দেশের খাদ্যদ্রব্যের মান প্রতিনিয়ত হুমকির মুখে পড়ছে। শিশু থেকে পশু। পানি থেকে দুধ, মাছ থেকে মাখন, টক থেকে মিষ্টি, সবজি থেকে পোল্ট্রি, মুদি থেকে মাংস— প্রায় প্রতিটি পণ্যেই ভেজাল। ফুটপাত থেকে মেগা শপিংমল। ছোট হোটেল থেকে বড় নামকরা কোম্পানি। থানা থেকে জেলা, বিভাগ থেকে রাজধানীসহ সবখানেই থাবা বসিয়েছে সর্বগ্রাসী ভেজাল। এসব খাদ্যে কোনোটা প্রস্তুতকালীন সময়ে ভেজাল দেওয়া হচ্ছে। আবার কোনোটা ক্ষেতে উৎপাদনের সময়েই অতিরিক্ত সার, কীটনাশক ব্যবহার করা হচ্ছে। নিত্যনতুন পন্থায় খাদ্যে ভেজাল মেশানোর এই মহোৎসব সাধারণ মানুষের আসল খাদ্য চেনার পথকে কঠিন থেকে কঠিনতর করে তুলেছে। সরকারি বিভিন্ন সংস্থা বছরব্যাপী মোবাইল কোর্ট অভিযান, জরিমানা, প্রতিষ্ঠান সিলগালা করেও কূলকিনারা পাচ্ছে না। উল্টো আইনি ফাঁকফোকরকে কাজে লাগিয়ে ভেজালকারী প্রতিষ্ঠানের নাম গোপন থাকায় অপরাধীরা পার পেয়ে যাচ্ছে, আর মারাত্মক স্বাস্থ্যঝুঁকিতে ধুঁকছে পুরো জাতি। খাদ্যে ভেজালের লাগাম টানতে মাঠে কাজ করছে বাংলাদেশ স্ট্যান্ডার্ডস অ্যান্ড টেস্টিং ইনস্টিটিউশন (বিএসটিআই), জাতীয় ভোক্তা-অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর এবং বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ (বিএফএসএ)। কিন্তু তাদের একের পর এক অভিযানের পরও পরিস্থিতির দৃশ্যমান কোনো উন্নতি নেই। অনেকে আবার ভুয়া বা জাল সনদেও করে যাচ্ছে ভেজাল পণ্যের ব্যবসা।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ভেজাল ও অস্বাস্থ্যকর খাদ্যে ভাসছে দেশ। রীতিমতো নীরব বিষক্রিয়ায় জিম্মি হয়ে পড়েছে দেশের প্রায় ১৮ কোটি মানুষ। নামিদামি রেস্টুরেন্ট থেকে শুরু করে ফুটপাতের বিক্রয়কেন্দ্র সবই এখন ভেজাল খাবারের দখলে। চাল থেকে শুরু করে ডাল, আটা-ময়দা ও মসলা পণ্যে ক্ষতিকর রাসায়নিক দেওয়া হচ্ছে। বিষাক্ত কেমিক্যাল দিয়ে পাকানো হচ্ছে প্রায় সব ধরনের ফল। অধিক সময় তরতাজা রাখতে মাছ-মাংসে দেওয়া হচ্ছে বিষ। আবার কিছু কিছু খাবার দেখতে আকর্ষণীয় করতে ফুডগ্রেড কালারের পরিবর্তে মেশানো হচ্ছে কাপড়ে ব্যবহারের রঙ। আরও ভয়ংকর তথ্য হচ্ছে-শিশুখাদ্য ও জীবনরক্ষাকারী ওষুধেও ভেজাল উপাদান দেওয়া হচ্ছে। মাঠে কৃষিপণ্যে ছিটানো হচ্ছে কীনটাশক, যা খাবারের মাধ্যমে সরাসরি মানুষের পেটে ঢুকছে। ফলে বিপন্ন হচ্ছে জনজীবন। বাড়ছে ক্যানসার, কিডনি ও লিভারের জটিল রোগ। আর এসব জেনেও নির্বিকার প্রশাসন।
কনজ্যুমারস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ক্যাব) কেন্দ্রীয় কমিটির ভাইস প্রেসিডেন্ট এসএম নাজের হোসাইন দৈনিক এদিনকে বলেন, খাদ্যে বিষ ও ভেজাল রোধে সরকার ফরমালিন নিয়ন্ত্রণ আইন-২০১৫, নিরাপদ খাদ্য আইন-২০১৩ এবং ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ আইন-২০০৯ প্রণয়ন করেছে। এমনকি ১৯৭৪ সালের বিশেষ ক্ষমতা আইনেও খাদ্যে ভেজাল দেওয়া ও বিক্রির সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদণ্ডের বিধান রয়েছে। কিন্তু এসব আইনের যথাযথ প্রয়োগ না থাকায় সাধারণ জনগণ সুফল পাচ্ছে না।
এদিকে বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের (বিএফএসএ) এক গবেষণায় আতঙ্কিত হওয়ার মতো কিছু তথ্য উঠে এসেছে। গবেষণার ফলাফলে বলা হয়েছে, সারা দেশ থেকে সংগৃহীত খাদ্য নমুনার ৫২ শতাংশ দূষিত। প্রতিষ্ঠানটির ল্যাবে ৮২টি খাদ্যপণ্য পরীক্ষার পর দেখা যায়, গড়ে ৪০ শতাংশ খাদ্যে ইউরোপীয় ইউনিয়নের সহনীয় মাত্রার চেয়ে ৩ থেকে ২০ গুণ বেশি নিষিদ্ধ ডিডিটি ও অন্যান্য বিষাক্ত উপাদান পাওয়া গেছে। এছাড়া ৩৫ শতাংশ ফল ও ৫০ শতাংশ শাক-সবজির নমুনায় বিভিন্ন কীটনাশকের উপস্থিতি ধরা পড়ে। চালের ১৩টি নমুনায় অতিমাত্রায় বিষাক্ত আর্সেনিক ও পাঁচটিতে ক্রোমিয়াম পাওয়া গেছে। হলুদের গুঁড়ার ৩০টি নমুনায় সিসা ও অন্যান্য ভারী ধাতু, আর লবণে সহনীয় মাত্রার চেয়ে ২০-৫০ গুণ বেশি সিসা পাওয়া গেছে। এমনকি মুরগি ও মাছেও মিলেছে ক্ষতিকর অ্যান্টিবায়োটিকের অস্তিত্ব। সাম্প্রতিক সময়ে ফুড গ্রেডের নামে খাবারে কাপড়ের রং ব্যবহার করার অপরাধে রাজধানীর বেইলি রোডের ‘কাচ্চি ভাই’ রেস্টুরেন্টকে জরিমানা করেছিল জাতীয় ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর। প্রতিষ্ঠানটিতে অভিযান চালিয়ে দুই লাখ টাকা জরিমানা করা হয়। অভিযানে নেতৃত্ব দেন অধিদপ্তরের ঢাকা কার্যালয়ের অফিসপ্রধান সহকারী পরিচালক মো. আব্দুল জব্বার মন্ডল ও সহকারী পরিচালক তাহমিনা বেগম। অভিযানের খবরে কাপড়ে ব্যবহারের রঙের জার ময়লার ডাস্টবিনে ফেলে দেন কাচ্চি ভাইয়ের একজন কর্মকর্তা। সেটি দেখে ফেলেন ভোক্তা অধিদপ্তরের কর্মকর্তা। সসের জারের মধ্যে রাখা হয় এসব রং। ডাস্টবিন থেকে ফেলে দেওয়া রঙের জার বের করে আনেন ভোক্তা অধিদপ্তরের কর্মকর্তা। এরপর কাচ্চি ভাইয়ের দায়িত্বে থাকা ম্যানেজার এটাকে ‘ফুড গ্রেড’ রং হিসাবে দাবি করলেও পরে নিজমুখে স্বীকার করেন এগুলো কাপড়ে ব্যবহারের রং, যা ফুড গ্রেড বলে ক্রেতাদের খাইয়ে আসছিলেন।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্যমতে, প্রতিবছর বিশ্বের প্রায় ৬০ কোটি মানুষ ভেজাল ও দূষিত খাদ্য গ্রহণের কারণে অসুস্থ হয়। এর মধ্যে মারা যায় ৪ লাখ ৪২ হাজার মানুষ। এ ছাড়া দূষিত খাদ্য গ্রহণের কারণে পাঁচ বছরের কম বয়সে আক্রান্ত ৪৩ শতাংশ শিশুর মধ্যে মৃত্যুবরণ করে ১ লাখ ২৫ হাজার। পরিবেশ বাঁচাও আন্দোলনের (পবা) গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, শুধু ভেজাল খাদ্য গ্রহণের কারণে প্রতিবছর দেশে ৩ লাখ লোক ক্যানসারে, ২ লাখ কিডনি রোগে, দেড় লাখ ডায়াবেটিসে আক্রান্ত হচ্ছে।
গত বছর হাইকোর্টের নির্দেশে লবণ, হলুদ, গুঁড়া মরিচ, কারি পাউডার, সরিষার তেল, বোতলজাত পানি, মাখন, আটা, ময়দা, নুডলস ও বিস্কুটের ৪০৬টি নমুনা পরীক্ষা করে আদালতে প্রতিবেদন দাখিল করে বিএসটিআই। প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, ৪৬টি শীর্ষস্থানীয় প্রতিষ্ঠানের ৭৪টি পণ্য নিম্নমানের। আদালত এসব পণ্য বাজার থেকে অপসারণ এবং সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের লাইসেন্স প্রত্যাহারের নির্দেশ দেন। জাতীয় জনস্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটও ২০১৮ সালে সারা দেশে ৪৩টি ভোগ্যপণ্যের (খাদ্যদ্রব্য) ৫ হাজার ৩৯৬টি নমুনা পরীক্ষা করে। ল্যাবরেটরিতে পরীক্ষার পর এই ৪৩ পণ্যেই ভেজাল পাওয়া গেছে। বর্তমানে বাজারে খাদ্যসামগ্রীর মানের অবস্থা একই।
ক্যাবের কেন্দ্রীয় কমিটির ভাইস প্রেসিডেন্ট এসএম নাজের হোসাইন আরো বলেন, কোনো সরকারের আমলেই খাদ্যে ভেজাল ও অস্বাস্থ্যকর খাবারের বিরুদ্ধে তেমন দৃশ্যমান কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি। কখনো কখনো লোক দেখানো অভিযানে সরকারের কোনো কোনো সংস্থা তোড়জোড় দেখালেও তা গর্জনেই সীমাবদ্ধ। নতুন সরকার চাইলে জনগণকে রক্ষায় কঠোর হতে পারে বলেও মনে করেন তিনি।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. শামীম আহমেদ এদিনকে বলেন, ভেজাল ও অস্বাস্থ্যকর খাবার এখন নীরব ঘাতকে পরিণত হয়েছে। সবকিছু চোখের সামনেই হচ্ছে। অথচ প্রতিকার নেই। শিশুদের শারীরিক বৃদ্ধি ব্যাহত হচ্ছে, বাড়ছে দীর্ঘমেয়াদি রোগ। এটি শুধু স্বাস্থ্য নয়, পুরো জাতির ভবিষ্যতের জন্য হুমকি। তিনি আরও বলেন, আইন থাকলেও প্রয়োগ কম। একাধিক কর্তৃপক্ষ নামমাত্র অভিযান চালালেও কঠোর শাস্তির অভাবে ভেজাল রোধ করা যাচ্ছে না। এভাবে চলতে থাকলে দেশের জনস্বাস্থ্য এক সময় বিপন্ন হয়ে পড়বে।
বিএসটিআইয়ের পরিচালক (সিএম) মো. সাইফুল ইসলাম এদিনকে বলেন, পণ্য ও সেবার মান নিয়ন্ত্রণে আমরা কাজ করছি। কিন্তু অসাধু ব্যবসায়ীদের নিত্যনতুন কৌশলের কাছে অনেক সময় হেরে যেতে হয়। এ অবস্থা উত্তরণে সবাইকে সচেতন হতে হবে।
খাদ্যদ্রব্যের ভেজাল এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, গত আগস্ট মাসে নিরাপদ খাদ্য আইনে বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ সারাদেশে অভিযান চালিয়ে ১ কোটি টাকা আর্থিক জরিমানা ও ৫০টি মামলা দায়ের করেছে। চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত কর্তৃপক্ষের পরিচালিত মোবাইল কোর্ট ও অভিযানে মোট ২ কোটি ৮৩ লাখ ৬৩ হাজার ৫০০ টাকা অর্থদণ্ড এবং ৭টি কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। কর্তৃপক্ষের হিসাবে এ সময়ে মোট ৭৪৪টি মোবাইল কোর্ট ও অভিযান পরিচালিত হয়েছে। মাসভিত্তিক পরিসংখ্যানে দেখা যায়, বছরের শুরু থেকেই নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিতে মাঠপর্যায়ের কার্যক্রম অব্যাহত ছিল। ফেব্রুয়ারিতে প্রধান কার্যালয়ের উদ্যোগে ৮টি মোবাইল কোর্ট ও অভিযান পরিচালনা করে ৬ লাখ টাকা জরিমানা করা হয়। মার্চে প্রধান কার্যালয়ের মাধ্যমে ৬টি অভিযানে ৪ লাখ টাকা এবং জেলা ও মেট্রোপলিটন কার্যালয়ের মাধ্যমে ৭৭টি অভিযানে ৩৬ লাখ ১০ হাজার টাকা জরিমানা আদায় ও একজনকে কারাদণ্ড দেওয়া হয়। এপ্রিল মাসে প্রধান কার্যালয়ের মাধ্যমে ১৩টি অভিযানে ৩ লাখ টাকা এবং জেলা ও মেট্রোপলিটন কার্যালয়ের মাধ্যমে ৭৬টি অভিযানে ৮ লাখ ৭০ হাজার টাকা জরিমানা আদায় করা হয়। মে মাসে প্রধান কার্যালয়ের মাধ্যমে ১১টি অভিযানে ৬ লাখ টাকা এবং জেলা ও মেট্রোপলিটন কার্যালয়ের মাধ্যমে ৭৪টি অভিযানে ১৬ লাখ টাকা জরিমানা আদায় ও তিনজনকে কারাদণ্ড দেওয়া হয়। জুনে প্রধান কার্যালয়ের মাধ্যমে ১২টি অভিযানে ৪ লাখ টাকা এবং জেলা ও মেট্রোপলিটন কার্যালয়ের মাধ্যমে ৭২টি অভিযানে ১৫ লাখ টাকা জরিমানা আদায় ও একজনকে কারাদণ্ড দেওয়া হয়। জুলাই মাসে প্রধান কার্যালয়ের মাধ্যমে ১৫টি অভিযানে ৬ লাখ টাকা এবং জেলা ও মেট্রোপলিটন কার্যালয়ের মাধ্যমে ১০৪টি অভিযানে ৪২ লাখ ২৬ হাজার টাকা জরিমানা আদায় করা হয়। এ মাসে একজনকে কারাদণ্ড দেওয়া হয়। আগস্টে অভিযানের পরিধি আরও বাড়ে। এ মাসে প্রধান কার্যালয়ের মাধ্যমে ২৫টি অভিযানে ১০ লাখ টাকা এবং জেলা ও মেট্রোপলিটন কার্যালয়ের মাধ্যমে ১৭২টি অভিযানে ৭৫ লাখ ৩৭ হাজার ৫০০ টাকা জরিমানা আদায় করা হয়। সেপ্টেম্বরে প্রধান কার্যালয়ের মাধ্যমে ২৩টি অভিযানে ১২ লাখ টাকা এবং জেলা ও মেট্রোপলিটন কার্যালয়ের মাধ্যমে ৫৬টি অভিযানে ৩৯ লাখ ২০ হাজার টাকা জরিমানা আদায় করা হয়। একই সময়ে একজনের কারাদণ্ডের তথ্য রয়েছে।
রাজধানীর বিভিন্ন খাদ্য প্রতিষ্ঠানে অনিবন্ধিতভাবে ব্যবসা পরিচালনা, অপরিচ্ছন্ন পরিবেশে খাবার তৈরি, লেবেলবিহীন মাছ-মাংস ও অন্যান্য খাদ্যসামগ্রী সংরক্ষণ এবং খাদ্যকর্মীদের স্বাস্থ্যসনদ ও পেস্ট কন্ট্রোলের প্রমাণক না থাকার মতো অনিয়ম শনাক্ত করা হয়। ঢাকার বাইরে বিভিন্ন জেলায় পরিচালিত অভিযানে পায়ে মাড়িয়ে চানাচুর তৈরি, পোড়াতেল ব্যবহার, অননুমোদিত রাসায়নিক রং ব্যবহার, উৎপাদনস্থলে তেলাপোকা ও ছারপোকার উপস্থিতি, অনুমোদনহীন ঘি ব্যবহার এবং নোংরা ও অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে খাদ্য উৎপাদনের মতো অনিয়মও ধরা পড়ে। এসব ঘটনায় জরিমানা ও মামলা করা হয়েছে।
কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, আইন প্রয়োগের পাশাপাশি বিগত ৮ মাসে ১ হাজার ৩০৭টি খাদ্যস্থাপনায় মনিটরিং করা হয়েছে। বাজার, হোটেল-রেস্তোরাঁ, বেকারি, মিষ্টির দোকান, খাদ্য উৎপাদন ও প্রক্রিয়াজাতকারী প্রতিষ্ঠানসহ বিভিন্ন খাদ্যস্থাপনায় এসব কার্যক্রম পরিচালিত হয়। এর মাধ্যমে খাদ্য উৎপাদন, সংরক্ষণ, পরিবেশন, প্রক্রিয়াজাতকরণ ও বিপণনে নিরাপদ খাদ্যবিধি অনুসরণ করা হচ্ছে কি না, তা তদারকি করা হয়। খাদ্য নিরাপত্তার আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো খাদ্যপণ্যের নমুনা পরীক্ষা। চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত বিএফএসএ ১ হাজার ২১০টি খাদ্য নমুনা পরীক্ষা করেছে। বোতলজাত পানি, ভোজ্যতেল, দুধ ও দুগ্ধজাত পণ্য, দই, গুঁড়া মশলা, শিশু খাদ্য ও বেকারি পণ্যসহ বিভিন্ন নিত্যপ্রয়োজনীয় খাদ্যপণ্য এ পরীক্ষার আওতায় এসেছে।
বাংলাদেশ নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ’র সদস্য (আইন ও নীতি) মো. আনোয়ারুল ইসলাম সরকার এদিনকে বলেন, নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিতে চলমান কার্যক্রম আরও জোরদার করার পরিকল্পনা রয়েছে। জেলা পর্যায় থেকে দেশব্যাপী অভিযান ও মনিটরিং কার্যক্রম বাড়ানোর জন্য প্রয়োজনীয় বরাদ্দ ও সহায়তার বিষয়ে মন্ত্রণালয়কে অবহিত করা হয়েছে। তিনি বলেন, নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিতে শুধু আইন প্রয়োগ নয়, খাদ্য উৎপাদন, প্রক্রিয়াজাতকরণ, সংরক্ষণ, পরিবহন ও বিপণনের প্রতিটি পর্যায়ে নজরদারি বাড়ানো হচ্ছে। একই সঙ্গে খাদ্যের মূল উপাদানের বিশুদ্ধতা নিশ্চিত করা এবং অবৈধ রং, গন্ধ ও ক্ষতিকর অ্যাডিটিভসের ব্যবহার বন্ধে গবেষণা ও কারিগরি কার্যক্রমও পরিচালিত হচ্ছে।
নিরাপদ খাদ্যপ্রাপ্তির নিশ্চয়তায় ২০১৩ সালে আইন প্রণয়ন করা হয়েছে। ২০১৫ সালে গঠন করা হয়েছে নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ। নিরাপদ খাদ্য আইন, ২০১৩ অনুযায়ী অপরাধের ধরন ও তীব্রতার ওপর ভিত্তি করে বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ড ও অর্থদণ্ডের বিধান রাখা হয়েছে। এই আইনে সর্বনিম্ন ১ লাখ টাকা থেকে সর্বোচ্চ ১০ লাখ টাকা জরিমানা এবং সর্বনিম্ন ৬ মাসের কারাদণ্ড থেকে সর্বোচ্চ ৫ বছরের জেল অথবা উভয় দণ্ডের শাস্তির বিধান রয়েছে।
জাতিসংঘ বহু আগেই খাদ্য অধিকারকে আন্তর্জাতিক মানবাধিকার আইনের অংশ হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে। বাংলাদেশ জাতিসংঘ মানবাধিকার সনদে স্বাক্ষরকারী অন্যতম দেশ। ভারতের খাদ্য নিরাপত্তা ও মান আইন, ২০০৬-এর অধীনে অপরাধের মাত্রা অনুযায়ী বিভিন্ন শাস্তি ও আর্থিক জরিমানার বিধান রয়েছে। এতে রয়েছে- নিম্নমানের বা ভেজাল খাদ্য বিক্রিতে ৫ লাখ টাকা পর্যন্ত জরিমানা। স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর ভেজাল উপাদান রাখলে ২ লাখ থেকে ১০ লাখ টাকা পর্যন্ত জরিমানা। অসুরক্ষিত বা বিষাক্ত খাদ্য তৈরি বা বিক্রি (ক্ষতি না হলে) ৩ মাস পর্যন্ত কারাদণ্ড এবং ৩ লাখ টাকা পর্যন্ত জরিমানার বিধান রয়েছে। মারাত্মক আঘাতপ্রাপ্তিতে ৬ বছর পর্যন্ত কারাদণ্ড এবং ৫ লাখ টাকা পর্যন্ত জরিমানা এবং ভোক্তার মৃত্যু হলে- সর্বনিম্ন ৭ বছর থেকে শুরু করে আজীবন কারাদণ্ড এবং কমপক্ষে ১০ লাখ টাকা জরিমানার বিধান রাখা হয়েছে। চীনের খাদ্য নিরাপত্তা আইনে খাদ্যে ভেজাল বা মানবদেহের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ পদার্থ মেশানোর বিষয়ে অত্যন্ত কঠোর অবস্থান নেওয়া হয়েছে। এই আইনে ভেজাল ও অনিরাপদ খাদ্য সরবরাহ করলে উৎপাদক ও ব্যবসায়ীদের লাইসেন্স বাতিলসহ উচ্চ অঙ্কের আর্থিক জরিমানা করা হয়। এছাড়া গুরুতর পরিণতি ও প্রাণহানির ক্ষেত্রে- খাদ্যে বিষক্রিয়া বা ভেজালের কারণে যদি কারও মৃত্যু হয় বা জনস্বাস্থ্যে চরম বিপর্যয় ঘটে, তাহলে দোষীদের বিরুদ্ধে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড এমনকি মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করার মতো কঠোর আইনি বিধান রয়েছে।
এত জরিমানা ও সিলগালার পরও কেন ভেজাল বন্ধ হচ্ছে না এমন প্রশ্নের জবাবে রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের (আইইডিসিআর) সাবেক প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ডা. মুশতাক হোসেন গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেন। দৈনিক এদিনকে তিনি বলেন, ‘খাদ্যে ভেজালের কারণে আমরা বহুমুখী স্বাস্থ্যগত সংকটে পড়ছি। প্যাকেটজাত খাদ্যের গায়ে উপাদানের সঠিক তথ্য লেখা থাকার কথা থাকলেও অনেক প্রতিষ্ঠান তা মানছে না। নিরাপদ খাদ্য নিশ্চিত করতে না পারলে আমাদের পুরো জাতির উৎপাদনশীলতা ও কর্মক্ষমতা কমে যাবে। ভেজাল খাদ্য গ্রহণের ফলে অকালে মৃত্যুর হারও বাড়ছে।’ ল্যাব পরীক্ষায় ভেজাল প্রমাণিত হওয়ার পরও সরকারি সংস্থাগুলো কেন প্রতিষ্ঠানের নাম প্রকাশ করে না এ প্রসঙ্গে ডা. মুশতাক বলেন, ‘কোম্পানির নাম না বলার কারণেই মানুষের মধ্যে সচেতনতা বাড়ছে না। এখানে বিদ্যমান আইনে বড় ধরনের সীমাবদ্ধতা রয়েছে। আইন সংশোধন করে নিয়মমাফিক বাজার থেকে নমুনা তুলে পরীক্ষা করতে হবে এবং দোষী প্রমাণিত হলে সেই প্রতিষ্ঠান ও পণ্যের নাম জনসমক্ষে ঘোষণা করতে হবে। কারণ ভেজালকারীরা রাষ্ট্রের এই আইনি দুর্বলতাকেই নিজেদের ঢাল হিসেবে ব্যবহার করছে।’


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









