বিদায়ের আনুষ্ঠানিকতা ছিল সাদামাটা, ছিল না বড় কোনো আয়োজন কিংবা মানুষের ঢল। তবে একজন সরকারি কর্মকর্তার প্রতি মানুষের শ্রদ্ধা, ভালোবাসা আর আক্ষেপে ভিন্ন মাত্রা পেয়েছে সেই বিদায়। বদলিজনিত কারণে সোমবার (৭ সেপ্টেম্বর) বাউফল উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) সোহাগ মিলু বিদায় নিয়েছেন।
মাত্র এক বছরের কিছু বেশি সময় বাউফলে দায়িত্ব পালন করেছেন তিনি। ২০২৫ সালের ২৪ আগস্ট সহকারী কমিশনার (ভূমি) হিসেবে যোগদানের পর দায়িত্ব পালন করেন ২০২৬ সালের ৭ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত। স্বল্প সময়ের এই কর্মকালেই সততা, নিষ্ঠা, বিনয় ও মানবিক আচরণের মাধ্যমে সাধারণ মানুষের আস্থা অর্জন করেছেন বলে স্থানীয়দের দাবি।
দায়িত্ব পালনকালে জেলার শ্রেষ্ঠ সহকারী কমিশনার হিসেবেও জেলা প্রশাসকের কাছ থেকে সম্মাননা পদক পেয়েছেন সোহাগ মিলু।
স্থানীয় বাসিন্দা রিপন হাওলাদার বলেন, “তিনি দায়িত্ব পালনে অত্যন্ত আন্তরিক ছিলেন। সাধারণ মানুষ সহজেই তার কাছে গিয়ে নিজেদের সমস্যার কথা বলতে পারতেন। বিশেষ করে সুবিধাবঞ্চিত মানুষ তার আচরণে স্বস্তি পেতেন।”
স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, কেউ কোনো অভিযোগ নিয়ে তার কাছে গেলে বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখতেন তিনি। প্রয়োজন হলে ঘটনাস্থলে গিয়ে পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করতেন। অভিযোগের পেছনে কোনো অসহায় মানুষের বাস্তব সমস্যা থাকলে মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি থেকে পাশে দাঁড়ানোর চেষ্টা করতেন।
সরকারি দায়িত্ব পালনে কঠোর অবস্থানের পাশাপাশি সাধারণ মানুষের সঙ্গে তার আচরণ ছিল নম্র ও বিনয়ী—এমনটাই বলছেন স্থানীয়রা। ভূমি সংক্রান্ত বিভিন্ন কাজে সাধারণ মানুষ তার কাছ থেকে সহযোগিতা পেয়েছেন বলেও জানান তারা।
তবে এমন একজন কর্মকর্তার বিদায়ের দিনটি প্রত্যাশা অনুযায়ী বর্ণিল হয়নি—এ নিয়ে স্থানীয়দের মধ্যে আক্ষেপ রয়েছে।
জানা গেছে, শুরুতে উপজেলা পরিষদ মিলনায়তনে বড় পরিসরে আনুষ্ঠানিক বিদায় অনুষ্ঠানের আয়োজনের কথা ছিল। সেখানে সহকর্মী, জনপ্রতিনিধি ও বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের উপস্থিতিতে সোহাগ মিলুকে বিদায় জানানোর পরিকল্পনা ছিল। কিন্তু শেষ পর্যন্ত সেই আয়োজন আর হয়নি। পরে ভূমি কার্যালয়ে সীমিত পরিসরে বিদায় অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়।
অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সালেহ আহমেদসহ ভূমি কার্যালয়ের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা।
স্থানীয়দের কেউ কেউ মনে করছেন, প্রশাসনিক নিয়মে একজন কর্মকর্তার বদলি ও বিদায় স্বাভাবিক বিষয় হলেও মানুষের সঙ্গে যিনি আন্তরিকভাবে কাজ করেছেন, তার বিদায়টা আরও একটু বড় পরিসরে এবং আন্তরিকভাবে হওয়া উচিত ছিল।
বদলির খবরে বাউফলের সুবিধাবঞ্চিত ও পিছিয়ে পড়া মানুষের মধ্যেও হতাশা দেখা দিয়েছে। তাদের অনেকের মতে, যিনি সাধারণ মানুষের কথা শুনেছেন এবং তাদের সমস্যাকে গুরুত্ব দিয়েছেন, তার বিদায় মানুষের উপস্থিতিতেই আরও স্মরণীয় হয়ে উঠতে পারত।
স্থানীয় এক বাসিন্দার ভাষায়, “বিদায়ের আয়োজন ছোট হতে পারে, কিন্তু মানুষের ভালোবাসা ছোট নয়।”
সোহাগ মিলুর বিদায় যেন সেই কথাটিই আরও একবার সামনে এনেছে। একজন কর্মকর্তা কতটা জাঁকজমকপূর্ণ আয়োজনে বিদায় নিলেন, তার চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে তিনি দায়িত্ব পালনকালে কতটা মানুষের হৃদয়ে জায়গা করে নিতে পেরেছেন।
বাউফল ছেড়ে নতুন কর্মস্থলের পথে পা বাড়িয়েছেন সোহাগ মিলু। সঙ্গে নিয়ে গেছেন দায়িত্ব পালনের নানা স্মৃতি। আর রেখে গেছেন এমন কিছু মানুষের ভালোবাসা, যাদের কাছে তিনি কেবল একজন সরকারি কর্মকর্তা ছিলেন না—ছিলেন আস্থার একজন মানুষ।
সাদামাটা সেই বিদায় হয়তো সময়ের সঙ্গে ম্লান হয়ে যাবে। কিন্তু একজন সৎ, বিনয়ী ও মানবিক কর্মকর্তার প্রতি বাউফলের মানুষের শ্রদ্ধা ও ভালোবাসার স্মৃতি থেকে যাবে দীর্ঘদিন।
সোহাগ মিলুর নতুন কর্মস্থলে সফলতা, সুস্বাস্থ্য ও সুন্দর ভবিষ্যৎ কামনা করেছেন বাউফলের সর্বস্তরের মানুষ।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









