২০২৪ সালের ৫ আগস্ট রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর বাংলাদেশে শুরু হয়েছিল এক নতুন অধ্যায়। সেই উত্তাল সময়ে রাজধানীর ধানমন্ডি ৩২ নম্বর থেকে প্রত্যন্ত অঞ্চল পর্যন্ত আওয়ামী লীগের অফিস থেকে শুরু করে পালিয়ে যাওয়া নেতা-কর্মীদের বাসাবাড়ি বুলডোজার চালিয়ে গুঁড়িয়ে দেওয়ার সময় উল্লাস করেছিল বহু মানুষ। তখনকার প্রেক্ষাপটে সেই ভাঙচুরের উৎসবে যারা হাততালি দিয়েছিল, তারা হয়তো বুঝতে পারেনি যে এই ‘বুলডোজার ভূত’ একদিন সাধারণ মানুষের জীবনেও চেপে বসবে।
ভাঙচুরের সেই ভারী যান বা বুলডোজার একসময় যা পলাতক আওয়ামী লীগের ওপর ক্ষোভ প্রকাশের মাধ্যম ছিল, তা এখন দেশজুড়ে পরিণত হয়েছে সাধারণ মানুষের আতঙ্কে। যার সর্বশেষ নজির দেখা গেছে মিরপুরের রাড্ডা নামক স্বাস্থ্যকেন্দ্রটি দখল-চেষ্টায়। এর আগেও সাধারণ মানুষের বাড়িঘর, প্লট দখলেও দেখা গেছে বুলডোজার, ভেকু বা এস্কেভেটরের ব্যবহার।
অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে ধানমন্ডি ৩২ নম্বরের বাড়িটি গুঁড়িয়ে দিতে ব্যবহার করা হয়েছিল ভারী ক্রেন ও বুলডোজার। তারপর একে একে তা ভেঙে দিতে থাকে জনরোষে ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগের বিভিন্ন কার্যালয় ও পলাতক নেতাদের বাড়িঘর-ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান। রাজনৈতিক ক্ষোভের বশে চালানো সেই বুলডোজার-অভিযানের সময় উল্লাস ও মিষ্টি বিতরণের দৃশ্যও দেখা গিয়েছিল। সে সময় রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা সতর্ক করে বলেছিলেন, বিচারবহির্ভূত বা বেআইনি উপায়ে যেকোনো স্থাপনা বুলডোজার দিয়ে গুঁড়িয়ে দেওয়ার এই উন্মাদনা সমাজে এক ভয়ানক অরাজকতার বীজ বপন করছে, যা শেষ পর্যন্ত সাধারণ মানুষের জানমালের নিরাপত্তাকেও হুমকির মুখে ফেলবে।
কিছুদিন যেতে না যেতেই সেই বুলডোজার মগজে গেঁথে যায় একশ্রেণির দখলবাজের। তারা প্রতিপক্ষের বাড়িঘর কিংবা প্লট দখলের উত্তম হাতিয়ার হিসেবে বেছে নেয় এই বুলডোজারকে। অনেক সময় বুলডোজার না মিললেও হাতের কাছে পাওয়া সহজলভ্য ভেকু বা এস্কেভেটরও পরিচিত হয়ে ওঠে ‘বুলডোজার’ নামে। এভাবেই চলে আসছিল গত কিছুদিন ধরে। যার সর্বশেষ অধ্যায় রাজধানীর মিরপুর ১ নম্বর সেকশনে অবস্থিত প্রায় অর্ধশত বছরের পুরনো সেবামূলক স্বাস্থ্যকেন্দ্র রাড্ডা এমসিএইচ-এফপি সেন্টার ভেঙে গুঁড়িয়ে দেওয়ার ঘটনা। গত সপ্তাহে রাতের আঁধারে ভারী যন্ত্রপাতি ও বুলডোজার ব্যবহার করে এই স্বাস্থ্যকেন্দ্রটির একটি পাকা ও তিনটি সেমিপাকা ভবন পুরোপুরি গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়।
সংস্থার দায়িত্বশীলদের তথ্য অনুযায়ী, জমি দখলের উদ্দেশ্যে চালানো এই বর্বরোচিত হামলায় হাসপাতালটির মূল্যবান আল্ট্রাসনোগ্রাম মেশিন, টিকাদানের সামগ্রী, জেনারেটর, এসি, ফ্রিজ ও ওষুধপত্র লুটপাট করা হয়। প্রায় দেড় কোটি টাকার এই ধ্বংসযজ্ঞের পর হামলাকারীরা সেখানে সমমনা দোকানদার সমিতির নামে সাইনবোর্ড ঝুলিয়ে দেয়। রাজনৈতিক পরিচয়ের সুবাদে দুর্বৃত্তরা শিশুদের টিকাদান কেন্দ্রও বুলডোজার দিয়ে মাটির সাথে মিশিয়ে দিতে কুণ্ঠা বোধ করেনি।
বিশ্লেষকদের মতে, রাষ্ট্র বা সমাজে যখন বেআইনি ভাঙচুরকে রাজনৈতিক বা অন্য কোনো অজুহাতে বৈধতা দেওয়া হয় বা সমাজ তা দেখে নীরব থাকে, তখন অপরাধী চক্র আরো বেপরোয়া হয়ে ওঠে। তবে মিরপুরের এই ঘটনা দেশকে এমনভাবে নাড়িয়ে দেয় যে, স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী ও বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান নিজ দলের দখলবাজদের বিরুদ্ধে কঠোর-কঠিন সাংগঠনিক ও আইনি পদক্ষেপ নিয়েছেন। পুলিশ ইতোমধ্যে জড়িত সন্দেহে কয়েকজনকে গ্রেপ্তার করে আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠিয়েছে। এমপি পদ হারিয়েছেন সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য ফেরদৌসী আহমেদ মিষ্টি। তবু প্রশ্ন থেকে যায়—এই ধ্বংসাত্মক মানসিকতা রোধ না করলে সাধারণ মানুষের জীবনের নিরাপত্তা কোথায় গিয়ে ঠেকবে?
আজ উল্লাসের সেই বুলডোজার যখন সাধারণ মানুষের হাসপাতাল ভেঙে গুঁড়িয়ে দেয়, তখন সমাজের বোধসম্পন্ন মানুষের বুঝতে বাকি থাকে না যে—অবিবেচকের মতো ধ্বংসের সংস্কৃতি দিনশেষে পুরো জাতির জন্যই বড় বুমেরাং হয়ে ফিরে আসে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, সমাজ বা রাষ্ট্রে যখন কোনো আইনি প্রক্রিয়াকে পাশ কাটিয়ে বলপ্রয়োগ বা মব জাস্টিসের মাধ্যমে যেকোনো স্থাপনা গুঁড়িয়ে দেওয়াকে একধরনের ‘স্বাভাবিক ঘটনা’হিসেবে মেনে নেওয়া হয়, তখন অপরাধী চক্র ও দখলদাররা আরো বেপরোয়া হয়ে ওঠে। একসময় তা মিরপুরের মতো জনকল্যাণমূলক স্বাস্থ্যকেন্দ্রেও আঘাত হানার সাহস জোগায়।
জনস্বাস্থ্য ও সমাজ উন্নয়ন বিশেষজ্ঞদের মতে, রাজনৈতিক প্রতিশোধের বুলডোজার আজ ভূমিদস্যুরা জমি-সংক্রান্ত বিরোধেও ব্যবহার করায় তা এখন সাধারণ মানুষকে সরাসরি আঘাত হানছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, সরকার বা নীতিনির্ধারকরা যদি এ ধরনের অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের পেছনে থাকা রাঘব বোয়াল বা মূল ইন্ধনদাতাদের (রাজনৈতিক পরিচয় নির্বিশেষে) আইনের আওতায় না এনে কেবল দায়সারাভাবে কুলি বা দিনমজুর গোছের লোকজনকে গ্রেপ্তার করে সন্তুষ্ট থাকে, তাহলে এই সংস্কৃতি বন্ধ হবে না। অপরাধীদের দলীয় বা রাজনৈতিক পরিচয় না দেখে এবং তাদের শুধু দল থেকে বহিষ্কার না করে দৃষ্টান্তমূলক আইনি শাস্তিও নিশ্চিত করার ওপর জোর দিতে হবে।
তাঁরা আরো বলছেন, এ ধরনের বেআইনি হামলা ও দখলদারির সংস্কৃতি চলতে থাকলে দেশি-বিদেশি কোনো দাতা সংস্থা, বেসরকারি প্রতিষ্ঠান বা উদ্যোক্তারা জনকল্যাণমূলক খাতে বা অবকাঠামো উন্নয়নে বিনিয়োগে সাহস পাবেন না। তারা নিরাপদ পরিবেশের অভাবে পিছিয়ে যাবেন, যার ফলে সার্বিক সামাজিক উন্নয়ন বাধাগ্রস্ত হবে। আর উঠতি অপরাধী চক্র ও দখলবাজদের দমানো না গেলে সমাজে ‘জোর যার মুল্লুক তার’নীতি প্রতিষ্ঠিত হয় এবং সাধারণ ও শান্তিকামী মানুষ নিরাপত্তাহীনতা ও আতঙ্কে ভোগে।
সাধারণ মানুষের বড় একটি অংশ মনে করেন, ভূমিদস্যু ও চাঁদাবাজ চক্রকে সরকার যেভাবে গ্রেফতার করতে শুরু করেছে, তা চলমান রাখতে হবে। এতে ভবিষ্যতে আর কেউ সাধারণ মানুষের জানমালে বুলডোজার চালানোর সাহস পাবে না। তারা এ বিষয়ে প্রধানমন্ত্রীর কঠোর উদ্যোগকেও সাধুবাদ জানিয়েছেন।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক ড. ইমতিয়াজ আহমেদের মতে, রাজনৈতিক সংস্কৃতির ভেতরে প্রতিশোধপরায়ণতা এবং প্রাতিষ্ঠানিক নিয়ম না মেনে ধ্বংসাত্মক পথ বেছে নেওয়া রাষ্ট্রের দীর্ঘমেয়াদী স্থিতিশীলতার জন্য ক্ষতিকর। তিনি বলেন, যেকোনো ঐতিহাসিক বা রাজনৈতিক স্মৃতিচিহ্ন অপসারণের ক্ষেত্রেও নিয়মতান্ত্রিক ও আইনি কাঠামো বজায় রাখা জরুরি। তা না হলে এই বিচারহীনতা ও বলপ্রয়োগের মানসিকতা সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে ছড়িয়ে পড়ে। যার প্রমাণ ইতিমধ্যে দেখা গেছে। আর এর খেসারত সাধারণ নাগরিকসহ বিভিন্ন জনসেবামূলক প্রতিষ্ঠানকে দিতে হচ্ছে।
বিভিন্ন উচ্ছেদ বা ভাঙচুরের প্রেক্ষাপটে দেশের শীর্ষস্থানীয় মানবাধিকার সংগঠন ও আইন গবেষকরা যৌথ বিবৃতিতে জানিয়েছিলেন, যেকোনো দলীয় ক্ষোভ বা উত্তেজনার বশে বুলডোজার ব্যবহার করে স্থাপনা গুঁড়িয়ে দেওয়া প্রচলিত আইনে এক ধরনের ফৌজদারি অপরাধ। তাদের মতে, রাষ্ট্রে আইনের শাসন দুর্বল হলে বা প্রশাসন নিষ্ক্রিয় থাকলে এই ‘বুলডোজার সংস্কৃতি’ ক্রমান্বয়ে সাধারণ মানুষের জানমাল ও মৌলিক অধিকারের নিরাপত্তাকেও বিপন্ন করে তোলে।
এ বিষয় রাজনৈতিক বিশ্লেষক খন্দকার আতিকুর রহমান দৈনিক এদিনকে বলেন, সমাজ বা রাষ্ট্রে যখন কোনো আইনি প্রক্রিয়াকে পাশ কাটিয়ে বলপ্রয়োগ বা মব জাস্টিসের মাধ্যমে বুলডোজার দিয়ে যেকোনো স্থাপনা গুঁড়িয়ে দেওয়াকে একধরনের ‘স্বাভাবিক ঘটনা’ হিসেবে মেনে নেওয়া হয়, তখন অপরাধী চক্র ও দখলদাররা আরো বেপরোয়া হয়ে ওঠে। তবে তিনি মনে করেন, স্বয়ং প্রধানমন্ত্রী উদ্যোগী হওয়ায় দখলবাজদের এই মানসিকতায় যতি পড়তে পারে।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









