দেশে তরলীকৃত পেট্রোলিয়াম গ্যাস (এলপিজি)সরবরাহ সংকট ও বাড়তি দামে বিক্রির অভিযোগের মধ্যেই ১২ কেজি এলপিজি সিলিন্ডারের দাম ২৫২ টাকা বাড়ানো হয়েছে। বেসরকারি খাতের ১২ কেজির সিলিন্ডারের দাম ১ হাজার ৫৮৫ টাকা থেকে বাড়িয়ে ১ হাজার ৮৩৭ টাকা নির্ধারণ করেছে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি)। নতুন দর গতকাল রবিবার সন্ধ্যা ৬টা থেকে কার্যকর হবে।
রবিবার নতুন দর ঘোষণা করে বিইআরসি জানিয়েছে, আন্তর্জাতিক বাজারে এলপিজির দাম বাড়ায় দেশের বাজারেও দাম সমন্বয় করা হয়েছে। আন্তর্জাতিক বাজারের দামের সঙ্গে সমন্বয় করে প্রতি মাসে এলপিজির দাম নির্ধারণ করে কমিশন। একই হারে সাড়ে ৫ কেজি থেকে ৪৫ কেজি পর্যন্ত বিভিন্ন ওজনের এলপিজি সিলিন্ডারের দামও বাড়ানো হয়েছে।
গাড়িতে ব্যবহৃত এলপিজি বা অটোগ্যাসের দাম প্রতি লিটার ৭৩ টাকা ৯ পয়সা থেকে বাড়িয়ে ৮৪ টাকা ৬২ পয়সা করা হয়েছে। তবে সরকারি কোম্পানির সরবরাহ করা সাড়ে ১২ কেজি এলপিজি সিলিন্ডারের দাম ৮২৫ টাকা অপরিবর্তিত রাখা হয়েছে। যদিও এই এলপিজির সরবরাহ খুবই সীমিত হওয়ায় সাধারণ ভোক্তাদের বেশির ভাগই তা কিনতে পারেন না। নতুন দর এমন সময়ে ঘোষণা করা হলো, যখন দেশের বিভিন্ন এলাকায় এলপিজির সংকট চলছে। বাড়তি দাম দিয়েও কোথাও কোথাও গ্যাস পাওয়া যাচ্ছে না।
আবার যেখানে পাওয়া যাচ্ছে, সেখানে ১২ কেজির সিলিন্ডার ২,২০০-২,৫০০ টাকা পর্যন্ত দামে বিক্রির অভিযোগ রয়েছে। ফলে নতুন দর ঘোষণার পর বাজারে ভোক্তার ওপর চাপ আরও বাড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। এর মধ্যেই সরবরাহ কমিয়ে কৃত্রিম সংকট তৈরির অভিযোগে ১২ আমদানিকারকের সেপ্টেম্বর মাসের আমদানি ও বিক্রির তথ্য চেয়েছে বিইআরসি। গত শনিবার চিঠি দিয়ে গতকাল রবিবারের মধ্যে এসব তথ্য জমা দিতে বলা হয়েছে। চিঠিতে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) কাছ থেকে পাওয়া আমদানির তথ্যও উল্লেখ করা হয়েছে। বিইআরসি চেয়ারম্যান জালাল আহমেদ জানিয়েছেন, আমদানি ও বিক্রির তথ্য পাওয়ার পর পরিস্থিতি বুঝে পরবর্তী পদক্ষেপ নেওয়া হবে।
এলপিজি ব্যবসায়ী সমবায় সমিতির অভিযোগ, গত ২০ সেপ্টেম্বর থেকে আমদানিকারকরা সরবরাহ প্রায় ৮০% কমিয়ে দেন। ২৫ সেপ্টেম্বরের পর কয়েকটি ডিপো থেকে সরবরাহ পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায়। তবে আমদানিকারকরা এ অভিযোগ অস্বীকার করে বলছেন, তারা বিইআরসির নির্ধারিত দামেই ডিস্ট্রিবিউটরদের কাছে এলপিজি সরবরাহ করছেন। তাদের দাবি, আমদানিকারক পর্যায়ে কোনো কৃত্রিম সংকট তৈরি করা হয়নি।
এর আগে গত শনিবার জ্বালানি মন্ত্রীর সঙ্গে বৈঠকেও আমদানিকারকরা একই দাবি করেন। তারা বলেন, আন্তর্জাতিক বাজারে এলপিজি ও জাহাজভাড়া বাড়লেও সরবরাহ স্বাভাবিক রাখার চেষ্টা করছেন তারা। বাজারে কারসাজি হয়ে থাকলে তা ডিস্ট্রিবিউটর ও খুচরা বিক্রেতা পর্যায়ে হতে পারে বলে তাদের দাবি।
বিইআরসির হিসাবে, ২০২১ সালের ১২ এপ্রিল দেশে প্রথমবার এলপিজির মাসভিত্তিক মূল্য নির্ধারণের সময় ১২ কেজি সিলিন্ডারের দাম ছিল ৯৭৫ টাকা। এরপর কখনও দাম বেড়েছে, কখনও কমেছে। তবে কমার তুলনায় বাড়ার প্রবণতাই বেশি। চলতি বছরের জানুয়ারিতে ১২ কেজি এলপিজির দাম ছিল ১ হাজার ২৫৩ টাকা। ফেব্রুয়ারিতে তা বেড়ে হয় ১ হাজার ৩৫৬ টাকা। পরে ভ্যাট কমায় ১৫ টাকা কমে দাম দাঁড়ায় ১ হাজার ৩৪১ টাকা। মার্চে অপরিবর্তিত থাকার পর এপ্রিলে দুই দফায় মোট ৫৯৯ টাকা বেড়ে দাম ১ হাজার ৯৪০ টাকায় ওঠে। এরপর জুনে ৫৫ টাকা এবং জুলাইয়ে ৩৫৭ টাকা কমানো হয়।
আগস্টে আবার ৭০ টাকা বেড়ে দাম হয় ১ হাজার ৫৯৮ টাকা। সেপ্টেম্বরে ১৩ টাকা কমিয়ে ১ হাজার ৫৮৫ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছিল। এক মাসের ব্যবধানেই এবার সেই দাম আবার ২৫২ টাকা বাড়িয়ে ১ হাজার ৮৩৭ টাকা করা হলো। মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধ শুরুর পর আন্তর্জাতিক বাজারে এলপিজির দাম বাড়লেও যুদ্ধবিরতির পর কিছুটা কমে আসে। এরপর কয়েক মাস ধরে বাজারে দামের ওঠানামা চলছে। আন্তর্জাতিক বাজারের এই পরিবর্তনের সঙ্গে সমন্বয় করেই দেশের বাজারে নতুন দাম নির্ধারণ করা হয়েছে বলে জানিয়েছে বিইআরসি।
এলপি গ্যাসের পর এবার যানবাহনে ব্যবহৃত অটোগ্যাসের দামও বেড়েছে। প্রতি লিটারে প্রায় ১২ টাকা বাড়িয়ে নতুন দাম নির্ধারণ করেছে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি)। রবিবার এ দাম নির্ধারণ করা হয়। নতুন দাম অনুযায়ী, প্রতি লিটার অটোগ্যাস ৮৪ টাকা ৬২ পয়সা করা হয়েছে। যা আগে ছিল ৭৩ টাকা ৯ পয়সা। এর আগে গত সেপ্টেম্বর মাসে ১২ কেজি এলপিজি সিলিন্ডারের দাম ১৩ টাকা কমিয়ে ১ হাজার ৫৮৫ টাকা নির্ধারণ করা হয়।
এদিকে এলপিজি নিয়ে খুচরা বাজারে অস্থিরতা চলছে। নির্ধারিত দামের চেয়ে বেশি দামে বিক্রি কিংবা নিয়মবহির্ভূতভাবে এলপিজি মজুত করলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার হুঁশিয়ারি দিয়েছে এলপিজি অপারেটরস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশ (এলওএবি)। গেল বৃহস্পতিবার এলওএবির সভাপতি মোহাম্মদ আমিরুল হকের স্বাক্ষরিত এক বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানানো হয়। এতে বলা হয়, দেশে বর্তমানে এলপিজির সরবরাহ সন্তোষজনক। গত সেপ্টেম্বরে দেশে ১ দশমিক ৫৬ লাখ টন এলপিজি আমদানি হয়েছে।
এর আগে আগস্টে আমদানি করা হয়েছিল ১ দশমিক ৫৮ লাখ টন। ফলে চাহিদার তুলনায় সরবরাহ পর্যাপ্ত রয়েছে এবং বাজারে কৃত্রিম সংকট তৈরির কোনো সুযোগ নেই। এলওএবি জানায়, গত ২৮ সেপ্টেম্বর বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ে মন্ত্রীর সভাপতিত্বে মন্ত্রণালয় ও এলওএবির নেতাদের মধ্যে এলপিজির সরবরাহ ও মূল্য পরিস্থিতি নিয়ে মতবিনিময় সভা অনুষ্ঠিত হয়। সভায় দেশের এলপিজি সরবরাহ ও বাজার পরিস্থিতি নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করা হয়।
বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, পর্যাপ্ত সরবরাহ থাকা সত্ত্বেও কোনো এলপিজি অপারেটর, পরিবেশক, ডিলার বা খুচরা বিক্রেতা বিইআরসি নির্ধারিত মূল্যের চেয়ে বেশি দামে এলপিজি সিলিন্ডার বিক্রি করলে এবং নিয়মবহির্ভূতভাবে মজুত করলে তা প্রচলিত আইনের লঙ্ঘন হিসেবে গণ্য হবে। এ ধরনের অনিয়মে জড়িতদের বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী যথাযথ শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
এর আগে গত ৩০ সেপ্টেম্বর জ্বালানিমন্ত্রী এক অনলাইন সভায় জেলা প্রশাসকদের এলপিজির বাজার পরিস্থিতি কঠোরভাবে মনিটর করার নির্দেশ দিয়েছেন। এর পরিপ্রেক্ষিতে এলওএবির পক্ষ থেকে সব সদস্য কোম্পানি, পরিবেশক, ডিলার ও খুচরা বিক্রেতাকে অবিলম্বে বিইআরসি নির্ধারিত মূল্যে এলপিজি বিক্রি নিশ্চিত করতে বলা হয়েছে। সাধারণ ভোক্তাদের অধিকার সুরক্ষা ও বাজার স্থিতিশীল রাখতে সংশ্লিষ্ট প্রশাসনিক কর্তৃপক্ষ এবং আইন প্রয়োগকারী সংস্থার সঙ্গে সার্বক্ষণিক সহযোগিতা অব্যাহত রাখার কথাও জানিয়েছে এলওএবি।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









