‘তিন দশক আগে এখানে প্লট কিনেছিলেন আমার বাবা। বছরের পর বছর অপেক্ষা করেছেন। শেষ বয়সেও আশায় ছিলেন পূর্বাচলে নিজের বাড়িটি দেখে যেতে পারবেন। কিন্তু তা আর হয়নি। শেষ পর্যন্ত অতৃপ্তি নিয়েই চলে যেতে হয়েছে তাঁকে।’ আক্ষেপের সুরে কথাগুলো বলেছিলেন পূর্বাচল নতুন শহর প্রকল্পের এক প্লট মালিকের ছেলে ওমর শরিফ। সঙ্গে যোগ করলেন, ‘আমিও বাড়ির মুখ দেখে যেতে পারব কি না জানি না। হয়তো আমার ছেলেমেয়েরা করবে!’
ঢাকা মহানগরীর ক্রমবর্ধমান আবাসন চাপ কমাতে এবং একটি আধুনিক, পরিকল্পিত ও স্বয়ংসম্পূর্ণ নগরী গড়ে তোলার যে স্বপ্ন নিয়ে যাত্রা শুরু হয়েছিল পূর্বাচল নতুন শহর প্রকল্পের— তিন দশক পেরিয়েও সেই স্বপ্ন আজও বাস্তব রূপ পায়নি। ১৯৯৫ সালে শুরু হওয়া এই মেগা প্রকল্প ৩১ বছরেও পুরোপুরি বসবাসযোগ্য নগরীতে রূপ নিতে ব্যর্থ হয়েছে।
তিন দশকেও পূর্বাচল নতুন শহর প্রকল্পের কাঙ্ক্ষিত উন্নয়ন হয়নি। নাগরিক সুবিধা না থাকায় বাড়ি নির্মাণের আগ্রহ হারাচ্ছেন প্লট মালিকরা। ২১ হাজার প্লট হস্তান্তরের বিপরীতে গড়ে উঠেছে মাত্র চার শর মতো বাড়ি বা স্থাপনা। সম্প্রতি ঢাকা উত্তর সিটির আওতাভুক্ত করা হয় পূর্বাচলকে।
ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশন-ডিএনসিসি প্রশাসক জানালেন, এরই মধ্যে নাগরিক সুবিধা নিশ্চিতে প্রাথমিক প্রস্তুতি শুরু হয়েছে। তবে নগর পরিকল্পনাবিদরা মনে করেন, কাগজে-কলমে সীমানা বদল হলেও মাঠপর্যায়ের বাস্তবতায় বিকেন্দ্রীকরণের মূল উদ্দেশ্য সফল না হওয়ার শঙ্কা তৈরি হয়েছে।
পরিকল্পনা অনুযায়ী পূর্বাচলের ৩০টি সেক্টরের আবাসিক প্লটের বেশির ভাগেরই নেই সীমানা প্রাচীর। অব্যবহৃত জায়গাগুলো কাজে লাগিয়ে অনেক মালিক বা স্থানীয় কৃষকদের দেখা যায় চাষাবাদ আর গরু-ছাগল লালন-পালন করতে। এছাড়া সড়কবাতি না থাকা, বহিরাগতদের অবাধ চলাচল, তিন জেলার সীমানা বিরোধ এবং রাজউকের অভ্যন্তরীণ আমলাতান্ত্রিক জটিলতায় মালিকরা প্রতিনিয়ত হয়রানির শিকার হচ্ছেন। মালিকরা জানান, এখানে গ্যাস, বাজার, যানবাহনের সমস্যা আছে। নেই কোনো স্কুল-কলেজ, তবে কর্তৃপক্ষের এ নিয়ে কোনো খোঁজ নেই বলে অভিযোগ তাদের। পূর্বাচলে এসে নতুন পরিবেশের বদলে গ্রাম্য পরিবেশে থাকার মতো অবস্থা তৈরি হয়েছে বলেও দাবি করেন তারা।
তবে সম্প্রতি প্রশাসনিক পুনর্বিন্যাস সংক্রান্ত জাতীয় বাস্তবায়ন কমিটি-নিকারের বৈঠকে পূর্বাচলকে নারায়ণগঞ্জ ও গাজীপুর জেলার আওতা থেকে ঢাকা উত্তর সিটির আওতাভুক্ত করা হয়েছে। এতে পড়ে থাকা খালি প্লটে বাড়ি নির্মাণে অচলাবস্থা কেটে যাওয়ার পথ কি তৈরি হলো? ডিএনসিসি প্রশাসক জানান, এরই মধ্যে নাগরিক সুবিধা নিশ্চিতে রাজউকের সঙ্গে সমন্বয় করে প্রাথমিক রূপরেখা ও প্রস্তুতি শুরু করেছেন তাঁরা।
জানতে চাইলে ডিএনসিসি প্রশাসক মো. শফিকুল ইসলাম খান বলেন, ‘আমরা রাজউকসহ বসে একটা সিদ্ধান্ত নিয়ে অপারেশনে চলে যাব। সেখানে আমাদের প্রশাসনিক ভবন থাকবে, জোনাল অফিস থাকবে। যখন কাজগুলো শুরু হয়ে যাবে, তখন সেখানে প্লট মালিকরা যাঁরা আছেন, তাঁরা নিজ উদ্যোগেই সেখানে কাজ শুরু করে দেবেন। হয়তো তারা রাজউকের কাছে আবেদন করে একটা সময়সীমা নির্ধারণ করতে পারেন।’
প্রশাসনিক জটিলতা দূর করতে এবং পূর্বাচল নতুন শহরকে বাসযোগ্য করতেই নতুন প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়েছে বলে জানান রাজউকের চেয়ারম্যান ইঞ্জিনিয়ার মো. রিয়াজুল ইসলাম। তবে কবে থেকে এই প্রকল্প শুরু হবে— সে প্রশ্ন এড়িয়ে গেলেও প্রয়োজনীয় সব ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে বলে জানান তিনি। রাজউক চেয়ারম্যান বলেন, ‘পূর্বাচল যেন অতিদ্রুত বাসযোগ্য করা যায় সেজন্য আমরা আরো কিছু কাজ হাতে নিয়েছি। বিভিন্ন প্লট মালিক বা বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে আমরা মতবিনিময় করছি যে, তারা কেন যাচ্ছেন না। তারা যেটা চান এবং তাদের ফাইলগুলো যাতে দ্রুত নিষ্পত্তি হয়, সেই ব্যাপারে সিরিয়াস নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।’
তবে নগর পরিকল্পনাবিদরা মনে করেন, কাগজে-কলমে সীমানা বদল হলেও মাঠপর্যায়ের বাস্তবতায় বিকেন্দ্রীকরণের মূল উদ্দেশ্যটি এখানে পুরোপুরি বিফল হওয়ার ঝুঁকিতে পড়েছে। নগর পরিকল্পনাবিদ আদিল মুহাম্মদ খান বলেন, এটা সরকারের যে বিকেন্দ্রীকরণ ধারণা, আমরা সম্পূর্ণ তার বিপরীত পথে হাঁটছি। ঢাকা আরো বড় হচ্ছে, ঢাকার প্রভাব আরো বড় হবে, ঢাকামুখিতা আরো বাড়বে। এটাকে আলাদা সিটি করপোরেশন বা নারায়ণগঞ্জের সঙ্গেও যদি নেওয়া হতো, তাহলে ঢাকামুখিতা কমে যেত। সঠিক পরিকল্পনা, উন্নয়ন নিয়ন্ত্রণ এবং আইনের শাসন নিশ্চিত হলেই পূর্বাচল বাসযোগ্য নগর হিসেবে গড়ে উঠবে বলে মত তাঁদের।
নারায়ণগঞ্জ এবং গাজীপুরের প্রশাসনিক জটিলতা থেকে মুক্ত হয়ে পূর্বাচল এখন পুরোপুরি ঢাকার অংশ। যে পূর্বাচলকে ঘিরে নাগরিকরা একটি আধুনিক স্বপ্নের নগরী প্রত্যাশা করেছিলেন, তিন দশক ধরে তা আটকে ছিল তিন জেলার প্রশাসনিক গোলকধাঁধায়। তবে ঢাকা সীমানার সাথে যুক্ত হয়ে সেই জটলা এখন কেটেছে। এখন মূল চ্যালেঞ্জ, রাজউকের কাগজে-কলমে মাস্টারপ্ল্যান ও ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের মধ্যে নাগরিক সেবার সমন্বয় কতটা দ্রুত বাস্তবায়িত হয়। পানি, গ্যাস আর নিরাপত্তার মতো মৌলিক চাহিদাগুলো যদি আগামী দিনগুলোতে নিশ্চিত করা না যায়, তাহলে এই নতুন শহর পুরোটাই শুধু প্লটের এক মরুভূমি হয়েই থেকে যাবে না তো?
স্বপ্নের পূর্বাচল আজও কাগুজে নগর
ঢাকা মহানগরীর ক্রমবর্ধমান আবাসন চাপ কমাতে এবং একটি আধুনিক, পরিকল্পিত ও স্বয়ংসম্পূর্ণ নগরী গড়ে তোলার যে স্বপ্ন নিয়ে যাত্রা শুরু হয়েছিল পূর্বাচল নতুন শহর প্রকল্পের— তিন দশক পেরিয়েও সেই স্বপ্ন আজও বাস্তব রূপ পায়নি। ১৯৯৫ সালে শুরু হওয়া এই মেগা প্রকল্প ৩১ বছরেও পুরোপুরি বসবাসযোগ্য নগরীতে রূপ নিতে ব্যর্থ হয়েছে। বারবার সময় বাড়ানো, একাধিক দফা নকশা পরিবর্তন, মামলা-মোকদ্দমা, স্থানীয় বিরোধ, সেবা সংস্থাগুলোর অকার্যকারিতা ও প্রশাসনিক সিদ্ধান্তহীনতায় পূর্বাচল নতুন শহর আজ দীর্ঘসূত্রতা ও ব্যর্থ পরিকল্পনার প্রতীক হয়ে দাঁড়িয়েছে।
সময়সীমা পেরোলেও শেষ হয়নি প্রকল্প
রাজউক সূত্র জানায়, প্রায় ৬ হাজার ১৫০ একর জমির ওপর গড়ে ওঠা পূর্বাচল নতুন শহর প্রকল্পের প্রাথমিক লক্ষ্য ছিল ঢাকার ওপর আবাসন চাপ কমিয়ে একটি পরিকল্পিত নতুন টাউনশিপ গড়ে তোলা। প্রাথমিক পরিকল্পনা অনুযায়ী ২০১৩ সালের মধ্যেই প্রকল্পটি শেষ হওয়ার কথা থাকলেও ২০২৬ সালে দাঁড়িয়েও এটি অসম্পূর্ণ ও আংশিক বসবাসযোগ্য অবস্থায় রয়েছে। প্রকল্পের বাস্তবায়নকাল পাঁচ দফা সংশোধন করা হয়েছে এবং সাতবার মেয়াদ বাড়ানো হয়েছে। সর্বশেষ সময়সীমা নির্ধারণ করা হয়েছিল ২০২৪ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত। তবু বাস্তবে পূর্বাচল এখনো পূর্ণাঙ্গ নগর হিসেবে দাঁড়াতে পারেনি।
হাজার কোটি ব্যয়েও নাগরিক সুবিধার সংকট
এ পর্যন্ত পূর্বাচল প্রকল্পে প্রায় ৮ হাজার কোটি টাকা ব্যয় করা হলেও কার্যকর সড়ক ব্যবস্থা, নিরবচ্ছিন্ন পানি, বিদ্যুৎ ও গ্যাস সংযোগ নিশ্চিত করা যায়নি। নাগরিক সুযোগ–সুবিধার অভাবে প্লট মালিকরা বসতি স্থাপনে আগ্রহ হারাচ্ছেন। বর্তমান সংকট কাটাতে ২০২৫ আগস্টে রাজউক নতুন করে আবার প্রায় ৯ হাজার কোটি টাকার আরেকটি উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব (ডিপিপি) পরিকল্পনা কমিশনে পাঠিয়েছে। যেখানে ভূমি উন্নয়নে ১৮৭ কোটি, ২৭৬টি মসজিদ ও তিনটি অন্যান্য ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান নির্মাণে ৭৬৭ কোটি, আনসার ব্যারাক নির্মাণে ১৩ কোটি, ৩৬৩ কিলোমিটার স্ট্রিট লাইট স্থাপনে ৫৪৫ কোটি, ১৯টি কাঁচাবাজার নির্মাণে ১ হাজার ৩৪০ কোটি এবং ২৮৮ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মাণ করা হবে রাজউক পূর্বাচল স্কুল অ্যান্ড কলেজ। এছাড়া ৩৩৭ কিলোমিটার সড়ক প্রশস্ত ও মজবুত করতে ১ হাজার ৫১১ কোটি, প্রায় ৩২১ কিলোমিটার নতুন সড়ক নির্মাণে ৩২৩ কোটি, জলাবদ্ধতা নিরসনে ১০টি স্লুইসগেট ও একটি বক্স কালভার্ট নির্মাণে ১৬১ কোটি, ২০ হাজার ২১৩ দশমিক ৭ বর্গমিটার আয়তনের আবাসিক ভবন নির্মাণে ১৪০ কোটি টাকা ব্যয়ের পরিকল্পনার প্রস্তাব করা হয়েছে। এসব প্রকল্পের কাজ শেষ হওয়ার সময় নির্ধারণ করা হয়েছে ২০২৮ সালের জুন মাস।
কেন বাসযোগ্য হয়ে উঠল না পূর্বাচল?
পূর্বাচল নতুন শহর প্রকল্পের মূল লক্ষ্য ছিল রাজধানীর ওপর জনসংখ্যার চাপ কমিয়ে একটি পরিকল্পিত, পরিবেশবান্ধব, আবাসিক-বাণিজ্যিক শহর গড়ে তোলা। যেখানে থাকবে প্রয়োজনীয় অবকাঠামো-প্রশস্ত সড়ক, গ্যাস, বিদ্যুৎ, পানি, হাসপাতাল, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, পার্ক ও অফিস এলাকা। কিন্তু বাস্তবে এই স্বপ্নের নগরী বাসযোগ্য হয়ে উঠতে পারেনি নানা সুদূরপ্রসারী সমস্যার কারণে।
প্লট বরাদ্দপ্রাপ্ত ব্যক্তি, রাজউকের প্রকল্প-সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা এবং নগরপরিকল্পনাবিদদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বাসযোগ্যতা অর্জনে ব্যর্থতার পেছনে কয়েকটি মূল কারণ রয়েছে। প্রথমত, প্রকল্পের অভ্যন্তরীণ সড়ক নির্মাণে চরম ধীরগতি লক্ষ্য করা গেছে। কিছু প্রধান সড়ক নির্মিত হলেও, অভ্যন্তরীণ প্লটসংলগ্ন সংযোগ সড়কগুলোর অবস্থা এখনো শোচনীয়। অনেক রাস্তা এখনো কাঁচা বা ভাঙাচোরা। যা বর্ষাকালে একেবারে চলাচলের অযোগ্য হয়ে পড়ে। দ্বিতীয়ত, গণপরিবহন ব্যবস্থা অত্যন্ত সীমিত।
ফলে যারা বসবাস শুরু করেছেন, তাদের বেশির ভাগই নির্ভর করেন ব্যক্তিগত যানবাহনের ওপর। যা সবার পক্ষে সম্ভব নয়। তৃতীয়ত, পূর্বাচলের অধিকাংশ এলাকায় এখনো নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ, গ্যাস ও সুপেয় পানির সংযোগ নিশ্চিত করা যায়নি। হাতে গোনা কয়েকটি ব্লকে বিদ্যুৎ রয়েছে, তবে গ্যাস না থাকায় বাসিন্দাদের সিলিন্ডার গ্যাস বা বৈদ্যুতিক চুলার ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে। সুপেয় পানির জন্য নিজস্ব গভীর নলকূপ স্থাপন করতে হচ্ছে, যা ব্যয়বহুল এবং পরিবেশের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ। পয়ঃনিষ্কাশন ব্যবস্থাও এখনো গড়ে ওঠেনি সেভাবে। বর্ষাকালে অনেক এলাকা জলাবদ্ধ হয়ে পড়ে, যার ফলে মশাবাহিত রোগের আশঙ্কা বাড়ে। এছাড়া পূর্বাচলের অবস্থান ঢাকার মূল কেন্দ্র থেকে অনেকটা দূরে হওয়ায় যাতায়াতও একটি বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
যোগাযোগ ও নাগরিক সেবা সংকটে বসবাসে নিরুৎসাহ
কুড়িল ফ্লাইওভারের মাধ্যমে ঢাকার সঙ্গে পূর্বাচলের যোগাযোগ কিছুটা সহজ হলেও, প্রকল্প এলাকার অভ্যন্তরীণ যোগাযোগ ব্যবস্থা এতটাই দুর্বল যে অনেক সময় প্লট মালিকরা নিজেদের জমিতে যেতেও আগ্রহ হারিয়ে ফেলেন। এ ছাড়া পূর্বাচলে এখনো পর্যাপ্ত ও মানসম্পন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠেনি। হাতে গোনা কয়েকটি স্কুল-কলেজ থাকলেও সেগুলো প্রয়োজনের তুলনায় অপ্রতুল। ফলে অনেক অভিভাবককে সন্তানদের ঢাকার মূল শহর বা অন্য দূরবর্তী এলাকায় পাঠাতে হয়, যা তাদের জন্য আর্থিক ও মানসিক চাপের কারণ। স্বাস্থ্যসেবার ক্ষেত্রেও একই চিত্র। পূর্বাচলে এখনো কোনো উন্নতমানের হাসপাতাল বা আধুনিক ক্লিনিক গড়ে ওঠেনি। ফলে বাসিন্দারা সাধারণ স্বাস্থ্যসেবা বা জরুরি চিকিৎসার জন্য ঢাকার ওপর নির্ভরশীল।
জমি অধিগ্রহণ ও পরিকল্পনায় জটিলতা
প্রকল্পের শুরু থেকেই জমি অধিগ্রহণ প্রক্রিয়ায় ছিল নানা জটিলতা। রাজউক ও ভূমি মালিকদের মধ্যে বোঝাপড়ার অভাব, ক্ষতিপূরণ নিয়ে বিরোধ এবং প্লট হস্তান্তরে দীর্ঘসূত্রতা প্রকল্প বাস্তবায়নে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। এর পাশাপাশি ছিল পরিকল্পনার দুর্বলতা। সুদূরপ্রসারী ও বাস্তবসম্মত পরিকল্পনার অভাব এবং বারবার নকশা ও বাস্তবায়ন পরিকল্পনায় পরিবর্তন প্রকল্পের গতি শ্লথ করেছে। পর্যাপ্ত সমন্বয়ের অভাবে প্রকল্পের অনেক গুরুত্বপূর্ণ কাজ দীর্ঘ সময়েও এগোয়নি।
পূর্বাচলে একটি প্লটের মালিক সাইদুর রহমান নামের একজন অবসরপ্রাপ্ত সরকারি কর্মকর্তা। তিনি বলেন, ‘অবসরের পর এখানে শান্তিতে থাকার স্বপ্ন নিয়ে প্লট কিনেছিলাম। ভেবেছিলাম, শেষ জীবনটা শান্ত পরিবেশে কাটাব। কিন্তু আজ ৩০ বছর পরও আমার স্বপ্ন স্বপ্নই রয়ে গেল। এখানে গ্যাস নেই, সুপেয় পানি নেই, বাচ্চাদের খেলার মাঠ নেই। মনে হয়, সারা জীবনের সঞ্চয় দিয়ে কেনা প্লটে আর বাড়ি করা দেখে যেতে পারব না।’
এখানে দ্বিতীয় পক্ষের মাধ্যমে প্লট কিনেছেন এক ব্যবসায়ী। নাম জানতে চাইলে এড়িয়ে গিয়ে শুধু বললেন, ‘আমার প্লটে বাড়ি করতে চেয়েছি। কিন্তু বিদ্যুৎ সংযোগের জন্য বছরের পর বছর অপেক্ষা করতে হচ্ছে। রাস্তাঘাট ঠিক নেই, তাই নির্মাণসামগ্রী আনাও কঠিন। নিরাপত্তার অভাবও একটি বড় সমস্যা। দিনে-দুপুরে চুরির ঘটনা ঘটে। সব মিলিয়ে রাজউক সব প্রস্তুতি শেষ করার আগ পর্যন্ত বাড়ি করতে পারব বলে মনে হচ্ছে না। শত শত প্লট মালিক চান তাদের নিজেদের প্লটে বাড়ির কাজ শুরু করতে। কিন্তু রাজউকের অগ্রগতি না থাকায় আমরা বাড়ির কাজ শুরু করতে পারছি না।’
স্বপ্নের নগর, বাস্তবে অচল
ভবিষ্যতে ৩০ থেকে ৪০ লাখ মানুষের বসবাসের সম্ভাবনা থাকলেও নাগরিক সুবিধা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত না হলে পূর্বাচল নতুন শহর প্রকল্প সেই স্বপ্ন বাস্তবায়নে ব্যর্থই থেকে যাবে— এমনটাই মনে করছেন বিশেষজ্ঞ ও প্লট মালিকরা। তিন দশক পেরিয়েও যদি একটি পরিকল্পিত নগর গড়ে না ওঠে, তবে প্রশ্ন উঠছে— পূর্বাচল কি সত্যিই স্বপ্নের নগর, নাকি দীর্ঘসূত্রতার আরেক নাম?
জহিরুল ইসলাম নামের এক প্লট মালিক জানান, ২০০৯ সালে পূর্বাচলে প্লট বরাদ্দ পেলেও কাজ শুরু করেন ২০২৫ সালে। নাগরিক সুবিধা না থাকায় আগ্রহ পাননি বাড়ি নির্মাণের। তার কাছে প্রশ্ন ছিল— এখন কি তাহলে নাগরিক সুবিধা মিলেছে? উত্তরে এই প্লট মালিক বলেন, ‘নাগরিক যে সুবিধাগুলো থাকার কথা ছিল, রাজউক যেগুলোর কথা বলেছিল, যেমন- শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, সড়ক বাতি, নিরাপত্তা— এগুলোর অভাবে আমি শুরু করতে পারিনি। আমাদের প্ল্যান পাস করানোর সময় মেয়াদ দেওয়া ছিল তিন বছর। তো আমি এখন বাধ্য হয়েই এসব সুবিধা ছাড়া শুরু করে দিয়েছি।’
আরেকজন প্লট মালিক শাহজাহান মিয়াও জানালেন তাঁর কথা। ২০১৪ সালে প্লট বরাদ্দ পেয়েও এখনো পড়ে আছে তাঁর জায়গা। স্কুল, কলেজ আর বসবাসের জন্য প্রয়োজনীয় সুবিধা না থাকায় বাড়ি নির্মাণ করছেন না তিনি। তিনি বলেন, ‘রাজউকের জটিলতার কারণে প্রক্রিয়া দীর্ঘ হচ্ছে। নাগরিক সুবিধা আমরা পাচ্ছি না, যেমন- পানি, বিদ্যুৎ আছে কিন্তু সড়কবাতি নেই, নিরাপত্তা নেই।’
প্লট আছে, মানুষ নেই
প্রকল্পের আওতায় ৩০টি সেক্টরে মোট ২৭ হাজার ১৭১টি প্লট ও ৬২ হাজার অ্যাপার্টমেন্টের সুযোগ থাকলেও এখন পর্যন্ত প্রায় ২১ হাজার প্লট হস্তান্তর করা হয়েছে। অথচ নির্মাণকাজ শুরু হয়েছে মাত্র কয়েক শ প্লটে। সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, বিস্তীর্ণ এলাকাজুড়ে হাজার হাজার প্লট ফাঁকা পড়ে আছে। কোথাও আধা নির্মিত ভবন, কোথাও ঝোপঝাড়ে ভরা জমি। কিছু প্লটে শ্রমিকদের জন্য অস্থায়ী টিন ও কাঠের ঘর গড়ে উঠেছে। হাতে গোনা কয়েকটি পরিবার নানা সীমাবদ্ধতার মধ্যেই বসবাস শুরু করেছে।
নেই মৌলিক নাগরিক সেবা
পূর্বাচল প্রকল্প এলাকায় এখনো নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস, পানি ও বিদ্যুৎ সংযোগ নিশ্চিত করা হয়নি। অভ্যন্তরীণ সড়কব্যবস্থাও অপর্যাপ্ত। ৩১৯ কিলোমিটার রাস্তার মধ্যে মাত্র ১৬০ কিলোমিটার নির্মাণ সম্পন্ন হয়েছে। অধিকাংশ রাস্তা এখনো নির্মাণাধীন। সন্ধ্যার পর সড়কবাতি না থাকায় পুরো এলাকা অন্ধকারে ঢেকে যায়। স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, খেলার মাঠ, পার্ক ও কমিউনিটি স্পেস— সবই কেবল নকশা আর পরিকল্পনার মধ্যে সীমাবদ্ধ।
নিরাপত্তাহীনতায় আতঙ্কিত বাসিন্দারা
নাগরিক সুবিধার পাশাপাশি পূর্বাচলের সবচেয়ে বড় সংকট নিরাপত্তা। পূর্ণাঙ্গ থানা বা স্থায়ী পুলিশ ফাঁড়ি না থাকায় পূর্বাচল ঘিরে তৈরি হয়েছে অপরাধীদের স্বর্গরাজ্যে। প্রায় প্রতিদিনই চুরি, ছিনতাই, ধর্ষণ, অপহরণ, ডাকাতিসহ খুন করে লাশ ফেলে যাওয়া এবং মাদক কারবারের অভিযোগ শোনা যায়। এছাড়া ৩০০ ফিট সড়কে বেপরোয়া যান চলাচলের কারণে সড়ক দুর্ঘটনাও যেন নিত্যদিনের রুটিনে পরিণত হয়েছে। সন্ধ্যার পর পর্যাপ্ত সড়কবাতি না থাকায় পুরো এলাকা অন্ধকারে ঢেকে যায়, যা অপরাধপ্রবণতা বাড়াচ্ছে বলে অভিযোগ স্থানীয়দের।
নতুন দুই থানা: স্বস্তি না নতুন প্রশ্ন
এমন বাস্তবতায় সরকার পূর্বাচল নতুন শহরের জন্য পূর্বাচল উত্তর থানা ও পূর্বাচল দক্ষিণ থানা নামে দুটি নতুন থানা গঠনের অনুমোদন দিয়েছে। নিকার সভার এই সিদ্ধান্ত সময়োপযোগী হলেও প্রয়োজনের তুলনায় তা খুবই কম— অভিমত নিরাপত্তা সংস্থাগুলোর। কারণ এর আগে পূর্বাচল এলাকাকে ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের (ডিএমপি) আওতায় এনে সেখানে ৪টি থানা, ৬টি পুলিশ ফাঁড়ি ও ৪১টি পুলিশ বক্সসহ একটি পূর্ণাঙ্গ ও স্বয়ংসম্পূর্ণ পুলিশ কাঠামো গড়ে তোলার জন্য এবং এই বিশাল কাঠামো পরিচালনার জন্য ৬ হাজার ৫২৪টি নতুন পদ সৃষ্টি লক্ষে গত ১৮ অক্টোবর পুলিশ সদর দপ্তরে প্রস্তাব পাঠায় ডিএমপি। সেখানে ছিল নতুন অপরাধ বিভাগ, ট্রাফিক বিভাগ ও পুলিশ লাইনস স্থাপনের পরিকল্পনাও। তবে আপাতত দুই থানার অনুমোদনেই সীমাবদ্ধ থাকছে উদ্যোগটি।
হয়রানি ও দুর্নীতির অভিযোগ
অভিযোগ রয়েছে-এই প্রকল্পে প্লটপ্রাপ্তরা পদে পদে হয়রানির শিকার হচ্ছেন। রাজউকের একশ্রেণীর কর্মচারী ও দালাল চক্র বিভিন্নভাবে প্লট মালিকদের ভোগান্তিতে ফেলে হাতিয়ে নিচ্ছেন মোটা অংকের অর্থ। স্থানীয় অধিবাসীদের ক্ষতিপূরণ ও পুনর্বাসন ব্যবস্থা না করেই প্রকল্পের প্লট বিতরণ ও ভৌত অবকাঠামো নির্মাণের কাজ শুরু হওয়ায় স্থানীয়দের সঙ্গে সংঘাত লেগেই রয়েছে। এসব সমস্যার মধ্য দিয়েই এগিয়ে চলেছে পূর্বাচল নতুন শহর প্রকল্পের উন্নয়ন কাজ।
ক্ষুব্ধ প্লট মালিকরা
পূর্বাচল নিউ টাউন সোসাইটির সভাপতি ও সাবেক সচিব ড. এ ওয়াই এম একরামুল হক এবং সাধারণ সম্পাদক সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তরের সাবেক প্রকৌশলী ইঞ্জিনিয়ার মো. আব্দুর রউফ বলেন, রাজউক নামমাত্র কিছু উন্নয়নকাজ করে সময়ক্ষেপণ করছে। প্রকৃতপক্ষে এখানে কোনো পরিকল্পিত নগরায়ণ হয়নি। যাঁরা পূর্বাচলে মাথা গোঁজার আশায় প্লট নিয়েছিলেন, ইতোমধ্যে তাঁদের বেশির ভাগই মারা গেছেন। রাজউকের এই ব্যর্থতায় তারা তাদের স্বপ্নের বাস্তবায়ন দেখে যেতে পারলেন না। রাজউকের এই দীর্ঘসূত্রিতা, দুর্নীতি ও লুটপাটে নতুন শহরের স্বপ্ন যেন আজ ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে। তাই পূর্বাচল প্রকল্পকে রাজউকের আওতার বাইরে এনে সিটি কর্পোরেশন বা গণপূর্ত অধিদপ্তরের অধীনে দেওয়ার দাবি জানিয়েছেন।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









