ঢাকার পাশে দ্রুত বদলে যাচ্ছে রূপগঞ্জ। একসময় নদী-খাল, কৃষিজমি ও গ্রামীণ জনপদ হিসেবে পরিচিত এ উপজেলা এখন শিল্পকারখানা, আবাসন প্রকল্প, পূর্বাচল নতুন শহর ও ৩০০ ফুট সড়ক ঘিরে পরিণত হচ্ছে নগরায়ণের গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্রে। বাড়ছে জনসংখ্যা, বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানের সম্ভাবনা; একই সঙ্গে বাড়ছে জলাবদ্ধতা, মাদক-সন্ত্রাস, অপরিকল্পিত ভূমি ভরাট, যানজট, পরিবেশ দূষণ, গ্যাস-বিদ্যুতের চাপ ও নাগরিক সুবিধার ঘাটতি।
এই বাস্তবতায় নারায়ণগঞ্জ-১ (রূপগঞ্জ) আসনের সংসদ সদস্য মুস্তাফিজুর রহমান ভূঁইয়া দিপুর ‘স্বপ্নের রূপগঞ্জ’ধারণা সামনে এসেছে। দায়িত্ব নেওয়ার পর জলাবদ্ধতা, যোগাযোগ, মাদক-সন্ত্রাস, শিক্ষা, পরিবেশ, গ্যাস-বিদ্যুৎ ও নাগরিক সুবিধার মতো স্থানীয় সমস্যাগুলো সংসদে তুলে ধরার পাশাপাশি মাঠপর্যায়েও বিভিন্ন উদ্যোগে সক্রিয় হয়েছেন তিনি। গত জুন মাসে দিপু ভূঁইয়া জানিয়েছিলেন, দায়িত্ব নেওয়ার পর কয়েক মাসে রূপগঞ্জে ৪০০ কোটি টাকার বেশি উন্নয়ন বরাদ্দ এসেছে। এসব অর্থ শিক্ষা, যোগাযোগ, অবকাঠামো, নদীর নাব্যতা ও সবুজায়নে কাজে লাগানোর পরিকল্পনার কথাও বলেন তিনি।
রূপগঞ্জের ভবিষ্যৎ বদলের সবচেয়ে বড় সম্ভাবনা পূর্বাচল। পরিকল্পিত এই নগর প্রকল্পকে ঘিরে আবাসন, ব্যবসা, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, যোগাযোগ ও কর্মসংস্থানের বিশাল সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। পূর্বাচলকে কেন্দ্র করে পুরো রূপগঞ্জকে একটি সমন্বিত নগর কাঠামোর সঙ্গে যুক্ত করার উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে এ অঞ্চল ঢাকার ওপর বাড়তে থাকা চাপ কমানোর বিকল্প নগরকেন্দ্র হতে পারে। তবে এজন্য পূর্বাচলের পাশাপাশি আশপাশের ইউনিয়নগুলোর সড়ক, ড্রেনেজ, গণপরিবহন, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবাকেও একই পরিকল্পনায় আনতে কাজ করছেন দিপু ভুঁইয়া।
যোগাযোগ খাতে কেওডালা-কায়েতপাড়া সেতু নতুন সম্ভাবনার দুয়ার খুলেছে। বালু নদের ওপর ৬২৫ দশমিক ৩৫ মিটার দীর্ঘ সেতুটির প্রকল্প ব্যয় প্রায় ৯৭ কোটি ৬৪ লাখ টাকা। এটি চালু হলে কাঞ্চন, কায়েতপাড়া ও আশপাশের এলাকার মানুষের যোগাযোগ সহজ হওয়ার পাশাপাশি শিল্প ও ব্যবসা-বাণিজ্যে গতি আসতে পারে। তবে সেতুর সুফল নিশ্চিত করতে সংযোগ সড়ক, যানজট, গণপরিবহন ও পথচারী নিরাপত্তার বিষয়গুলোও সমান গুরুত্ব পেতে হবে।
উন্নয়নের পাশাপাশি রূপগঞ্জের সবচেয়ে বড় নাগরিক সংকটগুলোর একটি জলাবদ্ধতা। খাল দখল ও ভরাটের কারণে পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। এ সমস্যা সংসদে তুলে ধরার পর বরপা এলাকায় সরকারি খাল দখলমুক্ত করতে অভিযানও হয়েছে। কিন্তু শুধু উচ্ছেদ নয়—খালের পানি প্রবাহ ফিরিয়ে আনা, নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণ এবং ভবিষ্যতে দখল ঠেকাতে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়াই হবে স্থায়ী সমাধানের পরীক্ষা।
মাদক ও অপরাধ নিয়ন্ত্রণেও কঠোর অবস্থানের কথা বলা বলেছেন স্থানীয় এমপি। চনপাড়াসহ বিভিন্ন এলাকায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষার পাশাপাশি তরুণদের খেলাধুলা, শিক্ষা ও কর্মসংস্থানের সঙ্গে যুক্ত করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। কারণ মাদকবিরোধী লড়াই শুধু পুলিশের অভিযান দিয়ে শেষ করা সম্ভব নয়। প্রয়োজন সামাজিক প্রতিরোধ, পরিবার ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ভূমিকা, কর্মসংস্থান এবং তরুণদের জন্য সুস্থ বিনোদনের সুযোগ। চনপাড়ার ক্ষেত্রেও অপরাধের অভিযোগের পাশাপাশি সাধারণ মানুষের শিক্ষা, আবাসন ও নাগরিক সুবিধার বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হচ্ছে বলে জানান সংশ্লিষ্টরা।
রূপগঞ্জের শিল্প ও আবাসননির্ভর অর্থনীতির জন্য গ্যাস-বিদ্যুৎও বড় চ্যালেঞ্জ। নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ ছাড়া শিল্পের সম্প্রসারণ ও নতুন বিনিয়োগ টেকসই হবে না। গত মাস থেকে বিদ্যুৎ বিভ্রাট কমে আসার কথা জানিয়েছেন দিপু ভূঁইয়া। তবে মানুষের প্রত্যাশা আরো পরিষ্কার—শুধু সংকট কমার ঘোষণা নয়, বাসাবাড়ি ও শিল্পকারখানায় বাস্তবে নিরবচ্ছিন্ন সেবা নিশ্চিত করা।
রূপগঞ্জের ভবিষ্যৎ নিয়ে স্থানীয়দের প্রত্যাশাও এখন স্পষ্ট। রূপগঞ্জের রহমান মিয়া বলেন, উন্নয়নের অনেক উদ্যোগ নিয়েছেন এমপি। আমরা চাই এসব উদ্যোগের বাস্তব সুফল। জলাবদ্ধতা, মাদক, যোগাযোগ ও নাগরিক সেবার সমস্যাগুলোর স্থায়ী সমাধান হলে রূপগঞ্জের চেহারা বদলে যাবে।
আর ভোলাব এলাকার আবদুল খালেক বলেন, রূপগঞ্জ খুব দ্রুত শহরে পরিণত হচ্ছে। এখন পরিকল্পিতভাবে কাজ না করলে ভবিষ্যতে যানজট ও জলাবদ্ধতা আরো বাড়বে। উন্নয়নের পাশাপাশি পরিবেশ ও নাগরিক সুবিধাকেও সমান গুরুত্ব দিতে হবে।
রূপগঞ্জের উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) এস এম আব্দুল্লাহ বিন শফিক দৈনিক এদিনকে বলেন, ‘আমি চাই প্রশাসন, জনপ্রতিনিধি ও গণমাধ্যমের সমন্বিত ভূমিকায় রূপগঞ্জে পরিবর্তন আনতে, রূপগঞ্জের মানুষের জন্য কাজ করাই আমার লক্ষ্য। সংসদ সদস্য দিপু ভুঁইয়ার নির্দেশনা অনুযায়ী আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ এবং এলাকার বিভিন্ন সমস্যা সমাধানে প্রশাসন কাজ করছে।‘ একই সঙ্গে সমস্যা ও অপরাধের তথ্য দ্রুত প্রশাসনকে জানানো হলে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া সহজ হবে বলেও জানান তিনি।
সব মিলিয়ে রূপগঞ্জ এখন এমন এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে, যেখানে উন্নয়নের গতি যেমন দ্রুত, তেমনি ভুল পরিকল্পনার ঝুঁকিও বড়। পূর্বাচল, শিল্পাঞ্চল, আবাসন ও যোগাযোগকে কেন্দ্র করে যদি পরিকল্পিত নগর ব্যবস্থাপনা গড়ে তোলা যায়, তাহলে রূপগঞ্জ হতে পারে ঢাকার বিকল্প একটি আধুনিক নগরকেন্দ্র। আর পরিকল্পনার ঘাটতি থাকলে একই উন্নয়নই তৈরি করতে পারে যানজট, জলাবদ্ধতা, পরিবেশদূষণ ও নাগরিক সংকটের নতুন বোঝা।
তবে স্থানীয়রা মনে করেন বর্তমান এমপির সঠিক নেতৃত্ব এবং বাস্তব পরিবর্তন নিশ্চিত করার যে মহাপরিকল্পনা, তা বাস্তবায়িত হলে ঢাকার পাশে রূপগঞ্জ শুধু একটি দ্রুতবর্ধনশীল উপজেলা নয়, বরং হয়ে উঠতে পারে বাংলাদেশের অন্যতম সম্ভাবনাময় আধুনিক নগর জনপদ।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









