প্রয়োজন অনুযায়ী ব্যয় করার নাম ‘মিতব্যয়িতা’। যারা প্রয়োজনের অতিরিক্ত ব্যয় করেন তারা ‘অমিতব্যয়ী’র পর্যায়ে পড়েন। আমরা জানি- হাজী মুহম্মদ মহসিন প্রয়োজনের অতিরিক্ত খরচ করেননি বলে তিনি ‘মিতব্যয়ী’। মাইকেল মধুসূদন দত্ত অপ্রয়োজনেও খরচ করতেন বলে তিনি ‘অমিব্যয়ী’ হিসেবে গণ্য। এই দুই মহামানবের বিষয়ে পরে আসছি।
আমাদের সমাজ ব্যবস্থার কিছু কিছু কারণে উল্লিখিত দুই বিষয়ে তেমন আমরা ভাবি না। মানুষের চাহিদার যেমন শেষ নেই, তেমনি ব্যয়বহুলও। তবু মানুষ চাহিদার সাথে সমন্বয় রেখে তার অর্জিত সম্পদ ব্যয় করে থাকেন। তবে এ ক্ষেত্রেও বিস্তর ফারাক রয়েছে। অনেকে চাহিদার তুলনায় কম খরচ করেন, অনেকে চাহিদার চেয়ে অতিরিক্ত খরচ করেন। কোনোটাই ভালোর পর্যায়ে পড়ে না। অল্প খরচে প্রয়োজনকে বিড়ম্বিত করে অর্থের অপচয় করাও নিবুর্দ্ধিতার পরিচয়।
মিতব্যয় বলতে স্বল্প খরচ নয়, পরিমিত খরচ বোঝায়। তাই বলছিলাম, যতটুকু প্রয়োজন ততটুকু খরচ করা। ধর্মীয় অনুষ্ঠানসহ যে কোনো অনুষ্ঠান আগের চেয়ে অনেকগুণ বেড়েছে । তার সাথে পাল্লা দিয়ে বেড়েছে নাম প্রচারের প্রতিযোগিতা। যেমন ধরা যেতে পারে- অমুক বাবু যেই মনের পরিচয় দেখাল তা প্রশংসাযোগ্য। এমন দান দিল এই গ্রাম কেনো অন্য কোনো গ্রামেও এ ধরনের দানের কথা আমরা কেউ শুনিনি। অনুষ্ঠানের ফলাফল ‘নাম প্রচার’ বা ‘প্রশংসা’।
এ সমাজে এমনও দেখা এবং শোনা যায়, গরিবের অনুষ্ঠানে ধর্মীয় গুরুরা আসেন না, অতিরিক্ত দান পাবেন না। একই দিনে ধনী-দরিদ্রের অনুষ্ঠান হলে তারা ধনী লোকের অনুষ্ঠানে গেলেন, কিন্তু গরিবের অনুষ্ঠানে গেলেন না, প্রয়োজনের বেশি দানীয়বস্তু পাবেন না বলে। বিত্তশালীর চেয়ে গরিবের দানটা অন্তরের এবং নিখাদ। বলে রাখা ভালো, বিধিবিধান মতো গরিব সব আয়োজন ঠিকই করেছে। মিতব্যয়িতা ও অমিতব্যয়িতার পার্থক্য উল্লিখিত বিষয়গুলো হতে পারে। মানুষের শক্তি সীমিত। এই সীমিত শক্তি দিয়ে সে জীবনে প্রতিষ্ঠা অর্জন করতে চায়। বিশেষ করে অর্থনৈতিক সচ্ছলতা সকলেরই কাম্য। আয় মতে ব্যয় করতে শিখলে অভাবনামক দানব সহজে সক্রিয় হতে পারবে না। তা ছাড়া সবার সময় এক রকম যায় না। সেজন্যে প্রয়োজনের অতিরিক্ত খরচ শুভফল বয়ে আনে না। মিতব্যয়ী হওয়া প্রত্যেকের অবশ্য কর্তব্য।
আমাদের সমাজে আরেক ধরনের লোক আছে তারা নিতান্ত প্রয়োজনেও অর্থ থাকা সত্ত্বেও খরচ করে না। খরচের ভয়ে নিজেও ভালোমন্দ খাবে না। আমরা তাদের ‘কৃপণ’ বলে অভিহিত করি। তাই বলছিলাম- মিতব্যয়ী ও কৃপণের মধ্যে আকাশ-পাতাল পার্থক্য। একজন দীন আত্মার অধিকারী, অন্যজন মহৎ মানসের ধারক। কৃপণে শুধু জমা করে আর মিতব্যয়ী নিজের জমা টাকা নিজ কল্যাণে বা পরের মঙ্গলে ব্যয় করে আত্মতৃপ্তি লাভ করে। মিতব্যয়ী লোকেরা মানুষের কাছে সম্মানিত ও শ্রদ্ধার পাত্র।
হাজী মুহম্মদ মহসিন অঢেল অর্থ হাতে পেয়েও সে অর্থ নিজ খুশিমতো ব্যয় করেননি। তিনি ছিলেন ‘মিতব্যয়ী’। তাঁর অর্জিত সম্পদ তিনি মানবের ভালোর তরে ব্যয় করেছেন। তাঁর সম্পূর্ণ বিপরীতে ছিলেন মাইকেল মধুসূদন দত্ত। তিনি অমিতব্যয়ী ছিলেন বলেই তাঁর জীবন সায়াহ্নে নিদারুণ অর্থকষ্টে ছিলেন। মিতব্যয়ী হওয়া শুধু নিজের ভালো নয়, জাতির জন্যেও সুফলদায়ক। ধর্মীয় বিধানেও অপচয়কারীর জীবন অভিশপ্ত। মানুষের জীবন ক্ষণস্থায়ী। এই দুর্লভ মানবজন্মে বিশাল মর্যাদা প্রতিষ্ঠা করতে হলে মিতব্যয়ী হওয়ার কোনো বিকল্প নেই। কারণ, অমিতব্যয়ী লোকেরা সমাজ বা জাতির কোনো কল্যাণ সাধন করতে পারেন না। অহেতুকভাবে আনন্দ-উল্লাস করে তারা অর্জিত সম্পদের বা অর্থের চরম বিনাশ ঘটান। বর্তমান সময়টা তেমন একটা ভালো যাচ্ছে না। তাই বলছিলাম, মিতব্যয়ী হওয়া সময়ের দাবি। একটি সুখী সমৃদ্ধশালী দেশ গড়তে হলে এ দেশের সাধারণ মানুষকে মিতব্যয়িতার সাথে নিজ নিজ কর্তব্য সম্পন্ন করা একান্ত অপরিহার্য। কীভাবে সামান্য খরচে সুন্দর জিনিস দেশ ও জাতিকে উপহার দেওয়া যায় সে প্রচেষ্টা চালানো সকলের নৈতিক দায়িত্ব ও কর্তব্য।
অপ্রয়োজনে টাকা খরচ করা বোকামির পর্যায়ে পড়ে। হিসেব মতো অর্থ ব্যয় করলে নিজের প্রয়োজন মিটিয়ে কিছু জমাও করা যায়। পারিবারিকভাবে ছেলেমেয়েদের ‘মিতব্যয়ী’ হওয়ার শিক্ষা দেওয়া যেতে পারে। কারণ, একদিন তারাই দেশের কাণ্ডারী হবে। তারা শৈশব থেকে মিতব্যয়ী হওয়ার শিক্ষা গ্রহণ করলে নিজের জীবন সুশৃঙ্খল হবে। তারাই হবে দেশ ও জাতির গৌরব।
লেখক: সাংবাদিক, কলামিস্ট এবং প্রাবন্ধিক


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









