রাজধানীর অধিকাংশ এলাকায় ঢাকা ওয়াসার সুয়ারেজ বা পয়ঃনিষ্কাশন লাইন নেই। কোথাও আংশিক থাকলেও অনেক স্থানে তা দীর্ঘদিন ধরে অকার্যকর। অথচ পানির সংযোগ থাকা প্রায় সব গ্রাহকের কাছ থেকেই নিয়মিত পানির বিলের সঙ্গে আদায় করা হচ্ছে পয়ঃনিষ্কাশন বা সুয়ারেজ বিল। সেবা না দিয়েই এই ‘ফাও’ বিল আদায়ের বিষয়টিকে গ্রাহকদের সঙ্গে প্রতারণার শামিল বলে অভিযোগ করেছেন সংশ্লিষ্টরা।
তবে রাজধানীর যেসব এলাকায় ঢাকা ওয়াসার সুয়ারেজ বা পয়ঃনিষ্কাশন লাইন নেই, সেসব এলাকায় আগামী এক বছর গ্রাহকদের কাছ থেকে সুয়ারেজ বিল আদায় করতে পারবে না সংস্থাটি। গত ১০ সেপ্টেম্বর গৃহায়ন ও গণপূর্ত সচিব মো. ওবায়দুর রহমানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত এক সভায় এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে ঢাকা ওয়াসার ব্যবস্থাপনা পরিচালক ড. মুহা. মনিরুজ্জামানকে।
সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, সুয়ারেজ লাইন না থাকা সত্ত্বেও গ্রাহকদের কাছ থেকে বিল আদায়ের অভিযোগ দীর্ঘদিনের। নতুন সিদ্ধান্তের ফলে এ ধরনের এলাকায় গ্রাহকদের বিল দেওয়া থেকে সাময়িক অব্যাহতি পাওয়ার সুযোগ তৈরি হয়েছে। কোন কোন এলাকা এ সিদ্ধান্তের আওতায় আসবে এবং কবে থেকে তা কার্যকর হবে, তা এখনো স্পষ্ট না হলেও গুলশান, বনানীসহ কয়েকটি এলাকার নাম আলোচনায় এসেছে।
ঢাকা ওয়াসার তথ্য অনুযায়ী, সংস্থাটির ১০টি পরিচালন অঞ্চলের মধ্যে মাত্র দুটিতে পূর্ণাঙ্গ সুয়ারেজ ব্যবস্থা রয়েছে। চারটি অঞ্চলে আংশিক ব্যবস্থা থাকলেও বাকি চারটিতে কোনো সুয়ারেজ লাইন নেই। বৃহত্তর উত্তরা, বৃহত্তর মিরপুরের অঞ্চল-৪ ও অঞ্চল-১০ এবং বারিধারা ও আশপাশের এলাকা নিয়ে গঠিত অঞ্চল-৮-এ সুয়ারেজ লাইন নেই। এ ছাড়া গুলশান, নিকেতন, বারিধারা, বনানী, মহাখালী ডিওএইচএস, বসুন্ধরা আবাসিক এলাকা ও নিকুঞ্জের মতো গুরুত্বপূর্ণ আবাসিক এলাকাতেও ওয়াসার সুয়ারেজ নেটওয়ার্ক নেই। অন্যদিকে, যেসব অঞ্চলে আংশিক সুয়ারেজ ব্যবস্থা রয়েছে, সেগুলোতেও সেবার কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন আছে। সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের তথ্য অনুযায়ী, দীর্ঘদিন সংস্কার ও উন্নয়ন না হওয়ায় রাজধানীর অনেক সুয়ারেজ লাইন অকার্যকর হয়ে পড়েছে। ফলে কোথাও লাইন থাকলেও সব গ্রাহক কার্যকর পয়ঃনিষ্কাশন সুবিধা পাচ্ছেন না।
বিশেষজ্ঞদের মতে, রাজধানীর মাত্র ২০ শতাংশ এলাকায় কোনো না কোনো ধরনের পয়ঃনিষ্কাশন ব্যবস্থা রয়েছে। বাকি প্রায় ৮০ শতাংশ এলাকায় কার্যকর ব্যবস্থা না থাকায় বিপুল পরিমাণ পয়ঃবর্জ্য শেষ পর্যন্ত খাল, নদী ও অন্যান্য জলাশয়ে গিয়ে মিশছে। এতে পরিবেশদূষণের পাশাপাশি জনস্বাস্থ্যের জন্যও বড় ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে। এর অন্যতম উদাহরণ গুলশান-বনানী লেকের দূষণ।
রাজউক সূত্রে জানা গেছে, গত ২৮ এপ্রিল প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত আন্তঃমন্ত্রণালয় সভায় গুলশান লেক দূষণমুক্ত করতে গুলশান, বনানী, বারিধারা ও নিকেতন এলাকার প্রতিটি ভবনে সেপটিক ট্যাংক ও সোকওয়েল অথবা পয়ঃবর্জ্য শোধনাগার (এসটিপি) স্থাপনের বিষয়ে প্রয়োজনীয় আইনগত পদক্ষেপ নিতে রাজউককে নির্দেশ দেওয়া হয়। ওই সিদ্ধান্তের পরিপ্রেক্ষিতে গত ১৬ জুলাই এবং সর্বশেষ ৮ সেপ্টেম্বর ভবনমালিকদের কাছে চিঠি পাঠানো হয়। তবে নির্দেশনা বাস্তবায়ন নিয়ে সংশ্লিষ্ট এলাকার বাসিন্দা ও হাউজিং সোসাইটির প্রতিনিধিদের সঙ্গে রাজউকের টানাপোড়েন তৈরি হয়েছে। বাসিন্দা ও সোসাইটির প্রতিনিধিদের অভিযোগ, পর্যাপ্ত জায়গার সংকট এবং কারিগরি বাস্তবতা বিবেচনায় না নিয়েই এ নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। তাদের মতে, বিদ্যমান অবকাঠামো ও ভবনের নকশা বিবেচনায় নিয়ে বাস্তবসম্মত সমাধান নির্ধারণ করা প্রয়োজন।
ওয়াসার কর্মকর্তা ও প্রকৌশলীদের তথ্য অনুযায়ী, ২০০৯ সাল থেকে পয়ঃনিষ্কাশন খাত থেকে প্রায় ৩ হাজার কোটি টাকার অধিক আদায় করেছে সংস্থাটি। যদিও একই সময়ে রাজধানীর অধিকাংশ এলাকায় গড়ে ওঠেনি কার্যকর সুয়ারেজ লাইন। ফলে বিপুল পরিমাণ পয়ঃবর্জ্য বিভিন্ন খাল, জলাশয় ও নদীতে গিয়ে পড়ছে।
ঢাকা ওয়াসা সূত্র জানায়, ১৯৯৬ সালের আইন অনুযায়ী রাজধানীতে পানি সরবরাহ ও সুয়ারেজ ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব আছে ওয়াসা। রাজধানীতে বর্তমানে ৩ হাজার ৫০০ কিলোমিটারের বেশি পানি সরবরাহের লাইন রয়েছে। এর মধ্যে পয়ঃনিষ্কাশন লাইন মাত্র ৯৩০ কিলোমিটারে। অর্থাৎ পানি সরবরাহ ব্যবস্থার তুলনায় সুয়ারেজ লাইন অনেক কম। তারপরও পানির লাইন যেখানে রয়েছে, সেখানের গ্রাহকদের কাছ থেকেই পয়ঃনিষ্কাশনের বিল আদায় করা হচ্ছে। ওয়াসার দায়িত্বশীল কর্মকর্তারা জানান, বর্তমানে সংস্থাটির ১০টি পরিচালন অঞ্চল রয়েছে। এর মধ্যে মাত্র দুটি অঞ্চলে পূর্ণাঙ্গ সুয়ারেজ লাইন রয়েছে। চারটি অঞ্চলে আংশিক সুয়ারেজ ব্যবস্থা আছে, আর বাকি চারটি অঞ্চলে কোনো সুয়ারেজ লাইনই নেই।
পানির বিলের সঙ্গে সুয়ারেজ লাইনের বিল নেওয়ার বিষয়ে মিরপুর-১১ নম্বর সেকশনের এক ভবন মালিক লুতফর রহমান দৈনিক এদিনকে বলেন, ‘পানির বিলের সঙ্গে অন্য বিলও নেয়। বিল নিচ্ছে কিন্তু বিনিময়ে পানি না পেয়ে ভোগান্তি পোহাতে হয়। অন্তত পানি সরবরাহ ঠিক থাকলেও তো হয়। আর সুয়ারেজ লাইনের বিল কী কারণে নেবে, এইটা তো স্পষ্ট করা উচিত।’ এ বিষয়ে রাজধানীর জিগাতলার এলাকার ভবন মালিক তানভীর এলাহী বলেন, সুয়ারেজ বিল বছরে একবার দিতে হয়। তাদের এলাকায় পয়ঃনিষ্কাশনের ব্যবস্থা আছে।
ঢাকা ওয়াসার সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, দীর্ঘদিন ধরে সংস্কার ও উন্নয়ন না হওয়ায় রাজধানীর অনেক সুয়ারেজ লাইন কার্যকারিতা হারিয়েছে। ওয়াসার বিভিন্ন অভ্যন্তরীণ নথিতেও একাধিক লাইন বিকল বা অকার্যকর হয়ে পড়ার তথ্য রয়েছে। ফলে কাগজে-কলমে কিছু এলাকায় সুয়ারেজ লাইন থাকলেও বাস্তবে সেবার মান নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।
ঢাকা ওয়াসা ২০১৩ সালে রাজধানীর পয়ঃনিষ্কাশন ব্যবস্থার উন্নয়নে একটি মহাপরিকল্পনা প্রণয়ন করে। ওই পরিকল্পনায় বলা হয়, পয়ঃবর্জ্য পরিবহনের প্রধান পাইপলাইন ‘ট্রাংক সুয়ারস’নামে পরিচিত। রাজধানীতে ওয়াসার তিনটি ‘ট্রাংক সুয়ারস’রয়েছে। তবে এসব লাইনের বেশির ভাগই বর্তমানে অকার্যকর বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে। তাই মহাপরিকল্পনার আওতায় পাঁচটি শোধনাগার নির্মাণের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। এই পরিকল্পনা প্রণয়নের এক যুগ পার হলেও তা বাস্তবায়নে দৃশ্যমান অগ্রগতি হয়নি। এর মধ্যে দাশেরকান্দি পয়ঃশোধানাগার নির্মাণ করা হলেও তৈরি করা হয়নি লাইন। বাকি চারটি শোধনাগার উত্তরা, মিরপুর, রায়েরবাজার ও পাগলায় (দ্বিতীয়) নির্মাণ করা হবে। এসব প্রকল্পের জমি অধিগ্রহণের কাজ শুরু হয়নি।
ওয়াসার আয়-ব্যয়ের হিসাব বিশ্লেষণে দেখা যায়, শুধু ২০১৬ থেকে ২০২১ সাল পর্যন্ত সময়েই পয়ঃনিষ্কাশন বিল বাবদ ১ হাজার ৭০০ কোটি টাকার বেশি আয় করেছে সংস্থাটি। এর মধ্যে ২০২১ সালে ৩৯১ কোটি ৪২ লাখ টাকা, ২০২০ সালে ৩৪১ কোটি ৭৯ লাখ টাকা, ২০১৯ সালে ৩৩৩ কোটি ৩৫ লাখ টাকা, ২০১৮ সালে ১১৮ কোটি ৭২ লাখ টাকা, ২০১৭ সালে ২৭৬ কোটি ৭৯ লাখ টাকা এবং ২০১৬ সালে ২৩৮ কোটি ২৫ লাখ টাকা আয় করেছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, রাজধানীর মাত্র ২০ শতাংশ এলাকায় কোনো না কোনোভাবে থাকলেও বাকি প্রায় ৮০ শতাংশ এলাকায় পয়ঃবর্জ্য নিষ্কাশনের কার্যকর ব্যবস্থা নেই। ফলে অধিকাংশ পয়ঃবর্জ্য শেষ পর্যন্ত খাল, নদী কিংবা অন্যান্য জলাশয়ে গিয়ে মিশছে, যা পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্যের জন্য বড় ঝুঁকি তৈরি করছে।
এ বিষয়ে নগর পরিকল্পনাবিদ ও বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্সের সাবেক সভাপতি অধ্যাপক ড. আদিল মুহাম্মদ খান এদিনকে বলেন, ‘কোনো প্রকার সেবা না দিয়ে বিল আদায় করা এক ধরনের প্রতারণা বা অসততা। যে সেবা দেওয়া হচ্ছে না, তার জন্য কেন বিল আদায় করবে রাষ্ট্রের একটি প্রতিষ্ঠান, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন।’
তিনি আরো বলেন, পুরো ঢাকায় চার ভাগের এক ভাগ স্থানে শুধু ওয়াসার সুয়ারেজ লাইন আছে। সুয়ারেজ টিট্রমেন্ট প্লান্টের জন্য যে মহাপরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে তা বাস্তবসম্মত ছিল না। কিছু পয়ঃবর্জ্য শোধনাগার (এসটিপি) বাদে কোনো অগ্রগতি দেখা যায়নি। দাশেরকান্দি যে ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্ট আছে তার এখনো নেটওয়ার্ক পাইপলাইন গড়ে তোলা হয়নি। কর্তৃপক্ষের উচিত সবদিক ভেবেচিন্তে নগরবাসীর সেবা প্রদান করা সম্ভব এমন পরিকল্পনা হাতে নেওয়া।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









