প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের বাসযাত্রার ছবি দিয়ে কেউ যদি ফেসবুকে লেখেন, ‘শুধুমাত্র একজন স্নাইপারের অভাব ছিল’-সেটা হেলাফেলা করে দেখার বিষয় নয়। অথচ সেই লেখক গতকাল রবিবার আদালতে বললেন, তিনি মজা করে ওই কথা লিখেছিলেন। এদিকে একজন ইউএনও হাততালি দিয়ে বললেন, ‘আমি বিএনপির লোক’। সেই ইউএনও গতকাল বললেন, রসিকতা করে তিনি ওই কথা বলেছেন। এ অবস্থায় মাঠ প্রশাসনের কর্মকর্তাদের বিতর্কিত কর্মকাণ্ড, রাজনৈতিক বক্তব্য ও পারস্পরিক বিরোধের ঘটনা নিয়ে আলোচনা-সমালোচনা তৈরি হয়েছে। এর আগে, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের রাজশাহী সফরে প্রটোকলবিরোধী আচরণের অভিযোগে বিভাগীয় কমিশনারকে স্ট্যান্ড রিলিজ, ঠাকুরগাঁওয়ের পীরগঞ্জের উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার (ইউএনও) রাজনৈতিক বক্তব্য এবং সুনামগঞ্জের জামালগঞ্জে ইউএনও ও সহকারী কমিশনারের (ভূমি) বিরোধের ঘটনা প্রশাসনের পেশাদারিত্ব ও নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে।
জনপ্রশাসন প্রতিমন্ত্রী মো. আব্দুল বারী, এমপি বলেন, প্রশাসন নিয়ে বিভিন্ন মহলের নেতিবাচক বক্তব্যের অনেকগুলোরই সত্যতা নেই। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া কর্মকর্তাদের বিতর্কিত কর্মকাণ্ডের অভিযোগ যাচাই করা হচ্ছে। অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে। বিচ্ছিন্ন কিছু ঘটনা দিয়ে পুরো প্রশাসনকে মূল্যায়ন করা ঠিক নয় বলেও মনে করেন তিনি।
‘শুধু একটা স্নাইপারের অভাব ছিল’ মন্তব্যটি মজা করে লিখেছিলাম
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে বহনকারী বাসের ছবির নিচে ফেসবুকে স্নাইপার ব্যবহারের প্রসঙ্গ তুলে মন্তব্য করেছিলেন আবু বকর সিদ্দিক। এ জন্য আদালতে ভুল স্বীকার করে তিনি বলেছেন, মজা করে কথাটি লিখেছিলেন, কাউকে হুমকি দেওয়া বা অন্য কোনো উদ্দেশ্য তার ছিল না। তবে এ ঘটনায় সন্ত্রাসবিরোধী আইনে করা মামলায় শুনানি শেষে গতকাল তার সাতদিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেছেন আদালত। গতকাল রবিবার ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট সারাহ ফারজানা হক রিমান্ডের আদেশ দেন।
মামলার তদন্ত কর্মকর্তা ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের সাইবার অ্যান্ড স্পেশাল ক্রাইম (উত্তর) বিভাগের উপ-পরিদর্শক (এসআই) মো. ইয়াছিন পাইক আসামি আবু বকরকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য সাতদিনের রিমান্ড আবেদন করেন। শুনানিতে তার পক্ষে কোনো আইনজীবী উপস্থিত ছিলেন না। এসময় বিচারক তার বক্তব্য জানতে চাইলে তিনি মন্তব্যটি মজা করে করেছিলেন বলে দাবি করেন। একই সঙ্গে ভুল হয়েছে বলেও স্বীকার করেন। রিমান্ড আবেদনে তদন্ত কর্মকর্তা উল্লেখ করেন, ফেসবুকে করা মন্তব্যের পেছনে কোনো সংঘবদ্ধ সন্ত্রাসী গোষ্ঠী বা অস্ত্র সরবরাহকারী চক্রের সংশ্লিষ্টতা রয়েছে কি না, তা খতিয়ে দেখা দরকার। এছাড়া সম্ভাব্য ষড়যন্ত্রে জড়িত ব্যক্তিদের শনাক্ত, অজ্ঞাতনামা আসামিদের বিষয়ে তথ্য সংগ্রহ এবং মামলার রহস্য উদ্ঘাটনে তাকে জিজ্ঞাসাবাদ প্রয়োজন।
আবু বকরকে গত ২১ অক্টোবর গভীর রাতে রাজশাহীর পবা থানার কচুয়াতৈল এলাকার বাসা থেকে আটক করে স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়ন (এসআরবি)। পরে সন্ত্রাসবিরোধী আইনে করা মামলায় তাকে গ্রেফতার দেখানো হয়। ২৩ অক্টোবর তাকে কারাগারে পাঠানোর পাশাপাশি জিজ্ঞাসাবাদের জন্য সাতদিনের রিমান্ড আবেদন করা হয়। শুনানির জন্য রবিবার দিন ধার্য করেছিলেন আদালত।
মামলার বিবরণ অনুযায়ী, গত ২০ অক্টোবর প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান রাজশাহী সফরে যান। শাহ মখদুম বিমানবন্দর থেকে রুয়েটের একটি বাসে করে নগরীতে প্রবেশ করেন তিনি। পরে ওই বাসে করেই সমাবেশে যোগ দেন এবং কর্মসূচি শেষে বিমানবন্দরে ফেরেন। প্রধানমন্ত্রীর সফরে ব্যবহৃত বাসের ছবি দিয়ে ‘দ্য বিউটি অব রাজশাহী’ নামের একটি ফেসবুক পেজে পোস্ট দেওয়া হয়। ওই পোস্টের মন্তব্যের ঘরে ‘এমডি আবু বকর সিদ্দিক’ নামের একটি অ্যাকাউন্ট থেকে লেখা হয়, ‘ইস একটা বড় সুযোগ ছিল, শুধু একটা স্নাইপার এর অভাব ছিল।’ মন্তব্যটি ছড়িয়ে পড়ার পর তা নিয়ে আলোচনা শুরু হয়।এ ঘটনায় ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের সাইবার অ্যান্ড স্পেশাল ক্রাইম (উত্তর) বিভাগের উপ-পরিদর্শক মো. মানিক হোসেন রমনা থানায় সন্ত্রাসবিরোধী আইনে মামলা করেন।
বিএনপি নেতা দাবি করা সেই ইউএনও বললেন ‘রসিকতা’
পীরগঞ্জ প্রতিনিধি জানান, ঠাকুরগাঁওয়ের পীরগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) গোলাম রব্বানী সরদারের সুর পাল্টে গেছে। সম্প্রতি নিজেকে একটি রাজনৈতিক দলের (বিএনপি) নেতা দাবি করলেও এখন বলছেন, নিজেকে বিএনপি নেতা দাবি করা ছিল তার ‘রসিকতা’। স্থানীয় সূত্র ও একাধিক সরকারি কর্মকর্তার অভিযোগ, পীরগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী অফিসার গোলাম রব্বানী সরদার দাপ্তরিক বৈঠক এবং বিভিন্ন সামাজিক অনুষ্ঠানে নিজেকে বিএনপির স্থানীয় নেতা হিসেবে পরিচয় দিয়ে প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করেন। সম্প্রতি এক গণমাধ্যমকর্মীকে দেওয়া বক্তব্যে নিজেকে বিএনপি নেতা দাবি করেন তিনি। যা এরই মধ্যে টক অব দা কান্ট্রিতে পরিণত হয়। একজন বিসিএস (প্রশাসন) ক্যাডার কর্মকর্তা হয়ে দলীয় পরিচয় প্রকাশ করায় প্রশাসনের নিরপেক্ষতা নিয়েও জনমনে প্রশ্ন ওঠে। সাধারণ মানুষ ও সেবা নিতে আসা প্রার্থীরা বলছেন, দলীয় পরিচয়ের কারণে নির্দিষ্ট একটি রাজনৈতিক মতাদর্শের বাইরে সাধারণ মানুষ সেবা পেতে গিয়ে চরম বৈষম্যের শিকার হচ্ছেন। কোনো বিষয়ে জানতে চাইলে বা প্রতিকার চাইতে গেলে সাধারণ মানুষের সঙ্গে দুর্ব্যবহার এবং রাজনৈতিক প্রভাব দেখিয়ে দমিয়ে রাখার চেষ্টা করেন তিনি। বাদল হোসেন নামে স্থানীয় এক সংবাদকর্মী বলেন, ‘ইউএনও গোলাম রব্বানী সবসময় নিজেকে বিএনপির ক্যাডার ভাবেন। কথায় কথায় মানুষকে জ্ঞান দেন। অথচ আমি যতটা জেনেছি ছাত্রজীবনে ছাত্রলীগের নেতা ছিলেন তিনি।’ একজন বিসিএস কর্মকর্তা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, সরকারি অফিসে একটি পেশাদার ও সেবামুখী পরিবেশ থাকার কথা, কিন্তু এখানে এখন ইউএনওর রাম রাজত্ব চলছে। অফিসারদের সারাক্ষণ এক ধরনের মানসিক চাপের মধ্যে থাকতে হয়। অফিসার্স ক্লাবে কেউ যান না।
ঠাকুরগাঁও জজ কোর্টের সিনিয়র আইজীবী আবু সায়েম বলেন, সরকারি কর্মচারী আচরণ বিধিমালা ১৯৭৯ অনুযায়ী, কোনো সরকারি কর্মকর্তা প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে রাজনৈতিক দলের সঙ্গে সম্পৃক্ত থাকতে পারেন না বা রাজনৈতিক পরিচয় দিতে পারেন না। কিন্তু পীরগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী অফিসারএ আইনকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে নিজের রাজনৈতিক পরিচয় ফলাও করে প্রচার করছেন। একজন সরকারি কর্মকর্তার এ ধরনের আচরণ প্রশাসন ও জনগণের মধ্যকার আস্থাকে মারাত্মকভাবে ক্ষুণ্ন করছে। এ বিষয়ে উপজেলা নির্বাহী অফিসার গোলাম রব্বানী সরদার বলেন, আমি কারো সঙ্গে অসদাচরণ করিনি, নিয়ম মেনে চাকরি করছি। নিজেকে বিএনপি নেতা দাবি করার বিষয়ে তিনি বলেন, ‘আমি রসিকতা করে বলেছি।’
কর্মকর্তাদের বিতর্কিত কর্মকাণ্ড
সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের রাজশাহী সফর ঘিরে বিভাগীয় কমিশনার ইউসুফ আলীর আচরণ বিতর্কের জন্ম দেয়। গত ২০ অক্টোবর রাতে তাকে স্ট্যান্ড রিলিজ করে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে সংযুক্ত করা হয়। সফর শেষে বিমানবন্দরে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে করমর্দনের পর তাকে জড়িয়ে ধরার মতো ভঙ্গি করার একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা শুরু হয়। তার বিরুদ্ধে প্রটোকলবিরোধী আচরণের অভিযোগ ওঠে। এর কয়েক দিনের মধ্যে ঠাকুরগাঁওয়ের পীরগঞ্জের ইউএনও গোলাম রব্বানী সরদারের একটি বক্তব্য নিয়েও বিতর্ক তৈরি হয়। সম্প্রতি একটি দুর্গামন্দিরে সংসদ সদস্য জাহিদুর রহমানের বক্তব্যের সময় ইউএনওকে হাততালি দিতে দেখা যায়। ওই অনুষ্ঠানে সংসদ সদস্য আগামী ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে বিএনপির প্রার্থীর পক্ষে ভোট চান। এ নিয়ে সমালোচনার মধ্যে ইউএনও বলেন, ‘আমি এখন বিএনপির নেতা’। একজন সরকারি কর্মকর্তার এমন বক্তব্য এবং রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে সমর্থনসূচক আচরণ নিয়ে প্রশ্ন ওঠে।
এর মধ্যে সুনামগঞ্জের জামালগঞ্জে ইউএনও শিল্পী রাণী মোদক ও সহকারী কমিশনার (ভূমি) আরিফুর রহমান শান্তর বিরোধও আলোচনায় এসেছে। ২৩ অক্টোবর দিবাগত রাতে আরিফুর রহমান ফেসবুকে পোস্ট দিয়ে ইউএনওকে নিজের মৃত্যুর জন্য দায়ী করেন এবং প্রশাসন ক্যাডার থেকে পদত্যাগের কথা লেখেন। পরে পোস্টগুলো মুছে ফেলা হয়।
সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, ইউএনওর মেয়ের জন্মদিনের অনুষ্ঠান ঘিরে তাদের মধ্যে পরিস্থিতির অবনতি ঘটে। পরে অসুস্থ হয়ে পড়া এসিল্যান্ডকে চিকিৎসার জন্য ঢাকায় নেওয়া হয়। উপজেলা প্রশাসনের দুই কর্মকর্তার মধ্যে এমন বিরোধের ঘটনায় প্রশাসনের অভ্যন্তরীণ পরিবেশ নিয়েও আলোচনা তৈরি হয়েছে।
প্রশাসন নিয়ে সমালোচনায় শীর্ষ পর্যায়মাঠ প্রশাসনের কর্মকর্তাদের বিতর্কিত কর্মকাণ্ডের পাশাপাশি প্রশাসনের দুর্নীতি, ঘুস, আমলাতান্ত্রিক জটিলতা ও জনসেবা নিয়ে অসন্তোষ প্রকাশ করেন সরকারের শীর্ষ পর্যায় এবং গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক ব্যক্তিরা। গত ১৩ সেপ্টেম্বর ভোলায় এক অনুষ্ঠানে জাতীয় সংসদের স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ সরকারি কর্মকর্তাদের দুর্নীতি নিয়ে কঠোর সমালোচনা করেন। তিনি বলেন, ‘আমাদের...অদ্ভুত দেশ! অধিকাংশ সরকারি কর্মকর্তা চোর। এগুলো নানা ধরনের ঘুসখোরি, লুটপাট এসব করে; যার ফলে মানুষের জীবনে নাভিশ্বাস উঠেছে।’
গত ৩০ জুলাই গণঅভ্যুত্থান দিবস উপলক্ষে তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয় আয়োজিত আলোচনা সভায় তৎকালীন স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায়মন্ত্রী (বর্তমানে রাষ্ট্রপতি) মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর প্রশাসনের পুরোনো অনিয়ম ও কাজ আটকে রাখার সংস্কৃতি নিয়ে আক্ষেপ প্রকাশ করেন। তথ্য ভবন মিলনায়তনে আয়োজিত অনুষ্ঠানে তিনি বলেন, আগে যারা ঘুস খেতেন, তারা এখনো ঘুস খাওয়ার ফন্দিফিকির করছেন। একইভাবে আগে যারা ভালো একটা কাজ আটকে দিতেন, তারা এখনো তা আটকে দিচ্ছেন। লোকজন ভোল পাল্টাচ্ছেন। ভোল পাল্টানো লোকজনই এখন অনেক বেশি জুলাইযোদ্ধা হয়ে গেছেন। মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর আরও বলেন, ‘এই কথাগুলো আক্ষেপে বলছি। আক্ষেপে বলছি এজন্য, আমার বয়স অনেক। আমি তো সত্যিকার অর্থেই এবার পরিবর্তনটা দেখতে চেয়েছিলাম। এখন পর্যন্ত সেটা আমি দেখছি না আমাদের মধ্যে।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









