একসময় বিদ্যুৎ ছিল বাংলাদেশের উন্নয়নের অন্যতম দৃশ্যমান সাফল্য। বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা বাড়িয়ে গ্রাম থেকে শহর ও দেশের বিস্তীর্ণ এলাকায় বিদ্যুৎ পৌঁছে দেওয়াকে উন্নয়নের বড় অর্জন হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে। পাওয়ার সেলের তথ্য অনুযায়ী দেশে বর্তমানে বিদ্যুৎ উৎপাদন ক্ষমতা ৩৩ হাজার ৯২ মেগাওয়াটে। সর্বোচ্চ বিদ্যুৎ উৎপাদন হয় গত ২০ মে ১৭ হাজার ২০১ মেগাওয়াট। গ্রাহক সংখ্যা ৫ কোটি ১ লাখ ৯৬ হাজার। মোট সঞ্চালন লাইন ১৮ হাজার ৮১৬ কি.মি। গ্রিড সাব-স্টেশন ক্ষমতা ৯১ হাজার ৫১২ এমভিএ। বিতরণ লাইন জুন ২০২৬ পর্যন্ত ৬ লাখ ৬১ হাজার ৭৯৬ কি.মি.। মাথাপিছু উৎপাদন ৬৮০ কিলোওয়াট।
২৫-২৬ অর্থবছর পর্যন্ত বিদ্যুৎ সুবিধা প্রাপ্ত জনগোষ্ঠী ১০০ শতাংশ। কিন্তু সেই সক্ষমতার মধ্যেও এই তীব্র গরমে আবারো বিদ্যুৎ সংকটে পড়েছে মানুষ। জ্বালানি সরবরাহের ঘাটতি, বাড়তি চাহিদা, আমদানিনির্ভরতা, বিদ্যুৎকেন্দ্রের আর্থিক সংকট এবং আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারের অস্থিরতার কারণে উৎপাদন সক্ষমতার পুরোটা কাজে লাগানো যাচ্ছে না। ফলে সারাদেশের মতো রাজধানীতেও ফিরে এসেছে লোডশেডিংয়ের দুর্ভোগ। তীব্র গরমে বিদ্যুতের চাহিদা বাড়ছে।
বাসাবাড়িতে ফ্যান, এসি, ফ্রিজ ও পানির পাম্পের ব্যবহার বাড়ার পাশাপাশি শিল্পকারখানা, অফিস, ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ও বাণিজ্যিক স্থাপনাতেও বিদ্যুতের ব্যবহার বাড়ছে। চাহিদার এই বাড়তি চাপের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে উৎপাদন বাড়াতে না পারায় জাতীয় গ্রিডে তৈরি হচ্ছে ঘাটতি। বিদ্যুৎকেন্দ্রের সক্ষমতা থাকলেও পর্যাপ্ত গ্যাস, কয়লা বা তরল জ্বালানি না পাওয়ায় অনেক কেন্দ্র পূর্ণ সক্ষমতায় চালানো সম্ভব হচ্ছে না। ফলে কাগজে বিপুল উৎপাদন সক্ষমতা থাকলেও প্রয়োজনের সময়ে গ্রিডে সেই বিদ্যুৎ পাওয়া যাচ্ছে না।
এর সরাসরি প্রভাব পড়ছে সারাদেশের মতো বিশেষ করে রাজধানীসহ বিভাগীয় শহরগুলোর জীবনযাত্রায়। দিনের ব্যস্ত সময়ে বিদ্যুৎ চলে যাওয়া, রাতে দীর্ঘসময় বিদ্যুৎ না থাকা কিংবা একই দিন একাধিকবার বিদ্যুৎ-বিভ্রাটে ভোগান্তিতে পড়ছেন নগরবাসী। তীব্র গরমে বিদ্যুৎ না থাকায় ফ্যান ও এসি বন্ধ হয়ে যাচ্ছে, বহুতল ভবনে লিফট ও পানির পাম্প অচল হয়ে পড়ছে। ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ও অফিসে কাজের গতি কমছে। যেসব প্রতিষ্ঠান জেনারেটর বা বিকল্প বিদ্যুৎ ব্যবহার করছে, তাদের বাড়তি জ্বালানি ব্যয়ও বহন করতে হচ্ছে। ফলে বাড়ছে জীবন যাত্রার ব্যায়ভার।
কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) জ্বালানি উপদেষ্টা এম শামসুল আলম মনে করেন, জ্বালানি খাতের দীর্ঘদিনের অব্যবস্থাপনা এবং কাঠামোগত দুর্বলতার কারণে এই সংকট বারবার ফিরে আসছে। শুধু গরমের বাড়তি চাহিদাকে দায়ী না করে দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা জরুরি। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কেবল নতুন বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ না করে দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান বাড়ানো, আমদানির উৎস বহুমুখী করা, নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বৃদ্ধি এবং আর্থিক খাতের সুশাসন নিশ্চিত করা না হলে ২৯ হাজার মেগাওয়াটের সক্ষমতার দেশেও মানুষকে লোডশেডিংয়ের চরম দুর্ভোগ পোহাতে হবে।
গরমের মধ্যে যন্ত্রণায় আছি- গভীর রাতেও দুই-তিনবার বিদ্যুৎ যায়, একবার গেলে দেড়-দুই ঘণ্টার কমে আসে না। এ কথা বলছিলেন মোহাম্মদপুরের নবীনগর এলাকার বাসিন্দা লিজা। তার দাবি, রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় প্রতিদিন ছয় থেকে সাত ঘণ্টার মতো লোডশেডিং হচ্ছে। এ অবস্থা দেশের বেশিরভাগ এলাকায়। দিনে-রাতে নিয়ম করে শহর এলাকায় পাঁচ থেকে ছয় ঘণ্টা এবং গ্রামাঞ্চলে ১২ থেকে ১৪ ঘণ্টা বিদ্যুৎ থাকছে না বলে জানাচ্ছেন বিদ্যুতের গ্রাহকরা।
মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে জ্বালানি সংকট শুরু হওয়ার পর থেকেই দেশে লোডশেডিং একটু একটু করে বেড়েছে। বিশেষ করে গ্রামাঞ্চলে বিদ্যুৎ-বিভ্রাট শুরু হয়েছে আরো আগে থেকেই। কিন্তু সম্প্রতি গ্রাম-শহর নির্বিশেষে সারা দেশে লোডশেডিং বেড়েছে বলেই তথ্য মিলছে। মূলত গরমের কারণে বিদ্যুতের চাহিদা বৃদ্ধি এবং বেশ কয়েকটি বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্রের ইউনিটে কারিগরি ত্রুটির কারণে উৎপাদন বন্ধ থাকায় বিদ্যুৎ সরবরাহ কমেছে।
বিদ্যুৎ বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, সারাদেশে চাহিদা বাড়লেও বিদ্যুৎ উৎপাদনের ঘাটতি থাকায় দৈনিক গড়ে ৩ হাজার মেগাওয়াটের বেশি লোডশেডিং দিতে হচ্ছে। এমনকি বিদ্যুৎ উৎপাদনে ঘাটতি তৈরি হওয়ায় রাজধানী ঢাকায় প্রতিদিন অন্তত ১১০ মেগাওয়াট লোডশেডিং দেওয়ার সিদ্ধান্ত ইতিমধ্যে সংসদে জানিয়েছেন বিদ্যুৎ জ্বালানি ও খনিজসম্পদ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত। যদিও কয়েকটি বিদ্যুৎ কেন্দ্রের বন্ধ হয়ে যাওয়া ইউনিউ চালু এবং আদানির বিদ্যুৎ সরবরাহ ঠিক হলে পরিস্থিতি স্বাভাবিক হতে পারে বলে জানান বিদ্যুৎ বিভাগের কর্মকর্তারা।
জ্বালানি সংকট শুরু হওয়ার পর থেকেই দেশজুড়ে ধাপে ধাপে লোডশেডিং বেড়েছে। গরমের তীব্রতা বৃদ্ধি আর একাধিক পাওয়ার প্লান্টের ইউনিটে কারিগরি জটিলতা তৈরি হওয়ায় সম্প্রতি পরিস্থিতি আরো অবনতি হয়েছে। সরকারি তথ্য অনুযায়ী, কাগজে-কলমে দেশে বিদ্যুৎ উৎপাদনের মোট সক্ষমতা ৩২ হাজার ৩৩২ মেগাওয়াট। যার মধ্যে গ্রিডভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা ২৮ হাজার ৯১৯ মেগাওয়াট। কিন্তু এখন পর্যন্ত বাংলাদেশে একদিকে সর্বোচ্চ ১৬ হাজার মেগাওয়াটের কিছু বেশি বিদ্যুৎ উৎপাদন করা সম্ভব হয়েছে। এ ছাড়া ভারতের আদানি পাওয়ারের সঙ্গেও ১৬শ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ আমদানির চুক্তি রয়েছে বাংলাদেশের।
তাহলে এতো উৎপাদন সক্ষমতা থাকার পরও বিদ্যুৎ নিয়ে এই বেহাল দশা কেন? বিদ্যুৎ বিভাগ বলছে, বাংলাদেশের বিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলো মূলত গ্যাস ও কয়লা নির্ভর হওয়ায় জ্বালানি সংকটে বর্তমানে দৈনিক বিদ্যুৎ উৎপাদন হচ্ছে ১৪ হাজার মেগাওয়াটের আশপাশে। এ ছাড়া আদানির একটি বিদ্যুৎ ইউনিটে কারিগরি সমস্যা তৈরি হওয়ায় সব মিলিয়ে সংকট দেখা দিয়েছে বলেও জানান বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিব উম্মে রেহানা। তিনি বলেন, আমাদের বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা অনেক কিন্তু পর্যাপ্ত জ্বালানি সরবরাহ না হওয়ায় বিদ্যুৎ উৎপাদনে ঘাটতি তৈরি হয়েছে।
বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের মধ্যেই সীমাবদ্ধ বলেই মনে করেন জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা। তারা বলছেন, জ্বালানির চিন্তা না করে কেবল বিদ্যুৎকেন্দ্র তৈরি ও উৎপাদন সক্ষমতা বাড়িয়েছে বাংলাদেশ। যারা ফলে যখনই জ্বালানির ঘাটতি হয়েছে তখনই বিদ্যুৎ নিয়ে এই জটিলতা তৈরি হয়েছে বলে মনে করেন জ্বালানি বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ড. ইজাজ হোসেন। তিনি বলেন, আপনার গাড়ি আছে কিন্তু গাড়ি চালানোর তেল নেই, বাংলাদেশের বিদ্যুৎ সেক্টরের বর্তমান অবস্থা ঠিক এমন।
গত দেড় দশকে বিদ্যুৎ খাতে বড় ধরনের বিনিয়োগের মাধ্যমে উৎপাদন সক্ষমতা ও অবকাঠামো সম্প্রসারণ করা হয়েছে। একের পর এক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের পাশাপাশি জাতীয় গ্রিড সম্প্রসারণ এবং বিদ্যুৎ আমদানির ব্যবস্থাও করা হয়েছে। ফলে স্থাপিত উৎপাদন সক্ষমতা প্রায় ২৯ হাজার মেগাওয়াটে পৌঁছেছে। কিন্তু স্থাপিত সক্ষমতা এবং বাস্তবে উৎপাদিত বিদ্যুতের মধ্যে বড় পার্থক্য রয়েছে। একটি কেন্দ্রের উৎপাদন সক্ষমতা ৫০০ মেগাওয়াট হলেও জ্বালানি সংকট, রক্ষণাবেক্ষণ, কারিগরি ত্রুটি কিংবা আর্থিক কারণে সেটি সবসময় পূর্ণ সক্ষমতায় চলতে পারে না।
ফলে বর্তমান সংকটকে শুধু বিদ্যুৎকেন্দ্রের ঘাটতি হিসেবে দেখার সুযোগ নেই, বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে কেন্দ্রগুলো সচল রাখার মতো নিরবচ্ছিন্ন ও সাশ্রয়ী জ্বালানি সরবরাহ। বাংলাদেশের বিদ্যুৎ উৎপাদনের বড় অংশ গ্যাসনির্ভর। দেশীয় গ্যাসের উৎপাদন ও সরবরাহ সীমিত হওয়ায় ঘাটতি পূরণে আমদানিকৃত তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস বা এলএনজির ওপর নির্ভরতা বেড়েছে। পাশাপাশি কয়লা ও তরল জ্বালানিনির্ভর কেন্দ্রগুলোও বিদ্যুতের চাহিদা সামাল দিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। কিন্তু গ্যাসের সরবরাহ কমে গেলে গ্যাসভিত্তিক কেন্দ্রগুলো উৎপাদন কমাতে বাধ্য হয়।
তখন ঘাটতি পূরণে তেলভিত্তিক কেন্দ্র চালানোর প্রয়োজন পড়ে, যা তুলনামূলক ব্যয়বহুল। অর্থাৎ একটি জ্বালানির সংকট অন্য জ্বালানির ওপর চাপ বাড়িয়ে শেষ পর্যন্ত বিদ্যুৎ উৎপাদনের ব্যয় ও সরবরাহ দুই ক্ষেত্রেই সমস্যা তৈরি করে।
এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারের অস্থিরতা। বাংলাদেশের জ্বালানি চাহিদার একটি বড় অংশ আমদানিনির্ভর হওয়ায় আন্তর্জাতিক বাজারে তেল, গ্যাস বা কয়লার দামের পরিবর্তনের সরাসরি প্রভাব পড়ে দেশের বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যয়ে। জ্বালানির আন্তর্জাতিক দাম বাড়ার পাশাপাশি জাহাজভাড়া, বীমা ব্যয় ও ডলারের বিনিময় হার বাড়লে একই পরিমাণ জ্বালানি আমদানিতেও বেশি অর্থ ব্যয় করতে হয়। ফলে বৈদেশিক মুদ্রার ওপর চাপ বাড়ে এবং বিদ্যুৎ উৎপাদনের আর্থিক ব্যয়ও বেড়ে যায়। মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত এই ঝুঁকিকে আরো বাড়িয়ে দিয়েছে। বিশ্বে তেল ও গ্যাস সরবরাহের গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চল মধ্যপ্রাচ্য।
এ অঞ্চলে সংঘাত দীর্ঘায়িত হলে জ্বালানি উৎপাদনের পাশাপাশি পরিবহন ব্যবস্থাও ঝুঁকির মুখে পড়ে। বিশেষ করে পারস্য উপসাগর ও ওমান উপসাগরের সংযোগস্থল হরমুজ প্রণালি বিশ্ব জ্বালানি বাণিজ্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ। মধ্যপ্রাচ্যের বড় তেল ও গ্যাস উৎপাদনকারী দেশগুলো থেকে বিপুল পরিমাণ জ্বালানি এই পথ দিয়ে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে যায়। এ পথে বড় ধরনের নিরাপত্তা ঝুঁকি বা দীর্ঘস্থায়ী বিঘ্ন তৈরি হলে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির দাম, পরিবহন ব্যয় ও সরবরাহের অনিশ্চয়তা বাড়তে পারে। আমদানিনির্ভর বাংলাদেশের জন্য এর প্রভাব সরাসরি বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে পড়ার ঝুঁকি রয়েছে।
বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর আর্থিক সংকটও পরিস্থিতিকে জটিল করছে। কেন্দ্রগুলোর পাওনা সময়মতো পরিশোধ করা না হলে তাদের জ্বালানি কেনা, ব্যাংকঋণ পরিশোধ ও পরিচালন ব্যয় মেটাতে সমস্যা তৈরি হতে পারে। একই সঙ্গে বিদ্যুৎ উৎপাদন ও জ্বালানি আমদানির জন্য প্রয়োজনীয় অর্থের সংকট তৈরি হলে উৎপাদন ব্যবস্থায়ও তার প্রভাব পড়ে। ফলে বিদ্যুৎ সংকটের পেছনে শুধু উৎপাদন সক্ষমতার বিষয় নয়, জ্বালানি সরবরাহ ও আর্থিক সক্ষমতাও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। তাছাড়া বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর পরও গ্রাহকের দুর্ভোগ কমেনি।
গত জুনে পাইকারি পর্যায়ে বিদ্যুতের দাম গড়ে ১৯ দশমিক ৮৫ শতাংশ এবং গ্রাহক পর্যায়ে গড়ে ১৬ দশমিক ৬৮ শতাংশ বাড়ানো হয়েছে। ফলে বাড়তি দামে বিদ্যুৎ কিনেও যদি গ্রাহককে নিয়মিত লোডশেডিংয়ের মুখোমুখি হতে হয়, তাহলে বিদ্যুৎ খাতের সেবার মান ও মূল্য নির্ধারণ নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হওয়া স্বাভাবিক। বিশেষ করে ব্যবসা ও শিল্পপ্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে বিদ্যুৎ বিভ্রাটের কারণে উৎপাদন বন্ধ হওয়া এবং পরে জেনারেটর চালাতে অতিরিক্ত জ্বালানি ব্যয় হওয়ায় মোট উৎপাদন ব্যয় আরো বাড়ছে।
লোডশেডিংয়ের প্রভাব শুধু ভোক্তার দুর্ভোগে সীমাবদ্ধ থাকছে না। শিল্পকারখানায় বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ হলে উৎপাদন ব্যাহত হয়, যন্ত্রপাতি চালু ও বন্ধের কারণে সময় নষ্ট হয় এবং জেনারেটর ব্যবহার করলে বাড়তি ব্যয় হয়। ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের জন্য এই অতিরিক্ত ব্যয় বহন করা তুলনামূলক কঠিন। দীর্ঘস্থায়ী বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকট শিল্পের উৎপাদন ব্যয় বাড়িয়ে দেশের প্রতিযোগিতা সক্ষমতাকেও দুর্বল করতে পারে। একই সঙ্গে পরিবহন ও উৎপাদন ব্যয় বাড়লে তার একটি অংশ শেষ পর্যন্ত পণ্যের দামে যুক্ত হয়ে মূল্যস্ফীতির ওপরও চাপ তৈরি করতে পারে।
পিডিবির কর্মকর্তারা জানান, দেশে বর্তমানে আটটি কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের মোট উৎপাদন সক্ষমতা প্রায় ৭ হাজার মেগাওয়াট। পটুয়াখালীর পায়রা বিদ্যুৎকেন্দ্র কারিগরি সমস্যার কারণে এবং মাতারবাড়ী বিদ্যুৎকেন্দ্রের একটি ইউনিট নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণের জন্য বন্ধ রয়েছে। এ ছাড়া বড়পুকুরিয়া কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের দুটি ইউনিটও কারিগরি ত্রুটির কারণে উৎপাদনের বাইরে রয়েছে।
অন্যদিকে, ভারতের ঝাড়খন্ডে অবস্থিত আদানির কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রটির সক্ষমতা প্রায় দেড় হাজার মেগাওয়াট। কয়লা সরবরাহে বিঘ্ন ঘটায় গত ৭ আগস্ট থেকে কেন্দ্রটি উৎপাদন কমিয়ে দিয়েছে। দিনের বেলায় কেন্দ্রটি প্রায় ৯০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ সরবরাহ করলেও সন্ধ্যা থেকে রাত ১২টা পর্যন্ত সর্বোচ্চ ১ হাজার ২০০ মেগাওয়াট পর্যন্ত বিদ্যুৎ দিচ্ছে। এ ছাড়া ঢাকার বাইরে দেশের গ্রামাঞ্চলে বিদ্যুৎ সরবরাহের দায়িত্বে রয়েছে আরইবির ৮০টি পল্লীবিদ্যুৎ সমিতি। পাশাপাশি কয়েকটি এলাকায় পিডিবিও বিদ্যুৎ সরবরাহ করে।
আরইবি সূত্র জানায়, চাহিদার তুলনায় বিদ্যুতের সরবরাহ কম থাকায় একই এলাকায় দিনে একাধিকবার লোডশেডিং দিতে হচ্ছে। বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্র মালিকদের সংগঠন বিইপ্পার সাবেক সভাপতি ইমরান করিম বলেন, ২০২০-২১ ও ২০২১-২২ অর্থবছরে তেলভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো তাদের সক্ষমতার ৬০ থেকে ৭০ শতাংশ পর্যন্ত ব্যবহার করে বিদ্যুৎ উৎপাদন করেছে। পরবর্তী সময়ে বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর পাওনা বাড়তে থাকায় উৎপাদন ধীরে ধীরে কমে যায় এবং এর প্রভাব পড়ে লোডশেডিংয়ে। তাঁর মতে, বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর সঙ্গে পিডিবির বকেয়া ও অন্যান্য যেসব বিরোধ রয়েছে, সেগুলোর সমাধান করা গেলে তেলচালিত কেন্দ্রগুলো থেকে এখনো বিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়ানোর সুযোগ রয়েছে।
পেট্রোবাংলার তথ্য অনুযায়ী, দেশে প্রতিদিন গড়ে ৩৮০ কোটি ঘনফুট গ্যাসের চাহিদা রয়েছে। কিন্তু দেশীয় গ্যাসক্ষেত্রগুলোতে উৎপাদন ধারাবাহিকভাবে কমছে। স্বাভাবিক সময়ে দেশীয় উৎস ও আমদানি করা এলএনজি মিলিয়ে সর্বোচ্চ প্রায় ২৭০ কোটি ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ করা হয়। এর মধ্যে এলএনজি থেকে সাধারণত প্রায় ১০৫ কোটি ঘনফুট গ্যাস জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হয়। তবে গতকাল এলএনজি সরবরাহ ৭৪ কোটি ঘনফুটের নিচে নেমে আসে। ফলে সেদিন দেশে মোট গ্যাস সরবরাহ হয়েছে প্রায় ২৩৫ কোটি ঘনফুট। চাহিদার তুলনায় এই ঘাটতির কারণে একদিকে বিদ্যুৎকেন্দ্রে উৎপাদন কমছে, অন্যদিকে শিল্পকারখানায় উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। একই সঙ্গে আবাসিক গ্রাহকদের রান্না এবং পরিবহন খাতেও গ্যাসের সংকট তীব্র হচ্ছে।
জ্বালানি বিশেষজ্ঞদের মতে, দীর্ঘদিনের অব্যবস্থাপনা ও কাঠামোগত দুর্বলতার কারণে গ্যাস-জ্বালানি সংকট বারবার ফিরে আসছে। ভোক্তা অধিকার সংগঠন কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) জ্বালানি উপদেষ্টা এম শামসুল আলম বলেন, সংকটের মধ্যেও সরাসরি ক্রয়পদ্ধতিতে এলএনজি কেনা, সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন থাকা জাহাজে এলএনজি আমদানি এবং চীনের অনভিজ্ঞ প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে নতুন টার্মিনাল নির্মাণের মতো উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। এসব কর্মকাণ্ডে সংকট থেকে বের হওয়ার কার্যকর উদ্যোগের প্রতিফলন দেখা যাচ্ছে না। তাঁর মতে, জ্বালানি খাতে কাঠামোগত সংস্কার না করলে অব্যবস্থাপনা ও অনিয়ম বন্ধ হবে না, ফলে সংকটও দীর্ঘস্থায়ী হবে।
সারাদেশে বিশেষ করে রাজধানীসহ বিভাগীয় শহরে লোডশেডিং ফিরে আসার বিষয়টি তাই শুধু নগরবাসীর সাময়িক দুর্ভোগের ঘটনা নয়। ঢাকা দেশের প্রশাসনিক, বাণিজ্যিক ও আর্থিক কর্মকাণ্ডের কেন্দ্র। ব্যাংক, আর্থিক প্রতিষ্ঠান, করপোরেট অফিস, হাসপাতাল, শপিংমল, রেস্টুরেন্ট ও বিভিন্ন সেবা খাতের বড় অংশ এই শহরকেন্দ্রিক। ফলে ঢাকায় বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যাহত হলে তার অর্থনৈতিক প্রভাবও তুলনামূলক বেশি। বহুতল ভবননির্ভর নগরজীবনে বিদ্যুৎ না থাকলে শুধু আলো বা ফ্যান বন্ধ হয় না পানির পাম্প, লিফট, নিরাপত্তা ব্যবস্থা এবং বিভিন্ন ডিজিটাল সেবাও ব্যাহত হয়। বাংলাদেশের বিদ্যুৎ খাতের বর্তমান পরিস্থিতির সবচেয়ে বড় বৈপরীত্য হলো—উৎপাদন সক্ষমতা বেড়েছে, কিন্তু সেই সক্ষমতা প্রয়োজনের সময় পুরোপুরি ব্যবহার করা যাচ্ছে না। অর্থাৎ সংকট এখন শুধু ‘বিদ্যুৎকেন্দ্র আছে কি না‘—এই প্রশ্নে সীমাবদ্ধ নয়। প্রশ্ন হলো, বিদ্যুৎকেন্দ্র চালানোর জন্য পর্যাপ্ত জ্বালানি আছে কি না, সেই জ্বালানি আমদানির সক্ষমতা আছে কি না এবং উৎপাদিত বিদ্যুতের মূল্য পরিশোধ করার মতো আর্থিক সক্ষমতা বিদ্যুৎ খাতে রয়েছে কি না।
মোহাম্মদপুরের বাসিন্দা শিউলি বেগম বলেন, শুক্রবার ছুটির দিনেও কয়েক দফা বিদ্যুৎহীন থাকতে হয়েছে। বিকেলে প্রায় এক ঘণ্টা বিদ্যুৎ না থাকার পর রাত ১০টার দিকে আবার বিদ্যুৎ চলে যায়। প্রায় দেড় ঘণ্টা পর রাত সাড়ে ১১টার দিকে বিদ্যুৎ আসে। সকাল ১০টা ১০ মিনিটের দিকে বিদ্যুৎ চলে যাওয়ার পর প্রায় এক ঘণ্টা অপেক্ষা করতে হয়েছে। তাঁর অভিযোগ, বিদ্যুতের পাশাপাশি বেশির ভাগ সময় গ্যাসও পাওয়া যায় না। ফলে বাধ্য হয়ে বিদ্যুৎচালিত চুলা ব্যবহার করতে হচ্ছে। এতে বাড়তি খরচ হলেও ভোগান্তি কমছে না। বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রতি বছর গরমে বিদ্যুতের চাহিদা বাড়ে। তাই গরমের কারণে সাময়িকভাবে লোডশেডিং বাড়তে পারে। কিন্তু শুধু তাপমাত্রাকে দায়ী করলে সমস্যার গভীরতা আড়ালে থেকে যায়। কারণ একটি দেশের বিদ্যুৎ নিরাপত্তা শুধু সর্বোচ্চ উৎপাদন সক্ষমতার ওপর নির্ভর করে না বরং এর সঙ্গে জ্বালানি নিরাপত্তা, বৈদেশিক মুদ্রার সক্ষমতা, বিদ্যুৎকেন্দ্রের আর্থিক স্বাস্থ্য, গ্রিডের সক্ষমতা এবং ভবিষ্যৎ চাহিদার সঠিক পূর্বাভাসও জড়িত।
একসময় গ্রামাঞ্চলে লোডশেডিং ছিল নিত্যদিনের বাস্তবতা। বিদ্যুৎ উৎপাদন ও বিতরণ সক্ষমতা বাড়ার পর বড় শহর, বিশেষ করে ঢাকার মানুষ তুলনামূলক নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহের সঙ্গে অভ্যস্ত হয়ে উঠেছে। এখন রাজধানীতেও যখন আবার নিয়মিত বিদ্যুৎ বিভ্রাট দেখা যায়, তখন এটি বিদ্যুৎ খাতের কাঠামোগত দুর্বলতার একটি দৃশ্যমান সংকেত হয়ে ওঠে।
বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা প্রায় ২৯ হাজার মেগাওয়াটে পৌঁছানোর পরও যদি সর্বোচ্চ চাহিদার সময়ে পর্যাপ্ত বিদ্যুৎ সরবরাহ করা না যায়, তাহলে শুধু নতুন বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণকে সমাধান হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। বরং বিদ্যুৎকেন্দ্রের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে দীর্ঘমেয়াদি জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করা, দেশীয় গ্যাস অনুসন্ধান বাড়ানো, জ্বালানি আমদানির উৎস ও পথ বহুমুখী করা, নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়ানো এবং বিদ্যুৎ খাতের আর্থিক ব্যবস্থাপনা শক্তিশালী করা জরুরি।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









