রাজধানীর মিরপুরের রাড্ডায় হামলা ও ভাঙচুর এবং দখলবাজির ঘটনায় এলাকায় গ্রেফতার আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে। স্থানীয় বিএনপি, যুবদল ছাত্রদল এবং স্বেচ্ছাবেক দলের নেতা-কর্মীরা আত্মগোপনে চলে গেছেন। পাশাপাশি ঘটনায় জড়িত এবং আড়ালে থেকে নেতৃত্বদানকারীরা রয়েছে ধরাছোঁয়ার বাইরে। অবশ্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী তাদের গ্রেফতারে সম্ভাব্য স্থানগুলোতে অভিযান অব্যাহ রেখেছে। এদিকে রাড্ডা স্বাস্থ্যকেন্দ্রে হামলা-ভাঙচুরের ঘটনায় সাইবার দলের নেতা গ্রেফতার রাজধানীর মিরপুরে মা ও শিশুস্বাস্থ্য সেবা কেন্দ্র রাড্ডা এমসিএইচ-এফপি সেন্টারে হামলা, ভাঙচুর ও লুটপাটের ঘটনায় জড়িত আরো একজনকে গ্রেফতার করেছে ঢাকা মহানগর পুলিশের গোয়েন্দা বিভাগ (ডিবি)। ওই ব্যক্তির নাম সাজ্জাদ হোসেন মিশু ওরফে মোল্লা (৩৬)। অপরদিকে দেশে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠায় দল-মত-নির্বিশেষে সরকারের কঠোর অবস্থানের পরও মিরপুর রাড্ডাকাণ্ডের হোতাদের অনেকে এখনো ধরাছোঁয়ার বাইরে। হামলা ও লুটপাটের সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগে দলীয় নেতাদের ক্ষমতাসীন বিএনপি দল থেকে বহিষ্কার করলেও অপরাধীদের এক সপ্তাহ পরও গ্রেপ্তার করতে পারেনি পুলিশ।
একাধিক গোয়েন্দা সূত্র বলেছে, রাড্ডার ঘটনার পর শাহ আলী থানা বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক খলিল চৌধুরী, সি ব্লক ইউনিট বিএনপির সাধারণ সম্পাদক আনোয়ার হোসেন, ৯৩ নম্বর ওয়ার্ড ছাত্রদলের সদস্যসচিব শান্ত রহমান, অটোরিকশা শ্রমিক দলের সভাপতি জাহাঙ্গীর হোসেন ও সদস্য হুজাইফাকে দল থেকে বহিষ্কার করা হয়।
এ ছাড়া ঢাকা মহানগর উত্তর বিএনপির সদস্য হাফিজুর রহমান শুভ্র, দারুস সালাম থানা স্বেচ্ছাসেবক দলের আহ্বায়ক আক্তার হোসেন মামুন, সদস্যসচিব হাফিজুর রহমান, দারুস সালাম শ্রমিক দলের আহ্বায়ক গোলাম রসুল পারভেজ, শাহ আলী থানা শ্রমিক দলের যুগ্ম আহ্বায়ক মনির হোসেন, ঢাকা মহানগর পশ্চিম ছাত্রদলের সহসভাপতি সারোয়ার আলম পিয়াস, সিনিয়র যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক রফিকুল ইসলাম জিন্নাহ, দারুস সালাম থানা ছাত্রদলের আহ্বায়ক ইকবাল হোসেন দীপু, সদস্যসচিব ওমর নাঈমকে বহিষ্কার করা হয়েছে। গ্রেপ্তার এড়াতে তারা এরই মধ্যে গা-ঢাকা দিয়েছেন। এরা ঢাকা মহানগর উত্তর যুবদলের আহ্বায়ক মোস্তফা জগলুল পাশা পাপেলের অনুসারী বলে জানা গেছে।
রাড্ডা এমসিএইচ-এফপি সেন্টারে হামলায় জড়িত থাকার অভিযোগে সোহেল, জুয়েল, জিহাদ হাসান, রাব্বি, সমমনা দোকানদার সমবায় সমিতির অফিস সহকারী শাহাদাত হোসেন, কাজী মকবুল হোসেন, সমমনা দোকানদার সমবায় সমিতির সম্পাদক শাহ আলম, সমিতির সদস্য আতিকুর রহমান ও কামরুল ইসলাম, শাকিল, ভাঙচুর ও লুটপাটে অংশ নেওয়া মিন্টু ও মিলন, শাহ আলী থানা বিএনপির সদস্য সাইফুল ইসলাম খোকন, শাহ আলী থানার ৮ নম্বর ওয়ার্ড শ্রমিক দলের সভাপতি আলম এবং ভেকু বহনকারী লোবেড গাড়ির চালক শহীদুল ইসলামকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
রাড্ডা এমসিএইচ-এফপি সেন্টারে হামলা, লুটপাট ও স্থাপনা গুঁড়িয়ে দেওয়ার ঘটনায় এ পর্যন্ত ৩০ জনকে শনাক্তের দাবি করছে পুলিশ। এদের মধ্যে ১৬ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। বাকিদের ধরতে একাধিক জায়গায় অভিযানও চালানো হয়েছে, বলছে পুলিশ। গতকাল কোনো আসামিকে গ্রেপ্তার করতে পারেনি। পুলিশ বলছে, ঘটনাস্থল ও আশপাশের সিসিটিভি ক্যামেরার ফুটেজ, মোবাইল ফোন সংক্রান্ত তথ্য এবং স্থানীয় বিভিন্ন সূত্র থেকে পাওয়া তথ্য মিলিয়ে হামলায় অংশ নেওয়া ও নির্দেশনা দেওয়া বেশ কয়েকজনকে শনাক্ত করা হয়েছে। তাদের তদন্তে সংশ্লিষ্টতার তথ্য বের হওয়ার পরই বিএনপি, ছাত্রদল, স্বেচ্ছাসেবক দল ও শ্রমিক দলের বিভিন্ন পর্যায়ের ওই ১৪ নেতা-কর্মীকে বহিষ্কার করা হয়। তবে দলীয় বিজ্ঞপ্তিতে অবশ্য রাড্ডার ঘটনার কথা সরাসরি উল্লেখ করা হয়নি। তাদের বিরুদ্ধে দলীয় শৃঙ্খলাবিরোধী ও অনৈতিক কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকার অভিযোগ আনা হয়।
পুলিশের তথ্যমতে, হামলা ও ভাঙচুরের সময় হানিফ মিয়া, মোস্তফা জগলুল পাশা ওরফে পাপেল, আবুল কালাম আজাদ ওরফে শুটার লেলিন সাদা মাইক্রোবাসে ঘটনাস্থলের আশপাশে ঘুরে নির্দেশনা দেন। আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী সূত্রে জানা যায়, স্বাস্থ্যকেন্দ্রে হামলা ও ভাঙচুরের আগে রাত ১২টা ৫ মিনিটে শাহ আলী থানা ছাত্রদলের সাবেক আহ্বায়ক আবুল কালাম আজাদ ওরফে শুটার লেলিনের কার্যালয়ের সামনে লোকজন জড়ো হন। পরে তারা স্বাস্থ্যকেন্দ্রের দিকে যান। ঘটনাস্থলের পাশে আন-নূরী জামে মসজিদসংলগ্ন ৬/৬ নম্বর সড়কের একটি ফুটেজে ঘটনার সময় একটি সাদা মাইক্রোবাস ও সেই সময় স্থানীয় শাহ আলী থানা শ্রমিক দলের সিনিয়র যুগ্ম আহ্বায়ক ইব্রাহিমসহ হাতে লাঠিসহ কয়েকজনকে দেখা যায়।
রাজধানীর মিরপুরে সুবিধাবঞ্চিত ও নিম্নআয়ের মানুষের স্বাস্থ্যসেবাদানকারী প্রতিষ্ঠান রাড্ডার ঘটনায় ক্ষুব্ধ সরকার। দলীয় নেতা-কর্মীদের জড়িত থাকার ঘটনায় বিব্রত নীতিনির্ধারক মহল। এ ঘটনায় খোদ প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নির্দেশে সংরক্ষিত মহিলা আসনের সংসদ সদস্য ফেরদৌসী আহমেদ মিষ্টিকে পদত্যাগ করতে হয়েছে। সরকারের এ ‘জিরো টলারেন্স’ নীতির পরও ঘটনার মূল হোতাদের পুলিশ গ্রেপ্তার করতে না পারায় ক্ষোভ তৈরি হচ্ছে জনমনে।
জানা যায়, সর্বশেষ বৃহস্পতিবার রাতে শাহ আলীর গুদারাঘাট এলাকা থেকে নুর আলমকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। আবুল কালাম আজাদ ওরফে শ্যুটার লেলিনের অন্যতম সহযোগী হলেন নুর আলম। এ ছাড়া গ্রেপ্তার এড়াতে বিএনপি, ছাত্রদল, স্বেচ্ছাসেবক দল ও শ্রমিক দলের বিভিন্ন পর্যায়ের বহিষ্কার হওয়া ১৪ নেতাকর্মী গা ঢাকা দিয়েছেন।
ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) মিরপুর বিভাগের উপকমিশনার (ডিসি) হাসান মোহাম্মাদ নাছের রিকাবদার জানান, হামলার নির্দেশদাতাদের মধ্যে প্রায় ৩০ জনকে শনাক্ত করা হয়েছে। এ পর্যন্ত ১৬ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তারা কেউই হামলায় জড়িত থাকার কথা স্বীকার করছেন না, তবে প্রযুক্তির মাধ্যমে তাদের সংশ্লিষ্টতার প্রমাণ পাওয়া গেছে। বাকিদের দ্রুতই আইনের আওতায় আনার চেষ্টা চলছে।
গত ২৪ সেপ্টেম্বর মধ্যরাতে মিরপুর-১ নম্বরে রাড্ডা এমসিএইচ-এফপি সেন্টারে হামলা চালানো হয়। হামলাকারীরা ভাঙচুর ও লুটপাটের পর ভারী যন্ত্র দিয়ে প্রতিষ্ঠানটির স্থাপনার একটি বড় অংশ গুঁড়িয়ে দেয়। ঘটনার পর সেখানে ‘সমমনা দোকানদার সমবায় সমিতি লিমিটেড’-এর সাইনবোর্ড ও ব্যানার টাঙানো হয়। তদন্ত-সংশ্লিষ্টরা বলছেন, শুধু শুটার লেলিনের কার্যালয়ের সামনেই নয়, মামলার এজাহারভুক্ত আসামি বিএনপি নেতা মোহাম্মদ হানিফ মিয়ার কার্যালয়ের সামনে জড়ো হয়েছিল হামলাকারীরা। রাত ১২টা ৫ মিনিটের দিকে বি-ব্লক মাঠসংলগ্ন একটি কার্যালয়ের সামনে লোকজন জড়ো হওয়ার দৃশ্য আশপাশের সিসিটিভি ফুটেজে পাওয়া গেছে। হামলাকারীদের একটি অংশ স্বাস্থ্যকেন্দ্রসংলগ্ন ছিন্নমূল মার্কেটের কাছে যায়। সেখানে লাঠিসোটা, রামদা, হাতুড়িসহ দেশীয় অস্ত্র সংগ্রহ করে তারা। হামলায় যাওয়ার আগে অনেকে মাথায় কাপড় বাঁধে এবং মুখ ঢেকে নেয়। ঘটনাস্থলের আশপাশের ফুটেজে ওই সময় একটি সাদা মাইক্রোবাস চলাচল করতেও দেখা গেছে। হামলার পরদিন ২৫ সেপ্টেম্বর রাড্ডা এমসিএইচ-এফপি সেন্টারের পক্ষ থেকে শাহ আলী থানায় মামলা করা হয়। মামলায় ঢাকা মহানগর উত্তর বিএনপির সাবেক সদস্য মোহাম্মদ হানিফ মিয়াসহ আরো ২৫০ জনকে অজ্ঞাত আসামি করা হয়। ঘটনার সঙ্গে স্থানীয় রাজনৈতিক নেতা-কর্মীদের নাম সামনে আসার পর সাংগঠনিক ব্যবস্থাও নেওয়া হয়েছে। এরই ধারাবাহিকতায় সংরক্ষিত নারী আসনের এমপি ফেরদৌসী আহমেদ মিষ্টি ১ অক্টোবর পদত্যাগ করতে বাধ্য হন। এ ঘটনায় সারাদেশে দলের নেতা-কর্মীদের জন্য বিএনপি হাইকমান্ডের ‘কঠোর বার্তা’ হিসেবে দেখছেন সবাই।
রাড্ডা স্বাস্থ্যকেন্দ্রে হামলা-ভাঙচুরের ঘটনায় সাইবার দলের নেতা গ্রেফতার এদিকে রাজধানীর মিরপুরে মা ও শিশুস্বাস্থ্য সেবা কেন্দ্র রাড্ডা এমসিএইচ-এফপি সেন্টারে হামলা, ভাঙচুর ও লুটপাটের ঘটনায় জড়িত আরো একজনকে গ্রেফতার করেছে ঢাকা মহানগর পুলিশের গোয়েন্দা বিভাগ (ডিবি)। ওই ব্যক্তির নাম সাজ্জাদ হোসেন মিশু ওরফে মোল্লা (৩৬)। পুলিশ বলে, তিনি জাতীয়তাবাদী সাইবার দলের ঢাকা জেলা শাখার সহসভাপতি। গতকাল শুক্রবার রাতে অভিযান চালিয়ে তাঁকে গ্রেফতার করা হয়। গতকাল শনিবার গোয়েন্দা পুলিশের (ডিবি) মিরপুর বিভাগের উপকমিশনার মোহাম্মদ রাকিব খান এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন।
আলোচিত এই ঘটনায় এ নিয়ে মোট ১৭ জনকে গ্রেফতার করল পুলিশ।
উপ-কমিশনার রাকিব খান জানান, সাজ্জাদ হোসেন শাহ আলী থানার সেকশন ১-এর বি ব্লকের ১ নম্বর সড়কে থাকতেন। তিনি শাহ আলী থানা ছাত্রদলের সাবেক প্রতিষ্ঠাতা কমিটির সদস্য ছিলেন। গত ২৪ সেপ্টেম্বর মধ্যরাতে মিরপুর ১-এর রাড্ডা এমসিএইচ-এফপি সেন্টারে হামলা, ভাঙচুর ও লুটপাটের ঘটনা ঘটে। মুখোশ পরা দুই শতাধিক ব্যক্তি দেশীয় অস্ত্র নিয়ে সেখানে ঢুকে নিরাপত্তাকর্মীদের জিম্মি করে। পরে ওষুধ, টিকা, চিকিৎসা সরঞ্জাম ও অন্যান্য মালামাল লুট করে ভারী যন্ত্রপাতি দিয়ে স্বাস্থ্যকেন্দ্রটির স্থাপনা গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়। পরে সম-মনা দোকানদার সমবায় সমিতির ব্যানারে এই হামলা চালানো হয়।
গ্রেপ্তার ১৭ জনের মধ্যে চারজন বিএনপি ও এর অঙ্গসহযোগী সংগঠনের নেতা-কর্মী আছেন। তাঁদের মধ্যে একজনকে আগেই বহিষ্কার করা হয়েছে। বাকি চারজন ওই সমিতির সঙ্গে সম্পৃক্ত। পুলিশ বলছে, গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের মধ্যে কয়েকজনের বিরুদ্ধে সরাসরি ভাঙচুর ও লুটপাটে অংশ নিয়েছে। নির্দেশদাতাদের শনাক্ত করে তাঁদের গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









