জাপানের প্রধানমন্ত্রীর আমন্ত্রণে চারদিনের সফরে দেশটিতে যাচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। ২৬ থেকে ২৯ অক্টোবরের এই এই সফরকালে টোকিওতে থাকছেন না দেশটিতে নিযুক্ত বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত মো. দাউদ আলী। সফরের কূটনৈতিক বিষয় ও সার্বিক সমন্বয়ে সহায়তায় বিশেষ দায়িত্ব দিয়ে টোকিও পাঠানো হয়েছে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সচিব (দ্বিপক্ষীয় বিষয়াবলি) মো. নজরুল ইসলামকে। অন্যদিকে সফরে দুই দেশের মধ্যে কৃষি, মৎস্য, মানবসম্পদ উন্নয়ন, দক্ষতা বৃদ্ধি, অভ্যন্তরীণ বিমান চলাচল, বাণিজ্য, পরিবেশ সংরক্ষণ এবং স্থানীয় সরকার ব্যবস্থার আধুনিকায়নসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে সমঝোতা স্মারক ও সহযোগিতা চুক্তি হতে পারে বলে আশাবাদী পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়।
টোকিওতে থাকবেন না রাষ্ট্রদূত
গতকাল বৃহস্পতিবার সরকারের উচ্চপর্যায় এবং ঢাকা ও টোকিওর কূটনৈতিক সূত্র জানায়, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সচিব (দ্বিপক্ষীয় বিষয়াবলি) নজরুল ইসলাম জাপানে পৌঁছেছেন। সফর চলাকালে টোকিওতে থেকে তিনিই দ্বিপক্ষীয় তদারকি ও কূটনৈতিক সহায়তার মূল দায়িত্বে থাকবেন। অন্যদিকে, ১৫ অক্টোবর পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের চিঠিতে সফর নিয়ে আলোচনার জন্য জাপানে নিযুক্ত বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত দাউদ আলীকে ঢাকায় ডেকে পাঠানো হয়। দুই দিনের মধ্যে দেশে ফেরার নির্দেশ অনুসরণ করে তিনি জাপান থেকে ঢাকায় ফিরেছেন।
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একাধিক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, সফর নিয়ে আলোচনার জন্য দাউদ আলীকে ঢাকায় ডাকা হলেও সফরের প্রস্তুতিমূলক কাজে তাঁকে যুক্ত রাখা হয়নি। সাবেক ও বর্তমান কূটনীতিকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, গত কয়েক দশকে কোনো প্রধানমন্ত্রীর গুরুত্বপূর্ণ কোনো দেশ সফরের সময় সেখানে বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূতের অনুপস্থিত থাকার নজির নেই। চাকরিতে থাকা রাষ্ট্রদূতকে ঢাকায় এনে সফরে বিশেষ দায়িত্ব দেওয়ার ঘটনাও তাঁদের জানা নেই। দাউদ আলী ও মো. নজরুল ইসলাম দুজনই ১৫তম বিসিএস (পররাষ্ট্র ক্যাডার) ব্যাচের কর্মকর্তা। জাপানে রাষ্ট্রদূত হওয়ার আগে দাউদ আলী রোমানিয়ায় বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত ছিলেন। চলতি বছরের ৭ ডিসেম্বর তাঁর অবসর-উত্তর ছুটিতে (পিআরএল) যাওয়ার কথা রয়েছে।
বাণিজ্য বৃদ্ধির আশাবাদ
ঘোষিত সফরসূচি অনুসারে, ২৭ অক্টোবর জাপানের প্রধানমন্ত্রী সানায়ে তাকাইচির সঙ্গে দ্বিপাক্ষিক বৈঠকে বসবেন তারেক রহমান। এ বৈঠকে জাপানের বাজারে বাংলাদেশি পণ্যের সুযোগ বৃদ্ধি ও বাণিজ্য সম্প্রসারণ, জাপানি বিনিয়োগ আকর্ষণ, অবকাঠামোগত উন্নয়ন এবং বাংলাদেশ-জাপান অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব চুক্তি (ইপিএ) বাস্তবায়নে বিশেষ আলোচনা হবে বলে আশা করা হচ্ছে। এছাড়া, নবায়নযোগ্য জ্বালানি, কৃষি, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি, ডিজিটাল রূপান্তর, দক্ষতা উন্নয়ন এবং মানবসম্পদ প্রশিক্ষণের বিষয়গুলোও আলোচনায় স্থান পাবে।
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানায়, উচ্চপর্যায়ের দ্বিপাক্ষিক বৈঠক শেষে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রীর সম্মানে মধ্যাহ্নভোজের আয়োজন করবেন জাপানি প্রধানমন্ত্রী। দুই দেশের মধ্যে কৃষি, মৎস্য, মানবসম্পদ উন্নয়ন, দক্ষতা বৃদ্ধি, অভ্যন্তরীণ বিমান চলাচল, বাণিজ্য, পরিবেশ সংরক্ষণ এবং স্থানীয় সরকার ব্যবস্থার আধুনিকায়নসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে সমঝোতা স্মারক ও সহযোগিতা চুক্তির খসড়া নিয়ে দুইপক্ষের মধ্যে আলোচনা চলছে। সফরে বেশ কিছু সমঝোতা স্মারক সই হতে পারে। বিদ্যমান কৌশলগত অংশীদারত্ব আরো গভীর করা এবং পারস্পরিক স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন ক্ষেত্রে সহযোগিতা সম্প্রসারণে এ সফর সময়োপযোগী সুযোগ তৈরি করবে বলে আশা করছে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়।
সফরকালে প্রধানমন্ত্রী ‘জাপান-বাংলাদেশ ইকোনমিক ফোরাম’-এ মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করবেন। তাঁর খসড়া সফরসূচিতে ‘জাপান-বাংলাদেশ পার্লামেন্টারি ফ্রেন্ডশিপ লিগ’ এবং ‘জাপান-বাংলাদেশ কমিটি ফর কমার্শিয়াল অ্যান্ড ইকোনমিক কোঅপারেশন’-এর চেয়ারম্যানের সঙ্গে বৈঠকের কথা রয়েছে। এছাড়া, জাপান আন্তর্জাতিক সহযোগিতা সংস্থা (জাইকা), জাপান ব্যাংক ফর ইন্টারন্যাশনাল কোঅপারেশন (জেবিআইসি), জাপান এক্সটার্নাল ট্রেড অর্গানাইজেশন (জেট্রো) এবং সাকাকাওয়া পিস ফাউন্ডেশনের প্রধানদের সঙ্গেও প্রধানমন্ত্রীর বৈঠকের পরিকল্পনা করা হচ্ছে। প্রধানমন্ত্রী এলএনজি টার্মিনাল ও বিদ্যুৎকেন্দ্র, একটি পারমাণবিক কেন্দ্র এবং নাগোয়ায় টয়োটার উৎপাদন প্ল্যান্টসহ বিভিন্ন জ্বালানি ও শিল্প স্থাপনা পরিদর্শন করতে পারেন।
মেট্রোরেল, হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের থার্ড টার্মিনাল এবং মাতারবাড়ির মতো বৃহৎ অবকাঠামো ও পরিবহন প্রকল্পে সহায়তার মাধ্যমে জাপান দীর্ঘদিন ধরেই বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান উন্নয়ন অংশীদার হিসেবে ভূমিকা রেখে আসছে। এ সফরে চলমান প্রকল্পগুলোর কাজ দ্রুত করার পাশাপাশি নতুন বেসরকারি বিনিয়োগ আকর্ষণ এবং অর্থনৈতিক, উন্নয়ন ও নিরাপত্তা সহযোগিতা জোরদার হবে বলে আশা করা হচ্ছে। দ্বিপাক্ষিক সহযোগিতার পাশাপাশি আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক শান্তি ও স্থিতিশীলতা, রোহিঙ্গা সংকটের স্থায়ী ও শান্তিপূর্ণ সমাধান, বৈশ্বিক জ্বালানি সংকট মোকাবিলায় সহযোগিতা এবং আন্তর্জাতিক সংঘাত নিরসনের প্রচেষ্টা নিয়ে দুই নেতা আলোচনা করবেন। গত এপ্রিলে জাপানি প্রধানমন্ত্রীর আমন্ত্রণে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান অনলাইন বৈঠকে অংশ নিয়েছিলেন, যেখানে এশিয়া জুড়ে জ্বালানি চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় জাপানের নেতৃত্বাধীন উদ্যোগকে স্বাগত জানায় বাংলাদেশ।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









