তীব্র সার সংকটের মাঝেই উত্তরাঞ্চলের বিভিন্ন উপজেলায় ফের গুদাম ভাঙচুর করে সার লুটপাট, বিক্ষোভ ও সড়ক অবরোধের ঘটনা ঘটেছে। সার নিয়ে দ্বিতীয় দিনের মতো বিক্ষুব্ধ কৃষকদের বিক্ষোভে চরম উত্তেজনা তৈরি হয়েছে। কৃষকদের অভিযোগ, রোপা আমন মৌসুমে জমিতে সার প্রয়োগের উপযুক্ত সময় হলেও স্থানীয় ডিলারদের কাছে প্রয়োজন অনুসারে সার পাচ্ছেন না তাঁরা। উল্টো কৃত্রিম সংকট তৈরি করে খোলা বাজারে অতিরিক্ত দামে সার বিক্রি হচ্ছে।
গতকাল সোমবার সকালে কুড়িগ্রামের রৌমারীতে সারের জন্য দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করেও বিতরণ শুরু না হওয়ায় ক্ষুব্ধ কৃষকরা একটি ডিলার পয়েন্টের গুদামের টিনের বেড়া ও দরজা ভেঙে ভেতরে ঢুকে শতাধিক বস্তা সার নিয়ে গেছেন। কৃষকদের অভিযোগ, আগের রাত দুইটা থেকেই সার নিতে লাইনে দাাঁড়িয়েছিলেন তারা। কিন্তু নির্ধারিত সময় পেরিয়ে গেলেও সার বিতরণ করেননি ডিলারের লোকজন। জেলার ভূরুঙ্গামারীতেও সার না পাওয়ার আশঙ্কায় কৃষকরা সড়ক অবরোধ ও উপজেলা কৃষি কর্মকর্তাকে অবরুদ্ধ করেন।
অন্যদিকে রাজশাহীর পুঠিয়া ও লালমনিরহাটেও পর্যাপ্ত সার সরবরাহ নিশ্চিতকরণ ও খুচরা বাজারের সার সিন্ডিকেট ভাঙার দাবিতে মহাসড়ক অবরোধ করেন কৃষকরা।
এর আগে গত রবিবারও সার দিতে দেরি হওয়ায় কুড়িগ্রামের নাগেশ্বরী উপজেলার কচাকাটা বাজারে একজন ডিলারের গুদামে ভাঙচুর করেন ক্ষুব্ধ কৃষকেরা। সারের দাবিতে জেলার ভূরুঙ্গামারী উপজেলায়ও সেদিন সড়কে বিক্ষোভ করেছেন কৃষকেরা। এছাড়া লালমনিরহাটেও একই দাবিতে সড়ক অবরোধ ও বিক্ষোভ করেন কৃষকেরা।
রৌমারীতে সার লুট
কুড়িগ্রামের রৌমারী উপজেলার বন্দবেড় ইউনিয়নে সার বিতরণে দেরি হওয়ায় একজন ডিলারের গুদামের বেড়া ও দরজা ভেঙে সার নিয়ে গেছেন বিক্ষুব্ধ কৃষকেরা। গতকাল ভোরের দিকে বন্দবেড় বাজারের মেসার্স মিতা হাসান এন্টারপ্রাইজের গুদামে এ ঘটনা ঘটে। ডিলারের দাবি, মহিলা কলেজপাড়া এলাকায় তার গুদাম থেকে এক থেকে দেড়শ’ বস্তা ইউরিয়া সার নেওয়া হয়েছে। তবে সার নেওয়ার অভিযোগ অস্বীকার করেছেন উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মাহবুবুল আলম বসুনিয়া। তিনি বলেন, সার লুট হয়ে যাওয়ার ভিডিওটি ভুয়া। বন্দবেড় ইউনিয়নে এমন কোনো ঘটনা ঘটেনি। রৌমারী উপজেলায় ৪২ হাজার কৃষক আছেন এবং তাঁরা সবাই সঠিকভাবে সার পাচ্ছেন।
স্থানীয় একাধিক কৃষক বলেন, গতকাল সকালে বন্দবেড় বাজারে সার বিতরণের কথা ছিল। কৃষকেরা রবিবার রাত দুইটা থেকে গুদামের সামনে এসে লাইনে দাঁড়াতে শুরু করেন। কিন্তু সকাল হলেও সার বিতরণ শুরু না হওয়ায় তাঁদের মধ্যে ক্ষোভ দেখা দেয়। সকাল নয়টা থেকে ১০টার দিকে একপর্যায়ে কয়েকজন কৃষক গুদামের টিনের বেড়া ও দরজা ভেঙে ভেতরে ঢুকে সার নিয়ে যান। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওতে দেখা যায়, কয়েকজন কৃষক গুদামের বেড়া ও দরজা ভেঙে সার বের করছেন। কেউ মাথায় করে, আবার কেউ ভ্যানে করে বস্তা নিয়ে যাচ্ছেন। পরে পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে। তবে নিয়ে যাওয়া সার ফেরত পাওয়া যায়নি।
গুদামে ৭৫০ বস্তা সার ছিল জানিয়ে মেসার্স মিতা হাসান এন্টারপ্রাইজের ব্যবস্থাপক সাইফুল ইসলাম বলেন, সকালে প্রায় এক হাজার কৃষক সার নিতে লাইনে দাঁড়ান। কে আগে সার নেবেন, তা নিয়ে ধাক্কাধাক্কি শুরু হলে পরিস্থিতি সামাল দিতে তাঁরা থানা ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার (ইউএনও) কার্যালয়ে যান। এ সুযোগে কৃষকেরা গুদামের বেড়া ও দরজা ভেঙে এক থেকে দেড়শ’ বস্তা সার নিয়ে যান।
পুলিশ প্রশাসনের সহায়তায় গুদামে থাকা বাকি সার বিতরণ করা হয় বলে জানান সাইফুল ইসলাম। বিতরণের হিসাব শেষ হলে কত বস্তা সার নিয়ে যাওয়া হয়েছে, তা নিশ্চিত হওয়া যাবে। রৌমারী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) কাওসার আলী বলেন, সকালে সার বিতরণের সময় পুলিশকে জানানো হয়নি। এ সময় কৃষকেরা ক্ষুব্ধ হয়ে কয়েক বস্তা সার নিয়ে যান বলে কৃষি বিভাগ থেকে জানানো হয়। পরে ঘটনাস্থলে পুলিশ মোতায়েন করা হয়। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. মাহবুবুল হাসান বলেন, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরাও মাঠে কাজ করছেন। একটি সার বিক্রয়কেন্দ্রে কিছুটা বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হয়েছিল। পরে প্রশাসনের সদস্যরা ঘটনাস্থলে গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনেন।
ভূরুঙ্গামারীতে কৃষি কর্মকর্তা অবরুদ্ধ
সোনাহাট ইউনিয়নের পাটেশ্বরী ব্রিজপাড় এলাকায় সার না পাওয়ার আশঙ্কায় কৃষকরা সড়ক অবরোধ ও বিক্ষোভ করেন। এ সময় তারা উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা আব্দুল জব্বারকে ঘিরে রাখেন তারা। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, বেলা ১১টার দিকে বিএডিসি সার ডিলার আমজাদ হোসেনের মেসার্স আফি সার ঘরে সার বিতরণ শুরু হলে সেখানে বিপুলসংখ্যক কৃষক জড়ো হন। পরে খোলা বাজারে সার বিক্রির দাবিতে তারা সড়ক অবরোধ করেন তারা। খবর পেয়ে উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা আব্দুল জব্বার ক্ষুব্ধ কৃষকেরা তাঁকে অবরুদ্ধ করেন।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) অমৃত দেবনাথ এবং সহকারী কমিশনার (ভূমি) আমিনুল হক তারেকও পুলিশ নিয়ে ঘটনাস্থলে যান। খোলা বাজারে সার বিক্রির আশ্বাস দিলে পরিস্থিতি শান্ত হয়। পরে ৩৩৫ বস্তা ডিএপি, ৯৫ বস্তা টিএসপি ও ১৫৭ বস্তা এমওপি সার বিতরণ করা হয়। আর পুলিশ কৃষি কর্মকর্তা আব্দুল জব্বারকে অবরুদ্ধ অবস্থা থেকে উদ্ধার করে। ওই উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা বলেন, সোনাহাট ইউনিয়নের চারটি ওয়ার্ডের কৃষকদের মাঝে সার বিতরণ করার কথা ছিল। তবে ইউনিয়নটির বিভিন্ন ওয়ার্ড থেকে বিপুলসংখ্যক কৃষক সেখানে উপস্থিত হন। এ সময় বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হয়। ইউএনও অমৃত দেবনাথ বলেন, বর্তমানে পরিস্থিতি শান্ত রয়েছে। খোলা বাজারে সার বিক্রির বিষয়ে বিকেলে উপজেলা সার ও বীজ মনিটরিং কমিটির সভা করা হয়েছে। কমিটির সিদ্ধান্তে পরবর্তী কার্যক্রম সৃশৃঙ্খলভাবে করা হবে।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক আবদুল্লাহ আল মামুন বলেন, জেলায় পর্যাপ্ত সার রয়েছে। আগাম ভুট্টা ও বেগুন চাষের জন্য কৃষকরা বাড়তি সার মজুত করায় কোথাও কোথাও সাময়িক চাপ তৈরি হচ্ছে। সমন্বয়ের মাধ্যমে সার বিতরণের চেষ্টা চলছে।
ভূরুঙ্গামারী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আজিম উদ্দিন বলেন, উপজেলার কোনো না কোনো ইউনিয়নে প্রতিদিন সার নিয়ে কৃষকেরা বিক্ষোভ করছেন। কোথাও কোথাও সড়ক অবরোধও করছেন তাঁরা। এসব পরিস্থিতি সামাল দিতে পুলিশকে প্রতিদিনই যেতে হচ্ছে। ওসি বলেন, কৃষি বিভাগে কী পরিমাণ সার মজুত আছে এবং কৃষকদের চাহিদা কত, তা পরিষ্কারভাবে জানানো হলে এ ধরনের সমস্যা কমত। কৃষি বিভাগ পর্যাপ্ত সার থাকার কথা বলছে, অথচ কৃষকেরা সার না পেয়ে সড়ক অবরোধ করছেন। এতে পুলিশের অন্য কাজ ব্যাহত হচ্ছে।
পুঠিয়ায় মহাসড়ক অবরোধ
রাজশাহীর পুঠিয়ায় পর্যাপ্ত সার সরবরাহ নিশ্চিতকরণ ও খুচরা বাজারের সার সিন্ডিকেট ভাঙার দাবিতে মহাসড়ক অবরোধ করেন প্রায় তিন শতাধিক কৃষক। এতে রাজশাহী-ঢাকা রুটে সব ধরনের যান চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। ঘণ্টাব্যাপী অবরোধে মহাসড়কের দুই পাশে শত শত বাস, ট্রাক আটকা পড়ে দীর্ঘ যানজটের সৃষ্টি হয়। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, সকালে উপজেলার বানেশ্বর বাজারে সার ডিলারের দোকানের সামনে দীর্ঘ লাইন দিয়েও সার না পেয়ে ক্ষোভে ফেটে পড়েন কৃষকেরা। পরে তারা বানেশ্বর বাজারে জড়ো হয়ে বিক্ষোভ মিছিল এবং রাজশাহী-ঢাকা মহাসড়কে অবস্থান নিয়ে অবরোধ করেন।
আন্দোলনরত পুঠিয়ার বিড়ালদহ গ্রামের কৃষক আব্দুর রহিম (৪৫) বলেন, ‘আমন ধানের গাছে এখনই সার দেওয়ার আসল সময়। তিনদিন ধরে বানেশ্বর বাজারে ঘুরছি, ডিলার বলে, সার নাই। কিন্তু বাজারের খুচরা দোকানে গোপনে বেশি টাকা দিলেই সার পাওয়া যাচ্ছে। সরকারি দামে সার না পেলে আমাদের চাষবাস করে না খেয়ে থাকা লাগবে।’ আরেকজন কৃষক রফিকুল ইসলাম (৫০) বলেন, ‘ভোর ছয়টা থেকে লাইনে দাঁড়িয়ে আছি। ১০টার সময় ডিলার ওছমান আলী বলে সার শেষ। আমরা সার না পাই জমি রক্ষা করবো কেমনে? সিন্ডিকেট করে আমাদের পকেট কাটা চলছে, এর বিচার চাই।’
কৃষকদের দাবি, পর্যাপ্ত সরকারি বরাদ্দ থাকা সত্ত্বেও অসাধু সিন্ডিকেট কৃত্রিম সংকট তৈরি করছে। ন্যায্য মূল্যে প্রয়োজনীয় ইউরিয়া, টিএসপি ও ডিএপি সার না পাওয়া পর্যন্ত আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দেন তাঁরা। সংবাদ পেয়ে বেলা ১১টার দিকে স্থানীয় উপজেলা প্রশাসন ও থানা পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছে ক্ষুব্ধ কৃষকদের সঙ্গে আলোচনায় বসে। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) লিয়াকত সালমান বলেন, অসাধু ডিলারদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ এবং দ্রুত সময়ের মধ্যে নির্ধারিত মূল্যে সার সরবরাহ করা হবে। এই আশ্বাসে কৃষকেরা মহাসড়ক অবরোধ তুলে নেন। বেলা সাড়ে ১১টার পর থেকে মহাসড়কে যান চলাচল স্বাভাবিক হয়।
অন্যদিকে, কৃষকদের অভিযোগ অস্বীকার করেছেন স্থানীয় সার ডিলার ও রাজশাহী জেলা সার ও কীটনাশক কমিটির সভাপতি ওছমান আলী। সারের পর্যাপ্ত মজুদের দাবি জানিয়ে তিনি বলেন, ‘কৃষকরা ভিত্তিহীন অভিযোগে ঢাকা-রাজশাহী মহাসড়ক অবরোধ করে সাধারণ মানুষের জনদুর্ভোগ সৃষ্টি করছেন। আমাদের এখানে এখন পর্যন্ত ইউরিয়ার কোনো সংকট নাই। কারণ হচ্ছে, আমার কাছে এখনো এক হাজার ৪০ বস্তা অর্থাৎ ৫১ মেট্রিকটন ইউরিয়া সার মজুদ আছে। ডিএপি মজুদ আছে দেড় টন, এমওপি প্রায় এক টন, আর টিএসপি আছে ১.৬৫ মেট্রিক টন। তবে মাসের শেষ দিকে হওয়ায় নন-ইউরিয়ার মজুদ কমে গেছে।
লালমনিরহাটে ফের মহাসড়ক অবরোধ
আমন মৌসুমের ভরা সময়ে প্রয়োজনীয় সার না পাওয়ার অভিযোগে ফের রংপুর-কুড়িগ্রাম মহাসড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ করেছেন লালমনিরহাটের কৃষকেরা। ডিলারদের বিরুদ্ধে কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি, সিন্ডিকেট করে সার আটকে রাখা এবং সরকার নির্ধারিত মূল্যের চেয়ে বেশি দামে সার বিক্রির অভিযোগ তুলে সোমবার সড়ক অবরোধ করেন বিক্ষুব্ধ কৃষকেরা।
বেলা ১১টার দিকে সদর উপজেলার পঞ্চগ্রাম ইউনিয়নের ফকিরের তকেয়া এলাকায় মহাসড়কে গাছের গুঁড়ি ফেলে অবরোধ শুরু করেন কৃষকেরা। প্রায় এক ঘণ্টা মহাসড়কে যান চলাচল বন্ধ থাকায় উভয় পাশে যানবাহনের দীর্ঘ সারি তৈরি হয়। এতে চরম দুর্ভোগে পড়েন যাত্রী ও চালকেরা।
বিক্ষুব্ধ কৃষকেরা জানান, আমন ধানের জমিতে সার প্রয়োগের গুরুত্বপূর্ণ সময় চলছে। অথচ কয়েক দিন ধরে ডিলারদের কাছে ঘুরেও চাহিদা অনুসারে সার পাওয়া যাচ্ছে না। কোথাও সার পাওয়া গেলেও সরকার নির্ধারিত দামের চেয়ে বেশি টাকা নেওয়া হচ্ছে বলেও অভিযোগ তাঁদের। ফলে সময়মতো জমিতে সার প্রয়োগ করতে না পারায় ফলন নিয়ে শঙ্কায় পড়েছেন তাঁরা।
কৃষকদের অভিযোগ, সরকারিভাবে পর্যাপ্ত সার মজুদের কথা বলা হলেও বাস্তবে ডিলারের দোকানে গিয়ে সার পাওয়া যাচ্ছে না। তবে অতিরিক্ত টাকা দিলে গোপনে সার পাওয়া যাচ্ছে। এতে প্রকৃত কৃষকেরা বঞ্চিত হলেও একটি চক্র লাভবান হচ্ছে বলে অভিযোগ করেন তারা।
কৃষক সফিকুল ইসলাম (৭০) বলেন, ডিলাররা সিন্ডিকেট করে কৃত্রিম সংকট তৈরি করেছেন। সরকার নির্ধারিত দামের চেয়ে বেশি দামে সার বিক্রি করা হচ্ছে। প্রকৃত কৃষকেরা চাহিদামতো সার পাচ্ছেন না। অথচ বেশি টাকা দিলে কালোবাজারে সার পাওয়া যাচ্ছে। তিনি বলেন, ‘এখন আমনের ভরা মৌসুম। জমিতে সারের খুব প্রয়োজন। সার সংগ্রহ করতেই যদি দিনের পর দিন চলে যায়, তাহলে খেতে কাজ করব কখন? সময়মতো সার না পেলে ফসলের উৎপাদন ব্যাহত হবে।’ অন্য কৃষক রহমান (৬০) বলেন, ‘সরকার বলছে, সারের কোনো সংকট নেই এবং পর্যাপ্ত মজুদ রয়েছে। কিন্তু ডিলারের দোকানে গেলে বলা হচ্ছে, গুদামে সার নেই। অথচ বেশি দাম দিলে কালোবাজারে সার পাওয়া যাচ্ছে। এভাবে চলতে থাকলে কৃষক ও কৃষি দুটিই ক্ষতিগ্রস্ত হবে।
অবরোধ চলাকালে কৃষকেরা সার সরবরাহ নিশ্চিত এবং কথিত সার সিন্ডিকেট বন্ধের দাবিতে বিভিন্ন স্লোগান দেন। তাঁরা নিয়মিত ও ন্যায্যমূল্যে সার সরবরাহ নিশ্চিতের পাশাপাশি সার বিতরণে অনিয়মে জড়িতদেরও বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানান।
খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে ছুটে যান সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মনোনিতা দাস, কৃষি বিভাগের কর্মকর্তা, থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি)সহ প্রশাসনের কর্মকর্তারা। তাঁরা বিক্ষুব্ধ কৃষকদের সঙ্গে কথা বলে তাদের অভিযোগ ও দাবিগুলো শোনেন। পরে উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে কৃষকদের নিয়মতান্ত্রিকভাবে সার সরবরাহের আশ্বাস দেওয়া হলে পরিস্থিতি শান্ত হয়। প্রায় এক ঘণ্টা পর কৃষকেরা মহাসড়ক থেকে সরে গেলে যান চলাচল স্বাভাবিক হয়।
ইউএনও মনোনিতা দাস বলেন, ‘সারের কোনো সংকট নেই। কৃষকদের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনায় সার বিতরণের ব্যবস্থা করা হচ্ছে।’ প্রশাসনের পক্ষ থেকে আরও জানানো হয়, সার বিতরণে কোনো অনিয়ম বা সিন্ডিকেটের প্রমাণ পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
এর আগে গত রবিবারও লালমনিরহাটে সার সংকট ও ডিলারদের বিরুদ্ধে কৃত্রিম সংকট তৈরির অভিযোগে কৃষকেরা মহাসড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ করেছিলেন। একদিনের ব্যবধানে ফের একই দাবিতে মহাসড়ক অবরোধের ঘটনায় জেলার সার বিতরণ ব্যবস্থাপনা নিয়ে কৃষকদের মধ্যে ক্ষোভ আরও প্রকাশ্য হয়ে উঠেছে।
৭৬ বস্তা সার জব্দ
বগুড়ার ধুনটে সরকারি ভর্তুকির সার অবৈধভাবে মজুদ করে রাখার অভিযোগে চার ব্যবসায়ীকে এক লাখ ৫০ হাজার টাকা জরিমানা করেছেন ভ্রাম্যমাণ আদালত। একই সঙ্গে মজুদ করা ৭৬ বস্তা সার জব্দ করা হয়েছে। গতকাল দুপুরে উপজেলার মথুরাপুর ও খাদুলি চারমাথা বাজারে এ অভিযান পরিচালনা করেন উপজেলা নির্বাহী অফিসার আরিফ উল্লাহ নিজামী। এ সময় উপস্থিত ছিলেন উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা ছামিদুল ইসলাম।
কৃষকদের জন্য সরকারি ভর্তুকিতে দেওয়া সার। কৃষকের হাতে পৌঁছানোর কথা থাকলেও অভিযোগ উঠেছে, সেই সারই অবৈধভাবে মজুদ করে রেখেছিলেন কয়েকজন ব্যবসায়ী। এ অভিযোগের ভিত্তিতে অভিযানে খাদুলি চারমাথা বাজারের ব্যবসায়ী মোখলেসকে ৫০ হাজার, বেলাল হোসেনকে ৩০ হাজার এবং আব্দুল মোমিনকে ২০ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়।
এছাড়া মথুরাপুর বাজারের ব্যবসায়ী মোহসিন আলমকে ৫০ হাজার টাকা জরিমানা করেন ভ্রাম্যমাণ আদালত। এ সময় বেলাল হোসেনের দোকান থেকে ১৪ বস্তা, মোখলেসের কাছ থেকে ২৮ বস্তা, আব্দুল মোমিনের কাছ থেকে ১১ বস্তা এবং মোহসিন আলমের কাছ থেকে ২৩ বস্তা সার উদ্ধার করে জব্দ করা হয়। অভিযানে আব্দুল মোমিনের দোকানে মেয়াদোত্তীর্ণ কীটনাশকও পাওয়া যায়। পরে সেগুলো জব্দ করে ধ্বংস করা হয়।
উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা ছামিদুল ইসলাম বলেন, সরকারি ভর্তুকির সার অবৈধভাবে মজুদ ও অনিয়মের বিরুদ্ধে অভিযান অব্যাহত থাকবে।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









