যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কের জন এফ কেনেডি (জেএফকে) আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে বাংলাদেশের সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসকে হেনস্তার ঘটনায় জড়িতদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। ঘটনাটির তীব্র নিন্দা জানিয়ে জড়িতদের শনাক্ত করে তাদের বিরুদ্ধে যথাযথ আইনি ব্যবস্থা নিতে নিউইয়র্কে বাংলাদেশ মিশনকে স্থানীয় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সঙ্গে যোগাযোগের নির্দেশ দিয়েছে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়।
সোমবার ওই বিমানবন্দরে ড. ইউনূসকে ঘিরে ক্ষোভ প্রকাশ করেন কয়েকজন প্রবাসী বাংলাদেশি। তাঁর বিরুদ্ধে হত্যা, গ্রেফতার ও দেশের গণতন্ত্র ধ্বংসের অভিযোগ তুলে যুক্তরাষ্ট্রে আসার কারণ জানতে চান প্রবাসীরা। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া ভিডিও ফুটেজে দেখা যায়, বিমানবন্দর চত্বরে হুইলচেয়ারে বসা অবস্থায় ড. মুহাম্মদ ইউনূসের দিকে এগিয়ে এসে কয়েকজন উচ্চস্বরে স্লোগান দিচ্ছেন এবং ক্ষোভ প্রকাশ করছেন।
এ সময় তাকে উদ্দেশ্য করে ‘ইউ আর আ টেররিস্ট’ এবং ‘হোয়াই ইউ কাম হিয়ার’ বলে চিৎকার করতে শোনা যায়। দেশ ও দেশের পুলিশ বাহিনীর ভূমিকা নিয়ে বিভিন্ন স্লোগানও তোলেন প্রবাসীরা। ভিডিওতে একজনকে বলতে শোনা যায়, ‘আপনি আমার দেশে হাজার হাজার পুলিশ সদস্যকে হত্যা করেছেন। কেন এখানে এসেছেন?’ ভিডিওটিতে আরো দেখা যায়, বিক্ষুব্ধরা তাঁকে ঘিরে বিভিন্ন ধরনের তির্যক মন্তব্য ও প্রতিবাদ করার সময় কঠোর নিরাপত্তা ও সহযোগীদের বেষ্টনীতে ড. ইউনূস শান্তভাবে পরিস্থিতি অতিক্রম করে সামনের দিকে এগিয়ে যাচ্ছেন। এক পর্যায়ে ড. ইউনূস ও তাঁর সঙ্গে থাকা লামিয়া মোর্শেদ দ্রুত বিমানবন্দরের ভেতরে চলে যান।
গতকাল মঙ্গলবার পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজের বিবৃতিতে বলা হয়, আন্তর্জাতিক মহলে অত্যন্ত সম্মানিত নোবেল শান্তি পুরস্কারজয়ী অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের সঙ্গে বিদেশের মাটিতে এই হেনস্তার ঘটনায় নিষিদ্ধ রাজনৈতিক সংগঠন বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বলে সন্দেহ করা একদল ব্যক্তি জড়িত ছিলেন বলে মনে করছে সরকার। বিবৃতিতে বলা হয়, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় নিউইয়র্কে বাংলাদেশের মিশনকে স্থানীয় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সঙ্গে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করতে বলেছে, যেন হেনস্তার ঘটনায় জড়িতদের শনাক্ত করা যায় এবং তাদের বিরুদ্ধে যথাযথ আইনি ব্যবস্থা নেওয়া যায়। তাদের কর্মকাণ্ড বিশ্ববাসীর সামনে বাংলাদেশ ও দেশের সব নাগরিকের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করেছে।
বিবৃতিতে বলা হয়, রাজনৈতিক কার্যক্রম নিষিদ্ধ সংগঠন আওয়ামী লীগ সংশ্লিষ্ট বলে সন্দেহ করা হচ্ছে, এমন গোষ্ঠী মুহাম্মদ ইউনূসকে বিদেশের মাটিতে হয়রানি করেছে বলে প্রতীয়মান হচ্ছে। বিদেশে বসবাসরত বাংলাদেশিরা ভবিষ্যতে দেশের সম্মানিত ব্যক্তিদের সঙ্গে এ ধরনের অসদাচরণ থেকে বিরত থাকবেন বলেও আশা করে সরকার।
আইনি পদক্ষেপের ঘোষণা তথ্য উপদেষ্টার
মুহাম্মদ ইউনূসকে হেনস্তায় জড়িতদের বিরুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রে আইনি পদক্ষেপ নেওয়ার কথা জানিয়েছেন প্রধানমন্ত্রীর তথ্য ও সম্প্রচার উপদেষ্টা জাহেদ উর রহমান। ইতালিতে অভিনেত্রী আজমেরী হক বাঁধন হেনস্তার শিকার হওয়ার পর যে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল, এ ক্ষেত্রেও তা–ই করা হবে বলে জানান তিনি। গতকাল মঙ্গলবার সচিবালয়ে সরকারের কার্যক্রম জানাতে সংবাদ সম্মেলনে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তথ্য উপদেষ্টা বলেন, ‘অবশ্যই এই অপরাধ যাঁরা করছেন, আমাদের অভিনেত্রী (আজমেরী হক বাঁধন) যে হেনস্তার শিকার হয়েছিলেন, তার পর থেকে যে লিগ্যাল প্রসেস শুরু হয়েছে, আমি সেটার ব্যাপারে জানি। সুতরাং এ ক্ষেত্রেও এটা হবে। বিদেশে বিভিন্ন জায়গায় থাকা আওয়ামী লীগের সন্ত্রাসীদের বলতে চাই, তাঁরা যদি এ ধরনের পদক্ষেপ নেওয়ার চেষ্টা করেন, এটা আনচ্যালেঞ্জ যাবে না, প্রশ্নই আসে না।’ জাহেদ বলেন, ‘সাবেক প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূস যে মর্যাদা (প্রটোকল) পাওয়ার কথা, তাতে কোনো ঘাটতি হয়েছে কি না, সেটিও সরকার খতিয়ে দেখবে।’
তাহেরের নিন্দা ও প্রতিবাদ
ওই ঘটনার নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়েছেন জামায়াতের নায়েবে আমির ও জাতীয় সংসদের বিরোধীদলীয় উপনেতা সৈয়দ আব্দুল্লাহ মো. তাহের। গতকাল মঙ্গলবার দুপুরে বিবৃতিতে তিনি বলেন, ‘বিশ্ববাসীর কাছে সম্মানীয় নোবেল বিজয়ী ড. ইউনূসকে হেনস্তা করার মধ্য দিয়ে দেশের সব নাগরিক এবং রাষ্ট্র হিসেবে সারা বিশ্বে বাংলাদেশকে অপমানিত ও খাটো করা হয়েছে। দেশের মান মর্যাদা বিশ্ব দরবারে সমুন্নত রাখতে বিদেশের মাটিতে দেশের সম্মানিত ব্যক্তিদের সাথে এহেন নিন্দনীয় কর্মকাণ্ড পরিচালনা করা কারোর জন্যই সমীচীন নয়, যা ফ্যাসিস্টদের দোসররা করেছে। এ ধরনের আচরণ থেকে সবার বিরত থাকা উচিত।’
সোহেল তাজের কড়া প্রতিক্রিয়া
কড়া প্রতিক্রিয়া জানিয়ে বাংলাদেশের প্রথম প্রধানমন্ত্রী শহীদ তাজউদ্দীন আহমদের ছেলে, সাবেক স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী তানজিম আহমেদ সোহেল তাজ ফেসবুক পোাস্টে লিখেছেন, ‘নিউজে প্রফেসর ইউনূসকে নিউ ইয়র্কের জেএফকে এয়ারপোর্টে হেনস্তা করার ভিডিও দেখে হতবাক হয়ে গেলাম। কতটুক নির্লজ্জ বেহায়া হলে নিজেরাই যেই গণহত্যা, গুম, খুন, দুর্নীতি করেছে, গণতন্ত্রকে কবর দিয়ে মানুষের ভোটের অধিকার কেড়ে নিয়েছিল; তারাই এখন সেই দায় আরেকজনের উপর চাপানোর চেষ্টা করছে। এটাই হচ্ছে সাবেক স্বৈরাচার পলাতক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার জাদুর ট্যাবলেট, এই ট্যাবলেট খেয়ে এদের মাথা নষ্ট হয়ে গেছে।’


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









