পশ্চিমবঙ্গের হুগলী শহরে ২০১৪ সালে হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে মারা যান জমিদার ও শিল্পপতি সুনীল কুমার বসু ওরফে সুনীল বোস। কিন্তু তিনি ‘জীবিত’ হয়ে ঢাকা ও মুন্সিগঞ্জের বিভিন্ন মৌজায় থাকা হাজার হাজার কোটি টাকার সম্পত্তির মালিকানা দাবি করছেন! নিজের নামে এনআইডি (ন্যাশনাল আইডি কার্ড) বানিয়ে জমি রেজিস্ট্রি করছেন। এমন চাঞ্চল্যকর ও বিরল প্রতারণা এবং জালিয়াতির ঘটনার পর দেশব্যাপী তোলপাড় চললেও প্রশাসন যেন নীরব দর্শক।
দৈনিক এদিনের অনুসন্ধানকালে নথিপত্র ঘেঁটে দেখা যায়, প্রখ্যাত স্বদেশি নেতা ও বাংলাদেশে কটন মিল শিল্পের পথিকৃত সূর্যকুমার বসু ঢাকা, মুন্সিগঞ্জ ও নারায়ণগঞ্জে শত শত একর জমি, মিল-কারখানা ও বাড়ির মালিক ছিলেন। তিনি নারায়ণগঞ্জের গোদনাইলে ১৯২৭ সালে ঢাকেশ্বরী কটন মিলস প্রতিষ্ঠা করে তৎকালীন পূর্ববঙ্গে ব্যাপক খ্যাতি অর্জন করেন। পরবর্তীতে লক্ষ্মীনারায়ণ ও চিত্তরঞ্জন কটন মিল প্রতিষ্ঠার নেপথ্য নায়ক ছিলেন তিনি। কিন্তু ১৯৬৫ সালে পাক-ভারত যুদ্ধের পর পাকিস্তান সরকার তাঁর কটন মিলগুলো বাজেয়াপ্ত করে সরকারীকরণ করে। তখন তিনি সবকিছু হারিয়ে পশ্চিমবঙ্গে চলে যান। সেখানে গিয়ে বর্ধমানে ঢাকেশ্বরী কটন মিল গড়ে তোলেন। পরবর্তীতে সেখানেই মারা যান। তাঁর পুত্র সুনীল কুমার বসু বাংলাদেশে থেকে গেলেও সর্বহারার মতো জীবন যাপন করতেন। একপর্যায়ে প্রাণ বাঁচাতে তিনিও পশ্চিমবঙ্গে চলে যান। ২০১৪ সালের ২৭ মার্চে হুগলীতে তিনি মৃত্যুবরণ করলে স্থানীয় শ্মশানে তাঁকে দাহ করা হয়।
এর পর থেকেই বোস পরিবারের বিশাল সম্পত্তি আত্মসাৎ করার জন্য একটি জালিয়াতচক্র নানা অপকৌশল ও ছলচাতুরী করতে থাকে। সুনীল কুমার বসুর মৃত্যুর খবর গোপন করে তারা তৈরি করে ‘ডামি সুনীল’। জাল দলিলপত্র এমনকি এনআইডিও তৈরি করতে সক্ষম হয় তারা। যার পরিপ্রেক্ষিতে ২০২৪ সালের ১৩ আগস্ট সংঘবদ্ধ জালিয়াতচক্রটি বরিশাল বাবুগঞ্জ থানার রহমতগঞ্জ সাব-রেজিস্ট্রি একটির পাওয়ার অব অ্যাটর্নি (আম-মোক্তার) দলিল রেজিস্ট্রি করা হয়। দলিল নম্বর-১৬৩৯। অভিযোগ উঠেছে, এই পাওয়ার অব অ্যাটর্নি দলিল রেজিস্ট্রি দেওয়া হয়েছে মোটা অংকের উৎকোচের বিনিময়ে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক সংশ্লিষ্ট অফিসের এক কর্মী বলেন, ‘ভাই রে, ঘুষের পাওয়ার এতই যে, দাহ করা লাশ শ্মশান থেকে এসে রেজিস্ট্রি অফিসের এজলাসে হাজির হয়ে দলিল দিয়ে যায়।’
দৈনিক এদিনের অনুসন্ধানে জানা যায়, দলিলদাতা সুনীল কুমার বসুর ঠিকানা হিসাবে ব্যবহৃত হচ্ছে ১৭১৮-২১ করিম কুটির, মসজিদ লেন, বরিশাল। জালিয়াতি করে সৃজনকৃত এনআইডিতে তাঁর জন্মতারিখ দেওয়া হয়েছে ১৯৩০ সালের ২৩ ডিসেম্বর। যে ঠিকানা ব্যবহার করে সংঘবদ্ধ চক্রটি জালিয়াতি চালিয়ে যাচ্ছে সেটি আসলে ভুয়া ঠিকানা। এদিনের পক্ষ থেকে একাধিকবার খোঁজখবর নিয়েও ‘ড্যামি’ সুনীল বসু ও তাঁর ঠিকানা খুঁজে পাওয়া সম্ভব হয়নি। স্থানীয় লোকজন সুনীলের নাম-ঠিকানার কথা শুনে যেন আকাশ থেকে পড়েন। আইনশৃংখলা রক্ষাকারী একাধিক সংস্থাও তদন্ত করে এই নাম-ঠিকানার কোনো অস্তিত্ব খুঁজে পায়নি।
এমনকি পিবিআই (পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন) থেকে তদন্ত করে পরিদর্শক মো. আক্রাম হোসেন মজুমদার ২০২১ সালের ১৭ আগস্ট যে প্রতিবেদন দেন, সেখানে সুনীল বসু ও তার বরিশালের ঠিকানা সঠিক নয় বলে মন্তব্য করা হয়। প্রকৃত সুনীল বসু কোনো দিনই বরিশালে বসবাস করেননি। তাঁর বাড়ি মুন্সীগঞ্জ জেলার টঙ্গীবাড়ি থানাধীন রাউৎভোগ গ্রামে। তা ছাড়া তিনি ২০১৪ সালে পশ্চিমবঙ্গে মৃত্যুবরণ করেছেন। যে জাল এনআইডিতে সুনীল বসুর নামের বানান দেওয়া হয়েছে, সেভাবে অর্থাৎ ‘সুনিল’ হিসাবে তিনি কখনো নাম লিখেননি।
বর্তমানে জালিয়াতচক্রটি রাজধানী ঢাকায় সুনীল কুমার বসুর নামে রেকর্ডকৃত ৭/১/এ আর, কে মিশন রোড, সুত্রাপুরের বাড়িটি হস্তান্তরের নানা কৌশল অবলম্বন করছে। ড্যামি সুনীল বসুর বানানো আইডি কার্ড, জন্মসনদ ও ভুয়া ওয়ারিশ সনদ দিয়ে বাড়ির ১৯ দশমিক ৮৪ শতাংশ জমি সাফ-কবলা রেজিস্ট্রি করতে মরিয়া হয়ে উঠেছে। সূত্রাপুরের সাব-রেজিস্ট্রারকে প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন মহল থেকেও নানাভাবে চাপ প্রয়োগ করা হচ্ছে বলে জানা গেছে। একথা স্বীকার করে সংশ্লিষ্ট সাব-রেজিস্ট্রার আবরার ইবনে রহমান এদিনকে বলেন, ‘এই একটি দলিল বারবার উত্থাপন করা হচ্ছে রেজিস্ট্রির জন্য । যার দাতাই ঠিক নেই। এনআইডিরও ঠিক নেই। ওপরমহল থেকে প্রচণ্ড চাপও দেওয়া হচ্ছে। মানে ঘুম হারাম অবস্থা।’
সূত্রাপুর সাব-রেজিস্ট্রি অফিস সূত্রে জানা যায়, একটি সংঘবদ্ধ জালিয়াতচক্র সুনীল কুমার বসুকে ড্যামি হিসাবে দাঁড় করিয়ে এই বাড়িটি বিক্রির সাফ-কবলা দলিল রেজিস্ট্রির চেষ্টা করছে। তাদের চেষ্টা সফল প্রতারকদের জয় হবে। পথ খুলবে আরো বিশাল প্রতারণার। সূর্য কুমার বসুর ওয়ারিশ দেখিয়ে ড্যামি সুনীলের মাধ্যমে এরপর বাউৎভোগের প্রায় ৬০০ বিঘা জমি, ঢাকার ৫/৬টি বাড়ি, কমলাপুর রেলস্টেশনের জমি ও নারায়ণগঞ্জের গোনাইলে তিনটি কটন মিলের হাজার হাজার কোটি টাকার সম্পত্তি আত্মসাৎ করা তাদের পক্ষে সহজ হয়ে যাবে।
এর নীল নকশা হিসাবে ২০২৪ সালে বরিশালের বাবুগঞ্জ সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে সুনীল বসুকে দাতা দেখিয়ে একটি পাওয়ার অব অ্যাটর্নি দলিল (নম্বর-১৬৩৯) রেজিস্ট্রি করা হয়। মূলত এই দলিলের মাধ্যমে সুনীল বসুর বিপুল পরিমাণ সম্পত্তি ও বাড়িঘর আত্মসাৎ করাই মূল উদ্দেশ্য। কিন্তু বাদ সেধেছে জাল দাতা। প্রকৃত সুনীল বসুর জন্ম ১৯১৫ সালে। তাঁর বাবা সূর্যকুমার বসু জন্ম ১৮৮৫ সালে। কিন্তু এনআইডিতে উল্লেখ করা হয়েছে সুনীল বসু ২৩ ডিসেম্বর ১৯৩০ খ্রিষ্টাব্দে জন্মগ্রহণ করেছেন। যদি ধরে নেওয়া হয়, সুনীল বসু ১৯৩০ খ্রিষ্টাব্দেই জন্মগ্রহণ করেছেন, তাহলে তো বর্তমানে তার বয়স ৯৭ বছর। এই বয়সে কতজন বাঙালি বেঁচে থাকেন? কতজনই বা হাঁটাচলা করতে পারেন? অথচ জানা গেছে, সুঠাম দেহী ড্যামি সুনীল বসু দলিল রেজিস্ট্রির জন্য ঘুরে বেড়াচ্ছেন।
স্বদেশি নেতা ও বাংলাদেশের কটন মিল শিল্পের পথিকৃৎ সূর্যকুমার বসুর হাজার হাজার কোটি টাকার সম্পত্তি হজম করার চেষ্টায় রত সংঘবদ্ধ জালিয়াতচক্রের সদস্য কারা? দীর্ঘদিন ধরে তারা এতবড় জালিয়াতি করার পরও কিভাবে বহাল তবিয়তে থেকে প্রকাশ্যে জাল-জালিয়াতি অব্যাহত রেখেছে? তারা আইনের আওতায় আসছে না কেন? এমন অনেক প্রশ্ন থাকলেও এর সঠিক জবাব পাওয়া দুরূহ। তবু এদিনের অনুসন্ধানী টিম দীর্ঘদিন চেষ্টা চালিয়ে একাধিক জালিয়াতচক্রের সন্ধান পেয়েছে, যারা এই বিপুল পরিমাণ সম্পত্তি গ্রাস করার চেষ্টায় রত। তা নিয়ে বেশকিছু মামলা, পিটিশন ও অভিযোগপত্র রয়েছে। কেউ আদালতের নিষেধাজ্ঞা নিয়ে মালিকানার পক্ষে দাঁড়ানোর মতো ঘটনাও ঘটাচ্ছেন। তবে এই সম্পত্তি আত্মসাতের পেছনে প্রধান দুটি চক্র সক্রিয় রয়েছে। একটি চক্র মৃত সুনীল বসুকে জীবিত বানিয়ে, অপর চক্রটি পশ্চিমবঙ্গের হুগলী শহরে ‘বসবাসরত’ সুনীল বসুর পক্ষ নিয়ে তাদের হাজার হাজার কোটি টাকার সম্পত্তি নিয়ে কামড়াকামড়ি করছে।
স্থানীয় বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, সুনীল কুমার রেকর্ডকৃত সম্পত্তি আত্মসাৎ করার জন্য বিভিন্ন সংঘবদ্ধ চক্র দীর্ঘদিন ধরে চেষ্টা-তদবির চালাচ্ছে। অথচ বাংলাদেশে সুনীল বসুর কোনো অস্তিত্ব নেই। এনআইডি বা জাতীয় পরিচয়পত্র চালু হওয়ার আগেই তিনি পশ্চিমবঙ্গে চলে যান। অথচ বিভিন্ন চক্র একাধিক এনআইডি সৃষ্টি করেছে। যার সঙ্গে প্রকৃত সুনীল বসুর জন্ম তারিখ আর চেহারার কোনো মিল নেই। ড্যামি সুনীল বসুকে গ্রেফতার করে জিজ্ঞাসাবাদ করলে আসল ঘটনা বেরিয়ে আসবে।
টিকাটুলীর বাসিন্দা বর্ষীয়ান আপ্তাব উদ্দিন আহমেদ বলেন, ‘সূর্যকুমার ও সুনীল কুমার বসু ঢাকার বিখ্যাত ব্যক্তি। তাদেরকে অনেকেই দেখেছেন। কিন্তু জাল সুনীল কুমার বসুর চেহারার সঙ্গে আসল সুনীল কুমার বসুর কোনো মিল নেই। তা ছাড়া ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ ও মুন্সীগঞ্জের ঠিকানা বাদ দিয়ে সুনীল বসু বরিশালে গিয়ে বসতি স্থাপন করবেন, সেটাও বিশ্বাসযোগ্য নয়।’ ১৯৩০০৬৯৫১২১১০৪৯৯ নম্বর জন্মসনদ ও ৭৩৫৫৬৯৬৩৬৫ নম্বর এনআইডি কার্ড বরিশাল সিটি কর্পোরেশন থেকে করার কথা বলা হলেও কর্পোরেশনের নথিতে তার কোনো অস্তিত্ব পাওয়া যায়নি। অপরদিকে বরিশাল বিভাগীয় নির্বাচন কমিশন অফিসে তার এনআইডির কোনো হদিস মেলেনি। অনলাইনে যাচাই করেও কোনো খোঁজ মেলেনি সুনীল কুমার বসুর এনআইডির।
এ বিষয়ে এদিনের বরিশাল ব্যুরো প্রধান আদনান ওলি বরিশাল মসলিন লেনে সরেজমিনে তদন্ত গিয়ে করিম কুটিরের সন্ধান পেলেও হোল্ডিং নম্বর খুঁজে পাননি। করিম সাহেবের বংশধর লিটু ও রায়হান জানান, তারা করিম কুটিরের আদি বাসিন্দা। তাদের হাতে এলাকার রাস্তাঘাট ও মসজিদ নির্মিত হয়েছে। মসজিদের কারণেই এলাকার নামকরণ মসজিদ হয়েছে। কিন্তু কোনোকালেই সুনীল কুমার বসু নামে হিন্দু কোনো ব্যক্তি সেখানে বাস করেননি। এ পর্যন্ত শতাধিক ব্যক্তি বা প্রশাসনের লোক করিম কুটিরে এসে সুনীল বসুর খোঁজ করেছেন। এ বিষয়ে জবাব দিতে দিতে তাঁরা বিরক্ত হয়ে গেছেন। করিম কুটিরের ঠিকানা ব্যবহার করে একটি ভূমি জালিয়াতচক্র যে অপকর্ম করছে, এর বিরুদ্ধে কোনো আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে কি না- এমন প্রশ্নে লিটু ও রায়হান জানান, গুপ্তচক্রের নাম-ঠিকানা জানা নেই বলে তারা থানায় অভিযোগ জানাতে পারছেন না।
কিভাবে একজন মৃত মানুষ ভুয়া এনআইডি কার্ড দিয়ে বরিশালের বাবুগঞ্জ সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে একটি আমমোক্তারনামা দলিল রেজিস্ট্রি হলো তা নিয়ে অনুসন্ধান করে জানা যায়, প্রায় ২০ লাখ টাকার ঘুষের বিনিময়ে এই নজিরবিহীন দুর্নীতির ঘটনাটি সংঘটিত হয়। মোসাম্মৎ রেহেনা পারভীন রেজিস্টারিং অফিসার হিসাবে সেই দলিলে স্বাক্ষর করেন। তিনি বাবুগঞ্জ সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে ২০২৩ সালের ২৩ মার্চ থেকে ২০২৫ সালের ১৩ এপ্রিল পর্যন্ত কর্মরত ছিলেন। সম্প্রতি তিনি দুরারোগ্য ক্যান্সারে মারা গেছেন। যার কারণে তার বক্তব্য সংযোজন করা যায়নি। বর্তমানে বাবুগঞ্জ সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে চলতি দায়িত্ব পালন করছেন মোঃ যোবায়ের হোসেন। তিনি এ বিষয়ে কোনো কথা বলতে চাননি।
এদিনের অনুসন্ধানে জানা যায়, বরিশাল-কেন্দ্রিক একটি জালিয়াতচক্র সুনীল কুমার বসুর নামে রেকর্ডকৃত হাজার হাজার কোটি টাকার সম্পত্তি গ্রাস করার জন্য সক্রিয় রয়েছে দীর্ঘদিন ধরে। এর মূলহোতা হলেন ষাটোর্ধ মোঃ শাহাদৎ হোসেন মিন্টু আকন। পিতা- মৃত আবদুল মান্নান আকন, গ্রাম- হোসনাবাদ, গৌরনদী, বরিশাল। তার এনআইডি নম্বর-০৬১৩২৯৪৭৯৯৮৯৩। তিনি সাজানো ভুয়া এক ব্যক্তিকে সুনীল কুমার বসু সাজিয়ে প্রকৃত সুনীল কুমার বসুর মালিকানাধীন ৭/১ আর কে মিশন রোডস্থ বাড়িটি জোরপূর্বক দখল করার জন্য ১০/১২ জন ভাড়াটিয়া সন্ত্রাসী নিয়ে সেখানে যান। কিন্তু স্থানীয় লোকজনদের বাধার মুখে শাহাদৎ হোসেন মিন্টু দলবলসহ সেখান থেকে পালিয়ে আসেন।
পিবিআই ঢাকা মেট্টো দক্ষিণের পুলিশ পরিদর্শক মো. আক্রাম হোসেন মজুমদার দীর্ঘদিন তদন্তপূর্বক যে প্রতিবেদন দেন তাতে বলা হয়েছে, শাহাদৎ হোসেন মিন্টুর সহযোগিতায় একজন অজ্ঞাত ব্যক্তিকে ভুয়া সুনীল কুমার বসু সাজিয়ে সরকারি কাগজপত্র, জন্মসদন, টিন নম্বর ও এনআইডি কার্ড সৃষ্টি করা হয়েছে বলে প্রমাণ পাওয়া যায়। যা পেনাল কোডের ৪২০/৪৬৭/৪৬৮/৪৭১/১০৯ ধারার প্রাথমিকভাবে প্রমাণিত হয়েছে। ভুয়া সুনীল কুমার বসুর আসল নাম ও ঠিকানা পাওয়া গেলে তার বিরুদ্ধে মামলা রুজু ও আইনি ব্যবস্থা নেওয়া যাবে।
দৈনিক এদিনের অনুসন্ধানে বরিশালের বাবুগঞ্জ সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে ২০২৪ সালের ১৩ আগস্ট রেজিস্ট্রিকৃত ১৬৩৯ নম্বর অপ্রত্যাহারযোগ্য পাওয়ার অব অ্যাটর্নী দলিলের নেপথ্য কাহিনী বেরিয়ে এসেছে। মূলত ঢাকায় থাকা আসল সূর্যবসুর সম্পত্তি আত্মসাৎ করার জন্যই দলিলটি করা হয়েছে। অপ্রত্যাহারযোগ্য আমমোক্তারনামা দলিলটি কৌশলে বাবুগঞ্জ রেজিষ্ট্রি অফিসে রেজিষ্ট্রি করা হয়েছে। দুটি তফশীলের একটি তফশীল বাবুগঞ্জের দেহেরগতি মৌজার বাগান পুকুরসহ ২১ শতাংশ জমি দেখানো হয়েছে। অন্য তফশীলে ঢাকার ওয়ারী মৌজার ১৯ দশমিক ৮৪ শতাংশ জমি ও ১০০ বর্গফুটের স্থাপনাসহ মোট ৪০ দশমিক ৮৪ শতাংশ জমি উল্লেখ করা হয়েছে। মূলত ঢাকার সম্পত্তিটি আত্মসাৎ করার জন্যই বাবুগঞ্জের বাগান ও পুকুরের জমি সংযোগ করে অপ্রত্যাহারযোগ্য পাওয়ার অব অ্যাটর্নী দলিলটি রেজিস্ট্রি করা হয়েছে। এটা প্রতারক ও জালিয়াতচক্রের একটি কৌশল মাত্র।
১৬৩৯ নম্বর দলিলে গ্রহীতা হিসাবে চারজনের নাম রয়েছে। তারা হলেন মোহাম্মদ শাহীন আলম, পরিতোষ কর্মকার, জাকির হোসেন ও মোঃ মহিউদ্দিন। তাদের সবার বাড়ি বরিশাল এলাকায়। অনুসন্ধানে জানা যায়, তারা সবাই জালিয়াতচক্রের মূলহোতা শাহাদাৎ হোসেন মিন্টুর অন্যতম সহযোগী। তারা সবাই একজন অজ্ঞাত ব্যক্তিকে সুনীল কুমার বসু সাজিয়ে ঢাকার সুত্রাপুরে সাব-রেজিষ্ট্রি অফিসে ৭/১/এ নম্বর আর কে মিশন রোডের বাড়িসহ অন্যান্য সম্পত্তি আত্মসাতের চেষ্টা করেছেন। সুত্রাপুর সাব-রেজিষ্ট্রি অফিসে দলিল রেজিষ্ট্রি করতে না পেরে বরিশালের বাবুগঞ্জে পাওয়ার দলিলের বলে সুত্রাপুর সাব-রেজিষ্ট্রি অফিসে সাব কবলা দলিল সম্পন্ন করে প্রকৃত সুনীল বসুর সম্পত্তি আত্মসাতের চেষ্টা চালাচ্ছেন।
শুধু শাহাদাৎ হোসেন মিন্টুই নয়, সূর্য কুমার বসুর ঐতিহাসিক বাড়িটি যো ওয়ারিশ সূত্রে মালিক সুনীর বসুর আত্মসাৎ করার জন্য বেশ কিছু জালিয়াতচক্র সক্রিয় রয়েছে। তারা একে অপরের বিরুদ্ধে মামলা-মোকাদ্দমায় লিপ্ত রয়েছেন। এর মধ্যে একটি মামলা হলো তফুরা প্রপার্টিজ বনাম সুনীল কুমার বসু, যুগ্নজজ আদালত-১ম, দেওয়ানী মোকদ্দমা নম্বর -১০০৪/২০১৪। আরেকটি মামলা হলো জামাল উদ্দিন ভূঁইয়া গং বনাম সুনীল কুমার বসু, মামলা নম্বর২/২০১৯, ঢাকা জেলা জজ ৭ম আদালত। তা নিয়ে সুপ্রীম কোর্টেও কিছু মামলা রয়েছে। একটি মামলা হলো সীম্যান ইন্টারন্যাশনাল লিমিটেড বনাম সুনীল কুমার বসু গং এর মধ্যে। যার নম্বর সিভিল আপীল নম্বর -৪৯। ২০০৯ খ্রিষ্টাব্দে হাইকোর্ট ১৪০১ নম্বর সিভিল রিভিশন মামলার নাসরিন একটি জাল চুক্তিপত্রের মাধ্যমে।
তারা দাবী করে, বাড়িটি বিনিময়ে সুনীল কুমার বসু তাদের কাছ থেকে ১ লক্ষ টাকা গ্রহণ করেছেন। এর ২১ বছর পর তারা ১৯৯৭ খ্রিষ্টাব্দে ঢাকা জজ কোর্টে একটি মামলা (নম্বর ৩৪৮/৯৭) করে এক তরফ ডিগ্রী লাভ করেন। কিন্তু ২০০৪ খ্রিষ্টাব্দে ঢাকা ৬ষ্ঠ সহকারি জজ আদালতে একটি মিস মামলা হলে ২৬জুন ২০০৭ খ্রিষ্টাব্দে আদালত একতরফা মামলাটি বাতিল করে দিয়ে বাড়ির জমি মূলজোতে সংযুক্ত করার আদেশ দেয়। তখন এর সঙ্গে যুক্ত হন মশিউজ্জামান চৌধুরী নামে এক ব্যক্তি। যিনি তুশকা প্রপার্টিজের এমডি হিসাবে পরিচিত। তার পক্ষে সোহরাবুল ইসলাম ও ইয়াসিন সরকার সুনীল বসুর বাড়িটি আত্মসাৎ করার জন্য সক্রিয় রয়েছেন। এমনকি বাড়িটি জোরপূর্বক দখল করে আনসার ক্যাম্প বসিয়েছেন।
আর কে মিশন রোডের বাসিন্দা আবুল কালাম জানান, একই সঙ্গে বরিশালের শাহাদাৎ হোসেন মিন্টু ও পরিতোষ কর্মকার অজ্ঞাত এক প্রতারককে ভূয়া সুনীল কুমার বসু সাজিয়ে বাড়ি-সম্পত্তি আত্মসাতের অপচ্ষ্টো করছে। পুলিশ, সিআইডি, আদালত ও পিবিআই কথিত সুনীল কুমার বসুকে ভূয়া ও প্রতারক ঘোষণা দিলেও তার মাধ্যমে বরিশালের বাবুগঞ্জে একটি আমমোক্তারনামা (পাওয়ার অব অ্যাটর্নী) দলিল রেজিষ্ট্রি করতে সক্ষম হয়। যার প্রেক্ষিতে ঢাকা জজ কোর্টে দলিলদাতা ও গ্রহীতাদের বিরুদ্ধে একটি প্রতারণার মামলা (নম্বর-১৩৭/২৪) দায়ের হয়েছে। উক্ত মামলার দলিল লেখক ও সনাক্তকারীকেও আসামি করা হয়েছে।
ইতোমধ্যে সিআর মামলা নং-৩১/২০২১, ধারা-৪২০/৪৬৭/৪৬৮/৪৭১/১০৯ দায়ের হলে শাহাদাৎ হোসেন মিন্টু ও কথিত সুনীল কুমার বসুর বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা দায়ের হলে মিন্টু জামিন নিলে নকল সুনীল বসু এখনো পলাতক রয়েছে। তাকে ধরিয়ে দেওয়ার জন্য ২০২৩ খ্রিষ্টাব্দের ৯ মে ও ১০ মে বিভিন্ন জাতীয় পত্রিকায় গণবিজ্ঞপ্তী দেওয়া হয়। এর পরও ভূয়া সুনীল বসু আত্মগোপনে থেকে দলিল রেজিষ্ট্রি করে যাচ্ছে। শুধু সংবাদপত্রের বিজ্ঞপ্তীর মাধ্যমেই নয়, তাকে সিআইডি, পিবিআই, থানা-পুলিশ অনেকবার তলব করলেও ভূয়া সুনীল বসু কখনো তাদের সামনে হাজির হয়নি। তার আসল পরিচয় প্রকাশ হয়ে যাওয়া কিংবা জেল জরিমানার ভয়ে বর্তমানে গুপ্ত জীবন যাপন করছেন।
তাছাড়া দেবব্রত নাগ পিতা-সুবোধচন্দ নাগ, বক্তারপুর কালীগঞ্জ, গাজীপুর দাবি করেন, ১৯৯৬ খ্রিষ্টাব্দে ২২ আগস্ট সুনীল কুমার বসুর ভাই অনীল কুমার বসু কলকাতায় অশোক সেনগুপ্তকে তার সম্পত্তি দেখাশোনা করার জন্য পাওয়ার অব অ্যাটর্নি নিয়োগ করেন। অশোক সেনগুপ্ত বাংলাদেশে এসে ২০০৩ খ্রিস্টাব্দের ২৩ অক্টোবর ঢাকা ও মুন্সীগঞ্জে অবস্থিত তাদের সম্পত্তি ১৯১৭ নম্বও পাওয়ার দলিলের মাধ্যমে দেবব্রত নাগকে সম্পত্তি দেখাশোনার দায়িত্ব দেন। দেবব্রত নাগের পক্ষে নজরুল ইসলাম নামে এক ব্যক্তি নানা মামলা মোকদ্দমা দেখাশোনা করছেন।
এভাবে বিভিন্ন পক্ষ, নানা মামলা-মোকদ্দমা আর জাল সুনীল কুমার বসু চক্করে আটকে আসে প্রকৃত সুনীল কুমার বসুর ঢাকা ও মুন্সীগঞ্জে থাকা হাজার হাজার কোটি টাকার সম্পত্তি। নানা পরিচয়ে নানা মালিকানা দাবীদার নানা জাল-জালিয়াত সক্রিয় রয়েছে এসব সম্পত্তি হজম করার জন্য। কিছু পয়সাওয়ালা ভূমিদস্যু পেছন থেকে কলকাঠি নাড়াচারা করছেন। অর্থ যোগাচ্ছেন জালিয়াতির কাজে।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









