সিলেটের অন্যতম প্রধান পর্যটন কেন্দ্র জাফলং। প্রতিদিন যেখানে হাজারো পর্যটকের কোলাহল, ওপার থেকে নেমে আসা পিয়াইন নদীর কলতান আর প্রকৃতির অপার সৌন্দর্য। কিন্তু এই চোখ ধাঁধানো নৈসর্গিক রূপের ঠিক আড়ালেই যেন প্রদীপের নিচের অন্ধকার হয়ে ধুঁকছে ৪৫০ শিশুর ভবিষ্যৎ! প্রতিষ্ঠার দেড় দশক পেরিয়ে গেলেও আজও মেলেনি সরকারি স্বীকৃতি।
একবিংশ শতাব্দীতে দাঁড়িয়েও একটু বৃষ্টির পানি আর ঝোড়ো হাওয়া মাথায় নিয়ে ভাঙা টিনশেডের নিচে বসে প্রতিদিন স্বপ্নজয়ের লড়াই চালাচ্ছে জাফলংয়ের ‘গুচ্ছগ্রাম বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়’-এর কোমলমতি শিক্ষার্থীরা। একদিকে অর্থের অভাবে শিক্ষকদের মানবেতর জীবন, অন্যদিকে যেকোনো সময় চিরতরে বন্ধ হয়ে যাওয়ার উপক্রম সীমান্ত এলাকার একমাত্র এই ভরসাস্থলটি এখন ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে।
বন্যার ক্ষত থেকে স্বপ্নের শুরু: অনুসন্ধানে জানা যায়, ১৯৮৮ সালের প্রলয়ঙ্করী বন্যার পর ঘরবাড়ি হারানো বানভাসি ছিন্নমূল মানুষের আশ্রয়ের জন্য গড়ে উঠেছিল জাফলংয়ের ‘উদয়ন গুচ্ছগ্রাম’। বিশাল এই এলাকার প্রায় সব মানুষই দিনমজুর, পাথরশ্রমিক ও খেটেখাওয়া মানুষ। এই অবহেলিত ও দরিদ্র জনপদের শিশুদের নিরক্ষরতার অন্ধকার থেকে বাঁচাতে ২০১১ সালে স্থানীয় যুবসমাজের উদ্যোগে ও কঠোর পরিশ্রমে প্রতিষ্ঠিত হয় ‘গুচ্ছগ্রাম বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়’। বর্তমানে কেবল গুচ্ছগ্রামই নয়, বরং রসুলপুর, সোনাটিলা, রহমতপুর, বাবুলের জুম ও মোহাম্মদপুর এলাকার হাজারো শ্রমজীবী পরিবারের সন্তানদের অক্ষরের সাথে পরিচয় করিয়ে দেওয়ার একমাত্র আশার আলো এই প্রতিষ্ঠানটি।
শত সংকটেও ঈর্ষণীয় সাফল্য: বিদ্যালয়টিতে বর্তমানে শিক্ষার্থীর সংখ্যা প্রায় ৪৫০ জন। অথচ নেই কোনো নিজস্ব পাকা ভবন, নেই আধুনিক শিক্ষাসামগ্রী, নেই পর্যাপ্ত বেঞ্চ। জরাজীর্ণ টিনের চাল দিয়ে বৃষ্টির পানি সরাসরি পড়ে কোমলমতি শিশুদের বই-খাতার ওপর। রোদ-বৃষ্টির সাথে যুদ্ধ করেই সম্পূর্ণ বিনাবেতনে পড়াশোনা করছে হতদরিদ্র পরিবারের সন্তানরা। তবে সবচেয়ে অবাক করার মতো বিষয় হলো- তীব্র অবকাঠামোগত ও আর্থিক সংকটের মধ্যেও বিদ্যালয়টির শিক্ষার্থীরা পিএসসি ও বৃত্তি পরীক্ষায় বরাবরই ঈর্ষণীয় ও ধারাবাহিক সাফল্য অর্জন করে আসছে। এই বিদ্যালয়ের গণ্ডি পেরিয়ে অনেকেই এখন মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শেষ করে দেশের বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে সুনামের সাথে কাজ করছেন। সুযোগ-সুবিধা পেলে এই শিশুরা যে আরো অনেকদূর যেতে পারত, তা তাদের মেধার স্বাক্ষরই প্রমাণ করে।
বিনাবেতনে ৮ শিক্ষকের নিঃস্বার্থ ‘শিক্ষা যুদ্ধ’: যেখানে দেশের অনেক সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে মাত্র ১০০ থেকে ১৫০ শিক্ষার্থীর পেছনে সরকার প্রতি মাসে বিপুল অর্থ ও জনবল ব্যয় করছে, সেখানে এই বিদ্যালয়ে ৪৫০ শিক্ষার্থীর ভবিষ্যৎ আগলে রেখেছেন মাত্র ৮ জন শিক্ষক। বছরের পর বছর ধরে নামমাত্র সম্মানী কিংবা সম্পূর্ণ বিনাবেতনে, নিজেদের পকেটের টাকা খরচ করে তারা এখানে পাঠদান চালিয়ে যাচ্ছেন। তারা শুধু শিক্ষক নন, তারা এই অবহেলিত জনপদের একেকজন আলোর ফেরিওয়ালা। তবে বর্তমান চরম অর্থনৈতিক সংকটের বাজারে এই শিক্ষকরা এখন পরিবার নিয়ে মানবেতর জীবনযাপন করছেন।
বিদ্যালয় পরিচালনা কমিটির সভাপতি ও গোয়াইনঘাট প্রেসক্লাবের সাধারণ সম্পাদক মো. করিম মাহমুদ লিমন আবেগঘন কণ্ঠে বলেন, ‘অর্থের চরম সংকটে পড়ে আজ বিদ্যালয়টি চালানো আমাদের পক্ষে অসম্ভব হয়ে পড়েছে। শিক্ষকদের মুখে দুমুঠো অন্ন তুলে দেওয়ার মতো ন্যূনতম সম্মানী কিংবা ভাঙা চালের ফুটো মেরামত করার সামর্থ্যও আজ আমাদের নেই। দ্রুততম সময়ে বিদ্যালয়টি সরকারীকরণ করা না হলে এই ৪ সাড়ে চারশত হতদরিদ্র শিশুর শিক্ষাজীবন চিরতরে অন্ধকারে হারিয়ে যাবে। আমরা এই শিশুদের স্বপ্নগুলোকে এভাবে বিলীন করতে পারি না।”
নিভে যাওয়া প্রদীপ জ্বালাতে প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপ কামনা: বিদ্যালয়টির নামে প্রয়োজনীয় পর্যাপ্ত ভূমিও রয়েছে, কেবল অভাব একটু সরকারি পৃষ্ঠপোষকতার। দেশের এমন একটি নামকরা ও রাজস্ব আয়ের অন্যতম উৎস পর্যটন কেন্দ্রের ঠিক পাশেই একটি সফল বিদ্যাপীঠের এই জরাজীর্ণ কঙ্কালসার রূপ অত্যন্ত বেমানান এবং পীড়াদায়ক বলে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন স্থানীয় সচেতন মহল।
সম্প্রতি স্কুলটিকে সরকারীকরণের জন্য প্রধানমন্ত্রীর কাছে লিখিত আবেদন করেছেন বিদ্যালয়টির সভাপতি মো. করিম মাহমুদ লিমন। আবেদনে তিনি উল্লেখ করেন, অত্র এলাকার কোমলমতি শিক্ষার্থীদের প্রাথমিক স্তরে সুশিক্ষা নিশ্চিত করতে এবং নিরক্ষরতার অভিশাপ থেকে এই সীমান্ত অঞ্চলকে রক্ষা করতে ‘গুচ্ছগ্রাম বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়’টি জরুরি ভিত্তিতে সরকারীকরণের প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হোক। অত্র এলাকার নিভে যাওয়া প্রদীপকে আবার জ্বেলে ওঠাতে তিনি সরাসরি সরকারপ্রধানের সুনজর কামনা করেছেন।
প্রশাসনের আশ্বাস ও সমাধানের প্রত্যাশা: উপজেলার শিক্ষানুরাগী ও সচেতন মহল মনে করেন, গুচ্ছগ্রাম বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়টি ঝরে পড়া রোধে তৃণমূল পর্যায়ে অসাধারণ ভূমিকা রাখছে। সরকারের প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয় এবং স্থানীয় প্রশাসন দ্রুত এগিয়ে এলে এ অঞ্চলের শিক্ষাব্যবস্থায় এক বৈপ্লবিক পরিবর্তন আসবে।
বিদ্যালয়টির সার্বিক অবস্থা ও সরকারীকরণের প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে জানতে চাইলে গোয়াইনঘাটের উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) রতন কুমার অধিকারী বলেন, “গুচ্ছগ্রাম বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়টি প্রত্যন্ত অঞ্চলের শ্রমজীবী মানুষের সন্তানদের শিক্ষা নিশ্চিতকরণে অত্যন্ত প্রশংসনীয় ভূমিকা পালন করছে। ৩ কিলোমিটারের মধ্যে কোনো সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় না থাকায় এ প্রতিষ্ঠানটির গুরুত্ব অপরিসীম। সম্প্রতি আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সংস্থা ওয়ার্ল্ড ভিশন বাংলাদেশের অর্থায়নে বিদ্যালয়ে প্রায় ৯ লাখ টাকা ব্যয়ে একটি আধুনিক ওয়াশ ব্লক নির্মাণকাজের উদ্বোধন করা হয়েছে। প্রশাসন সব সময় এই বিদ্যালয়ের পাশে রয়েছে। শিক্ষার মানোন্নয়ন, অবকাঠামো সংস্কার ও প্রয়োজনীয় শিক্ষা সরঞ্জাম সরবরাহের জন্য আমরা ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সাথে যোগাযোগ করছি। বিদ্যালয়টিকে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় হিসেবে স্থায়ী রূপ দেওয়ার (সরকারীকরণ) ব্যাপারেও সরকারি নিয়ম অনুযায়ী প্রয়োজনীয় সহযোগিতা প্রদান করা হবে।”
সীমান্তবর্তী এই ৪৫০ শিশুর চোখের স্বপ্নগুলো কি তবে জরাজীর্ণ টিনের চালের মতোই ভেঙে পড়বে, নাকি মেহনতি মানুষের এই বাতিঘরটি পাবে তার যোগ্য স্বীকৃতি?—এখন এটাই গোয়াইনঘাটের সর্বস্তরের মানুষের আকুল প্রশ্ন।
দেখে এসেছেন প্রতিমন্ত্রী: সম্প্রতি প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয় প্রতিমন্ত্রী ববি হাজ্জাজ জাফলংয়ে যুব সমাজ কর্তৃক পরিচালিত গুচ্ছগ্রাম বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় পরিদর্শন শেষে বিদ্যালয়টির চমৎকার পরিবেশ এবং কোমলমতি শিক্ষার্থীদের পড়াশোনার প্রতি আগ্রহ দেখে তিনি দারুণ মুগ্ধ হন। যুবসমাজের এই নিঃস্বার্থ ও স্বতঃস্ফূর্ত প্রচেষ্টাকে স্বাগত জানিয়ে প্রতিমন্ত্রী বলেন, “দুর্গম এলাকায় শিশুদের মাঝে শিক্ষার আলো ছড়িয়ে দিতে তরুণদের এই উদ্যোগ গ্রামীণ জনপদে শিক্ষার মান উন্নয়নে এক অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে। তরুণরাই যে সমাজ পরিবর্তনের মূল কারিগর, এই বিদ্যালয়টি তার একটি উজ্জ্বল প্রমাণ।
বিদ্যালয়টির ভবিষ্যৎ প্রসঙ্গে প্রতিমন্ত্রী আরো জানান, বর্তমান সরকারের আপাতত নতুন কোনো স্কুল সরকারীকরণের সিদ্ধান্ত নেই। তবে পরবর্তীতে সরকার যদি কখনো এমন সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে, তবে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে এই গুচ্ছগ্রাম বেসরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়টিকে সরকারি করা হবে।
তিনি যুব সমাজের এই মহৎ উদ্যোগের সার্বিক সাফল্য কামনা করেন এবং এলাকার নিরক্ষরতা দূরীকরণে এই ধারা অব্যাহত থাকবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেন।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









