মধ্যপ্রাচ্যে দীর্ঘদিন ধরে চলমান যুদ্ধের ব্যাপক প্রভাব পড়েছে বাংলাদেশে। হরমুজ প্রণালি বন্ধ থাকার কারণে জ্বালানি সরবরাহ ভীষণভাবে ব্যাহত হওয়ায় দেশের গ্যাস-বিদ্যুতের অবস্থা খুবই নাজুক। গ্যাসের অভাবে বন্ধ হয়ে গেছে বহু শিল্প কারখানা। বিদ্যুতেও চলছে লোডশেডিং। বিভিন্ন জায়গায় যোগাযোগ করেও যখন খুব বেশি একটা ফায়দা মিলছে না, ঠিক তখনই সরকার উদ্যোগ নিয়েছে দেশবাসীকে আশার আলো দেখানোর। ঘোষণা দিয়েছে ২০৩০ সালের মধ্যে নতুন ১০ হাজার মেগাওয়াট সৌর বিদ্যুৎ উৎপাদনে সক্ষমতা বাড়ানোর।
বাংলাদেশে সৌরবিদ্যুৎকে বিদ্যুতের প্রধান উৎসে পরিণত করা এখন সময়ের দাবি। অথচ দেশে মাত্র ১ হাজার ৭০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদিত হচ্ছে নবায়নযোগ্য উৎসগুলো থেকে, যা মোট বিদ্যুৎ উৎপাদনের মাত্র ৫ শতাংশের কাছাকাছি। অন্যদিকে পাকিস্তানে সৌরবিদ্যুতের (বিশেষ করে রুফটপ) উৎপাদন ইতিমধ্যে ছয় হাজার মেগাওয়াট অতিক্রম করেছে। এর মাধ্যমে পাকিস্তান বছরে প্রায় ১২ বিলিয়ন ডলার সাশ্রয়ে সক্ষম হচ্ছে। ভারতে নবায়নযোগ্য উৎসগুলো (সৌর, বায়ু, জলবিদ্যুৎসহ) থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনসক্ষমতা ২ লাখ ৭৪ হাজার মেগাওয়াট অতিক্রম করেছে, যার মধ্যে কেবল সৌরবিদ্যুৎ থেকেই আসছে দেড় লাখ মেগাওয়াটের বেশি। এমনকি ভিয়েতনামও তাদের বিদ্যুৎ চাহিদার ৩০ শতাংশ মেটাচ্ছে নবায়নযোগ্য উৎসগুলো থেকে।
বাংলাদেশের ‘সাসটেইনেবল অ্যান্ড রিনিউয়েবল এনার্জি ডেভেলপমেন্ট অথরিটি’ (স্রেডা) তাদের ‘ন্যাশনাল সোলার এনার্জি রোডম্যাপ’(২০২১-২০৪১)-এ ৩০ হাজার মেগাওয়াটের সোলার এনার্জির লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের সুপারিশ করেছে। এর মধ্যে ১২ হাজার মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ ছাদভিত্তিক সোলার প্যানেল থেকে আহরণের পরিকল্পনা রয়েছে। কিন্তু এই রোডম্যাপ ঘোষণার কয়েক বছর পার হলেও টার্গেট পূরণে উপযুক্ত কর্মসূচি গৃহীত হয়নি। বড় নগর ও মফস্বল শহরের ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান ও বসতবাড়িগুলোর ছাদ ব্যবহারের মাধ্যমে সাত থেকে আট হাজার মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন মোটেই অসম্ভব নয়। এ জন্য প্রয়োজন সোলার প্যানেল ও ব্যাটারির ওপর ভর্তুকি প্রদান, যন্ত্রপাতির শুল্ক হ্রাস এবং যুগোপযোগী ‘নেট মিটারিং’পদ্ধতি চালু করা।
২০২৪ সালে ভারতের সাধারণ নাগরিকদের বাড়ির ছাদে সৌরবিদ্যুৎ প্যানেল স্থাপনের জন্য ‘পিএম সূর্য ঘর যোজনা’(রুফটপ সোলার যোজনা) চালু করা হয়েছে। এই যোজনা অনুযায়ী, তিন কিলোওয়াট উৎপাদনক্ষমতার সোলার প্যানেল স্থাপনে প্রায় ১ লাখ ৪০ থেকে দেড় লাখ রুপি খরচ হয়। ভারত সরকার এতে সর্বোচ্চ ৭৮ হাজার রুপি পর্যন্ত ভর্তুকি দেয় এবং বাকি ব্যয়ভার ভোক্তাকে বহন করতে হয়। মোট এক কোটি পরিবারকে পিএম সূর্য ঘর যোজনায় অন্তর্ভুক্ত করার বিশাল পরিকল্পনা নিয়েছে ভারত। যোজনার এই পূর্ণাঙ্গ মডেলটি সরাসরি বাংলাদেশেও প্রয়োগযোগ্য।
বর্তমান সরকার নবায়নযোগ্য শক্তি বা সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনকে অগ্রাধিকার দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। কিন্তু এখন পর্যন্ত বেসরকারি ভবনগুলোতে ভারতের ‘পিএম রুফটপ সোলার যোজনা’র আদলে সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনে প্রণোদনা বা ভর্তুকি দেওয়ার সুনির্দিষ্ট নীতিমালা গ্রহণ করেনি।
সাম্প্রতিক বৈশ্বিক যুদ্ধ-সংঘাত ও ভূরাজনৈতিক উত্তেজনার পর বাংলাদেশের জ্বালানি পরিস্থিতি চরম বিপর্যয়ে পতিত হয়েছে। এলএনজিচালিত বেশির ভাগ বিদ্যুৎ প্ল্যান্ট বন্ধ থাকছে। দেশে প্রায় ২৭ হাজার মেগাওয়াট উৎপাদনসক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও দৈনিক উৎপাদন এখন ১৩ থেকে ১৪ হাজার মেগাওয়াটে সীমিত। এই সংকটের প্রধান কারণ আমদানিনির্ভর এলএনজিভিত্তিক জ্বালানিনীতি ও কয়লানির্ভর মেগা প্রকল্প। ওয়াকিবহাল মহলের ধারণা, কয়েকজন প্রভাবশালী এলএনজি আমদানিকারককে সুবিধা দিতেই বিগত সরকারের সময় এই ক্ষতিকর নীতি গৃহীত হয়েছিল।
বিদ্যুৎ খাতের জীবাশ্ম জ্বালানিনির্ভরতা থেকে মুক্তি পেতে চীন, ভারত ও ভিয়েতনামের সোলার সাফল্যের মডেল কাজে লাগিয়ে আমাদের সৌরবিদ্যুৎ নীতি অবিলম্বে ঢেলে সাজানো প্রয়োজন। ভারতের সূর্য ঘর যোজনার মতো মডেল বাংলাদেশেও বাড়ির মালিকদের উৎসাহিত করবে। চীন, ভারত, ভিয়েতনাম, থাইল্যান্ড, ফিলিপাইন ও জার্মানি ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনে অভাবনীয় সাফল্য পেয়েছে। সোলার প্যানেল, ব্যাটারিতে ভর্তুকি এবং ‘নেট মিটারিং’এ ক্ষেত্রে চাবিকাঠি হিসেবে কাজ করেছে। ‘নেট মিটারিং’প্রযুক্তি এখন চীন থেকে সুলভে আমদানি করা যায়, অথচ এ দেশে এর অগ্রগতি নগণ্য। সৌরবিদ্যুৎ এখন সবচেয়ে পরিবেশবান্ধব ও সাশ্রয়ী প্রযুক্তি। চীন, ভিয়েতনাম ও থাইল্যান্ডে এক ইউনিট সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন খরচ ইতিমধ্যে বাংলাদেশি টাকায় ১০ টাকার নিচে নেমেছে। ব্লুমবার্গের এক প্রতিবেদনে দেখানো হয়েছে, ২০৩০ সালে ১ মেগাওয়াট-ঘণ্টা সৌরবিদ্যুতের উৎপাদন খরচ হবে মাত্র ৪২ ডলার। বিপরীতে এলএনজিচালিত প্ল্যান্টে এর খরচ পড়বে ৯৪ ডলার এবং কয়লাভিত্তিক কেন্দ্রে ১১৮ ডলার।
বাংলাদেশে বিদ্যুৎ সংকট সমাধানের অংশ হিসেবে বিএনপি সরকার যে লক্ষ্য নিয়েছে, সেখানে ছাদভিত্তিক সৌর বিদ্যুৎ উৎপাদনকে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। ছাদে সৌর বিদ্যুৎ উৎপাদনকে উৎসাহিত করতে গ্রাহকের কাছ থেকে উৎপাদিত অতিরিক্ত বিদ্যুৎ সাড়ে ১০ টাকা দরে কেনারও ঘোষণা দিয়েছে সরকার। কিন্তু ছাদে বিদ্যুৎ উৎপাদন পরিকল্পনা কতটা সফল হবে সেটি নিয়ে নানা প্রশ্ন আছে এবং এই পরিকল্পনা বাস্তবায়নে কিছু চ্যালেঞ্জও রয়েছে বাংলাদেশে। গত ১ সেপ্টেম্বর সরকারি এক প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী, আগামী ছয় মাসের মধ্যে ছাদে সৌর বিদ্যুৎ উৎপাদন করে চাহিদার অতিরিক্ত বিদ্যুৎ গ্রিডে দিতে পারলে প্রতি ইউনিট ১০ টাকা ৫০ পয়সা দরে সাধারণের কাছ থেকে কিনে নেওয়ার ঘোষণা দেওয়া হয়েছে।
সরকারি প্রজ্ঞাপনে বলা হয়েছে, যেসব গ্রাহক ২০২৭ সালের ফেব্রুয়ারি মাসের মধ্যে ছাদভিত্তিক সোলার বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে পারবে, তাদের কাছ থেকে তিন বছর এই বিদ্যুৎ কেনা হবে। বিদ্যমান নেট এনার্জি মিটারিং পদ্ধতিতে বিতরণ সংস্থাগুলো এই বিদ্যুতের হিসাব রাখবে এবং তিন মাস অন্তর প্রণোদনার অর্থ দেওয়া হবে। বিদ্যুৎ বিভাগের নবায়নযোগ্য জ্বালানি উন্নয়ন কৌশলপত্র অনুযায়ী, ছাদে উৎপাদন হবে ৫৫০০ মেগাওয়াট, আর ভূমিভিত্তিক ৪৫০০ মেগাওয়াট। সরকারি-বেসরকারি আবাসিক ও শিল্প খাতের ভবনের ছাদ ব্যবহার করে এই বিদ্যুৎ উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা নিয়ে নানা প্রশ্ন সামনে আনছেন নবায়নযোগ্য জ্বালানি নিয়ে কাজ করা অ্যাক্টিভিস্ট, ব্যবসায়ী ও শিল্পমালিকরা।
সৌরবিদ্যুতের প্রসারে ১৫০০ কোটি টাকা ঋণ দিচ্ছে সরকার
বিদ্যুৎ উৎপাদনে জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরতা হ্রাস এবং নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতের প্রসারে সরকারি-বেসরকারি তিন প্রতিষ্ঠানকে ১ হাজার ৫০০ কোটি টাকা ঋণ দিচ্ছে সরকার। প্রতিষ্ঠানগুলো এই ঋণ থেকে বিভিন্ন গ্রাহককে ঋণ দেবে। এ ঋণের সুদের হার হবে সর্বোচ্চ ৬ শতাংশ। প্রতিষ্ঠান তিনটি হলো-ইনফ্রাস্ট্রাকচার ডেভেলপমেন্ট কোম্পানি লিমিটেড (ইডকল), বাংলাদেশ ইনফ্রাস্ট্রাকচার ফাইন্যান্স ফান্ড লিমিটেড (বিআইএফএফএল) এবং পল্লী কর্ম-সহায়ক ফাউন্ডেশন (পিকেএসএফ)। প্রতিটি প্রতিষ্ঠানকে ৫০০ কোটি টাকা করে দীর্ঘমেয়াদি ঋণ প্রদান করা হবে। অর্থ মন্ত্রণালয়ের অর্থ বিভাগ থেকে এ সংক্রান্ত একটি সরকারি পরিপত্র জারি করা হয়েছে। অর্থ মন্ত্রণালয় বলছে, এই ১৫০০ কোটি টাকার ঋণের মধ্যে ১০০০ কোটি টাকা ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে মাইক্রো-স্মল-মিডিয়াম (এমএসএমই) খাতের জন্য সংরক্ষিত থাকা বরাদ্দ থেকে পুনর্বিন্যাস করা হবে। অবশিষ্ট ৫০০ কোটি টাকা পরিচালন ঋণ থেকে সংস্থান করা হবে।
সরকারি পরিপত্রে এই বিশেষ তহবিল গঠন ও ঋণ প্রদানের পেছনে কয়েকটি প্রধান কারণ ও লক্ষ্য তুলে ধরা হয়েছে। এতে বলা হয়, বিদ্যুৎ উৎপাদনে আমদানিনির্ভর জীবাশ্ম জ্বালানির উচ্চমাত্রার ব্যবহারের ফলে বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি পেয়েছে, সরকারের ওপর ভর্তুকির চাপ বেড়েছে এবং জাতীয় জ্বালানি নিরাপত্তার ক্ষেত্রে ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। জাতীয় নবায়নযোগ্য জ্বালানি উন্নয়ন কৌশলপত্র (২০২৫-২০৩০) অনুযায়ী, ২০৩০ সালের মধ্যে দেশের মোট বিদ্যুৎ উৎপাদনের অন্তত ২০ শতাংশ নবায়নযোগ্য জ্বালানি থেকে অর্জনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছে সরকার। এই লক্ষ্যে পৌঁছাতে এ উদ্যোগ নিয়েছে সরকার।
নবায়নযোগ্য জ্বালানি প্রযুক্তি স্থাপন অত্যন্ত ব্যয়বহুল হওয়ায় এতে বিনিয়োগ উৎসাহিত করতে সহজ শর্তে, স্বল্প সুদে এবং দীর্ঘমেয়াদে অর্থপ্রবাহ নিশ্চিত করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। প্রজ্ঞাপনে নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতে দেওয়া এই ঋণের ব্যবহার ও নীতিমালা কিছু দিকনির্দেশনাও দেওয়া হয়েছে। এতে বলা হয়, সরকার অংশগ্রহণকারী তিনটি প্রতিষ্ঠানকে যে ঋণ দিচ্ছে তার বার্ষিক সুদ হার হবে মাত্র ০.৫ শতাংশ হারে। আর ঋণের মেয়াদ হবে ১০ বছর, যার মধ্যে ১ বছরের গ্রেস পিরিয়ড অন্তর্ভুক্ত থাকবে। প্রতিষ্ঠানগুলো সুবিধাভোগী বা গ্রাহক পর্যায়ে সর্বোচ্চ বার্ষিক ৬ শতাংশ হারে এই ঋণ বিতরণ করবে। ঋণের ক্ষেত্রে কিছু বিধিনিষেধও দেওয়া হয়েছে। এতে বলা হয়, ঋণের অর্থ কোনোভাবেই পুরনো ঋণ পরিশোধ, শেয়ার বা জমি ক্রয়, ব্যক্তিগত ভোগ কিংবা প্রশাসনিক ব্যয়ে ব্যবহার করা যাবে না।
সৌরবিদ্যুতের সরঞ্জাম আমদানিতে বড় করছাড়
সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়াতে এ খাতের প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি ও যন্ত্রাংশ আমদানিতে শুল্ক-কর আরো কমিয়েছে সরকার। নতুন সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, এসব সরঞ্জাম আমদানিতে মোট করভার ১৭ শতাংশ থেকে কমিয়ে মাত্র ১ শতাংশ করা হয়েছে। একইসঙ্গে বাণিজ্যিক আমদানিকারকদের জন্যও শর্তসাপেক্ষে এ সুবিধা দেওয়া হয়েছে। গত ১৬ সেপ্টেম্বর জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানিয়েছে। এনবিআর বলছে, বর্তমান বৈশ্বিক জ্বালানি সংকট ও দেশের বিদ্যুৎ ঘাটতির প্রেক্ষাপটে সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন দ্রুত সম্প্রসারণের লক্ষ্যেই এ সুবিধা বাড়ানো হয়েছে। নতুন সুবিধা প্রজ্ঞাপন জারির তারিখ থেকে ১৮০ দিন কার্যকর থাকবে। এর আগে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের বাজেটে প্রজ্ঞাপন জারি করে সৌরবিদ্যুৎ খাতের গুরুত্বপূর্ণ উপকরণ আমদানিতে আমদানি শুল্ক, রেগুলেটরি শুল্ক ও আগাম কর থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছিল। ফলে এসব পণ্য আমদানিতে ১৫ শতাংশ মূল্য সংযোজন কর (মূসক) ও ২ শতাংশ অগ্রিম আয়করসহ মোট করভার ছিল ১৭ শতাংশ। নতুন সিদ্ধান্তে এই করভার আরো কমানো হয়েছে। এখন সৌরবিদ্যুৎ সংশ্লিষ্ট যন্ত্রপাতি ও যন্ত্রাংশ আমদানিতে ১ শতাংশের অতিরিক্ত কাস্টমস ডিউটি, রেগুলেটরি ডিউটি, সম্পূরক শুল্ক, মূসক, আগাম কর এবং অগ্রিম আয়কর থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে। ফলে সব মিলিয়ে আমদানিকারকের ওপর করভার থাকবে মাত্র ১ শতাংশ।
বাণিজ্যিক আমদানিকারকরাও সুবিধা পাবেন
এবারের সিদ্ধান্তের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো— শুধু নির্দিষ্ট প্রকল্প বা ব্যবহারকারীর জন্য নয়, শর্তসাপেক্ষে বাণিজ্যিক আমদানিকারকদের জন্যও এ সুবিধা প্রযোজ্য হবে। এনবিআর জানিয়েছে, আগে বাণিজ্যিক আমদানিকারকদের মাধ্যমে সৌরবিদ্যুৎ সংশ্লিষ্ট যন্ত্রপাতি ও যন্ত্রাংশ আমদানিতে এই বিশেষ সুবিধা প্রযোজ্য ছিল না। নতুন সিদ্ধান্তের ফলে নির্ধারিত শর্ত পূরণ সাপেক্ষে বাণিজ্যিক আমদানিকারকরাও ১ শতাংশ করভারেই এসব উপকরণ আমদানি করতে পারবেন।
কমবে সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্পের ব্যয়
এনবিআরের মতে, আমদানি পর্যায়ে করভার কমানোর ফলে সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্পের সামগ্রিক ব্যয় কমবে। এতে নতুন সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্প স্থাপনে বিনিয়োগ বাড়ার পাশাপাশি বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা দ্রুত বাড়ানোর সুযোগ তৈরি হবে। দেশে বিদ্যুৎ উৎপাদনে দীর্ঘদিন ধরে গ্যাস, কয়লা ও তেলসহ জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরতা রয়েছে। আমদানি করা জ্বালানির দাম ও সরবরাহের ওপর নির্ভরতার কারণে বৈশ্বিক বাজারের অস্থিরতা দেশের জ্বালানি খাতেও প্রভাব ফেলে। এ অবস্থায় সৌরবিদ্যুৎকে তুলনামূলকভাবে নিরাপদ ও টেকসই জ্বালানি উৎস হিসেবে সম্প্রসারণের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। এনবিআর বলছে, সৌরবিদ্যুৎ খাতের যন্ত্রপাতি আমদানিতে করভার কমানোর ফলে নবায়নযোগ্য জ্বালানির ব্যবহার বাড়বে। একই সঙ্গে জীবাশ্ম জ্বালানির ওপর নির্ভরতা কমিয়ে দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা জোরদার করা এবং দীর্ঘমেয়াদে টেকসই অর্থনৈতিক উন্নয়নে সহায়তা করবে এ উদ্যোগ। তবে নতুন সুবিধাটি স্থায়ী নয়। প্রজ্ঞাপন জারির দিন থেকে ১৮০ দিনের জন্য কার্যকর থাকবে এ করছাড়। ফলে আগামী কয়েক মাসে সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্পের যন্ত্রপাতি আমদানি ও নতুন প্রকল্প স্থাপনের ক্ষেত্রে এ সুবিধার প্রভাব কতটা পড়ে, সেটিই এখন দেখার বিষয়।
স্থানীয় সরকারের সব প্রতিষ্ঠানের ছাদে বাধ্যতামূলক হচ্ছে সৌর প্যানেল
প্যানেলে উৎপাদিত বিদ্যুৎ দিয়ে নিজস্ব চাহিদা মেটাবে প্রতিষ্ঠানগুলো। উদ্বৃত্ত বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে সরবরাহ করে প্রতিষ্ঠানগুলো আয় করতে পারবে। স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম বলেন, ‘স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলো মানুষের দৈনন্দিন সেবার সঙ্গে সরাসরি যুক্ত। আমরা চাই, বিদ্যুতের সমস্যায় এসব সেবা যেন ব্যাহত না হয়। ভবনের ছাদ কাজে লাগিয়ে নিজেদের বিদ্যুৎ উৎপাদন করলে খরচ কমবে। ব্যাটারি ব্যাকআপ জরুরি কাজ চালু রাখতে সহায়তা করবে। আবার বাড়তি বিদ্যুৎ গ্রিডে দিয়ে প্রতিষ্ঠানগুলো আয় করতে পারবে। শহর থেকে ইউনিয়ন পর্যন্ত এই উদ্যোগ বাস্তবায়ন করে আমরা স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানগুলোকে আরো সক্ষম করতে চাই।’
১৪ ও ১৫ সেপ্টেম্বর স্থানীয় সরকার বিভাগের পৃথক চিঠিতে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর ভবনে ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ স্থাপন বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। সঙ্গে রাখতে বলা হয়েছে অন্তত দুই ঘণ্টার ব্যাটারি ব্যাকআপ। দেশে বিদ্যুৎ-সংকটের মধ্যে স্থানীয় সরকার বিভাগ এই উদ্যোগ নিয়েছে। উদ্যোগটি সিটি করপোরেশন, পৌরসভা, জেলা পরিষদ, উপজেলা পরিষদ ও ইউনিয়ন পরিষদ পর্যন্ত বাস্তবায়ন হবে। স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয় সূত্র বলছে, নিজস্ব বিদ্যুৎ উৎপাদনের পাশাপাশি প্রতিষ্ঠানগুলোর রাজস্ব আয় বাড়ানোর বিষয়টি নতুন এই নির্দেশনায় গুরুত্ব পেয়েছে। আগামী বছরের জানুয়ারির মধ্যে এসব প্রতিষ্ঠানে সৌরবিদ্যুৎ স্থাপন করার নির্দেশনা দেওয়া হবে বলে গণমাধ্যমকে জানিয়েছেন স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী মীর শাহে আলম।
সিটি করপোরেশনগুলোকে পাঠানো চিঠিতে নিজস্ব ভবন, আঞ্চলিক নির্বাহী কর্মকর্তাদের কার্যালয়, বাসভবন, মিলনায়তন, ডাকবাংলো ও অতিথিশালার ছাদে সৌরবিদ্যুৎ স্থাপনের কথা বলা হয়েছে। করপোরেশনের অধীন মার্কেট–হাটবাজারের স্থায়ী শেডে আয়তন বিবেচনায় এই ব্যবস্থা নিতে হবে। পৌরসভা ও জেলা পরিষদের ভবন, মিলনায়তন, ডাকবাংলোসহ অধীনস্থ মার্কেট–হাটবাজারের স্থায়ী শেড এই নির্দেশনার আওতাভুক্ত। উপজেলা পরিষদ ভবনের পাশাপাশি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ও চেয়ারম্যান বা প্রশাসকের বাসভবন, কর্মচারীদের আবাসিক ভবন এবং অধীনস্থ হাটবাজারের স্থায়ী শেডে সৌরবিদ্যুৎ স্থাপন করতে হবে। ইউনিয়ন পরিষদের ভবনগুলোর ক্ষেত্রে এই নির্দেশনা বাস্তবায়নের জন্য জেলা প্রশাসকদের চিঠি দেওয়া হয়েছে। অর্থায়নের ক্ষেত্রে প্রতিষ্ঠানের সক্ষমতা বিবেচনা করা হয়েছে। যেমন—আর্থিকভাবে স্বয়ংসম্পূর্ণ প্রতিষ্ঠানগুলো নিজেদের রাজস্ব কিংবা বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচির অর্থ এই খাতে ব্যয় করতে পারবে। আবার যেসব প্রতিষ্ঠান আর্থিকভাবে স্বয়ংসম্পূর্ণ নয়, সেগুলো বিদ্যুৎ বিতরণকারী প্রতিষ্ঠানের তালিকাভুক্ত কোম্পানির আর্থিক–কারিগরি সহায়তায় কার্যক্রম বাস্তবায়ন করবে। এ ক্ষেত্রে জাতীয় রুফটপ সোলার কর্মসূচির নির্দেশিকা অনুসরণ করতে হবে। প্যানেল স্থাপনকারী কোম্পানির সঙ্গে পরবর্তী ২০ বছরের মেরামত–রক্ষণাবেক্ষণের জন্য নন-জুডিশিয়াল স্ট্যাম্পে চুক্তি করার নির্দেশনা রয়েছে।
সৌরবিদ্যুতে ঝুঁকছে বড় শিল্পগোষ্ঠী
দেশের অন্যতম শীর্ষস্থানীয় শিল্পগোষ্ঠী ডিবিএল গ্রুপ তাদের ৭টি তৈরি পোশাক ও টেক্সটাইল কারখানার ছাদে ৫ দশমিক ৫ মেগাওয়াট ক্ষমতার সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদন ইউনিট স্থাপন করেছে। পাশাপাশি নতুন করে সিরামিক, তৈরি পোশাকসহ ১০টি কারখানায় ১৬ মেগাওয়াটের সৌরবিদ্যুৎ বসানোর পরিকল্পনা নিয়েছে তারা। এর মধ্যে চলতি বছর উৎপাদনে আসবে ৮ মেগাওয়াট। বাকিটা আগামী বছর। জানতে চাইলে ডিবিএল গ্রুপের ভাইস চেয়ারম্যান এম এ রহিম বলেন, আমাদের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের জ্বালানিনিরাপত্তা ও বিদেশি ক্রেতাদের কার্বন নিঃসরণের চাপ থাকায় আমরা দ্রুত সৌরবিদ্যুতে বিনিয়োগ করছি। নতুন প্রযুক্তি আসায় এখন সৌরবিদ্যুৎ স্থাপনে আগের চেয়ে সময় কম লাগছে। কারখানার ছাদের সৌরবিদ্যুতে প্রতি ইউনিটে খরচ পড়ছে ৬ থেকে সাড়ে ৬ টাকা।
ডিবিএল গ্রুপের মতো বড় শিল্পকারখানাগুলো এখন দ্রুতগতিতে সৌরবিদ্যুতের দিকে ঝুঁকছে। গত দশকে সরকারের নীতি ও বিদেশি ক্রেতাদের কার্বন নিঃসরণ কমানোর চাপে পড়ে সৌরবিদ্যুৎ স্থাপন শুরু হয়। জ্বালানিসংকট প্রকট হওয়ার পাশাপাশি জ্বালানির দাম বাড়তে থাকায় তিন বছর ধরে সৌরবিদ্যুতে বিনিয়োগ বাড়াচ্ছে বড় বড় শিল্পগোষ্ঠী। সৌরবিদ্যুৎ স্থাপনের সঙ্গে যুক্ত একাধিক প্রতিষ্ঠানের কর্তাব্যক্তিরা জানান, শিল্পকারখানার ছাদে সৌরবিদ্যুতের যতগুলো বড় প্ল্যান্ট হয়েছে, তার অধিকাংশই হয়েছে গত দুই বছরে। ইতিমধ্যে বিভিন্ন শিল্পকারখানায় ৬০০ মেগাওয়াটের বেশি উৎপাদনক্ষমতার সৌরবিদ্যুৎ ইউনিট স্থাপিত হয়েছে। তার মধ্যে বেশির ভাগই রপ্তানিমুখী তৈরি পোশাকশিল্পে। যদিও ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ–শিল্পের বিদ্যুতের পুরো চাহিদা পূরণ করতে পারে না। তবে কারখানার তিন–চার ঘণ্টা পর্যন্ত কার্যক্রম সচল রাখতে সহায়তা করে। সৌরবিদ্যুতের মাধ্যমে কারখানার মোট বিদ্যুৎ–চাহিদার ৫-১৫ শতাংশ পর্যন্ত পূরণ হয়। যদিও কারখানাভেদে এই হার বেশিও হয়। ফলে দিনের বেলায় জাতীয় গ্রিডের বিদ্যুতের ওপর চাপ কিছুটা হলেও কমাতে পেরেছে এসব শিল্পকারখানার ছাদভিত্তিক সৌরবিদ্যুৎ—এমনটাই জানান সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের সঙ্গে যুক্ত শিল্পের কর্তাব্যক্তিরা।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, আবুল খায়ের স্টিল, ওয়ালটন, হা-মীম গ্রুপ, প্রাণ–আরএফএল গ্রুপ, বিএসআরএম, ইয়ংওয়ান গ্রুপ, মেঘনা গ্রুপ অব ইন্ডাস্ট্রিজ (এমজিআই), প্যাসিফিক জিনস গ্রুপ, টিম গ্রুপ, ডিবিএল গ্রুপ, রাইজিং গ্রুপ, ঊর্মি গ্রুপ, মাইক্রোফাইবার গ্রুপ, পলমল গ্রুপ, অ্যাপেক্স ফুটওয়্যার, কর্ণফুলী শু ইন্ডাস্ট্রিজ, মাসকো গ্রুপসহ বিভিন্ন শিল্পপ্রতিষ্ঠান ইতিমধ্যে তাদের কারখানায় বিভিন্ন ক্ষমতার সৌরবিদ্যুৎ ইউনিট স্থাপন করেছে।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









