মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার দীর্ঘদিন বন্ধ থাকার পর বাংলাদেশি কর্মীদের জন্য পুনরায় সম্ভাবনা তৈরি হলেও এজেন্সি বাছাই প্রক্রিয়া ঘিরে নতুন করে বিতর্ক দেখা দিয়েছে। মালয়েশিয়ায় কর্মী পাঠানোর জন্য দেশটির নির্ধারিত শর্ত পূরণ না করা কয়েকটি বাংলাদেশি রিক্রুটিং এজেন্সিও তালিকায় স্থান পেয়েছে। একই সঙ্গে অল্পসংখ্যক কর্মী বিদেশে পাঠানোর অভিজ্ঞতা থাকা প্রতিষ্ঠানও কাজ পাওয়ায় পুরো প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
সম্প্রতি বাংলাদেশ থেকে মালয়েশিয়ায় কর্মী নিয়োগের জন্য ২৫ এজেন্সির তালিকা প্রকাশ করেছে দেশটির বিদেশি কর্মী নিয়োগ প্ল্যাটফর্ম এফডব্লিউসিএমএস। গত ২১ আগস্ট এসব এজেন্সির নাম ঘোষণা করা হয়। যদিও কাজ পাওয়ার যোগ্য রিক্রুটিং এজেন্সি বাছাইয়ের ক্ষেত্রে ১০টি শর্ত দেয় কুয়ালালামপুর। তার একটি হলো- ‘মানব পাচার বা অপরাধে জড়িত থাকার অভিযোগ বা আইনি রেকর্ড থাকা যাবে না।’ কিন্তু তারা বাংলাদেশের যে এজেন্সিগুলোকে কর্মী পাঠানোর কাজ দিয়েছে, তার অন্তত চারটির বিরুদ্ধে ‘বিদেশে নারী পাচারের মাধ্যমে অবৈধ অর্থ উপার্জনের’ মামলা রয়েছে। শুধু তা-ই নয়, দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) এর তদন্ত করছে।
জানা যায়, দেশে দুই হাজারের বেশি বৈধ রিক্রুটিং এজেন্সি বিশ্বের বিভিন্ন দেশে কর্মী পাঠায়। এর মধ্যে ২০১৬ সালে ১০টি এজেন্সিকে কর্মী পাঠানোর কাজ দিয়েছিল মালয়েশিয়া। ২০২২ সালে সেটা বেড়ে ২৫টি হয়, যা ‘সিন্ডিকেট’নামে পরিচিতি পায়। এসব এজেন্সির মালিক ছিলেন তৎকালীন আওয়ামী লীগ নেতা ও এমপি-মন্ত্রীরা। তাদের বিরুদ্ধে কর্মী পাঠানোর ক্ষেত্রে ব্যাপক দুর্নীতির অভিযোগ ওঠে। ৭৯ হাজার টাকায় কর্মী পাঠানোর কথা থাকলেও তা ৫ লাখ ছাড়িয়ে যায়। এর জেরে ২০২৪ সালের ৩১ মে বাংলাদেশের জন্য শ্রমবাজার বন্ধ করে দেয় দেশটি, যা এখনও বন্ধ রয়েছে।
ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের রাষ্ট্রক্ষমতায় এসে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এবং প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রী ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ মালয়েশিয়ায় কর্মী নিয়োগের জন্য বিভিন্ন উদ্যোগ নেয়। এরই অংশ হিসেবে মালয়েশিয়ার ১০ শর্তের ছয়টি পূরণ করা ৪২৩ এজেন্সির তালিকা দেয় বাংলাদেশ। এর মধ্যে ২৫ এজেন্সিকে বাছাই করে তালিকা প্রকাশ করে মালয়েশিয়া। পরে ‘সহযোগী এজেন্সি’ হিসেবে আরও ৩৩৮ প্রতিষ্ঠানের নামের তালিকা প্রকাশ করে কুয়ালালামপুর।
এদিকে এজেন্সিগুলোকে কোন মানদণ্ডে বাছাই করা হয়েছে, তা জানায়নি মালয়েশিয়া। দেশটির দেওয়া শর্তের মধ্যে একটি ছিলো- পাঁচ বছরে অন্তত তিন দেশে তিন হাজার কর্মী পাঠানোর অভিজ্ঞতা থাকতে হবে। তবে তালিকায় এমন অনেক প্রতিষ্ঠান রয়েছে যাদের কর্মী পাঠানোর সংখ্যা, অভিজ্ঞতা এবং অন্যান্য মানদণ্ডে বাদ পড়া এজেন্সির চেয়েও কম। এমন অনেক এজেন্সি রয়েছে যারা নিবন্ধন পাওয়ার পর ২৩৫ জন কর্মী পাঠিয়েছে। সাকুল্যে ৩৬০ কর্মী পাঠানো এজেন্সিও তালিকায় জায়গা পেয়েছে। এছাড়া মানব পাচারের অভিযোগের শর্ত পূরণ না করা চার এজেন্সিকেও তালিকায় রেখেছে মালয়েশিয়া। এগুলো হলো রিফা ইন্টারন্যাশনাল, জেনারেল ট্রেডিং, গডনেস সার্ভিস লিমিটেড ও ভেলি ট্রেড ইন্টারন্যাশনাল।
গত বছরের ৩ জুলাই নারী কর্মীদের চাকরির নামে বিদেশে পাচার করে অবৈধভাবে অর্থ উপার্জনের অভিযোগে মামলা করা হয়। জেলা সমন্বিত কার্যালয় মামলা করা এই মামলায় ৫৭ এজেন্সির তথ্য চেয়ে দুদকের সহকারী পরিচালক এবং তদন্ত কর্মকর্তা গত ২৩ জুলাই চিঠি দেন বিএমইটি মহাপরিচালককে। এ তালিকায় মালয়েশিয়ায় কর্মী পাঠানোর কাজ পাওয়া ওই চার এজেন্সির নাম রয়েছে।
সরকারি দপ্তর এবং জনশক্তি ব্যবসায়ীদের সূত্রগুলো বলছে, এবারও ক্ষমতাধরদের পছন্দের এজেন্সি তালিকায় জায়গা পেয়েছে। এর সংখ্যা অন্তত ১৪টি। এছাড়া ৭টি এজেন্সি ২০২২ সালের ‘সিন্ডিকেটের’ বাংলাদেশ অংশের নিয়ন্ত্রক রুহুল আমিন স্বপনের আশীর্বাদপুষ্ট। আর গতবারের সিন্ডিকেটে ছিল এমন চারটি এজেন্সি ভিন্ন নামে এবারও রয়েছে। যুবদলের এক নেতার স্ত্রীর মালিকানাধীন এজেন্সির নাম তালিকায় জায়গা পেয়েছে। এক প্রতিমন্ত্রীর তিনটি এজেন্সিও তালিকায় রয়েছে। এছাড়া একজন উপদেষ্টার আত্মীয় বেনামে রয়েছেন এবারের সিন্ডিকেটে। গতবার ২৫ এজেন্সির সিন্ডিকেটে ছিল আওয়ামী লীগ নেতা আবদুল হাইয়ের প্রতিষ্ঠান গ্রিনল্যান্ড। এবার রয়েছে তার স্ত্রী লায়লা আরজুমান বানুর প্রতিষ্ঠান।
প্রবাসী কল্যাণমন্ত্রী আরিফুল হক চৌধুরী জানান, এজেন্সি বাছাইয়ের একক ক্ষমতা মালয়েশিয়ার। অভিজ্ঞ বা অনিভজ্ঞ যারাই কাজ পেয়েছে, তাদের মালয়েশিয়া ঠিক করে দিয়েছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, পুরোনো পদ্ধতি অনুসরণ করায় আবারও সিন্ডিকেটের দৌরাত্ম্য ও দুর্নীতির আশঙ্কা রয়েছে।
জানা গেছে, বাংলাদেশে বৈধ রিক্রুটিং এজেন্সির সংখ্যা দুই হাজারের বেশি। এর মধ্যে মালয়েশিয়ার দেওয়া শর্তের ছয়টি পূরণকারী ৪২৩টি প্রতিষ্ঠানের তথ্য বাংলাদেশ সরকার দেশটিকে দেয়। পরে ২০২১ সালের সমঝোতা স্মারকের আওতায় মালয়েশিয়া গত ২১ আগস্ট ২৫টি এজেন্সি নির্বাচন করে। এরপর আরও ৩১২টি প্রতিষ্ঠানকে ‘সহযোগী এজেন্সি’ হিসেবে যুক্ত করা হয়। ফলে কর্মী পাঠানোর ক্ষেত্রে আগের মতো সীমিতসংখ্যক প্রতিষ্ঠানের নিয়ন্ত্রণ ফিরে আসছে কি না, তা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে। কারণ ২০২২ সালেও মাত্র ২৫টি এজেন্সিকে কর্মী পাঠানোর সুযোগ দেওয়া হয়েছিল। তখন এসব প্রতিষ্ঠানের অনেকগুলোর মালিকানা বা সংশ্লিষ্টতার সঙ্গে তৎকালীন এমপি, মন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ নেতাদের নাম উঠে আসে। কর্মীপ্রতি নির্ধারিত ব্যয় ৭৯ হাজার টাকা হলেও বাস্তবে অনেক কর্মীর পাঁচ লাখ টাকারও বেশি ব্যয় হয়েছিল বলে অভিযোগ ওঠে।
মালয়েশিয়ার প্রাথমিক ১০ শর্তের মধ্যে ছিল—রিক্রুটিং এজেন্সির লাইসেন্স কমপক্ষে পাঁচ বছর পুরোনো হতে হবে এবং আগের পাঁচ বছরে অন্তত তিনটি দেশে তিন হাজার কর্মী পাঠানোর অভিজ্ঞতা থাকতে হবে। এ ছাড়া ১০ হাজার বর্গফুটের স্থায়ী অফিস এবং নিজস্ব প্রশিক্ষণকেন্দ্র থাকার শর্তও ছিল। পরবর্তীতে বাংলাদেশের অনুরোধে কয়েকটি শর্ত শিথিল করা হলেও মানব পাচারসংক্রান্ত অভিযোগ বা আইনি রেকর্ড না থাকার শর্ত বহাল ছিল। কিন্তু তালিকায় এমন চারটি প্রতিষ্ঠান রয়েছে, যাদের বিরুদ্ধে দুদকের তদন্তাধীন মামলা রয়েছে। প্রতিষ্ঠানগুলো হলো—রিফা ইন্টারন্যাশনাল, জেনারেল ট্রেডিং, গডনেস সার্ভিস লিমিটেড এবং ভেলি ট্রেড ইন্টারন্যাশনাল। এতে প্রশ্ন উঠেছে—মানব পাচারের অভিযোগ বা আইনি রেকর্ড না থাকার শর্ত যদি বহালই থাকে, তাহলে তদন্তাধীন এসব প্রতিষ্ঠান কীভাবে মালয়েশিয়ার কর্মী পাঠানোর তালিকায় জায়গা পেল?
শুধু মামলাধীন এজেন্সি নয়, কর্মী পাঠানোর অভিজ্ঞতার দিক থেকেও কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের অবস্থান প্রশ্ন তুলেছে। তথ্য অনুযায়ী, সাতক্ষীরা ইন্টারন্যাশনাল গত তিন বছরে মাত্র ১১১ জন কর্মী বিদেশে পাঠিয়েছে। ভালুকা ওভারসিস পাঠিয়েছে ২৩৫ জন, বাংলাদেশ ওয়ান সার্ভিস ২৭০ জন, আল-হায়াত ওভারসিজ ৩০১ জন, অ্যাঙ্কর কেয়ার গ্লোবাল ৩৬০ জন, কান্ট্রি এমপ্লয়মেন্ট ওভারসিজ ৪৬৬ জন এবং এ-প্লাস ইন্টারন্যাশনাল ৮০১ জন কর্মী পাঠিয়েছে। এর মধ্যে অ্যাঙ্কর কেয়ার গ্লোবালের মোট কর্মী পাঠানোর সংখ্যাই ৩৬০ জন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। অথচ প্রাথমিক শর্তের মধ্যে ছিল নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে একাধিক দেশে উল্লেখযোগ্যসংখ্যক কর্মী পাঠানোর অভিজ্ঞতা। ফলে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উঠছে—অভিজ্ঞতার মানদণ্ডে পিছিয়ে থাকা প্রতিষ্ঠানগুলোকে কোন বিবেচনায় তালিকায় রাখা হয়েছে?
২০২২ সালের মালয়েশিয়া শ্রমবাজারেও অনভিজ্ঞ কয়েকটি প্রতিষ্ঠানকে সুযোগ দেওয়া হয়েছিল বলে অভিযোগ ওঠে। সে সময় কিছু প্রতিষ্ঠানের কর্মী পাঠানোর অভিজ্ঞতা ছিল অত্যন্ত কম। পরবর্তীতে কর্মী পাঠানোর নামে অতিরিক্ত অর্থ আদায়, দুর্নীতি এবং অনিয়মের অভিযোগ ব্যাপক আকার ধারণ করে। এসব অভিযোগের পর ২০২৪ সালের ৩১ মে মালয়েশিয়া বাংলাদেশ থেকে কর্মী নেওয়া বন্ধ করে দেয়। তখন প্রায় ১৭ হাজার বাংলাদেশি কর্মী সব প্রক্রিয়া সম্পন্ন করেও মালয়েশিয়ায় যেতে পারেননি।
উল্লেখ্য, মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার বাংলাদেশের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। প্রতিবছর বিপুলসংখ্যক বাংলাদেশি কর্মী বিদেশে কাজের সুযোগ খোঁজেন। তাই একটি স্বচ্ছ ও প্রতিযোগিতামূলক নিয়োগব্যবস্থা প্রয়োজন। কিন্তু যদি আবারও নির্দিষ্ট কিছু প্রতিষ্ঠানের হাতে কর্মী পাঠানোর নিয়ন্ত্রণ কেন্দ্রীভূত হয়, তাহলে কর্মীদের কাছ থেকে অতিরিক্ত অর্থ নেওয়ার ঝুঁকি বাড়তে পারে। ২০২২ সালের অভিজ্ঞতায় দেখা গেছে, সরকার নির্ধারিত ব্যয়ের তুলনায় বাস্তব খরচ কয়েক গুণ বেড়ে যাওয়ার অভিযোগ উঠেছিল। ফলে এবারও যদি একই ধরনের পরিস্থিতি তৈরি হয়, তাহলে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হবেন বিদেশে যাওয়ার স্বপ্ন দেখা সাধারণ শ্রমিকরা।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









