একসময় শহরের অভিজাত বাসাবাড়ির ফটকে ছোট্ট বোর্ডে লেখা থাকত ‘কুকুর হইতে সাবধান’। দেশে এখন ভুয়া সাংবাদিকদের দৌরাত্ম্য এমন পর্যায়ে;;; পৌঁছে গেছে যে, সাধারণ মানুষের মনের দেয়ালে সেই আদলে একটি ছবি নিশ্চিত করেই ভেসে বেড়ায় ‘সাম্বাদিক হইতে সাবধান’। কারণ সেই ভুয়া সাংবাদিকরা নিজেদের নামের আগে ‘সাংবাদিক’ শব্দটা পর্যন্ত;;;; সঠিকভাবে উচ্চারণ করতে পারেন না। নিজেকে তারা পরিচয় দেন অমুক পত্রিকা, চ্যানেল বা ডটকমের ‘সাম্বাদিক’ বলে।
রাজধানী থেকে শুরু করে দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চল পর্যন্ত;;;;; নামসর্বস্ব অনলাইন, বেনামী পত্রিকা ও কথিত টিভি চ্যানেলের অভাব নেই বললেই চলে। এর পাশাপাশি ব্যাঙের ছাতার মতো গজিয়ে উঠেছে তথাকথিত সাংবাদিক ও মানবাধিকার সংগঠন। নাম-ঠিকানা যা-ই হোক, আইডি কার্ড গলায় ঝুলিয়ে নানাভাবে মানুষকে ফাঁদে ফেলে আয়-উপার্জন করাই এদের উদ্দেশ্য। তথ্যমতে, দেশের বিভিন্ন এলাকার অপরাধী, বহু মামলার আসামি, অশিক্ষিত, কু-শিক্ষিত ও ধান্দাবাজরা এখন সাংবাদিক ও মানবাধিকারকর্মী বনে গেছেন। এদের হাবভাব দেখে মনে হয় অনেক বড় মাপের সাংবাদিক। অথচ কখনো তাদের সংবাদ বা ছবি কোনো পত্রিকা বা মূলধারার অনলাইনে প্রকাশ পায়নি। টেলিভিশন চ্যানেলগুলোতে প্রচারিত হয়নি কোনো প্রতিবেদন বা ফুটেজ। মানবাধিকারকর্মী পরিচয়ে একটি চক্র পত্রিকার সংবাদকে পুঁজি করে তার কপি হাতে নিয়ে দ্বারস্থ হয় ভুক্তভোগীদের কাছে। এরপর খোলস পাল্টে চলে অর্থবাণিজ্য। কথিত অনলাইন টিভি, আইপিটিভি, ফেসবুক টিভি এবং তার সাংবাদিকদের বিচরণও কম নয়। এরা ক্যামেরা ও মাইক্রোফোন হাতে নিয়ে চষে বেড়ায় দেশের এক প্রান্ত থেকে অপর প্রান্ত পর্যন্ত। এদের খপ্পরে পড়ে সর্বস্বান্ত হয় সাধারণ মানুষ।
বিভিন্ন সংঘবদ্ধ চক্র সাংবাদিক ও মানবাধিকারকর্মী পরিচয়ে ভয়ঙ্কর অপরাধ করে যাচ্ছে প্রতিনিয়ত। এদের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করতে গিয়ে নাজেহাল হয়েছেন অনেকেই। ফোনে অফিসে বা গোপন স্থানে ডেকে চাঁদা আদায় করা, ফেসবুকে স্ট্যাটাস লিখে ব্ল্যাকমেইল করে টাকা উপার্জন করা, ছিনতাই, মাদক কারবার, মাদক সেবনসহ নানা অপরাধ করার অভিযোগ রয়েছে এসব কথিত সাংবাদিক ও মানবাধিকারকর্মীদের বিরুদ্ধে। রাজধানীর মিরপুর-পল্লবী, উত্তরা, সাভার, আশুলিয়া, ধামরাই, ডেমরা, শ্যামপুর, কদমতলী, কেরানীগঞ্জসহ বিভিন্ন এলাকা এখন কথিত সাংবাদিক ও মানবাধিকার কর্মীদের অভয়ারণ্য। জনবহুল এসব এলাকায় খুব সহজেই দাপিয়ে বেড়ানো যায় বলে এখানে বাড়ছে সাংবাদিকতার নামে অপরাধ। অনেক দালাল, মাদক কারবারি ও ছিনতাইকারীরা পরিচয় দিচ্ছে সংবাদকর্মী হিসেবে।
জাতীয় প্রেসক্লাব চত্বরে সম্প্রতি এই প্রতিবেদকের কথা হয় ‘দৈনিক জন জাগরণ’ নামের একটি পত্রিকার এক প্রতিনিধির সাথে। প্রশ্ন করতেই ভুল উচ্চারণে নিজেকে পরিচয় দেন ‘সাম্বাদিক’ বলে। পদবী ‘স্টাফ রিপোর্টার’ হলেও করতে পারেননি সঠিক বানানও। ব্যাগ থেকে পত্রিকার একটি কপি বের করে দিলেন। কিন্তু সেখানে দেখা গেল আরো বড় তেলেসমাতি। পত্রিকাটির মাস্ট হেডে বড় অক্ষরে ‘দৈনিক জন জাগরণ’ লেখা থাকলেও নেই কোনো রেজিস্ট্রেশন বা ডিএ নম্বর। যার অর্থ পত্রিকাটির সরকারি কোনো অনুমোদনই যে নেই!
ঢাকা জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে তাৎক্ষণিক খোঁজ নিয়ে জানা গেল অনুমোদন না মেলার সত্যতাও। শুধু ছাপা কপিই নয়, ইন্টারনেট অনুসন্ধানে দেখা গেল, পত্রিকাটির নামে দিব্যি চলছে অনলাইন ও মাল্টিমিডিয়া সংস্করণও! অথচ সেই পত্রিকার প্রকাশক-সম্পাদক পরিচয়ে তার আগের দিনই প্রেসক্লাবের ভেতরে হল ভাড়া করে বিরাট অনুষ্ঠান করে গেছেন মো. শিহাব উদ্দিন নামের এক লোক। নিজেকে পরিচয় দিয়েছেন ‘শহীদ জিয়া স্মৃতি সংসদ’ নামের একটি সংগঠনের নেতা হিসেবে। তার মুঠোফোন নম্বর জোগাড় করে বারবার কল দেওয়া হলেও ফোন ধরেননি তিনি।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়নের (ডিইউজে) সভাপতি মোহাম্মদ শহিদুল ইসলাম দৈনিক এদিনকে বলেন, ‘ডিজিটাল যুগে কে সাংবাদিক কে সাংবাদিক না, সেটা নির্ধারণ করা জরুরি। এ ক্ষেত্রে একটা নীতিমালা জরুরি। সরকারের কাছে সাংবাদিকের পরিচয় নিশ্চিত করার জন্য নীতিমালা প্রণয়ণ ও নিবন্ধনের দাবি জানান তিনি।’ তিনি আরো বলেন, ‘এলাকায় এলাকায় ছড়িয়ে থাকা প্রেসক্লাব যেমন মিরপুর, পল্লবী, গাবতলী, উত্তরা, তেজগাঁও, যাত্রাবাড়ি, শ্যামপুর প্রেসক্লাবসহ নানা নামে এক শ্রেণীর প্রতারক সাধারণ মানুষকে হয়রানি করে থাকে। এমন অভিযোগ প্রতিনিয়ত আমাদের কাছে আসে।’ এসব বন্ধ করতে সরকারের প্রতি তিনি জোর দাবি জানিয়েছেন। পাশাপাশি তিনি আরো বলেন, ‘আগামীকাল (আজ রবিবার) তথ্য মন্ত্রণালয়ে একটা মিটিং আছে, সেই মিটিংয়ে বিষয়টি উত্থাপন করব।’ পেশার মর্যাদা রক্ষায় তিনি সাংবাদিক সংগঠনসহ সকল পেশাদার সাংবাদিককে এগিয়ে আসার আহ্বান জানান।
ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটির (ডিআরইউ) সাধারণ সম্পাদক মাইনুল হাসান সোহেল দৈনিক এদিনকে বলেন, ‘সারা দেশে ছড়িয়ে পড়েছে ভুয়া সাংবাদিকরা। গলায় অজানা-অচেনা কিছু প্রতিষ্ঠানের আইডি কার্ড ঝুলিয়ে নিজেদের সাংবাদিক পরিচয় দিয়ে সাধারণ মানুষকে তারা হয়রানি করে। কেউ কেউ চাঁদাবাজি করে। এতে সাধারণ সাংবাদিকরা বিব্রত হন।’ তিনি বলেন, ‘ভুয়া সাংবাদিকদের প্রতিরোধে সাংবাদিকদের নিবন্ধনের আওতায় আনা জরুরি।’ প্রেস কাউন্সিলের অধীনে একটা নীতিমালা প্রণয়ণ করে সাংবাদিক নিবন্ধন নিশ্চিত করার দাবি জানান তিনি।
ভুয়া সাংবাদিকরা বিভিন্ন প্রতারণার ফাঁদ পেতে এবং তথাকথিত মানবাধিকার সংগঠনের সদস্য-সমর্থকরা নিজেদের ‘মানবাধিকার সাংবাদিক’পরিচয় দিয়ে নিরীহ লোকজনকে নানাভাবে হয়রানি করছে বলেও অভিযোগ রয়েছে। এসব চক্রে বিতর্কিত নারী সদস্যও থাকেন। এরা খ্যাত-অখ্যাত একাধিক গণমাধ্যমের ৪/৫টি আইডি কার্ড বুকে-পিঠে ঝুলিয়ে মোটরসাইকেল, প্রাইভেটকার ও মাইক্রোবাসে ‘প্রেস’কিংবা ‘সংবাদপত্র’লিখে দাপিয়ে বেড়ায় সর্বত্র। তারা মূলত পুলিশ, র্যাব, ডিবির সোর্সের দায়িত্ব পালনেই বেশি ব্যস্ত।
পুরান ঢাকার বংশাল ও চকবাজার এলাকার আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সোর্স হিসেবে কাজ করছেন আনোয়ার হোসেন। দীর্ঘ ১৬ থেকে ১৭ বছর তিনি সোর্সের কাজ করছেন। তার সঙ্গে রয়েছে আরো বেশ কয়েকজন সোর্স। কখনো ডিবি, কখনো র্যাব, কখনো সিআইডি বা কখনো এনএসআইয়ের সোর্স হিসেবে কাজ করছেন। তবে এখন আর আগের মতো সোর্স মানি পান না তিনি। গোয়েন্দা কর্মকর্তারা এখন আর ওইভাবে তাকে টাকা দেন না। যার ফলে তিনি এবং সঙ্গীয় সোর্সদের সিংহভাগ কথিত সাংবাদিক বনে গেছেন। তারা এখন বিভিন্ন অখ্যাত অনলাইন, ইউটিউব, নিউজ পোর্টালে কাজ করছেন। তাদের রয়েছে মিডিয়ার দেওয়া পরিচয়পত্র। কিন্তু তাদের কোনো বেতন নেই। পরিচয়পত্র গলায় ঝুলিয়ে দাপিয়ে বেড়াচ্ছেন ঢাকা শহর। শুধু তা-ই নয়, সোর্স থাকা অবস্থায় তাদের হাতে ব্যবসায়ী থেকে শুরু করে যেসব সাধারণ মানুষ হয়রানির শিকার হয়েছেন, এখন ‘সাংবাদিক’ যুক্ত হওয়ায় তাদের শৌর্যবীর্য যেন আকাশচুম্বী। বিশেষ করে লালবাগ চকবাজার অবৈধ পলিথিন, ভেজাল পণ্য এবং জুতার কারখানাসহ সকল প্রতিষ্ঠানে চাঁদাবাজির মাত্রা অসহনীয় হয়ে উঠেছে। তারা এখন শুধু সোর্স নয়, সাংবাদিকও। তাদের নামে রয়েছে ব্যাপক অভিযোগ এবং মামলাও।
একাধিক প্রবীণ সাংবাদিক এবং মানবাধিকার কর্মী সখেদে এদিনকে বলেন, রাজধানী ও পার্শ্ববর্তী এলাকাগুলোতে অনলাইন, আন্ডারগ্রাউন্ড পত্রিকা ও কথিত টিভি চ্যানেলের অভাব নেই বললেই চলে। একসময় পুলিশের সোর্স হিসেবে কাজ করা ব্যক্তিরাই এখন ওই সকল অখ্যাত পোর্টালের সাংবাদিক। ব্যাঙের ছাতার মতো গজিয়ে উঠেছে তথাকথিত সাংবাদিক ও মানবাধিকার সংগঠন। নাম-ঠিকানা যা-ই হোক, আইডি কার্ড গলায় ঝুলিয়ে নানাভাবে মানুষকে ফাঁদে ফেলে আয়-উপার্জন করাই এদের উদ্দেশ্য।
অখ্যাত টিভির নামে এক ইউটিউব চ্যানেলের আওতাতেও রাজধানীর উপকণ্ঠ এলাকাগুলোতে দুই শতাধিক সাংবাদিককে কার্ড বিতরণ করার খবর পাওয়া গেছে। সেখানে মাদক কারবারি, সেলুন কর্মী, চা-বিক্রেতা, ফুটপাতে জুতা বিক্রেতা, পরিবহন হেলপার, হকার, মাছ-সবজি বিক্রেতাসহ যেকোনো পেশার মানুষ, নাম লেখার যোগ্যতা থাকুক না থাকুক কিছু টাকা দিয়েই ক্রাইম রিপোর্টার পদবীযুক্ত আইডি কার্ড পেয়ে যাচ্ছেন।
রাজধানীর বৃহত্তর মিরপুর এবং উত্তরাজুড়ে আরো ভয়াবহ অবস্থা। সেখানে বসবাস করা একজন সিনিয়র সাংবাদিক জানিয়েছেন, অন্তত পাঁচ শ ভুয়া সাংবাদিক দাপিয়ে বেড়াচ্ছে মিরপুর ও উত্তরা এলাকা। সাংবাদিক ও মিডিয়ার নাম ব্যবহার করে এক ডজনেরও বেশি ক্লাব-সংগঠন গড়ে উঠেছে। এক এক এলাকায় দুইটা-তিনটার অধিক প্রেসক্লাব রয়েছে। এছাড়া মূলধারার সংবাদমাধ্যমের সঙ্গে কেউ সংযুক্ত না থাকলেও নিজেরাই একাধিক অনলাইন নিউজ পোর্টাল খুলে সাংবাদিক-সম্পাদক বনে যাচ্ছেন। তাদের ভুয়া অনলাইন পোর্টালে যাচ্ছেতাই লিখে দিচ্ছেন, যাকে খুশি তার পক্ষে লিখছেন, চাঁদা না পেলেই ডুবিয়ে দিচ্ছেন। এসব অনলাইন পোর্টালগুলো আবার পত্রিকা আকারে প্রিন্ট করেও লিফলেটের মতো ছড়িয়ে দেন তারা।
সাভার প্রেসক্লাবের সদস্য মাহফুজ সানি বলেন, দেশে অজ্ঞাতনামা পত্রিকা ও নিবন্ধনহীন অনলাইন নিউজ পোর্টালের বিষয়ে সরকার আরো কঠোর হলে এ থেকে নিস্তার পেতে পারে সাংবাদিকতা। এসব ভুঁইফোড় অনলাইন নিউজ পোর্টাল ও আন্ডারগ্রাউন্ড পত্রিকার কারণে প্রশ্নবিদ্ধ হচ্ছে পেশাদার সাংবাদিকরা। পেশাদার সাংবাদিকদের ভাবমূর্তি ফিরিয়ে আনতে দমন করতে হবে এসব অপসাংবাদিকতা।
ঢাকার সাভার, আশুলিয়া মিরপুর, উত্তরা ও ধামরাইয়ের স্থানীয় সাংবাদিক, পুলিশ কর্মকর্তা ও সচেতন মহলের সাথে এসব নানা বিষয়ে কথা বলে জানা গেছে, এসব এলাকায় প্রায় ৫ হাজারের মতো কথিত সাংবাদিক রয়েছেন। মানবাধিকারকর্মী পরিচয়ে দেন দুই হাজারের মতো। যেন ঘরে ঘরে সাংবাদিক ও মানবাধিকারকর্মী। এসব এলাকার বিভিন্ন স্থানে গড়ে উঠেছে তথাকথিত সাংবাদিক ও মানবাধিকার সংগঠনের অফিস। এসব সংগঠনের নেই কোনো জনহিতকর কার্যক্রম। এদের দৌরাত্মে অতিষ্ঠ এলাকাবাসী। শুধু তা-ই নয়, এদের নিয়ে উল্টো আতঙ্কে থাকেন থানা-পুলিশ থেকে শুরু করে জনপ্রতিনিধিরাও ।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









