারতকে যা দিয়েছেন তা তারা চিরদিন মনে রাখবে’। আজ সেই প্রতিদান হিসেবেই ভারত তাকে আশ্রয় দিয়েছে।’
ভারতের উদ্দেশে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ’আমরা আপনাদের সাথে বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক চাই, ইন্টার ডিপেন্ডেন্সি বা পারস্পরিক নির্ভরশীলতাকে সম্মান করি। তবে আমরা কখনোই আওয়ামী লীগ হব না। আমরা বাংলাদেশের স্বার্থকে সবার উপরে রেখে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক বজায় রাখতে চাই।’
আওয়ামী লীগ সরকারের সমালোচনা করে তিনি বলেন, ’আওয়ামী লীগ এবং শেখ হাসিনা রাজনীতি করেছেন ঢাকাকে দিল্লি বানিয়ে। তারা দেশের মানুষের আকাঙ্ক্ষাকে গুরুত্ব না দিয়ে একটি বিশেষ দেশের মদদে ক্ষমতা কুক্ষিগত করে রেখেছিলেন। কিন্তু ২০২৪-এর গণঅভ্যুত্থান মানুষের চোখ খুলে দিয়েছে। মানুষ এখন রক্ত দিতে শিখেছে।’
অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের মেয়াদ ও সংস্কারের বিষয়ে সালাহউদ্দিন বলেন, ’কিছু মহল বিভ্রান্তি ছড়িয়ে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের মেয়াদ অস্বাভাবিক দীর্ঘ করতে চেয়েছিল। তারা বলেছিল, ‘মানুষ নাকি তাদের আরও পাঁচ বছর চায়’। তারা বিপ্লবী সরকারের কথা বলে সংবিধানকে পাশ কাটাতে চেয়েছিল। কিন্তু জনগণের আকাঙ্ক্ষা হলো একটি সুষ্ঠু নির্বাচন এবং গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় ক্ষমতা হস্তান্তর।’
রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে পরিবর্তন আনার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, ’পলিটিক্যাল কালচার পাল্টাতে হবে। আমার নেতা তারেক রহমান নির্বাচিত হয়ে শপথ নিয়েই বিরোধী দলের নেতাদের কাছে ছুটে গিয়েছেন। আমরা সংবিধানে এমন সংশোধন নিয়ে আসব, যাতে প্রধানমন্ত্রীর মেয়াদ ১০ বছরের বেশি আর না হয়। সরাসরি সংসদ সদস্য ছাড়া স্বাধীনভাবে সংসদ সদস্যরা রাষ্ট্রপতি নির্বাচন করবেন, সেই পদ্ধতি নিয়ে আসব আমরা। আমরা নিয়ে আসব, চেক অ্যান্ড ব্যালেন্স থাকবে—আপার হাউস এবং লোয়ার হাউসের মধ্যে। জনগণের সার্বভৌম ক্ষমতা বলে যারা নির্বাচিত হবে, তাদের ক্ষমতাই হবে সংবিধানের মূল শক্তি।
আমরা সেই পরিবর্তনের আকাঙ্ক্ষা, শহীদের আকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়ন করতে চাই। ২০২৪ আমাদের অনেক কিছু শিখিয়েছে। এই গণঅভ্যুত্থান মানুষের চোখ খুলে দিয়েছে। ফ্যাসিবাদের প্রত্যাবর্তন এই মাটিতে আর হবে না। সবাই মিলে আমরা অপরাজনীতি এবং ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াই।’


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









