বাচ্চাটার শ্বাসকষ্ট হচ্ছে। চিকিৎসক বলেছেন, আইসিইউ সাপোর্ট লাগবে। কিন্তু হাসপাতালে আইসিইউতে কোনো শয্যা খালি নেই। ১০ মাস বয়সী শিশুকে কোলে নিয়ে সিলেট শহীদ শামসুদ্দিন আহমদ হাসপাতালের মেঝেতে শুয়ে ছিলেন গৃহিণী সুহাদা বেগম।
গতকাল সোমবার দুপুর ১২টার দিকে হাসপাতালের হাম ওয়ার্ডে কথা হয় তাঁর সঙ্গে। তিনি বলেন, চার দিন আগে হাম সন্দেহে চার মাস বয়সী জমজ দুই সন্তানকে হাসপাতালে ভর্তি করেন। পরীক্ষায় দুজনের শরীরেই হাম শনাক্ত হয়।
সুহাদা বেগম এদিনকে বলেন, জ্বর-কাশি নিয়ে প্রথমে সন্তানদের গোয়াইনঘাট উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে যান। সেখানে দুই দিন চিকিৎসা নেওয়ার পরও অবস্থার উন্নতি হয়নি। পরে চিকিৎসকের পরামর্শে তাঁদের শহীদ শামসুদ্দিন আহমদ হাসপাতালে আনা হয়।
বিয়ানীবাজারের আলীনগরের বাসিন্দা সুহেদা আক্তারও তিন দিন ধরে দুই সন্তানকে নিয়ে এই হাসপাতালে আছেন। তাঁর বড় ছেলের বয়স চার বছর দুই মাস। তার হামের পাশাপাশি নিউমোনিয়াও ধরা পড়েছে। ছোট সন্তানের বয়স ১৮ মাস। তারও হামসহ অন্য রোগ রয়েছে। শয্যা না পেয়ে মেঝেতেই চলছে দুই শিশুর চিকিৎসা।
সুনামগঞ্জের দিরাইয়ের বাসিন্দা শেফালী বলেন, তাঁর ছেলের বয়স তিন বছর। তিন দিন ধরে হাসপাতালে ভর্তি। প্রচণ্ড শ্বাসকষ্ট নিয়ে সন্তানকে হাসপাতালে এনেছিলেন। চিকিৎসকেরা জানিয়েছেন, ধীরে ধীরে তার অবস্থার উন্নতি হচ্ছে।
১০০ শয্যায় রোগী ১৪৯
সোমবার (৭ সেপ্টেম্বর) শহীদ শামসুদ্দিন আহমদ হাসপাতালের হাম ওয়ার্ডে গিয়ে দেখা যায়, শয্যার সংকটে মায়েরা অসুস্থ শিশুদের নিয়ে মেঝেতে গাদাগাদি করে বসে আছেন। অনেকের ঠিকমতো শুয়ে থাকারও ব্যবস্থা নেই। একটি শয্যায় একাধিক রোগীকেও চিকিৎসা নিতে দেখা গেছে।
হাম ওয়ার্ডে ভর্তি অধিকাংশ শিশুর বয়স দুই বছরের কম। কারও এখনো টিকা নেওয়ার বয়স হয়নি, কেউ টিকা নেয়নি, আবার কেউ নিয়েছে মাত্র এক ডোজ। দুই ডোজ টিকা নেওয়ার পরও হামের উপসর্গ নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে কোনো কোনো শিশু।
হাসপাতালের আবাসিক চিকিৎসক ডা. খসরুজ্জামান রনি এদিনকে বলেন, হামে শুধু শিশুরাই নয়, বড়রাও আক্রান্ত হচ্ছেন। পরিস্থিতির এখনো কোনো পরিবর্তন হয়নি।
তিনি বলেন, সোমবার হাম সন্দেহে ৪৪ জন রোগী হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। সব মিলিয়ে ১০০ শয্যার বিপরীতে রোগী ভর্তি আছেন ১৪৯ জন। তার ভাষ্য, হাসপাতালে আসা অনেক শিশুই টিকা নেয়নি। কেউ কেউ এক ডোজ টিকা নিয়েছে। রোগীর চাপ বেড়ে যাওয়ায় চিকিৎসা দিতে কিছুটা বেগ পেতে হচ্ছে।
সিলেট বিভাগে হাম পরিস্থিতির চাপ শুধু শহীদ শামসুদ্দিন হাসপাতালেই সীমাবদ্ধ নেই। গতকাল সোমবার পর্যন্ত বিভিন্ন হাসপাতালে হামের চিকিৎসা নিচ্ছে ৪২১ জন। স্বাস্থ্য বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, এ পর্যন্ত সিলেট বিভাগে হামে মৃত্যু হয়েছে ১৫৮ জনের। তাঁদের মধ্যে ১০ জনের শরীরে হাম নিশ্চিত হয়েছিল।
টিকা দেওয়ার পরও সংক্রমণ
হাম পরিস্থিতির মধ্যে গত ২০ এপ্রিল থেকে ২০ মে পর্যন্ত দেশব্যাপী ৬ মাস থেকে ৫ বছর বয়সী শিশুদের জন্য হাম-রুবেলা টিকাদান ক্যাম্পেইন চালানো হয়। সিলেট বিভাগে লক্ষ্যমাত্রার প্রায় ৯৯ দশমিক ৪০ শতাংশ শিশুকে টিকা দেওয়া হয়েছে।
বিভাগের চার জেলা ও সিলেট সিটি করপোরেশনে মোট ১৩ লাখ ২৩ হাজার ৯৬৬ শিশুকে টিকা দেওয়ার লক্ষ্যমাত্রা ছিল। এর বিপরীতে টিকা পেয়েছে ১৩ লাখ ১৬ হাজার ৩১ জন। অর্থাৎ লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে ৭ হাজার ৯৩৫ জন কম শিশু টিকা পেয়েছে।
জেলা ও সিটি করপোরেশনভিত্তিক তথ্যে দেখা যায়, সুনামগঞ্জে লক্ষ্যমাত্রার ৯৯ দশমিক ৭৬ শতাংশ এবং হবিগঞ্জে ৯৯ দশমিক ১৬ শতাংশ শিশুকে টিকা দেওয়া হয়েছে। সিলেট জেলায় টিকাদানের হার ৯৮ দশমিক ৭৬ শতাংশ।
মৌলভীবাজারে লক্ষ্যমাত্রার চেয়েও বেশি শিশুকে টিকা দেওয়া হয়েছে। সেখানে ২ লাখ ৫ হাজার ১১৪ শিশুকে টিকা দেওয়ার লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে টিকা পেয়েছে ২ লাখ ৫ হাজার ৫৩৯ জন। কভারেজ ১০০ দশমিক ২১ শতাংশ।
সিলেট সিটি করপোরেশনেও লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে সামান্য বেশি টিকা দেওয়া হয়েছে। ৬৮ হাজার ৯৩৩ শিশুর লক্ষ্যমাত্রার বিপরীতে টিকা পেয়েছে ৬৮ হাজার ৯৪১ জন। কভারেজ ১০০ দশমিক ১ শতাংশ।
সিলেট বিভাগীয় স্বাস্থ্য পরিচালক ডা. মাহবুবুর রহমান এদিনকে বলেন, হাম একটি সংক্রামক রোগ। সাম্প্রতিক সময়ে এর প্রাদুর্ভাব ও রোগীর সংখ্যা কিছুটা বাড়ছে। টিকাদানের উপযুক্ত বয়স ও বয়সসীমার পার্থক্যের কারণে অনেক শিশু সময়মতো টিকা না পাওয়ায় সংক্রমণ ছড়াচ্ছে। তিনি বলেন, ‘বর্তমানে আমরা স্ক্রিনিং করে বাদ পড়া শিশুদের চিহ্নিত করছি।’
সম্প্রতি সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল পরিদর্শনে গিয়ে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন সাংবাদিকদের বলেন, চলতি মাসের শেষ দিকে দেশব্যাপী হামের বিশেষ টিকাদান কর্মসূচি শুরু হবে। অসচেতনতা ও তথ্যের অভাবে অনেক শিশু টিকা থেকে বাদ পড়েছে বলেও জানান তিনি।
হাসপাতালে রোগী ভর্তির সংখ্যা বাড়লেও বাড়েনি শয্যাসংখ্যা। ফলে অনেক রোগীর ঠাঁই হচ্ছে মেঝেতে, আবার কোথাও এক শয্যায় একাধিক রোগীকে চিকিৎসা নিতে হচ্ছে। স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন, হাম পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে টিকাদানের পাশাপাশি হাসপাতালে বাড়তি শয্যা ও প্রয়োজনীয় চিকিৎসাসুবিধা নিশ্চিত করা জরুরি।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









