টঙ্গীর তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাস (এলপিজি) সিলিন্ডারের খুচরা বিক্রেতা মো. মিঠু রহমান। ছোট দোকানে বিভিন্ন কোম্পানির এলপিজি সিলিন্ডার বিক্রি করেন। গতকাল রবিবার সকালে ক্রেতা সেজে তার কাছে সিলিন্ডার কিনতে চেয়ে মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে প্রথমে সিলিন্ডার নেই বলে সাফ জানিয়ে দেন। কিন্তু গ্যাস না থাকায় বাসায় রান্না হচ্ছে না, যেভাবেই হোক ম্যানেজ করে দেন — বলার পর ১২ কেজির একটি সিলিন্ডার ২,৪০০ টাকা দাম চান। এই বিক্রেতা বলেন, ‘সিলিন্ডার এমনিতেই নেই। দাম ২ হাজার ৪০০ টাকা দেবেন। দেখি যদি ম্যানেজ করে দিতে পারি। বিকেলে একবার ফোন দিয়েন।’
শুধু টঙ্গী নয়, এমন বাড়তি দামে সিলিন্ডার বিক্রির চিত্র রাজধানী, রাজধানীর আশপাশের এলাকাসহ সারা দেশেই। অথচ ১২ কেজির এই সিলিন্ডারের সরকার নির্ধারিত মূল্য ১ হাজার ৫৮৫ টাকা। অথচ নির্ধারিত এই দামে সিলিন্ডার বিক্রির নজির কোথাও পাওয়া যাচ্ছে না। বেশি দামে সিলিন্ডার বিক্রির সঙ্গে যুক্ত হয়েছে সিলিন্ডার নেই অজুহাত। রবিবার সকালে রাজধানীর আজিমপুর, ধানমন্ডিসহ বিভিন্ন এলাকা সিলিন্ডার গ্যাসের খুচরা দোকান বন্ধ ছিল। আর যে সব দোকানে অন্যান্য জিনিসপত্রের সঙ্গে সিলিডার বিক্রি করা হয় সেসব দোকানেও সিলিন্ডার নেই। আজিমপুরের এক খুচরা বিক্রেতা বলেন, সিলিন্ডার দেওয়া যাবে, তবে ২ হাজার ৫০০ টাকা পড়বে। নতুন বোতলসহ কিনলে ৪ হাজার টাকা দিতে হবে।
‘বাংলাদেশ এলপিজি সিলিন্ডার এক্সচেঞ্জ পয়েন্ট গ্রুপ’ একটি ফেসবুক গ্রুপ। গ্রুপটিতে অনেকেই সিলিন্ডার গ্যাস বিক্রির তথ্য দিয়ে থাকেন। অনেক ক্রেতাও তাদের নিজেদের অভিজ্ঞতা তুলে ধরেন ফেসবুক পোস্টের মাধ্যমে। গ্রুপে সুমাইয়া ইসলাম নামের একজন লিখেছেন, ‘দেশটা আসলে যাচ্ছে কোথায়? আজকে বসুন্ধরার ২ টা এলপি গ্যাস নিয়ে আসলাম ৪ হাজার ৯০০ টাকা দিয়ে। ১টি ২ হাজার ৪৫০ টাকা করে, চিন্তা করেন। যেই গ্যাস ক্রয় করতাম ১২০০/১৪০০ টাকা, আজ সেই গ্যাসের দাম আকাশছোঁয়া। আমরা সাধারণ মানুষ কী করবো? আমাদের কি মেরে ফেলতে চান? না কি বাংলাদেশের জন্মগ্রহণ করে ভুল করে ফেলছি? এই দেশের মানুষ শেষ হয়ে যাবে দেইখেন! আমি বলি আমাদের ওপর অন্যায়-জুলুম করা হচ্ছে।’ যোগ করেন তিনি। বাবু মিয়া নামের একজন একটি ভিডিও পোস্ট করেছেন। ভিডিওতে মজার ছলে একটি বাংলা গান জুড়ে দিয়ে তিনি লিখেছেন, ‘২ হাজার টাকা দিয়ে গ্যাস নিয়ে যাইতেছি।’
ফেসবুক গ্রুপটিতে শেখ এন্টারপ্রাইজ নামের একটি পেজ থেকে এলপিজি সিলিন্ডারের গাড়ির ছবি পোস্ট করে লেখা হয়েছে, ‘কী এক অবস্থা, ডিপোতে নাকি মাল নাই। গাড়ি পাঠাইলাম ভোরে, মাত্র আসলো। এমনি কী ব্যবসা চলে না কিরে ভাই। আমার মতো কার এই অবস্থা কমেন্ট করেন কিন্তু। ১২ কেজি একটা সিলিন্ডার গ্যাসের দাম ২ হাজার থেকে ২ হাজার ৫০০ টাকা বিক্রি হচ্ছে। তাইলে সাধারণ মানুষ কীভাবে কিনবে? সরকারের কাছে একটা দাবি, দ্রুত খরচা বাজার নিয়ন্ত্রণ করুন।’ পরে ক্রেতা সেজে ফেসবুক পেজে থাকা মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে বিক্রেতা রাকিব বলেন, ‘সিলিন্ডার আছে, তবে কম। ২ হাজার টাকা চলতেছে। নরসিংদী থেকে নিতে হবে।’
‘৬৪ জেলা এলপিজি ডিস্ট্রিবিউটর অ্যাসোসিয়েশন’ নামের একটি ফেসবুক গ্রুপে মো. রাসেল পোস্ট করেছেন, ‘১২ কেজি একটা সিলিন্ডার গ্যাসের দাম ২ হাজার থেকে ২ হাজার ৫০০ টাকা বিক্রি হচ্ছে। তাইলে সাধারণ মানুষ কীভাবে কিনবে? সরকারের কাছে একটা দাবি, দ্রুত খরচা বাজার নিয়ন্ত্রণ করুন।’
‘এলপি গ্যাসের বাজার’ নামের একটি ফেসবুক গ্রুপ থেকে এক খুচরা ব্যবসায়ীর মুঠোফোন নম্বর সংগ্রহ করা হয়। ক্রেতা পরিচয়ে কথা বলে জানা যায় তিনি সাতক্ষীরায় ব্যবসা করেন। মো. লাবিব নামের এই ব্যক্তি বলেন, ‘গ্যাস আছে। আমরা ১ হাজার ৮০০ টাকা করে বিক্রি করতেছি। ওমেরা, আই গ্যাস, ফ্রেশ এগুলো আছে। অনেক বেশি নেই, টুকটাক আছে, বিক্রি করা যাচ্ছে। ডিলার পয়েন্ট কাছে তো — শহরের পাশেই। এজন্য আমরা পাই। গ্রাম-গঞ্জের কী অবস্থা বলতে পারবো না।’
‘বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন’ (বিইআরসি) ও খাত সংশ্লিষ্টদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, গত আগস্ট ও সেপ্টেম্বর—দুই মাসেই দেশে এলপিজির আমদানি পর্যাপ্ত ছিল। ফলে আমদানির ঘাটতির কারণে বাজারে সংকট তৈরি হওয়ার কথা নয় বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। বিইআরসি বলছে, দেশে সেপ্টেম্বর মাসে এলপিজি আমদানি হয়েছে ১ লাখ ৫৬ হাজার মেট্রিক টন। আগস্ট মাসে আমদানি হয়েছে ১ লাখ ৫৭ হাজার টন। সেই হিসাবে দেশে চাহিদার তুলনায় এলপি গ্যাসের সংকট নেই।
সেপ্টেম্বর মাসের আমদানি ও বিক্রির তথ্য চেয়ে ১২ এলপিজি আমদানিকারককে চিঠি দিয়েছে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি)। শনিবার (৩ অক্টোবর) ইস্যু করা চিঠিতে একদিন পরেই (৪ অক্টোবর) হিসাব জমা দিতে বলা হয়েছে। চিঠিতে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) থেকে প্রাপ্ত আমদানির তথ্য উল্লেখ করা হয়েছে।
বিইআরসি চেয়ারম্যান জালাল আহমেদ গণমাধ্যমকে বলেছেন, গতকাল রবিবার তথ্য জমা দিতে বলা হয়েছে। এরপর পরিস্থিতি বুঝে পরবর্তী পদক্ষেপ নেওয়া হবে। সরকার নির্ধারিত দামে গ্যাস সিলিন্ডার বিক্রি নিশ্চিতে রাজধানীসহ দেশজুড়ে বিশেষ তদারকি কার্যক্রম পরিচালনা করেছে জাতীয় ভোক্তা-অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর।
গতকাল শনিবার ঢাকাসহ দেশের ১৬ জেলায় ডিলার, পাইকারি ও খুচরা পর্যায়ের গ্যাস সিলিন্ডার বিক্রয়কারী প্রতিষ্ঠানগুলোয় এই অভিযান পরিচালিত হয়। ভোক্তা-অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের ২৩টি টিমের একযোগে পরিচালিত ঔ অভিযানে নানা অনিয়মের দায়ে ৩৯টি প্রতিষ্ঠানকে মোট ৪ লাখ ২৬ হাজার ৫০০ টাকা জরিমানা করা হয়েছে। বাণিজ্য মন্ত্রণালয় থেকে এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানানো হয়েছে। এতে বলা হয়, বাজারে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের মূল্য স্থিতিশীল রাখা, গ্যাস সিলিন্ডারের স্বাভাবিক সরবরাহ নিশ্চিত করা এবং সরকার নির্ধারিত মূল্যের চেয়ে অতিরিক্ত দাম আদায় ঠেকাতে এ তদারকি চালানো হয়।
অভিযানে ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে মূল্যতালিকা প্রদর্শন, ক্রয়-বিক্রয়ের ভাউচার সংরক্ষণ ও প্রদান, সিলিন্ডারের নিরাপত্তা বিধি প্রতিপালন এবং মেয়াদোত্তীর্ণ সিলিন্ডার বিক্রি হচ্ছে কি না তা যাচাই করা হয়। একই সঙ্গে ব্যবসায়ীদের কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি, অযৌক্তিক মজুত ও সরবরাহে প্রতিবন্ধকতা তৈরি থেকে বিরত থাকার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। দৃশ্যমান স্থানে হালনাগাদ মূল্যতালিকা প্রদর্শন এবং সরকার নির্ধারিত দামে সিলিন্ডার বিক্রির বিষয়েও সতর্ক করা হয়েছে।
ভোক্তাদের গ্যাস সিলিন্ডার কেনার আগে ওজন, সিল, মেয়াদ ও দৃশ্যমান ত্রুটি পরীক্ষা করার পরামর্শ দিয়েছে অধিদপ্তর। পাশাপাশি মূল্যতালিকা যাচাই এবং ক্রয়ের সময় রশিদ বা ভাউচার সংগ্রহ করতে বলা হয়েছে। সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, গ্যাস সিলিন্ডার বিক্রিতে কোনো অনিয়ম দেখা গেলে জাতীয় ভোক্তা-অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের হটলাইন ১৬১২১-এ অভিযোগ জানাতে পারবেন ভোক্তারা। বাজারে শৃঙ্খলা ও ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করতে এ ধরনের অভিযান অব্যাহত রাখা হবে।
বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের (বিইআরসি) সদস্য (গ্যাস) মো. মিজানুর রহমান বলেন, ‘আমরা গতকাল শনিবারও অফিস করেছি। ১২টি আমদানিকারক প্রতিষ্ঠানকে চিঠি দিয়েছি। তারা সেপ্টেম্বরে কী পরিমাণ এলপিজি বিক্রি করেছে জানতে চেয়েছি।’ তিনি বলেন, ‘আমরা সমন্বিতভাবে কাজ করে যাচ্ছি। মিনিস্ট্রি কাজ করছে। জেলা পর্যায় পর্যন্ত তদারকি করা হচ্ছে। আজ নতুন দাম ঘোষণা করা হবে। এরপর আরও কঠোরভাবে মনিটরিং করা হবে।’
জানতে চাইলে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ বলেন, ‘এলপিজি সরকার আমদানি করে না। এটা প্রাইভেট কোম্পানি আনে। এটাকে ঠিক রাখার জন্য আমরা কাজ করছি। দিন-রাত কাজ করছি। সুতরাং দেখা যাক কতদূর কী করা যায়।’


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









