ফ্যাসিস্ট শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর দেশের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষক ও প্রতিষ্ঠানপ্রধানদের বিরুদ্ধে বিক্ষোভ, ঘেরাও ও পদত্যাগের ঘটনা ঘটে। সিলেটেও এমন পরিস্থিতিতে অন্তত ১০ থেকে ১২টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান প্রধানকে পদত্যাগে বাধ্য করা হয় বলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের দাবি। তাঁদের কেউ কেউ পরে কর্মস্থলে ফিরেছেন। তবে অন্তত সাত থেকে আটটি প্রতিষ্ঠানের প্রধান এখনো কর্মস্থলে ফিরতে পারেননি।
কেউ সাময়িক বরখাস্ত, কেউ বাধ্যতামূলক ছুটিতে। আবার কেউ কোনো আনুষ্ঠানিক সিদ্ধান্ত ছাড়াই প্রতিষ্ঠানের বাইরে রয়েছেন। কারো সরকারি বেতন বন্ধ, কেউ আবার নিয়মিত বেতন পাচ্ছেন। কয়েকজন আদালতের শরণাপন্ন হলেও আদালতের আদেশের পরও কর্মস্থলে ফিরতে পারেননি বলে অভিযোগ রয়েছে। ফলে প্রায় দুই বছর ধরে তাঁদের অনেকের কর্মজীবন ঝুলে আছে।
আজ বিশ্ব শিক্ষক দিবস। সারা দেশের মতো সিলেটেও নানা কর্মসূচির মধ্য দিয়ে পালিত হবে দিবসটি। তবে মবের মুখে পড়ে কর্মস্থলের বাইরে থাকা শিক্ষকদের কাছে দিনটি যেন আক্ষেপের। দীর্ঘশ্বাস আর অনিশ্চয়তায় কাটছে তাঁদের দিন। যে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানকে ঘিরে তাঁদের দীর্ঘদিনের কর্মজীবন, সেই প্রিয় ক্যাম্পাসে আর ফিরতে পারবেন কি না, সেই প্রশ্নই এখন তাঁদের মনে ঘুরপাক খাচ্ছে।
সাদা কাগজে স্বাক্ষর
২০২৪ সালের ২৫ আগস্ট দুপুর সাড়ে ১২টা। সিলেট নগরের ব্লু-বার্ড স্কুল অ্যান্ড কলেজের নিজ কার্যালয়ে অফিস করছিলেন অধ্যক্ষ হুসনে আরা। হঠাৎ বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের ব্যানারে একদল শিক্ষার্থী ক্যাম্পাসে অবস্থান নেয়। জাতীয় পতাকা হাতে তারা স্কুল ও কলেজ ভবনের ছাদে ওঠে। আরেক দল মাঠে অবস্থান নিয়ে হ্যান্ড মাইকে অধ্যক্ষের অপসারণের দাবি জানায়। পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে উঠলে শিক্ষার্থীদের ছুটি দেওয়া হয়। পরে আন্দোলনকারীদের একটি অংশ অধ্যক্ষের কার্যালয়ে ঢুকে সাদা কাগজে লেখা পদত্যাগপত্রে স্বাক্ষর করার জন্য চাপ দেয়।
একপর্যায়ে তাঁদের চাপে পদত্যাগ করতে বাধ্য হন হুসনে আরা। প্রায় একই সময়ে এমন পরিস্থিতির মুখে পড়েন কিশোরী মোহন গার্লস হাইস্কুলের প্রধান শিক্ষক গৌরা ঘোষ। ২৭ আগস্ট তাঁর প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীদের একটি অংশ তাঁর বিরুদ্ধে আন্দোলন শুরু করে। দুই দিন পর, ২৯ আগস্ট, তাঁর বাসা থেকে জোর করে সাদা কাগজে স্বাক্ষর নেওয়া হয় বলে অভিযোগ করেন তিনি। এরপর থেকে তিনি আর প্রতিষ্ঠানে ঢুকতে পারেননি। বন্ধ রয়েছে তাঁর বেতন-ভাতাও।
গৌরা ঘোষের দাবি, তাঁর বিরুদ্ধে দুবার তদন্ত হয়েছে। কোনো তদন্তেই অভিযোগের প্রমাণ পাওয়া যায়নি। এরপরও তিনি কর্মস্থলে ফিরতে পারেননি। তিনি বলেন, ‘যারা আমার বিরুদ্ধে আন্দোলনে ছিল, তারা আমার খুব প্রিয় শিক্ষার্থী। তাদের সামনে রেখে কিছু লোক আমার বাসা থেকে জোর করে সাদা কাগজে স্বাক্ষর নিয়েছে।’
শুধু গৌরা ঘোষ নন, একই ধরনের ঘটনার কথা জানিয়েছেন সিলেটের আরো কয়েকজন প্রতিষ্ঠানপ্রধান। সংশ্লিষ্ট শিক্ষক ও প্রতিষ্ঠানপ্রধানদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ২০২৪ সালের আগস্ট ও সেপ্টেম্বরে সিলেটের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে প্রতিষ্ঠানপ্রধানদের বিরুদ্ধে আন্দোলন শুরু হয়। কোথাও শিক্ষার্থীরা সামনে থাকলেও এসব আন্দোলনের পেছনে স্থানীয় প্রভাবশালী ব্যক্তি এবং কোনো কোনো ক্ষেত্রে সহকর্মীদের ইন্ধন ছিল বলে অভিযোগ করেছেন ভুক্তভোগীরা। এসব অভিযোগের স্বতন্ত্র যাচাই করা সম্ভব হয়নি। তবে আন্দোলনের পর প্রতিষ্ঠানপ্রধানদের কেউ পদত্যাগ করেছেন, কাউকে বাধ্যতামূলক ছুটিতে পাঠানো হয়েছে, আবার কাউকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে।
সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা যেসব প্রতিষ্ঠানের নাম জানিয়েছেন, তার মধ্যে রয়েছে ব্লু-বার্ড স্কুল অ্যান্ড কলেজ, কিশোরী মোহন গার্লস হাইস্কুল, মডেল স্কুল অ্যান্ড কলেজ, শাহজালাল উচ্চ বিদ্যালয়, সাউথ সুরমা উচ্চ বিদ্যালয়, সুনামগঞ্জের দোয়ারাবাজার উপজেলার বাশতলা শহীদ স্মৃতি উচ্চ বিদ্যালয় এবং দিরাই উপজেলার জগদল কলেজ। তাঁদের হিসাবে, এমন প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা ১০ থেকে ১২টি। প্রশ্ন উঠেছে, আন্দোলনের পর যেসব শিক্ষককে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে, তাঁদের বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ, তদন্ত ও শাস্তির প্রক্রিয়া কতটা অনুসরণ করা হয়েছে?
‘কর্মস্থলে ফিরতে পারব কি না, জানি না’
সাউথ সুরমা উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মোহাম্মদ আব্দুল হক বলেন, ২০২৪ সালের ২ সেপ্টেম্বর তাঁর বিরুদ্ধে মব তৈরি করে জোর করে সাদা কাগজে স্বাক্ষর নেওয়া হয়। এরপর থেকে তিনি আর প্রতিষ্ঠানে ঢুকতে পারেননি। তবে তাঁর সরকারি বেতন চালু আছে। আব্দুল হক বলেন, ‘আমি সরকারি বেতন পাচ্ছি। কিন্তু কর্মস্থলে ফিরতে পারব কি না, তার কোনো পরিবেশ নেই।’শাহজালাল উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক সুরঞ্জিত দাসের ঘটনাটিও ভিন্ন নয়। তাঁর ভাষ্য, ২০২৪ সালের ৭ আগস্ট প্রথম তাঁর বিরুদ্ধে আন্দোলন হয়। এরপর ১৫ ও ২৪ আগস্ট আবারও আন্দোলন করা হয়। পরে ২০ অক্টোবর তাঁকে বাধ্যতামূলক ছুটিতে পাঠানো হয়। সুরঞ্জিত দাসের দাবি, তাঁর বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট কোনো অভিযোগ নেই। এরপরও তাঁকে কর্মস্থলে ফিরতে দেওয়া হচ্ছে না। নভেম্বর থেকে তাঁর সরকারি বেতনও বন্ধ রয়েছে বলে জানান তিনি।
আদালতে গিয়েও সমাধান নেই
গৌরা ঘোষের দাবি, আদালতে রিট করার পর তাঁকে স্বপদে ফেরানোর নির্দেশ দেওয়া হলেও প্রতিষ্ঠান কর্তৃপক্ষ তা কার্যকর করছে না। তিনি বলেন, ‘রিটের প্রেক্ষিতে আদালত আমাকে স্বপদে ফেরার নির্দেশ দিয়েছেন। কিন্তু কর্তৃপক্ষ তা আমলে নিচ্ছে না। আমাকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে কি না, সেটিও জানানো হয়নি। একেবারে ঝুলন্ত অবস্থায় রেখেছে।’অন্য কয়েকজন শিক্ষকও আদালতের শরণাপন্ন হয়েছেন বলে জানা গেছে। তবে আদালতে মামলা হওয়ার পরও তাঁদের কর্মস্থলে ফেরার বিষয়টি অনেক ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপনা কমিটির সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করছে।
‘প্রতিষ্ঠান গড়েছি, এখন আমাকে বের করে দেওয়া হলো’
সুনামগঞ্জের দোয়ারাবাজার উপজেলার বাশতলা শহীদ স্মৃতি উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক জসিম উদ্দিন বলেন, সরকার পতনের পর থেকেই তাঁকে সরানোর চেষ্টা শুরু হয়। শেষ পর্যন্ত ২০২৫ সালের ৩০ ডিসেম্বর তাঁকে প্রধান শিক্ষকের পদ থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়। তিনি বলেন, ‘প্রতিষ্ঠানের পিওনের কাজ থেকে শুরু করে বিদ্যালয়টিকে প্রতিষ্ঠিত করেছি। যারা আমাকে মব করে বের করে দিয়েছে, তখন তাদের প্রতিষ্ঠানের ভালো কাজে এগিয়ে আসতে দেখিনি। সরকার পতনের পর থেকে ষড়যন্ত্র করতে করতে একপর্যায়ে আমাকে বের করে দেওয়া হয়েছে।’
তাঁর অভিযোগ, দীর্ঘদিনের চাকরিজীবন ও প্রতিষ্ঠানে অবদানের পরও স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায় নয়, রাজনৈতিক ও সামাজিক চাপের পরিবেশে তাঁকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে। এসব ঘটনার পর শিক্ষকরা প্রতিষ্ঠানের বাইরে চলে গেলেও তাঁদের ফিরিয়ে নেওয়ার বিষয়ে কার্যকর উদ্যোগ দেখা যায়নি বলে অভিযোগ ভুক্তভোগীদের। শিক্ষা প্রশাসনের বক্তব্য, বিষয়টি সংশ্লিষ্ট ব্যবস্থাপনা কমিটির এখতিয়ার। আর সেই কমিটির সিদ্ধান্তের অপেক্ষায় মাসের পর মাস কর্মস্থলের বাইরে থাকতে হচ্ছে শিক্ষকদের।
শিক্ষাবিদ, লেখক ও গবেষক আবুল ফাতেহ ফাত্তাহ বলেন, কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রধান শিক্ষক বা শিক্ষকের বিরুদ্ধে অভিযোগ থাকলে তদন্ত করা যেতে পারে। অভিযোগের সত্যতা প্রমাণিত হলে বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ রয়েছে। কিন্তু মবের চাপের মুখে সাদা কাগজে স্বাক্ষর নিয়ে কোনো শিক্ষককে পদত্যাগে বাধ্য করা অমানবিক। তিনি বলেন, এভাবে একজন শিক্ষককে দীর্ঘদিন কর্মস্থলের বাইরে রাখা কতটা আইনসংগত ও ন্যায়সংগত, সেই প্রশ্নও রয়েছে।
মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরের (মাউশি) সিলেট অঞ্চলের পরিচালক অধ্যাপক ড. মো. দিদার চৌধুরী বলেন, মবের শিকার হয়ে যারা পদত্যাগ করতে বাধ্য হয়েছেন, তাঁদের ফিরিয়ে আনার প্রক্রিয়া চলমান।
তিনি বলেন, ‘ব্লু-বার্ডসহ কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের প্রধান রিট করেছেন। তাঁদের বিষয়টি সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপনা কমিটি দেখছে। বেতন নিয়েও বৈষম্যের কথা স্বীকার করেন তিনি। তাঁর ভাষ্য, কোনো কোনো শিক্ষক প্রতিষ্ঠানের বাইরে থাকলেও সরকারি বেতনের অংশ পাচ্ছেন, আবার কেউ পাচ্ছেন না। বিষয়গুলো তাঁদের নজরে রয়েছে। যথাযথ প্রক্রিয়ায় তাঁদের ফিরিয়ে আনা হবে।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









