রাজধানীর বাজারে একদিকে বাড়ছে চিনি ও খোলা ভোজ্যতেলের দাম, অন্যদিকে বাজারে কমেছে বোতলজাত ভোজ্যতেলের সরবরাহ। সবজির দাম আগের তুলনায় কিছুটা কমলেও বেশ কয়েকটি সবজি এখনো কেজিপ্রতি ১০০ টাকার ওপরে বিক্রি হচ্ছে। বেড়েছে আটা-ময়দার দাম, সবজি, মাছ-মাংস ও ডিমের দাম এখনো উচ্চমূল্যেই আটকে আছে।
ক্রেতারা বলছেন, বাজারে মাছ, মুরগি ও ডিম কিনতেই সবচেয়ে বেশি চাপ পড়ছে। একটির দাম কিছুটা কমলেও অন্যটির দাম বেড়ে যাচ্ছে। তাদের অভিযোগ, আয় বাড়ছে না, অথচ প্রতিদিনই বাড়ছে বাজার খরচ। ফলে আগের তুলনায় একই পরিমাণ টাকায় কম পণ্য কিনতে হচ্ছে। নিম্ন ও মধ্যবিত্ত ক্রেতাদের মতে, সব নিত্যপণ্যের দামই তাদের নাগালের বাইরে চলে যাচ্ছে। দাম এভাবে বাড়তে থাকলে সংসারের ব্যয় সামলানো আরও কঠিন হয়ে পড়বে।
গতকাল শুক্রবার রাজধানীর বিভিন্ন বাজার ঘুরে দেখা গেছে, সপ্তাহের ব্যবধানে প্রতি কেজি চিনির দাম প্রায় ১০ টাকা বেড়ে ১২০ থেকে ১২৫ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। বিক্রেতারা বলছেন, পাইকারি বাজারে দাম বাড়ায় খুচরা পর্যায়েও এর প্রভাব পড়েছে। লালবাগের মুদি দোকানি মিরাজ ও মালিবাগ বাজারের বিক্রেতা চিশতির ভাষ্য, ‘কয়েক দিনের ব্যবধানে ৫০ কেজির এক বস্তা চিনির দাম ডিলাররা ৯০০ টাকা থেকে এক হাজার টাকা পর্যন্ত বাড়িয়েছেন। সামনে প্যাকেটজাত চিনির দামও বাড়তে পারে বলে মনে হচ্ছে।’
এদিকে বাজারে বোতলজাত ভোজ্যতেলের সরবরাহ কমেছে। খুচরা বিক্রেতাদের অভিযোগ, নতুন করে দাম বাড়ানোর প্রস্তুতি হিসেবে কোম্পানিগুলো সরবরাহ কমিয়ে দিয়েছে। ফলে অনেক দোকানেই চাহিদা অনুসারে বোতলজাত তেল পাওয়া যাচ্ছে না। যদিও বোতলজাত সয়াবিন তেলের দাম এখনো বাড়েনি, প্রতি লিটার ২০০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। তবে খোলা তেলের দাম বেড়ে গেছে। বাজারে খোলা সয়াবিন তেল প্রতি লিটার ১৮৫ থেকে ১৯০ টাকা এবং পাম তেল ১৬৫ থেকে ১৭০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। অন্যদিকে প্যাকেটজাত আটা প্রতি কেজি ৬৫ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। ১৫ থেকে ২০ দিন আগেও এই আটা বিক্রি হয়েছে ৫৫ টাকায়। অর্থাৎ, কেজিতে দাম বেড়েছে ১০ টাকা। একই ভাবে ময়দার দামও বেড়েছে। খোলা ময়দা এখন প্রতি কেজি ৬৫ থেকে ৭০ টাকা এবং প্যাকেটজাত ময়দা কোম্পানিভেদে ৭০ থেকে ৭৫ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।
গত সপ্তাহের তুলনায় সবজির দাম কিছুটা কমলেও সাধারণ ক্রেতাদের মাঝে খুব একটা স্বস্তি নেই। অধিকাংশ সবজি ৬০ থেকে ৮০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে। আর শিম, গাজর, বেগুন ও টমেটোর মতো কয়েকটির দাম এখনো চড়া। প্রতি কেজি টমেটো ১৩০ টাকা, বেগুন ১২০ টাকা, শিম ২০০ টাকা, গাজর ১৪০ টাকা এবং বরবটি ১০০ টাকা দরে বিক্রি হতে দেখা গেছে। এছাড়া পটল ৬০ টাকা, শসা ৬০ টাকা, করলা ৮০ টাকা, ঝিঙা ও চিচিঙ্গা ৮০ টাকা, কাঁকরোল ৮০ টাকা, ঢেঁড়স ৬০ টাকা, পেঁপে ৪০ টাকা, ধুন্দল ৬০ টাকা এবং মুলা ৮০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে। তবে, কাঁচা মরিচের দাম কিছুটা কমেছে। ভারত থেকে আমদানির প্রভাবে খুচরা বাজারে প্রতি কেজি কাঁচা মরিচ ১২০ থেকে ১৬০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে, যা গত সপ্তাহে ৩৬০ থেকে ৩৮০ টাকা ছিল। কারওয়ানবাজারে পাইকারিতে মরিচের কেজি এখন ১০০ থেকে ১১০ টাকা।
নিউমার্কেটে বাজার করতে আসা কামরুজ্জামান তমাল ও রায়সাহেব বাজারের ক্রেতা বেসরকারি চাকরিজীবী সৌরভ আমান বলেন, ‘সবজির দাম আগের চেয়ে কিছুটা কমলেও চার-পাঁচটি সবজি এখনো ১০০ থেকে ২০০ টাকার মধ্যে। বাকিগুলো ৬০ থেকে ৮০ টাকার নিচে নামছেই না।
ধুপখোলা বাজারের সবজি বিক্রেতা খাদিমুল ইসলাম বলেন, ‘বেগুন, শিম, গাজর, বরবটি ও টমেটোর সিজন না হওয়ায় সরবরাহ কিছুটা কম। এ কারণে এসব সবজির দাম তুলনামূলক বেশি। তবে অন্যান্য সবজির দাম আগের তুলনায় কমেছে। টানা বৃষ্টি না হলে সবজির দাম এমনই থাকবে।’
ডিমের বাড়তি দাম এখনো কমেনি। বাজারে প্রতি ডজন ডিম ১৪০ থেকে ১৫০ টাকা এবং পাড়া-মহল্লার দোকানে ১৫৫ থেকে ১৬০ টাকা পর্যন্ত বিক্রি হচ্ছে। মুরগির বাজারেও খুব একটা পরিবর্তন নেই। ব্রয়লার মুরগি প্রতি কেজি ১৯০ টাকা, সোনালি ৩২০ থেকে ৩৪০ টাকা এবং দেশি মুরগি ৬৫০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। গরুর মাংস বিক্রি হচ্ছে ৭৮০ থেকে ৮০০ টাকা কেজি দরে। মুরগি বিক্রেতা আনিস আহমেদ ও জিকরুল আযম বলেন, ‘গত সপ্তাহের তুলনায় দাম তেমন বদলায়নি। সরবরাহ স্বাভাবিক থাকলে দাম কমার সম্ভাবনা আছে। আগের মতো ব্রয়লার ১৯০ টাকায় কেজি ও সোনালি মুরগি ৩২০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে।’
মাছের বাজারে ক্রেতাদের জন্য কোনো সুসংবাদ নেই। ২৫০ টাকার নিচে কোনো মাছ পাওয়া দুষ্কর হয়ে পড়েছে। তেলাপিয়া প্রতি কেজি ২৫০ থেকে ২৬০ টাকা, পাঙাশ ২৩০ থেকে ২৫০ টাকা, রুই ও কাতলা আকারভেদে ৩৮০ থেকে ৫০০ টাকা এবং চিংড়ি এক হাজার টাকা থেকে এক হাজার ৩০০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। এছাড়া পাবদা ৩৫০ থেকে ৪০০ টাকা, মৃগেল ২৫০ থেকে ৩০০ টাকা, দেশি কই ৭০০ থেকে ৮০০ টাকা, চাষের কই ৩০০ টাকা, বড় আকারের রুই ৪৫০ থেকে ৫০০ টাকা, ট্যাংরা ৭০০ টাকা, ভেটকি ৪০০ থেকে ৫৫০ টাকা, মৃগেল ২৫০ থেকে ৩০০ টাকা, পোয়া ২৬০ টাকা, শোল ৭০০ টাকা এবং বাইন ৬০০ থেকে ৮০০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে। চাষের শিং মাছ আকারভেদে ৩০০ থেকে ৪৫০ টাকা কেজি। ৯০০ গ্রাম থেকে এক কেজি ওজনের ইলিশ প্রায় দুই হাজার ৫০০ টাকায় এবং এক কেজি ৩০০ গ্রাম ওজনের ইলিশ প্রায় তিন হাজার টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে।
নারিন্দা বাজারের ক্রেতা মাক্কী ও আবু দাউদ আক্ষেপ করে বলেন, ‘মাছ কিনতে এসে অবাক হতে হয়। ২৫০ টাকার নিচে কোনো মাছ পাওয়া যাচ্ছে না। তেলাপিয়াও যদি আড়াইশ টাকা কেজি হয়, তবে আমাদের মতো মধ্যবিত্তদের জন্য বাজার করা অসম্ভব হয়ে দাঁড়িয়েছে।’ মাছ বিক্রেতা কফিল উদ্দিন বলেন, 'মাছের দাম প্রায় স্থির। একদিন ২০-৩০ টাকা কমলে পরদিনই আবার বেড়ে যায়।' অন্যদিকে ইলিশের দাম সাধারণের নাগালের বাইরে। এক কেজি ওজনের ইলিশ দুই হাজার ৫০০ টাকা থেকে তিন হাজার টাকা পর্যন্ত বিক্রি হচ্ছে।’


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









