শালীনতা এমন একটি গুণ, যা মানুষকে গোপনেও আল্লাহকে ভয় করতে শেখায় এবং প্রকাশ্যেও মর্যাদা ও সংযমের সঙ্গে চলতে সাহায্য করে। তাই একজন মুমিনের জীবনে শালীনতা কোনো সাময়িক অভ্যাস নয়; বরং এটি ঈমানের সৌন্দর্য ও চরিত্রের পরিচয়।
জীবনে শালীনতার চর্চা করবেন যেভাবে
আল্লাহর সর্বক্ষণিক নজরদারির কথা স্মরণ করা
শালীনতার সবচেয়ে শক্তিশালী ভিত্তি হলো—আল্লাহ আমাকে সব সময় দেখছেন—এই বিশ্বাস অন্তরে দৃঢ় করা। মানুষ যখন একাকী থাকে, তখনো আল্লাহর দৃষ্টি থেকে সে আড়াল হতে পারে না। আল্লাহ বলেন, ‘তোমরা যা প্রকাশ করো এবং যা গোপন করো, আল্লাহ তা জানেন।’ (সুরা : আলে ইমরান, আয়াত : ২৯) এই অনুভূতিই একজন মানুষকে প্রকাশ্য এবং গোপন সব ধরনের অশ্লীলতা, হারাম দৃষ্টি ও অন্যায় কাজ থেকে বিরত রাখতে যথেষ্ট।
চোখকে হারাম দৃষ্টি থেকে হেফাজত করা
শালীনতার একটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ হলো চোখের হিফাজত। কারণ অনেক পাপের সূচনা হয় একটি মাত্র দৃষ্টি থেকে। তাই আল্লাহ মুমিন পুরুষদের উদ্দেশে বলেন, ‘মুমিনদের বলুন, তারা যেন তাদের দৃষ্টি সংযত করে এবং নিজেদের লজ্জাস্থান হেফাজত করে। এটাই তাদের জন্য অধিক পবিত্র। (সুরা : নুর, আয়াত : ৩০)
পরের আয়াতে মুমিন নারীদেরও দৃষ্টি সংযত রাখা ও শালীনতা রক্ষার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। তাই রাস্তাঘাটে, কর্মস্থলে, বিনোদনের ক্ষেত্রে কিংবা মোবাইলের পর্দায়—যেখানে হারাম দৃশ্য সামনে আসে, সেখানে দৃষ্টি ফিরিয়ে নেওয়ার অভ্যাস করতে হবে।
কথাবার্তায় অশ্লীলতা ও কটু ভাষা পরিহার করা
শালীনতা শুধু নীরবতা বা পোশাকের বিষয় নয়; মুখের ভাষাও চরিত্রের আয়না। অশ্লীল রসিকতা, গালাগালি, কটু কথা, অপমানজনক মন্তব্য কিংবা অন্যকে হেয় করে কথা বলা একজন মুমিনের সৌন্দর্য নষ্ট করে। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি আল্লাহ ও শেষ দিনের প্রতি ঈমান রাখে, সে যেন ভালো কথা বলে অথবা নীরব থাকে। (সহিহ বুখারি, হাদিস : ৬০১৮)। তাই কথা বলার আগে নিজেকে প্রশ্ন করা উচিত—আমার এই কথাটি কি সত্য, প্রয়োজনীয় ও শালীন? উত্তর নেতিবাচক হলে নীরব থাকাই উত্তম।
পোশাকে ইসলামী শালীনতা ও মর্যাদা বজায় রাখা
পোশাক মানুষের ব্যক্তিত্বের প্রকাশ। ইসলাম এমন পোশাকের শিক্ষা দেয়, যা শরিয়তের নির্দেশনা মেনে শরীরকে আবৃত করে এবং ব্যক্তির মর্যাদা রক্ষা করে। আল্লাহ মুমিন নারী-পুরুষ উভয়কেই দৃষ্টি ও পবিত্রতা রক্ষার নির্দেশ দিয়েছেন; নারীদের জন্য বিশেষভাবে শালীন পোশাক ও সৌন্দর্য প্রদর্শনে সংযমের নির্দেশ এসেছে। (সুরা : নুর, আয়াত : ৩০-৩১)
তাই পোশাকের ক্ষেত্রে শুধু ‘কী পরলাম’ নয়, বরং কেন পরলাম, কোথায় পরলাম এবং এতে ইসলামী শালীনতা বজায় থাকছে কি না—এসব বিষয়ও বিবেচনা করা জরুরি।
সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ব্যবহারে সংযমী হওয়া
বর্তমান সময়ে শালীনতা রক্ষার একটি বড় প্রতিবন্ধক হলো সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম। একটি মোবাইলের পর্দাই কখনো চোখের জন্য ফিতনার দরজা, আবার কখনো গুনাহ ছড়িয়ে দেওয়ার মাধ্যম হয়ে উঠতে পারে।
তাই অশ্লীল ছবি ও ভিডিও থেকে দূরে থাকতে হবে। অশালীন পেজ ও অ্যাকাউন্ট আনফলো করতে হবে। অশ্লীল মন্তব্য, রসিকতা ও পোস্ট করা থেকে বিরত থাকতে হবে। নিজের ছবি, ব্যক্তিগত বিষয় বা সৌন্দর্য প্রদর্শনের ক্ষেত্রেও শরিয়তের সীমা বিবেচনা করতে হবে। এবং অন্যের গোপনিয়তা ও সম্মান রক্ষা করে চলতে হবে। অনলাইনে করা কাজও আমলনামার বাইরে নয়। আল্লাহ বলেন, ‘মানুষের প্রতিটি কথা লিপিবদ্ধ হয়।’ (সুরা : কাফ, আয়াত : ১৮)
নেককার ও শালীন মানুষের সঙ্গ গ্রহণ করা
মানুষ তার পরিবেশ ও সঙ্গীদের দ্বারা গভীরভাবে প্রভাবিত হয়। তাই শালীন জীবনযাপনের জন্য নেককার ও আল্লাহভীরু মানুষের সঙ্গ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। রাসুলুল্লাহ (সা.) উত্তম ও মন্দ সঙ্গীর উদাহরণ দিয়েছেন আতর বিক্রেতা ও কামারের হাপরের সঙ্গে। ভালো সঙ্গীর কাছ থেকে উপকার ও সুগন্ধ পাওয়া যায়, আর খারাপ সঙ্গীর কারণে ক্ষতি ও দুর্গন্ধের প্রভাব পড়তে পারে।’ (সহিহ মুসলিম, হাদিস : ২৬২৮)। তাই এমন বন্ধু বেছে নিতে হবে, যাদের সঙ্গে থাকলে নামাজ, পর্দা, পবিত্রতা, ভালো চরিত্র ও আল্লাহর স্মরণ বাড়ে—গুনাহ নয়।
অশ্লীল বিনোদন ও পরিবেশ থেকে নিজেকে দূরে রাখা
যে পরিবেশে অশ্লীলতা স্বাভাবিক হয়ে যায়, সেখানে দীর্ঘদিন থাকলে অন্তর ধীরে ধীরে গুনাহকে স্বাভাবিক মনে করতে শুরু করে। তাই অশ্লীল সিনেমা, ভিডিও, গান, কনটেন্ট, অনুষ্ঠান কিংবা এমন পরিবেশ থেকে নিজেকে দূরে রাখতে হবে, যা ঈমান ও চরিত্রকে দুর্বল করে। আল্লাহ বলেন, ‘তোমরা পাপ ও সীমালঙ্ঘনের কাজে একে অপরকে সহযোগিতা করো না।’ (সুরা : মায়িদা, আয়াত : ২)। শুধু নিজে অশ্লীলতা থেকে বেঁচে থাকাই যথেষ্ট নয়; বরং এমন কনটেন্ট তৈরি, প্রচার বা ছড়িয়ে দেওয়ার কাজ থেকেও বিরত থাকা উচিত।
প্রতিদিন নিজের কাজের হিসাব নেওয়া
শালীন জীবন গড়ে ওঠে আত্মসমালোচনার মাধ্যমে। প্রতিদিন রাতে কয়েক মিনিট নিজেকে প্রশ্ন করা যেতে পারে। আল্লাহ বলেন, ‘হে মুমিনগণ! তোমরা আল্লাহকে ভয় করো এবং প্রত্যেক ব্যক্তি যেন দেখে, সে আগামীকালের জন্য কী পাঠিয়েছে।’ (সুরা : হাশর, আয়াত : ১৮)। এই আত্মজিজ্ঞাসা মানুষকে নিজের ভুল শনাক্ত করে তাওবা ও সংশোধনের সুযোগ করে দেয়।
হালাল-হারাম মেনে চলা
রিজিক, খাদ্য, উপার্জন ও জীবনযাপনের ক্ষেত্রেও শালীনতা ও ভারসাম্য থাকা জরুরি। হারাম উপার্জন করে বাহ্যিকভাবে যতই ভদ্রতা প্রদর্শন করা হোক, তা প্রকৃত পবিত্রতা নয়। আল্লাহ বলেন, ‘আল্লাহ তোমাদের যে হালাল ও পবিত্র রিজিক দিয়েছেন, তা থেকে তোমরা আহার করো এবং আল্লাহকে ভয় করো।’ (সুরা : মায়িদা, আয়াত : ৮৮)
তাই উপার্জনে সততা, ব্যবসায় আমানতদারি, লেনদেনে স্বচ্ছতা এবং খাদ্য-পানীয় ও জীবনযাপনে হালাল-হারামের সীমা মেনে চলতে হবে।
আল্লাহর কাছে উত্তম চরিত্রের জন্য দোয়া করা
চরিত্রের সৌন্দর্য আল্লাহর বড় নিয়ামত। তাই নিজের প্রচেষ্টার পাশাপাশি আল্লাহর কাছে সুন্দর চরিত্রের জন্য দোয়া করতে হবে। রাসুলুল্লাহ (সা.) নিজেও সুন্দর চরিত্রের জন্য দোয়া করতেন। দোয়াটি হলো
অর্থ : ‘হে আল্লাহ! আমাকে সর্বোত্তম চরিত্রের দিকে পরিচালিত করুন। আপনি ছাড়া কেউ উত্তম চরিত্রের দিকে পরিচালিত করতে পারে না। আর আমার থেকে মন্দ চরিত্র দূরে রাখুন। আপনি ছাড়া কেউ তা দূর করতে পারে না।’
রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর জীবন ছিল শালীনতার সর্বোত্তম আদর্শ। আবু সাঈদ খুদরি (রা.) বলেন, ‘রাসুলুল্লাহ (সা.) পর্দানশীন কুমারী নারীর চেয়েও অধিক লজ্জাশীল ছিলেন।’ (সহিহ মুসলিম, হাদিস : ২৩২০)
অতএব, আজ থেকেই শুরু হোক শালীনতা চর্চার মহা উৎসব—চোখে শালীনতা, কথায় শালীনতা, পোশাকে শালীনতা, আচরণে শালীনতা, অনলাইনে শালীনতা এবং সর্বোপরি অন্তরে আল্লাহভীতি সদা জাগ্রত রাখতে হবে। আল্লাহ তাআলা আমাদের সবাইকে আমল করার তাওফিক দান করুক। আমিন।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









