ইয়েমেনে সৌদি হামলার জবাবে বাংলাদেশি বিমানযাত্রীদের রক্ত ঝরিয়ে নিষ্ঠুর প্রতিশোধ নিয়েছে হুতি সশস্ত্র বিদ্রোহীরা। সৌদি আরবের রাজধানী রিয়াদে কিং খালিদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে ইয়েমেনের ইরান-সমর্থিত হুতি সশস্ত্র গোষ্ঠীর হামলায় নিহত ১২ জনের মধ্যে দুজন বাংলাদেশি নাগরিক আছেন।
আরো ৪জন বাংলাদেশি আছেন আইসিইউতে। সৌদি কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে শনিবারের এ হামলায় আহত হয়েছেন ৩০৯ জন। হুতিদের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা মোহাম্মদ আল-বুখাইতি রিয়াদের বিমানবন্দরে হামলার দায় স্বীকার করেছেন। তিনি বলেছেন, ইয়েমেনে সৌদি হামলার জবাবে এ হামলা চালানো হয়েছে। সৌদি হামলায় বেসামরিক অবকাঠামো লক্ষ্যবস্তু হয়েছে বলেও জানান তিনি।
এদিকে, সৌদি বিমানবন্দরে হুতিদের হামলার তীব্র নিন্দা জানিয়েছে বাংলাদেশ। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বলেছে, এ হামলায় দুই বাংলাদেশি নাগরিক মর্মান্তিকভাবে প্রাণ হারিয়েছেন এবং আরও অনেকে আহত হয়েছেন। তাঁদের অনেকের অবস্থাই আশঙ্কাজনক। গতকাল রবিবার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সূত্র জানিয়েছে, রিয়াদের কিং খালিদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে শনিবার রাতের হামলায় নিহত দুই বাংলাদেশির নাম-পরিচয় জানা গেছে। তাদের মধ্যে একজন্য ওমরাহ যাত্রী, আরেকজন প্রবাসী শ্রমিক। তারা হলেন- মোহাম্মদ শহীদ, তার বাড়ি বগুড়া। আরেকজন নাসরুল্লাহ বদরপুরী, তিনি কুমিল্লার বাসিন্দা। নিহতদের মরদেহ দ্রুত দেশে ফিরিয়ে আনার পাশাপাশি আইনি ও অন্যান্য প্রক্রিয়ার জন্য পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এবং রিয়াদে অবস্থিত বাংলাদেশ দূতাবাস প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করছে।
পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলাম গতকাল জানিয়েছেন, সৌদি আরবের রাজধানী রিয়াদের কিং খালিদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে হুতিদের হামলায় দুইজন বাংলাদেশি নিহতের পাশাপাশি চারজন গুরুতর আহত হয়েছেন। তারা সৌদি আরবের একটি হাসপাতালের আইসিইউতে চিকিৎসাধীন রয়েছেন। প্রতিমন্ত্রী বলেন, ‘সৌদির বিমানবন্দরে হামলায় দুই বাংলাদেশি নাগরিক নিহত হয়েছেন। চার বাংলাদেশি আহত হয়েছেন, তারা সৌদির কিং খালেদ হাসপাতালের আইসিইউতে আছেন। আমরা সবার পরিচয় নিশ্চিতের চেষ্টা করছি।’ প্রতিমন্ত্রী জানিয়েছেন, এই ঘটনায় যারা নিহত হয়েছে তাদের মরদেহ বাংলাদেশে আনা হবে রাষ্ট্রীয় খরচে।
এর আগে হুতিদের হামলায় দুইজন বাংলাদেশিসহ ১২ জন হতাহতের ঘটনায় নিন্দা জানিয়ে বিবৃতি দিয়েছে বাংলাদেশ সরকার।
চলতি সপ্তাহে কিং খালেদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে এটি তৃতীয় হামলা। এ হামলার পর বিমানবন্দরের কার্যক্রম সাময়িকভাবে বন্ধ রাখা হয়েছে। সব ফ্লাইট অন্যত্র সরিয়ে নেওয়া হয়েছে। সৌদি আরবের বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ এক্সে দেওয়া এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, বিমানবন্দরে হামলার ঘটনায় অন্তত ১২ জন নিহত হয়েছেন। নিহত ব্যক্তিদের মধ্যে সৌদি আরবের চারজন, বাংলাদেশের দুজন এবং যুক্তরাষ্ট্র, জর্ডান, ফিলিস্তিন, সিরিয়া, সুদান ও মিসরের একজন করে নাগরিক রয়েছেন। বিষয়টি সম্পর্কে অবগত ব্যক্তিরা জানিয়েছেন, অ্যাম্বুলেন্স ও হেলিকপ্টারে করে আহত ব্যক্তিদের হাসপাতালে নেওয়া হলে সেখানে ব্যাপক ভিড় হয়। আহত ব্যক্তিদের কয়েকজনের অবস্থা আশঙ্কাজনক।
শনিবারের এ হামলার আগে কোনো সতর্কবার্তা দেওয়া হয়নি। সৌদি আরবের হুমকি শনাক্তকরণ ও সতর্কীকরণ ব্যবস্থাও কোনো সংকেত দেয়নি। এর আগে চলতি সপ্তাহে কিং খালেদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে দুটি হামলায় চারজন নিহত হন। এ ছাড়া বিমানবন্দরের রানওয়েতে দাঁড়িয়ে থাকা সৌদি আরবের একটি বাণিজ্যিক উড়োজাহাজেরও ব্যাপক ক্ষতি হয়।
বিমানবন্দরে আহত ব্যক্তিদের পড়ে থাকতে দেখেন প্রত্যক্ষদর্শীরা। নাম প্রকাশ না করার শর্তে বিমানবন্দরে থাকা একজন প্রত্যক্ষদর্শী বলেন, তিনি বিস্ফোরণ দেখেছেন। এরপর বিমানবন্দরের ভেতরে কয়েকজনকে আহত অবস্থায় মাটিতে পড়ে থাকতে দেখেন। এক ডজনের বেশি অ্যাম্বুলেন্সকে বিমানবন্দরের দিকে যেতে দেখা গেছে। আহত আরেকজন যাত্রী নাম প্রকাশ না করার শর্তে রয়টার্সকে বলেন, বিমানবন্দরের বাইরে আকাশে কোনো কিছুকে উড়ে যেতে দেখেছিলেন তিনি। এরপর বের হওয়ার ফটকের কাছে ছাদের একটি অংশ ধসে পড়েছে। বিমানবন্দরের অভ্যন্তরীণ টার্মিনালে হামলার ঘটনা প্রত্যক্ষ করা একজন যাত্রী বার্তা সংস্থা এএফপিকে বলেন, ‘আমি ৪০৩ নম্বর গেটে ছিলাম। ৪০১ নম্বর গেটে হামলা হতে দেখেছি। নিজের চোখের সামনে আহত মানুষ দেখেছি। সবাই দৌড়াদৌড়ি করছিল।’
চিকিৎসা-সংক্রান্ত একটি সূত্র জানিয়েছে, এই হামলার পরিপ্রেক্ষিতে স্বাস্থ্য কর্মকর্তারা ‘গুরুতর জরুরি পরিস্থিতি’ সামাল দিতে চিকিৎসকদের জরুরি ভিত্তিতে তলব করেছেন।
এদিকে রিয়াদে হামলার কয়েক ঘণ্টা পর হুতিদের বিরুদ্ধে লড়াইরত সৌদি নেতৃত্বাধীন আন্তর্জাতিক জোটের একজন মুখপাত্র সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে দেওয়া এক পোস্টে জানিয়েছেন, দাম্মামের কিং ফাহাদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের কাছে একটি ‘প্রজেক্টাইল’ আঘাত হেনেছে। ফ্লাইট পর্যবেক্ষণকারী ওয়েবসাইট ফ্লাইটরাডার২৪-এর তথ্য অনুযায়ী, রিয়াদগামী সব ফ্লাইট অন্য বিমানবন্দরে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে অথবা বাতিল করা হয়েছে। একপর্যায়ে বিমানবন্দরের ওপর দিয়ে শুধু একটি হেলিকপ্টারকে চক্কর দিতে দেখা গেছে।
বাংলাদেশের সমবেদনা
গতকাল সকালে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এক বিজ্ঞপ্তিতে বলেছে, বাংলাদেশ শোকসন্তপ্ত পরিবার, বিশেষ করে নিহত বাংলাদেশি ভুক্তভোগীদের পরিবারের প্রতি গভীর সমবেদনা ও আন্তরিক সহানুভূতি জানাচ্ছে। আহত ব্যক্তিদের দ্রুত সুস্থতা কামনা করছে। বেসামরিক জীবন বিপন্ন করা এবং বেসামরিক অবকাঠামোকে লক্ষ্য করে এ ধরনের হামলা বরদাশতযোগ্য নয় এবং তা অবিলম্বে বন্ধ হওয়া উচিত বলেছে বাংলাদেশ। এ হামলার প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশ সৌদি আরব সরকার এবং সে দেশের ভাইদের মতো সাধারণ মানুষের প্রতি দৃঢ় সংহতি জানিয়েছে। আঞ্চলিক শান্তি, নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতার স্বার্থে বাংলাদেশ অবিলম্বে শত্রুতা বন্ধ, বেসামরিক নাগরিক ও অবকাঠামোর সুরক্ষা এবং সংলাপ ও কূটনীতির মাধ্যমে চলমান সংকটের শান্তিপূর্ণ সমাধানের আহ্বান জানিয়েছে। হামলার পর নিরাপত্তার কারণে আজ সোমবার বাংলাদেশ সময় রাত ৩টা পর্যন্ত বিমানবন্দরের কার্যক্রম বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। এ ঘটনায় বিমান চলাচল ও যাত্রীসেবায় বিঘ্ন সৃষ্টি হয়েছে।
হুতিদের ফের হুঁশিয়ারি
সৌদি আরবের রাজধানী রিয়াদের আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে প্রাণঘাতী হামলার পর দেশটির বিমানবন্দরগুলো এড়িয়ে চলতে এয়ারলাইনস, বিমানবন্দরকর্মী এবং যাত্রীদের আবারও কড়া সতর্কবার্তা দিয়েছে ইয়েমেনের হুতিরা। গতকাল দেওয়া এক বিবৃতিতে ইয়েমেনের ইরান সমর্থিত শিয়া গোষ্ঠীটি হুঁশিয়ার করে বলেছে, এই সতর্কবার্তাকে যেন অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা হয়। বিবৃতিতে হুতিরা আরও বলে, রিয়াদ বিমানবন্দরে হামলা প্রতিহত করতে ব্যর্থ হওয়ার সব দায় সৌদি সরকারের ওপরই বর্তায়।
কঠোর জবাবের হুঁশিয়ারি সৌদি জোটের
অপরদিকে, রিয়াদের কিং খালিদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে হুতিদের হামলাকে ‘যুদ্ধাপরাধ’ বলে অভিহিত করেছে ইয়েমেনের সরকারকে সমর্থনকারী সৌদি আরবের নেতৃত্বাধীন জোট। আন্তর্জাতিক মানবিক আইন অনুযায়ী কঠোর জবাব দেওয়ার হুঁশিয়ারিও দিয়েছে তারা। সৌদি আরবের সংবাদমাধ্যম সৌদি গেজেট এ খবর জানিয়েছে। জোটের মুখপাত্র মেজর জেনারেল তুর্কি আল-মালিকি বলেন, ১০ অক্টোবরের ওই হামলায় বিমানবন্দরের একটি যাত্রী টার্মিনালকে লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছে, যাতে বেসামরিক মানুষ হতাহত হয়েছেন। আন্তর্জাতিক মানবিক আইন ও যুদ্ধের প্রথাগত নিয়ম অনুযায়ী এটি পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধাপরাধ। তিনি জোর দিয়ে বলেন, আন্তর্জাতিক মানবিক আইন ও যুদ্ধের নিয়ম মেনে জোটের যৌথ বাহিনী কমান্ড এ হামলার দৃঢ় জবাব দেবে।
ভারতের তীব্র নিন্দা
সৌদি আরবের রাজধানী নিহত এবং তিন শতাধিক আহত হওয়ার ঘটনায় তীব্র নিন্দা জানিয়েছে ভারত। বেসামরিক নাগরিক ও অবকাঠামোর ওপর বারবার হামলাকে ‘সম্পূর্ণ অগ্রহণযোগ্য’ উল্লেখ করে অবিলম্বে এসব হামলা বন্ধের আহ্বান জানিয়েছে নয়াদিল্লি। গতকাল রবিবার ভারতের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক বিবৃতিতে বলা হয়, গত কয়েক দিনে রিয়াদের কিং খালিদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে একাধিক হামলা চালানো হয়েছে।
এর মধ্যে ১০ অক্টোবরের ‘কাপুরুষোচিত’ হামলায় প্রাণহানি, আহত হওয়ার ঘটনা এবং সম্পদের ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। বিবৃতিতে বলা হয়, বেসামরিক নাগরিক ও বেসামরিক অবকাঠামোর ওপর বারবার হামলা সম্পূর্ণ অগ্রহণযোগ্য। এসব হামলা অবিলম্বে বন্ধ করতে হবে। সৌদি আরবের সার্বভৌমত্ব রক্ষায় দেশটির সরকার ও জনগণের পাশে রয়েছে নয়াদিল্লি। একই সঙ্গে দ্রুত ওই অঞ্চলে শান্তি ও স্বাভাবিক পরিস্থিতি ফিরে আসার আশা প্রকাশ করেছে দেশটি।
সৌদিকে আরো সামরিক সহায়তার ঘোষণা যুক্তরাজ্যের
এদিকে, সৌদি আরবকে সামরিক সহায়তা আরও বাড়ানোর সম্ভাবনা রয়েছে বলে জানিয়েছেন যুক্তরাজ্যের প্রতিরক্ষামন্ত্রী ওয়েস স্ট্রিটিং। ইয়েমেনের হুতি বিদ্রোহীদের সঙ্গে সংঘাতের প্রেক্ষাপটে যুক্তরাজ্য এখনই কোনো আক্রমণাত্মক সামরিক অভিযানে অংশ নেওয়ার কথা বিবেচনা করছে না বলে জানিয়েছেন তিনি। বিবিসির ‘সানডে উইথ লরা কুয়েনসবার্গ’ অনুষ্ঠানে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে স্ট্রিটিং বলেন, যুক্তরাজ্য ইতোমধ্যে সৌদি আরবকে আকাশে উড়োজাহাজে জ্বালানি সরবরাহের সহায়তা দিচ্ছে।
সৌদি আরবে প্রাণঘাতী হামলার পরিপ্রেক্ষিতে এই সহায়তা আরও বাড়ানো হতে পারে কি না, জানতে চাইলে তিনি বলেন, সম্ভাবনা রয়েছে। সৌদি আরবের ওপর হুতি হামলা এবং সংঘাতের তীব্রতা বাড়ার প্রেক্ষাপটে যুক্তরাজ্যের সহায়তার পরিধি বাড়ানোর সম্ভাবনা নিয়ে এই মন্তব্য করেন ব্রিটিশ প্রতিরক্ষামন্ত্রী। তবে কী ধরনের অতিরিক্ত সহায়তা দেওয়া হতে পারে, সে বিষয়ে বিস্তারিত জানাননি তিনি।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









