নানান প্রতিকূলতায়ও ব্যাংকে মানুষের আমানত বাড়ছে ঠিকই, কিন্তু সেই আমানতের বিপরীতে তারা তেমন কোনো সুবিধাই পাচ্ছেন না। বরং তাদের গচ্ছিত টাকা ঋণ নিয়ে বছরের পর বছর খেলাপী হিসেবে দেখিয়ে দেশ-বিদেশে আয়েশী জীবন কাটাচ্ছেন কতিপয় ব্যাক্তি। তাই অর্থনীতির জটিল এই মারপ্যাচে পড়ে নাভিশ্বাস উঠছে সাধারণ মানুষের। ফলে কিছু টাকা জমাতে আমানতকারীর ঘাম, শ্রমের স্রোতে বারোটা বাজলেও বিপরীতে পোয়াবারো হচ্ছে খেলাপীদের।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ব্যাংকে মানুষের আমানত বাড়ছে, কিন্তু সেই অর্থের বিপরীতে ঋণপ্রবাহ বাড়ছে ধীরগতিতে। একই সময়ে পুরোনো ঋণের বড় অংশ খেলাপি হয়ে ব্যাংকগুলোর আর্থিক সক্ষমতার ওপর চাপ তৈরি করছে। ফলে বাংলাদেশের ব্যাংক খাতে এখন এক অস্বাভাবিক চিত্র-একদিকে আমানত বাড়ছে, অন্যদিকে ঋণখেলাপির বোঝা ক্রমেই ভারী হচ্ছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরের জুন মাস শেষে ব্যাংক খাতে আমানত আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে। এ বছর মে মাস শেষে ব্যাংকিং ব্যবস্থায় আমানত ছিল ২০ লাখ ৪১ হাজার ৬৯২ কোটি ৭০ লাখ টাকা, যা এক বছর আগের তুলনায় ১১ দশমিক ৪১ শতাংশ বেশি। আমানত বৃদ্ধির প্রধান কারণ ছিল মেয়াদি আমানত বৃদ্ধি। তার আগের বছর জুলাই থেকে চলতি বছরের মে মাস পর্যন্ত সময়ে ব্যাংক আমানত বেড়েছে ১ লাখ ৬৩ হাজার ৫২৩ কোটি টাকা।
অর্থাৎ ব্যাংকের প্রতি মানুষের আস্থা পুরোপুরি ভেঙে পড়েনি। বরং ব্যাংকে অর্থ রাখার প্রবণতা বেড়েছে। কিন্তু সমস্যাটি অন্য জায়গায়—এই আমানতের অর্থ উৎপাদনশীল বিনিয়োগে কতটা যাচ্ছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের জুন ২০২৬-এর মুদ্রা ও ঋণসংক্রান্ত তথ্য বলছে, জুন শেষে ডিপোজিট মানি ব্যাংকগুলোর বেসরকারি খাতে ঋণ ছিল ১৮ লাখ ১৭ হাজার ৮৭৩ কোটি টাকা। এক বছরের ব্যবধানে এ খাতে প্রবৃদ্ধি হয়েছে মাত্র ৪ দশমিক ৫৩ শতাংশ।
অর্থাৎ ব্যাংকে আমানত বাড়লেও বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ তুলনামূলকভাবে স্থবির। বিনিয়োগ ও ব্যবসা সম্প্রসারণে ঋণের চাহিদা কমে যাওয়ার পেছনে উচ্চ সুদহার, মূল্যস্ফীতি, ব্যবসায়িক অনিশ্চয়তা এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক দুর্বলতা বড় কারণ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
সবচেয়ে বড় উদ্বেগের জায়গা খেলাপি ঋণ। চলতি বছরের জুনে ব্যাংক খাতের খেলাপি ঋণ ৬ লাখ কোটি টাকার সীমা অতিক্রম করেছে। মার্চ শেষে খেলাপি ঋণ ছিল ৫ লাখ ৮৮ হাজার ৭০৪ কোটি টাকা। তিন মাসে তা বেড়েছে ১৭ হাজার ৮৫১ কোটি টাকা। ফলে খেলাপি ঋণের অনুপাতও ব্যাংকিং খাতের জন্য অত্যন্ত উদ্বেগজনক পর্যায়ে রয়েছে।
গত কয়েক বছরে খেলাপি ঋণের এই বিস্ফোরণের পেছনে শুধু অর্থনৈতিক মন্দা নয়, বরং দীর্ঘদিনের দুর্বল ঋণ ব্যবস্থাপনা, রাজনৈতিক প্রভাব, পর্যাপ্ত যাচাই ছাড়াই ঋণ অনুমোদন এবং ঋণ আদায়ে দুর্বলতাকে দায়ী করা হচ্ছে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বড় খেলাপীদের জন্য বড় সুবিধা দিতেই যেন কাজ করছে দেশের আর্থিক খাতগুলো। অর্থ্যাৎ যত বড় খেলাপি তত বড় ছাড়। এ সুবিধা কাজে লাগিয়ে বারবার ব্যাংক থেকে ঋণ নেন প্রভাবশালীরা। সামান্য টাকা পরিশোধেই হয়ে যান খেলাপিমুক্ত। আবার আগের চেয়ে বেশি ঋণ নেন। ফের খেলাপির তালিকায় নাম লেখান। হয়ে যান বড় খেলাপি। এমন অব্যবস্থাপনায় লাগামহীন হয়ে পড়েছে ঋণ আদায়। নানা পদক্ষেপের পরও আসছে না কোনো কার্যকর ফল।
এমন পরিস্থিতিতে গত সোমবার বাংলাদেশ ব্যাংক ১ হাজার কোটি টাকার বেশি খেলাপিদের কিস্তি পরিশোধে যে ছাড় দিয়েছে, তাতে তলানিতে নামবে ঋণ আদায়— এমনটি মনে করছেন অর্থনীতিবিদ, ব্যাংকার এবং নীতি বিশ্লেষকরা। তাদের মতে, খেলাপি ঋণ বড় হলে বড় ছাড় পাওয়া যায়- এ ধারণা থেকে অনেক ভালো গ্রাহক এখন বাংলাদেশ ব্যাংকের নীতিগত সহায়তা পেতে স্বেচ্ছায় বড় খেলাপি হতে চাইবেন।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, শুধু যে বর্তমান সরকারই খোলাপীদের সুবিধা দিচ্ছেন তা নয়। এর আগে অন্তর্বর্তী ও আওয়ামী লীগ সরকারও একইভাবে খেলাপিদের সুবিধা দিতে অন্তত অর্ধশত সার্কুলার ও বিশেষ আদেশ দিয়েছিল। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো, খেলাপি কমাতে নামমাত্র ১ কিংবা ২ শতাংশ এককালীন পরিশোধে পুনঃতফসিলের সুযোগ। এতে ঋণ নিয়মিত হচ্ছে; কিন্তু আদায় বাড়ছে না।
সবশেষে ব্যাংক খাতে অনাদায়ী ঝুঁকিপূর্ণ ঋণ দাঁড়িয়েছে ১০ লাখ ৮৭ হাজার কোটি টাকা, যা মোট ঋণের প্রায় ৫৯ শতাংশ। অথচ গত মার্চ পর্যন্ত ঘোষিত খেলাপি ৫ লাখ ৫৭ হাজার কোটি টাকা। বাকি প্রায় সোয়া ৬ লাখ কোটি টাকার ঋণ বাংলাদেশ ব্যাংকের সার্কুলারের অজুহাতে খেলাপির খাতার বাইরে রয়েছে। উল্লেখ্য, ২০২২ সালে ঋণ পুনঃতফসিলে এককালীন পরিশোধ ছিল ১০-১৫ শতাংশ।
অন্তর্বর্তী সরকারের অর্থ উপদেষ্টা ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ বলেছেন, বাংলাদেশে বড় ঋণ আদায় হচ্ছে না, এটা একটা সংস্কৃতির মতো রূপ ধারণ করেছে। কারণ ঋণ আদায় হচ্ছে না তা নিয়ে যা হচ্ছে, তা বাস্তব ব্যাংকিং না। আর ১ হাজার কোটি টাকার বেশি ঋণখেলাপিদের ছাড় দিলে তারা নতুন ঋণ পাবেন। খেলাপি কমবে। কিন্তু আদায় তো তেমন হবে না।
এভাবে বড় খেলাপিরা ছাড় পেলে আদায় তলানিতে নেমে যাবে। এরকম যত সুবিধা দেওয়া হোক না কেন, ভালো কাজ করে না। সুফল মেলে না। এতে ভালো ঋণগ্রহীতারা ইচ্ছা করে বড় খেলাপি হয়ে যাবেন। তখন কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নীতিমালা মেনে তারা খেলাপি হবেন না। আদায়ও হবে না। এমন উৎসাহ ব্যাপকভাবে ছড়ালে খেলাপি কোথায় গিয়ে ঠেকবে? এর জন্য দায়ী কে, কেন, কার স্বার্থে- তা বুঝে নিতে হবে।
এদিকে গত বুধবার প্রকাশিত কেন্দ্রীয় ব্যাংক খেলাপিঋণের হালনাগাদ চিত্রে দেখা গেছে, জুন শেষে শ্রেণিকৃত ঋণ দেশের ব্যাংক খাতের মোট ঋণের প্রায় এক-তৃতীয়াংশে পৌঁছেছে। এর মধ্যে একীভূত হওয়া পাঁচ ব্যাংকে খেলাপিঋণ ৮০ শতাংশেরও বেশি, যা এখন সম্মিলিত ইসলামী ব্যাংক হিসেবে পরিচালিত হচ্ছে।
গত জুন মাস শেষে দেশের ব্যাংক খাতে খেলাপিঋণ বেড়ে ছয় লাখ ৬ হাজার ৫৫৫ কোটি টাকায় দাঁড়িয়েছে। তিন মাসের ব্যবধানে খেলাপিঋণ বেড়েছে ১৭ হাজার ৮৫১ কোটি টাকা। একই সময়ে মোট ঋণের মধ্যে শ্রেণিকৃত ঋণের হারও ০.৫২ শতাংশ বেড়ে ৩.৭৮ শতাংশে উঠেছে। ফলে ব্যাংকখাতের ঋণমান ও আর্থিক স্থিতিশীলতা নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুসারে, গত বছরের জুন মাসে খেলাপিঋণ ছিল পাঁচ লাখ ৩০ হাজার ৪২৮ কোটি টাকা। সে হিসেবে এক বছরে খেলাপিঋণ বেড়েছে ৭৬ হাজার ১২৭ কোটি টাকা বা ১৪ দশমিক ৩৫ শতাংশ। অন্যদিকে, চলতি বছরের মার্চ শেষে দেশের ব্যাংক খাতে খেলাপিঋণ ছিল পাঁচ লাখ ৮৮ হাজার ৭০৪ কোটি টাকা। জুন শেষে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ছয় লাখ ৬ হাজার ২৮৪ কোটি টাকা, যা মোট বিতরণ করা ঋণের ৩২ দশমিক ৭৮ শতাংশ।
তবে খেলাপি ঋণের সমস্যা সব ব্যাংকে সমান নয়। বরং কয়েকটি ব্যাংকে এর বড় অংশ কেন্দ্রীভূত হয়েছে। চলতি বছরের মার্চ মাসের তথ্য বলছে, দেশের ৬১টি ব্যাংকের মধ্যে মাত্র ১৫টি ব্যাংকের হাতে মোট খেলাপি ঋণের ৮৫ শতাংশের বেশি ছিল। এতে বোঝা যায়, পুরো ব্যাংক খাতের সংকটের একটি বড় অংশ নির্দিষ্ট কিছু ব্যাংকের ওপর কেন্দ্রীভূত। বিশেষ করে কয়েকটি রাষ্ট্রায়ত্ত ও বড় বেসরকারি ব্যাংকের ঋণমান ও মূলধন পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে।
রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর মধ্যে জনতা ব্যাংকের পরিস্থিতি সবচেয়ে নাজুকগুলোর একটি। বিভিন্ন প্রতিবেদনে দেখা গেছে, ব্যাংকটির মোট ঋণের বড় অংশই খেলাপি। রাষ্ট্রায়ত্ত অন্য কয়েকটি ব্যাংকও উচ্চ খেলাপি ঋণ ও মূলধন ঘাটতির চাপে রয়েছে।
অন্যদিকে ইসলামী ব্যাংকের গত বছরের নিরীক্ষিত হিসাবে শ্রেণিকৃত ঋণ ৯৪ হাজার ৩২২ কোটি টাকায় পৌঁছেছিল, যা ব্যাংকটির মোট ঋণ পোর্টফোলিওর প্রায় ৫১ শতাংশ।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য বলছে, দেশে অনাদায়ী ঋণ ১০ লাখ ৮৭ হাজার কোটি টাকা। তার মধ্যে খেলাপি ঋণ ৫ লাখ ৫৭ হাজার কোটি টাকা। আর পুনঃতফসিলকৃত ঋণ ৪ লাখ ৪৭ হাজার কোটি টাকা। অবলোপনকৃত ঋণ ৮৩ হাজার ৪৭৯ কোটি টাকা। আদালতে আটকা প্রায় ১ লাখ ৭৮ হাজার কোটি টাকা।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের মার্চের শেষে মোট শ্রেণিকৃত ঋণের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৫ লাখ ৮৮ হাজার ৭০৪ কোটি টাকায়। গত ডিসেম্বরে এর পরিমাণ ছিল ৫ লাখ ৫৭ হাজার ২১৭ কোটি টাকা। সব মিলিয়ে মার্চ পর্যন্ত ব্যাংকগুলোর মোট বিতরণ করা ঋণের পরিমাণ ১৮ লাখ ২৪ হাজার ৬৬৮ কোটি টাকা।
জানতে চাইলে বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র ও নির্বাহী পরিচালক আরিফ হোসেন খান বলেন, মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে বিশ্বের অন্যান্য দেশের মতো বাংলাদেশের রপ্তানির ক্ষেত্রে সাময়িক সময়ের জন্য নেতিবাচক প্রভাব দেখা যাচ্ছে। বিশেষ করে জ্বালানি সংকটের কারণে দেশের রপ্তানিমুখী শিল্পপ্রতিষ্ঠানের উৎপাদন সাময়িকভাবে ব্যাহত হচ্ছে, যা গ্রাহকের ঋণ পরিশোধ সক্ষমতার ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে।
অন্যদিকে বাজারভিত্তিক সুদহার ব্যবস্থা প্রবর্তনের ফলে ঋণগ্রহীতা ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের সুদব্যয় উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়লেও ব্যবসায়িক মন্দার কারণে ঋণগ্রহীতাদের ঋণ পরিশোধের সক্ষমতাও কমেছে। আবার জ্বালানির কারণে পরিবহন খরচ বেড়েছে।
এসব বিবেচনায় ব্যবসা চালাতে যাদের বেশি ঋণ দরকার, তাদের জন্য সুযোগ করে দেওয়া হয়েছে। ১ হাজার কোটি টাকার বেশি খেলাপিদের ছাড় উসকে দেবে, তা আমলে নেয়নি কেন্দ্রীয় ব্যাংক। নতুন করে ইচ্ছা করে কেউ খেলাপি হলে তাকে তো সুদ দিতে হবে। সেই হিসাব করে ইচ্ছা করে খেলাপির ঘটনা ঘটবে না- এমনটি মনে করছেন বাংলাদেশ ব্যাংকের এই মুখপাত্র।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









