বাঙালি সনাতন ধর্মাবলম্বীদের সবচেয়ে বড় ধর্মীয় উৎসব আসন্ন দুর্গাপূজা ‘নির্বিঘ্নে, শান্তিপূর্ণ ও উৎসবমুখর পরিবেশে’ উদযাপনের লক্ষ্যে ‘পর্যাপ্ত নিরাপত্তা ব্যবস্থা’ নেওয়ার কথা বলেছেন পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) মো. আলী হোসেন ফকির। তিনি বলেছেন, ‘দুর্গাপূজা ঘিরে পুলিশ প্রাক-পূজা, পূজা চলাকালীন এবং প্রতিমা বিসর্জন ও পূজা পরবর্তী সময়ে তিন স্তরের নিরাপত্তা ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে। পুলিশের পূজাকেন্দ্রিক নিরাপত্তা কার্যক্রম শুরু হয়েছে।’
দুর্গাপূজা সামনে রেখে গতকাল রবিবার দুপুরে পুলিশ সদরদপ্তরে আইনশৃঙ্খলা ও নিরাপত্তা সংক্রান্ত বৈঠকে সভাপতির বক্তব্যে আইজিপি বলেন, পূজা ঘিরে কোনো মহল বা গোষ্ঠী যেন সামাজিক সম্প্রীতি বিনষ্ট করতে না পারে সেজন্য সকলকে সজাগ ও সতর্ক থাকতে হবে। এক্ষেত্রে কমিউনিটি ও বিট পুলিশিংয়ের মাধ্যমে জনসম্পৃক্ততা বাড়ানোর ওপর গুরুত্বারোপ করেন তিনি।
আইজিপি বলেন, সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টায় প্রতি বছরের মত এবারও দুর্গাপূজা নিরাপদে, আনন্দঘন পরিবেশে উদযাপিত হবে বলে তিনি আশা করছেন।
পুলিশ সদর দপ্তরের সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়েছে, বৈঠকে ছিলেন পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা এবং হিন্দু ধর্মীয় বিভিন্ন সংগঠনের নেতারা। এর বাইরে মহানগরের পুলিশ কমিশনার, রেঞ্জ ডিআইজি, জেলার পুলিশ সুপার ও নৌ পুলিশের পুলিশ সুপাররা ভার্চুয়ালি যুক্ত ছিলেন।
বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, হিন্দু ধর্মীয় বিভিন্ন সংগঠনের নেতারা গৃহীত নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়ে ‘সন্তোষ’ প্রকাশ করে সরকার এবং পুলিশ প্রশাসনকে ধন্যবাদ জানান। সেখানে বলা হয়, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ‘বিভ্রান্তিমূলক পোস্ট, অপপ্রচার, গুজব বা ছবি আপলোড করে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বিনষ্টের অপচেষ্টাকারীদের’ বিরুদ্ধে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা গ্রহণে মাঠ পর্যায়ের পুলিশ কর্মকর্তাদের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি রক্ষায় বিভিন্ন ধর্মের গণ্যমান্য ব্যক্তি ও স্থানীয় জনসাধারণের সঙ্গে সার্বক্ষণিক যোগাযোগ রক্ষা এবং নিয়মিত পূজামণ্ডপ পরিদর্শনের জন্যও পুলিশ কর্মকর্তাদের নির্দেশনা দেওয়া হয়।
বৈঠকে জানানো হয়, দুর্গাপূজা ঘিরে কেউ যেন কোনো অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটাতে না পারে সেজন্য পুলিশ সচেষ্ট রয়েছে। যেকোনো অপ্রীতিকর পরিস্থিতি এড়াতে জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯ অথবা কাছের থানায় যোগাযোগ করার জন্য পূজা উদযাপন পরিষদের নেতাদের অনুরোধ জানানো হয়।
পূজা চলাকালে সিসিটিভি সক্রিয় রাখা, পূজামন্ডপ ও বিসর্জনস্থলে পর্যাপ্ত আলো, স্ট্যান্ড বাই জেনারেটরের ব্যবস্থা রাখা, প্রতিটি মণ্ডপে স্বেচ্ছাসেবক নিয়োগ করে সার্বক্ষণিক নিরাপত্তার ব্যবস্থা করার জন্য পূজা উদযাপন পরিষদ নেতাদের প্রতি আহ্বান জানানো হয়।
দুর্গাপূজা চলাকালে অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি মোকাবেলায় পোশাকে ও সাদা পোশাকে পুলিশের পাশাপাশি সোয়াট, ক্রাইম রেসপন্স টিম (সিআরটি), কুইক রেসপন্স টিম (কিউআরটি), ক্রাইম সিন ভ্যান এবং বোম ডিসপোজাল ইউনিট সার্বক্ষণিক প্রস্তুত থাকবে বলে বৈঠকে আশ্বস্ত করা হয়। এ উপলক্ষে পুলিশ সদরদপ্তর এবং অন্যান্য পুলিশ ইউনিটে সার্বক্ষণিক মনিটরিং সেল চালু থাকবে বলেও সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়।
এ বছর দেশে প্রায় ৩৩ হাজার পূজামণ্ডপে দুর্গাপূজা উদযাপিত হচ্ছে।
মণ্ডপে নিরাপত্তা দেওয়ার সিদ্ধান্ত বিএনপির
আসন্ন শারদীয় দুর্গোৎসবে মণ্ডপের নিরাপত্তায় পূজা কমিটির সঙ্গে সমন্বিতভাবে কাজ করবে বিএনপি। যুগ্ম মহাসচিব খায়রুল কবির খোকনের নেতৃত্বে ১২ সদস্যের দুর্গাপূজা পর্যবেক্ষণ কমিটিও গঠন করেছে দলটি। শনিবার রাতে গুলশানে চেয়ারম্যানের কার্যালয়ে বিএনপির জাতীয় স্থায়ী কমিটির বৈঠকে এসব সিদ্ধান্ত হয়। চেয়ারম্যান তারেক রহমানের সভাপতিত্বে বৈঠকে ছিলেন ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী, স্থায়ী কমিটির সদস্য গয়েশ্বর চন্দ্র রায়, আবদুল মঈন খান, আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী, সালাহউদ্দিন আহমেদ, ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু, সেলিমা রহমান, এ জেড এম জাহিদ হোসেন, রুহুল কবির রিজভী, আমানউল্লাহ আমান, ইসমাইল জবিউল্লাহ ও ফরহাদ হালিম ডোনার।
বৈঠক শেষে ব্রিফিংয়ে এসে বলে রুহুল কবির রিজভী বলেন, ‘বৈঠকে আসন্ন দুর্গাপূজায় ঢাকাসহ দেশের মণ্ডপে হিন্দু ধর্মাবলম্বী ভাই-বোনদের নির্বিঘ্নে পূজা উদযাপনের ব্যবস্থা ও অনুকূল পরিবেশ তৈরি করা এবং তারা যেন উৎসবে শামিল হয়ে প্রত্যেকে প্রত্যেকের আনন্দ ভাগ করে নিতে পারেন- সেসব নিয়ে নেতারা আলোচনা করেন। কীভাবে সারা দেশে পূজামণ্ডপে দলের নেতাকর্মীরা স্থানীয় পূজা উদযাপন কমিটির সঙ্গে সমন্বয় করে স্বেচ্ছাসেবীর ভূমিকা পালন করবেন, তা নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়েছে বৈঠকে। আমাদের দলের নেতাকর্মীরা প্রত্যেকে পূজামণ্ডপে অনিমেষ প্রহরীর মতো ভূমিকা পালন করবেন।’ অভিযোগ করে রিজভী বলেন, ‘নানাভাবে দেশের বিরুদ্ধে, গণতান্ত্রিক আন্দোলনের বিরুদ্ধে নানা ধরনের নীলনকশা কেউ কেউ করছেন। সমস্ত অপপ্রচার, অপকীর্তি এবং ষড়যন্ত্রকে জনগণ প্রতিহত করতে সক্ষম হবে এবং আমাদের দলের নেতাকর্মীরা এ বিষয়ে সজাগ থাকবেন, তারা সজাগ প্রহরীর ভূমিকা পালন করবেন।’
নৈরাজ্য রুখতে সতর্ক থাকার আহ্বান
এদিকে দুর্গাপূজায় আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে বিএনপির নেতাকর্মীদের সতর্ক ও দায়িত্বশীল ভূমিকা পালনের আহ্বান জানিয়েছেন তথ্য ও সম্প্রচার প্রতিমন্ত্রী ইয়াসের খান চৌধুরী। তিনি বলেছেন, ‘কোনো গুপ্ত বাহিনী বা নিষিদ্ধ সংগঠন যেন অস্থিতিশীল পরিস্থিতি সৃষ্টি করতে না পারে, সেদিকে সবাইকে নজর রাখতে হবে। সবাই মিলে পাহারা দিতে হবে।’প্রতিটি পূজামণ্ডপে সিসিটিভি ক্যামেরা ও অগ্নিনির্বাপণ সরঞ্জাম রাখার বিষয়টি নিশ্চিতে প্রশাসনকে নির্দেশনাও দেন তথ্য প্রতিমন্ত্রী।
গতকাল রবিবার কিশোরগঞ্জ জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের সম্মেলনকক্ষে আইনশৃঙ্খলা বৈঠকে প্রধান অতিথি ছিলেন তথ্য প্রতিমন্ত্রী। ইয়াসের খান বলেন, ‘দুর্গাপূজা ঘিরে সন্ত্রাস ও নৈরাজ্য প্রতিরোধে যুবদল, ছাত্রদল, স্বেচ্ছাসেবক দলসহ বিএনপির অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীদের সহযোগিতা প্রয়োজন।পাশাপাশি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে গুজব, অপপ্রচার এবং ধর্মীয় সম্প্রীতি বিনষ্টের অপচেষ্টা ঠেকাতে সবাইকে সতর্ক থাকতে হবে।’
তিনি বলেন, ‘এবার প্রতিটি পূজামণ্ডপে সরকারি সহায়তা হিসেবে ৫০০ কেজি থেকে বাড়িয়ে ৬০০ কেজি চাল দেওয়া হচ্ছে। পাশাপাশি হিন্দু সম্প্রদায়ের মানুষের জন্য উপহার পাঠানো হবে।’
জেলা প্রশাসক সোহনা নাসরিনের সভাপতিত্বে বৈঠকে ছিলেন কিশোরগঞ্জ-২ আসনের সংসদ সদস্য জালাল উদ্দিন, কিশোরগঞ্জ-৫ আসনের সংসদ সদস্য শেখ মজিবুর রহমান ইকবাল, জেলা পরিষদের প্রশাসক খালেদ সাইফুল্লাহ সোহেল, জেলা জামায়াতের আমির রমজান আলী এবং পুলিশ সুপার মোহাম্মদ মিজানুর রহমানসহ জেলা প্রশাসন ও পুলিশের উর্ধ্বতন কর্মকর্তা, বিভিন্ন সরকারি দপ্তরের প্রতিনিধি এবং হিন্দু সম্প্রদায়ের বিভিন্ন সংগঠনের নেতারা।
বৈঠকে স্বাগত বক্তব্যে অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট মো. এরশাদুল আহমেদ জানান, কিশোরগঞ্জের ১৩টি উপজেলায় ৪১৮টি পূজামণ্ডপে দুর্গাপূজা হবে। পূজা নির্বিঘ্নে সম্পন্ন করতে নিরাপত্তাসহ প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি সম্পন্ন হয়েছে।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









