গ্যাস-বিদ্যুৎ ও জ্বালানি তেলের বাড়তি দামের প্রভাবে এমনিতেই নিত্যপণ্যের বাজারে আগুন। এসব জিনিসের মূল্যবৃদ্ধির জাঁতাকলে পিষ্ট সাধারণ নিম্ন ও মধ্যবিত্ত আয়ের মানুষ। তাদের কাছে মাছ-মাংস খাওয়া যেন একপ্রকার বিলাসিতা। আর পোলাও কিংবা বিরিয়ানির মতো সুস্বাদু খাবার আরো উচ্চবিলাসিতা।
এই অবস্থায় সাধারণ মানুষ বিশেষ করে নিম্ন আয়ের গরিব লোকের সন্তানদের প্লেটে একটু ভালো খাবার বলতে ‘দুধের স্বাদ ঘোলে মিটানো’র মতো শেষ সম্বল ছিল ডিমের কারি, ব্রয়লার মুরগির হাড় কিংবা গিলা-কলিজার ঝোল রান্না করে চারটে পোলাও দিয়ে কোনো রকমে উদর পূর্তি করানো। কিন্তু গরিবের সেই ‘বিলাসিতায়’ হঠাৎই নামল দামের খড়গ। কারণ ‘দামের গজবে’পোলাওয়ের চাল এখন অনেকটাই অধরা, যেন রঙিন স্বপ্ন। গত এক মাসে প্রতি কেজি পোলাও চালের দাম বেড়েছে ৮০ থেকে ১০০ টাকা পর্যন্ত। অথচ সংশ্লিষ্টরা নির্বিকার।
বাজারে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, দেশের বাজারে অস্বাভাবিকভাবে বাড়ছে সুগন্ধি বা পোলাও চালের দাম। গত ছয় মাসে কেজিপ্রতি দাম বেড়েছে ৮০ থেকে ৯০ টাকা পর্যন্ত। বর্তমানে ব্র্যান্ডভেদে প্যাকেটজাত পোলাও চাল (চিনিগুঁড়া/কালিজিরা) কেজিপ্রতি সর্বনিম্ন ২১০ থেকে সর্বোচ্চ ২৩০ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। খোলা পোলাও চালের দামও হু-হু করে বাড়ছে। কোথাও কোথাও খোলা পোলাও চাল বিক্রি হচ্ছে ১৮০ থেকে ২০০ টাকা কেজি দরে। দাম বাড়ার কারণে অনেকেই এখন আগের কম দামের প্যাকেটজাত পোলাও চাল বেশি দামে বিক্রি করছে। আবার কেউ কেউ প্যাকেটের চাল খোলা হিসেবে ২০০ টাকা কেজি দরে বিক্রি করছে। মূল্যবৃদ্ধির জন্য নজরদারির দুর্বলতাকেই দায়ী করছেন ক্রেতারা। তাদের অভিযোগ, বাড়তি চাহিদার সুযোগে কিছু অসাধু ব্যবসায়ী দাম বাড়িয়ে দিয়েছে।
তবে মাত্র এক দুই মাসের ব্যবধানে এই অস্বাভাবিক দাম বাড়ার পেছনে মোটাদাগে দুটি বিষয় আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে। একটি হলো- সাম্প্রতিক সময়ে দুই দফায় বিপুল পরিমাণ সুগন্ধি চালের রপ্তানির অনুমোদন। আরেকটি বলা হচ্ছে কৃত্রিম সংকট।
যদিও দেশের বাজারে সুগন্ধি চালের চাহিদা ও দাম অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যাওয়ায় রপ্তানিতে কঠোর হয়েছে সরকার। অনুমোদন দেওয়া রপ্তানি কোটা পুনর্বিবেচনা করে তা কমানো বা সমন্বয়ের উদ্যোগ নিয়েছে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়। কিন্তু মন্ত্রণালয়ের সেই উদ্যোগে কাজের কাজ কিছুই হচ্ছে না।
রাজধানীর চাল ব্যবসায়ীরা বলছেন, পাইকারি বিক্রেতারা এরই মধ্যে অনেক চড়া দামে সুগন্ধি চাল কিনছেন। ফলে তাদেরও পাইকারি বাজার থেকে বেশি দামে চাল কিনতে হচ্ছে। এ বছর অনেক বেশি সুগন্ধি চাল রপ্তানির অনুমোদন দেওয়ায় এই দাম বাড়ছে বলে পাইকারি বাজারে গুঞ্জন রয়েছে। তবে রপ্তানিকারকরা বলছেন, মিল মালিক ও বড় কর্পোরেট প্রতিষ্ঠানগুলো কৃত্রিম সংকট তৈরি করে দাম বাড়িয়েছে।
খুচরা ব্যবসায়ীরা বলছেন, এক মাস আগেও পাইকারি বাজারে বস্তাপ্রতি (৫০ কেজি) সবচেয়ে বেশি বিক্রীত সুগন্ধি চাল চিনিগুঁড়ার (ভালো মানের) দাম ছিল ৭ হাজার ৫০০ টাকা। বর্তমানে দাম বেড়ে ৯ হাজার ৫০০ টাকায় উঠে গেছে। অর্থাৎ এক মাসে বস্তাপ্রতি চিনিগুঁড়া চালের দাম বেড়েছে ২ হাজার টাকা।
রাজধানীর পলাশী মোড়ের বুয়েট মার্কেটে থেকে ১৯০ টাকায় এক কেজি চিনিগুঁড়া পোলাও চাল কিনে ক্ষোভ প্রকাশ করেন আব্দুস সাত্তার। দৈনিক এদিনকে তিনি বলেন, ‘আগে শুনতাম ইলিশ মাছ, চিংড়ি মাছ রপ্তানি হয় বলে দাম বেশি থাকে। এখন দেখতেছি পোলাও চালও রপ্তানি হলে দাম বাড়ে। কৃষিপ্রধান দেশ হয়েও যদি পোলাও চাল এত দাম দিয়ে কিনতে হয়, সেটি আমাদের জন্য দুঃখজনক।’
এই বাজারের নজরুল রাইস এজেন্সির মালিক নজরুল ইসলাম বলেন, ‘আজকে খোলা যে পোলাও চাল ১৯০-২০০ টাকা পর্যন্ত বিক্রি হচ্ছে, এক মাস আগেও এটার দাম ছিল সর্বোচ্চ ১১০ টাকা পর্যন্ত। কিন্তু হঠাৎ করে কী কারণে পোলাও চালের দাম বেড়ে গেল তা জানি না।’ তবে বাজারে চালের কোনো সংকট নেই বলেও তিনি জানান।
একই বাজারের ইনসাফ বাজারের মালিক ওমর ফারুক রাহিম বলেন, ‘এক মাস আগেও আমরা যেসব প্যাকেট পোলাওয়ের চাল ১১০ থেকে ১২০ টাকায় বিক্রি করতাম এখন সেই প্যাকেটের দাম ২২০ থেকে ২৩০ টাকা পর্যন্ত বিক্রি করতে হচ্ছে। এতে আগের তুলনায় বিক্রি অনেক কমে গেছে। বিশেষ করে নিম্ন ও মধ্যবিত্তের কাস্টমারদের এখন প্যাকেট চাল কিনতে খুব বেশি দেখা যায় না।’ তিনি জানান, বাজারে সাধারণত এসিআই, স্কয়ার, প্রাণ, আকিজ ও অন্য দু-একটি ব্র্যান্ডের পোলাও চালই বেশি বিক্রি হয়।
রাজধানীর সেগুনবাগিচা কাঁচাবাজারের সেলিম রাইস ভাণ্ডারের স্বত্বাধিকারী মো. সেলিম উদ্দিন মোল্লা জানান, পাইকারি বাজারে শোনা যাচ্ছে রপ্তানির কারণে পর্যাপ্ত চাল পাওয়া যাচ্ছে না। ইতোমধ্যেই গত এক মাসে চিনিগুঁড়া সুগন্ধি চালের দাম বস্তাপ্রতি ২৫ শতাংশের বেশি বেড়েছে। এখনো চাহিদা অনুযায়ী চাল পাওয়া যাচ্ছে না। পরিস্থিতি ঠিক না হলে দাম আরো বাড়তে পারে।
ব্যবসায়ীদের কেউ কেউ দাবি করছেন, আন্তর্জাতিক বাজারে চাহিদা বেশি থাকায় স্বাভাবিকভাবেই দেশীয় বাজারে দাম বাড়ছে। এবার প্রতি কেজি চাল রপ্তানির সর্বনিম্ন মূল্য ১ দশমিক ৬০ মার্কিন ডলার নির্ধারণ করা হয়েছে। সে হিসেবে বর্তমান ডলার রেট অনুযায়ী প্রতি কেজি সুগন্ধি চালের সর্বনিম্ন রপ্তানি মূল্য ১৯৭ টাকা। অথচ, এক মাস আগে যখন চাল রপ্তানির অনুমোদন মিলেছে তখন দেশে প্রতিকেজি চিনিগুঁড়া পোলাও চাল বিক্রি হতো ১৫০ থেকে ১৬০ টাকা কেজি দরে। সাম্প্রতিক সময়ে রপ্তানির চেয়ে স্থানীয় বাজারে দাম কম হওয়ায় এটি সমন্বয় হয়েছে।
তবে কনজ্যুমার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (ক্যাব) সহ-সভাপতি নাজের হোসাইন এদিনকে বলেন, ‘আমাদের দেশে বছরে ১০-১২ লাখ টন সুগন্ধি চাল উৎপাদন হয়। বার্ষিক অভ্যন্তরীণ চাহিদা মিটিয়েও যা থেকে কয়েক লাখ টন উদ্বৃত্ত থেকে যায়। ওই উদ্বৃত্ত অংশ থেকেই মাত্র কয়েক হাজার টন চাল বিভিন্ন দেশে রপ্তানির অনুমোদন দিয়েছে সরকার। এই যে রপ্তানি হবে এটিও বিভিন্ন দেশে থাকা প্রবাসী বাংলাদেশিরা কিনবেন। সেই অর্থে দেশের মানুষের স্বার্থেই রপ্তানি হবে।’
তিনি বলেন, রপ্তানির কারণে দাম বাড়ার যে গুঞ্জন উঠেছে, এটি সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন। ব্যবসায়ীরা এটিকে অজুহাত হিসেবে দেখিয়ে এই সুযোগে দাম বাড়িয়ে নিচ্ছেন। তাছাড়া, পরিবহন খরচ বৃদ্ধি ও জ্বালানি সংকটের যে অজুহাত দেওয়া হচ্ছে সেটিও অযৌক্তিক। যদি জ্বালানি ও পরিবহনের জন্য দাম বাড়ত, তাহলে অন্যান্য চলেরও দাম বাড়ার কথা। এটি সম্পূর্ণ একটি ‘কৃত্রিম সংকট’, যা ব্যবসায়ীরা তাদের সুবিধার জন্য তৈরি করছেন। ’এ ছাড়াও কতিপয় কর্পোরেট ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠান ও মিলারদের যোগসাজশেই সুগন্ধি চালের দাম বাড়িয়ে বাজার অস্থিতিশীল করার চেষ্টা চালাচ্ছে’ যোগ করেন নাজের হোসাইন।
রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) তথ্যমতে, ২০০৯-১০ অর্থবছরের দিকে বাংলাদেশ থেকে বিশ্ববাজারে সুগন্ধি চাল রপ্তানি শুরু হয়। প্রথমবার মাত্র ৬৬৩ টন রপ্তানি হলেও ২০১৯-২০ অর্থবছরে এ পরিমাণ ১০ হাজার ৮৭৯ টনে উন্নীত হয়। পরে ২০২০-২১ অর্থবছরে সাড়ে ৮ হাজার টন এবং ২০২১-২২ অর্থবছরে ৫ হাজার ১০০ টন সুগন্ধি চাল রপ্তানি হয়েছিল। এরপর ২০২২-২৩ ও ২০২৩-২৪ অর্থবছরে সরকার সুগন্ধি চাল রপ্তানির অনুমোদন স্থগিত রেখেছিল। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে দুই দফায় ২৩ হাজার ৯৫৯ টন সুগন্ধি চাল রপ্তানির অনুমতি মিলেছিল, যার মেয়াদ কয়েক দফায় বাড়িয়ে চলতি বছরের এপ্রিল পর্যন্ত নির্ধারণ করেছিল সরকার। এবার দুই দফায় রপ্তানির লক্ষ্য প্রায় দ্বিগুণ বাড়িয়ে ৪৫ হাজার ৩২০ টনে উন্নীত করা হয়েছে।
বাণিজ্য মন্ত্রণালয় সূত্র বলছে, ব্যবসায়ীদের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়, দেশের শীর্ষ ১০টি বড় মিলমালিকের কাছে বিপুল পরিমাণ সুগন্ধি চাল মজুত রয়েছে। বাজারে প্রয়োজন অনুযায়ী চাল না ছেড়ে কৃত্রিম সংকট তৈরি করার কারণেই মূল্যবৃদ্ধি হয়েছে বলে অভিযোগ তাদের।
সব পক্ষের বক্তব্য পর্যালোচনার পর বাজারে কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করে অতিরিক্ত মুনাফা করার প্রবণতা ঠেকাতে কঠোর তদারকির সিদ্ধান্ত নিয়েছে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়। জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর ও সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ী সংগঠনগুলোকে সঙ্গে নিয়ে বাজার তদারকি আরো জোরদার করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
তবে, বাংলাদেশ চাল রপ্তানিকারক সমিতির সভাপতি মোহাম্মদ ইশাকুল হোসেন জানান, গত এক মাসে মাত্র দুই হাজার টনের মতো পোলাও চাল রপ্তানি হয়েছে। কৃষকরা যেন ন্যায্যমূল্য পান, তা নিশ্চিত করতেই সরকার রপ্তানির অনুমোদন দিয়েছে। কিন্তু কিছু মিল মালিক চাল মজুত করে রেখেছে এবং দাম বাড়িয়ে পরিস্থিতির সুযোগ নেওয়ার চেষ্টায় রয়েছে।
তিনি আরো জানান, বাংলাদেশে কম করে হলেও বার্ষিক ১০ লাখ টন সুগন্ধি চাল উৎপাদিত হয়। যেখানে অভ্যন্তরীণ চাহিদা মাত্র চার লাখ টন। ফলে উদ্বৃত্ত থাকে প্রায় ছয় লাখ টন। এমন পরিস্থিতিতে উদ্বৃত্ত চালের একাংশ রপ্তানি হলে দেশীয় বাজারের সরবরাহে ঘাটতি তৈরি হওয়ার কথা নয়। বরং এই বাজার অস্থিরতা দেশের কৃষি রপ্তানি সম্ভাবনাকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









