ডেঙ্গু ও হাম-দুই রোগেই প্রতিদিন প্রাণ হারাচ্ছেন একাধিক মানুষ। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের নিয়মিত প্রতিবেদনে উঠে আসছে নতুন সংক্রমণ ও মৃত্যুর হিসাব। বাড়ছে মৃত্যুর তালিকা। কিন্তু প্রতিটি সংখ্যার পেছনে রয়েছে একটি জীবন, একটি পরিবার এবং অপূরণীয় ক্ষতি। জনস্বাস্থ্যের জন্য উদ্বেগজনক এই পরিস্থিতিতে প্রতিদিনের মৃত্যুর খবর যেন ধীরে ধীরে মানুষের কাছে স্বাভাবিক হয়ে উঠছে। অথচ ডেঙ্গু ও হামে প্রতিটি মৃত্যুই প্রতিরোধযোগ্য করার চেষ্টা জরুরি। ডেঙ্গু পরিস্থিতি উদ্বেগজনক মাত্রায় পৌঁছেছে বলে মনে করছেন স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা। তাদের মতে, দেরিতে হাসপাতালে ভর্তি হওয়াই মৃত্যুহার বেশি হওয়ার প্রধান কারণ। অনেক রোগী শুরুতে পরীক্ষা ও চিকিৎসা নিতে অবহেলা করায় পরিস্থিতি গুরুতর হয়ে পড়ছে।
শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের সহযোগী অধ্যাপক এইচ এম নাজমুল আহসান বলেন, বেশির ভাগ রোগী যখন হাসপাতালে আসেন, তখন তারা মারাত্মক সংকটাপন্ন অবস্থায় থাকেন। এমন অবস্থায় অনেক সময় তাদের বাঁচানো সম্ভব হয় না। তিনি ব্যাখ্যা করেন, সাধারণত হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার পরপরই অধিকাংশ রোগীর মৃত্যু হয়।
হাসপাতালে অবস্থানকালে অবনতি ঘটে এমন রোগীর সংখ্যা তুলনামূলকভাবে কম। অনেক ক্ষেত্রে অতিরিক্ত রক্তক্ষরণ, একাধিক অঙ্গ বিকল হয়ে পড়ার মতো জটিলতা দেখা যায়। গর্ভাবস্থা বা ডায়াবেটিস, কিডনি কিংবা হৃদরোগের মতো দীর্ঘমেয়াদি সমস্যাও মৃত্যুঝুঁকি বাড়ায়।
নাজমুল আহসান বলেন, রোগীরা অনেক সময় খুব দেরিতে হাসপাতালে আসেন, আবার অনেককে ঢাকার বাইরে থেকে দেরিতে রেফার করা হয় বলেও মৃত্যুহার বাড়ছে। তিনি বলেন, অনেকে অবস্থা সংকটাপন্ন না হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করেন, আবার অনেককে বরিশাল, পিরোজপুর বা বরগুনার মতো জেলা থেকে রেফার করা হয়। প্রথম কয়েক ঘণ্টার মধ্যে সঠিকভাবে তরল পদার্থ না দেওয়া হলে প্রায়শই তাদের অবস্থার অবনতি হয়।
তিনি বলেন, অনেক রোগী প্রি-শক অবস্থায় যাত্রা শুরু করেন এবং ঢাকায় পৌঁছানোর সময় পুরোপুরি শকে চলে যান। ততক্ষণে অনেকটা দেরি হয়ে যায়। নাজমুল আহসান বলেন, এ কারণেই ঢাকার দক্ষিণ অংশে মৃত্যুর সংখ্যা সবচেয়ে বেশি— কারণ এখানেই অন্য জেলা থেকে সংকটাপন্ন রোগীদের রেফার করা হয়। তিনি আরও উল্লেখ করেন, ঢাকার বাইরে অনেক চিকিৎসক ডেঙ্গু ব্যবস্থাপনায় যথাযথ প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত নন। ফলে ফ্লুইড ম্যানেজম্যান্টে ভুল হয়, যা অনেক সময় প্রতিরোধযোগ্য মৃত্যুর কারণ হয়ে দাঁড়ায়। সীমিত সুযোগ-সুবিধাসম্পন্ন ছোট হাসপাতালগুলো এই সমস্যা আরও বাড়িয়ে দেয়।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ মোশতাক হোসেন বলেন, ডেঙ্গুতে মৃত্যুহার কমাতে হলে আগেভাগে শনাক্তকরণ ও স্বাস্থ্যসেবা বিকেন্দ্রীকরণ অত্যন্ত জরুরি। তিনি বলেন, যদি মানুষ স্বল্প খরচে নিজের এলাকার কাছেই ডেঙ্গু পরীক্ষা করতে পারতেন, তাহলে রোগটি শুরুতেই শনাক্ত করা সম্ভব হতো। তিনি আরও বলেন, এখন রোগীদের বড় হাসপাতালে যেতে হয় এবং ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করতে হয়। এর মধ্যেই অনেকের জ্বর কমে যায়। কিন্তু ডেঙ্গুতে সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ সময়টি শুরু হয় জ্বর কমার পর। তিনি হাসপাতালের চাপ কমাতে এবং সময়মতো রোগ নির্ণয় নিশ্চিত করতে কোভিড-১৯ পরীক্ষার মতো কমিউনিটি ক্লিনিকগুলিতে ডেঙ্গু পরীক্ষা করার পরামর্শ দেন। এই বিশেষজ্ঞ সতর্ক করেন, 'বিকেন্দ্রীকরণ না হলে মৃত্যুহার বেশিই থেকে যাবে।
হামের প্রাদুর্ভাবে শিশুমৃত্যু বেড়ে ১২৪৯
দেশজুড়ে হামের উপসর্গ নিয়ে আরও সাত শিশুর মৃত্যু হয়েছে। এতে গত ১৫ মার্চ থেকে হামের প্রাদুর্ভাবে মারা যাওয়া শিশুর সংখ্যা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ২৪৯ জনে। গতকাল বৃহস্পতিবার এক বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানিয়েছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। এতে বলা হয়েছে, গত বুধবার সকাল ৮টা থেকে বৃহস্পতিবার সকাল ৮টা পর্যন্ত হামের উপসর্গ নিয়ে সাত শিশুর মৃত্যু হয়েছে। তাদের মধ্যে ঢাকা বিভাগে চার শিশু এবং চট্টগ্রাম, বরিশাল ও খুলনা বিভাগে একজন করে শিশু মারা গেছে। এই সময়ে নিশ্চিতভাবে হামে আক্রান্ত হয়ে আরও এক শিশুর মৃত্যু হয়।
এছাড়া, গত ২৪ ঘণ্টায় মোট ৬৪ শিশুর শরীরে নিশ্চিত হাম শনাক্ত হয়েছে। এই সময়ে আরও এক হাজার ২৫১ শিশুর শরীরে হামের উপসর্গ দেখা দেওয়ার তথ্য পাওয়া গেছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, গত ১৫ মার্চ থেকে গতকাল বৃহস্পতিবার পর্যন্ত মোট ২ লাখ ৫০ হাজার ৫২ শিশু হাম ও হামের উপসর্গে আক্রান্ত হয়েছে। তাদের মধ্যে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ২ লাখ ১ হাজার ৪৬৮ শিশু। এসব শিশুর মধ্যে নিশ্চিত হামে ১০৫ জন এবং হামের উপসর্গ নিয়ে আরও ১ হাজার ১৪৪ জনের মৃত্যু হয়েছে। একই সময়ে মোট ১ লাখ ৯৩ হাজার ৩০১ শিশু সুস্থ হয়ে হাসপাতাল থেকে বাড়ি ফিরেছেন।
ডেঙ্গুতে ১০ মাসে ৪১৫ জনের মৃত্যু
দেশে গত ২৪ ঘণ্টায় ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হয়ে আরও ৬ জনের মৃত্যু হয়েছে। একই সময়ে আক্রান্ত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন ১ হাজার ৮৮৬ জন। বৃহস্পতিবার) স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের ডেঙ্গুবিষয়ক নিয়মিত বুলেটিনে এ তথ্য জানানো হয়। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, এ নিয়ে চলতি বছর ডেঙ্গুতে মোট ৪১৫ জনের মৃত্যু হয়েছে। এর মধ্যে অক্টোবরেই মারা গেছে ১৭০ জন । এছাড়া সেপ্টেম্বরে সর্বচ্চ ১৪৮ জন, আগস্টে ৪৩, জুলাইয়ে ৩৬, জুনে ১৩ , মে মাসে একজন এবং জানুয়ারি ও ফেব্রুয়ারিতে দুজন করে ডেঙ্গু রোগীর মৃত্যু হয়েছে।
বুলেটিনে বলা হয়, বুধবার সকাল ৮টা থেকে পরবর্তী ২৪ ঘণ্টায় দেশের বিভিন্ন হাসপাতালে ডেঙ্গু আক্রান্ত হয়ে ১ হাজার ৮৮৬ জন ভর্তি হয়েছেন। এ নিয়ে চলতি বছর হাসপাতালে ভর্তি রোগীর সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ৩২ হাজার ১০৫ জনে এবং সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছে ১ লাখ ২৫ হাজার ৪৩৯ জন। গত ২৪ ঘণ্টায় সবচেয়ে বেশি রোগী ভর্তি হয়েছেন ঢাকা বিভাগে ৭৫৫ জন। এছাড়া চট্টগ্রামে ২৭২ জন, খুলনায় ২৬৪ জন, বরিশালে ২২৯ জন, রাজশাহীতে ১৮৮ জন, ময়মনসিংহে ৮৯ জন, রংপুরে ৭৮ জন এবং সিলেট বিভাগে ১১ জন রোগী ভর্তি হয়েছেন।
ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের শুয়ে আছে ১৩ বছরের শিশু জিহাদ হাসান। ডেঙ্গুতে আক্রান্ত হওয়ায় তার রক্তে প্লাটিলেট কমছে। এর সঙ্গে তার তীব্র পেটব্যথা ও বমি হচ্ছে। পাশেই বসেই কাঁদছিলেন মা শিউলি বেগম। অবস্থার উন্নতি না হওয়ায় তিন দিন আগে টঙ্গী থেকে তাকে এই হাসপাতালে নিয়ে আসা হয়েছে। শিউলি বেগমের সঙ্গে গত বুধবার ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে কথা হয় এই প্রতিনিধির। ছেলের অবস্থা সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, তাদের এলাকার ড্রেন ময়লায় ভরা। বাসার আশপাশও নিয়মিত পরিষ্কার করা হয় না। মশার উপদ্রব থেকে বাঁচার উপায় নেই। শেষ পর্যন্ত সেই মশাবাহিত রোগেই সংকটাপন্ন তার সন্তান। জিহাদ হাসানের এই সংকটাপন্ন অবস্থা এখন আর কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা না। ডেঙ্গুর প্রকোপ ছড়িয়ে পড়েছে দেশজুড়ে। তবে আক্রান্তের সংখ্যা কোনো জেলায় খুব বেশি আবার কোনো জেলায় কম।
কেন নিয়ন্ত্রণে আসছে না হাম ও ডেঙ্গু
রোগতত্ত্ব, রোগনিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউটের (আইইডিসিআর) সাবেক প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ও জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ডা. মুশতাক হোসেন বলেন, ডেঙ্গু ও হাম জনস্বাস্থ্যের জরুরি পরিস্থিতি তৈরি করেছে। এ ধরনের পরিস্থিতি মোকাবিলায় প্রচলিত চিকিৎসাব্যবস্থার ওপর নির্ভর করলে চলবে না। জনস্বাস্থ্যের জরুরি অবস্থা মোকাবিলায় আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত কিছু পদ্ধতি রয়েছে, যার প্রয়োগ কোভিড মহামারির সময়ও দেখা গেছে।
মুশতাক হোসেনের মতে, বাংলাদেশে যে সরকারই ক্ষমতায় এসেছে, তারা প্রচলিত রোগের চিকিৎসাব্যবস্থা দিয়েই জনস্বাস্থ্যের সংকট মোকাবিলার চেষ্টা করেছে। কিন্তু এ পদ্ধতি কার্যকর হচ্ছে না। প্রয়োজনীয় দক্ষতা ও সম্পদ থাকা সত্ত্বেও পদ্ধতিগত পরিবর্তন না আনায় সংকট সামাল দেওয়া যাচ্ছে না। এর ফলে মানুষের মৃত্যু হচ্ছে। হাম প্রতিরোধে টিকাদানের গুরুত্ব তুলে ধরে তিনি বলেন, বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে টিকা দিতে হবে। হাম বাতাসের মাধ্যমে ছড়ানো অত্যন্ত বিপজ্জনক রোগ। এ থেকে শিশুদের সুরক্ষিত রাখতে অন্তত ৯৫ শতাংশ শিশুকে টিকার আওতায় আনতে হবে। বিষয়টি জানা থাকলেও সরকার প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নিচ্ছে না বলে অভিযোগ করেন তিনি।
মুশতাক হোসেন বলেন, সম্প্রসারিত টিকাদান কর্মসূচি (ইপিআই) জানে, সফল টিকাদান কার্যক্রম পরিচালনায় কী ধরনের পরিকল্পনা প্রয়োজন। কিন্তু এ কর্মসূচিতে পর্যাপ্ত জনবল ও সম্পদ দেওয়া হচ্ছে না। তিনি বলেন, কতটি আইসিইউ কেনা প্রয়োজন, সে হিসাব মন্ত্রীর কাছে থাকতে পারে। কিন্তু এক লাখ আইসিইউ কেনা হলেও সেগুলো পরিচালনার জন্য এক কোটি দক্ষ স্বাস্থ্যকর্মী প্রয়োজন হবে। তাঁর মতে, শুধু চিকিৎসার সরঞ্জাম বাড়িয়ে জনস্বাস্থ্যের জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলা করা সম্ভব নয়। টিকাদান কার্যক্রম পরিচালনায় স্বীকৃত পদ্ধতি অনুসরণ করা হচ্ছে না বলেও অভিযোগ করেন এই বিশেষজ্ঞ। তাঁর ভাষ্য, টিকাদান কার্যক্রমে দায়সারা পদ্ধতি অনুসরণ করে ভাইরাস মোকাবিলার চেষ্টা সফল হবে না।
টিকা দিতে হলে মাইক্রোপ্ল্যানিং বা বিস্তারিত এলাকাভিত্তিক পরিকল্পনা করতে হবে। এ ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় অর্থ ও সম্পদ বরাদ্দের বিকল্প নেই। তা না হলে প্রতিদিন মানুষের মৃত্যু চলতেই থাকবে। মুশতাক হোসেন আরও বলেন, আন্তর্জাতিক পর্যায়ে বাংলাদেশের টিকাদান কর্মসূচির যে সুনাম ছিল, তা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। আন্তর্জাতিক পর্যায়ের দলগুলো ইতিমধ্যে জানিয়েছে, বাংলাদেশের টিকাদানের সেই সুনাম আর নেই। এ কর্মসূচিতে এখনো অনেক অসম্পূর্ণতা রয়েছে।
শত কোটি টাকা খরচের পরও থামছে না মৃত্যু
মশা নিয়ন্ত্রণে রাজধানীর দুই সিটি করপোরেশনের বরাদ্দের সঙ্গে দেশের অন্যান্য এলাকার বরাদ্দের ব্যবধান অনেক। এই কাজে ২০২৬–২৭ অর্থবছরে ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশন ৩২২ কোটি ৮৫ লাখ টাকা বরাদ্দ রেখেছে। এর মধ্যে উত্তর সিটি ২০৮ কোটি ৮৫ লাখ এবং দক্ষিণ সিটি ১১৪ কোটি টাকা বরাদ্দ পেয়েছে। দক্ষিণ সিটিতে শুধু কীটনাশক কেনার জন্যই বরাদ্দ ৫০ কোটি ৫০ লাখ টাকা। ডেঙ্গুসহ মশাবাহিত রোগ প্রতিরোধে অর্থ বিভাগের মাধ্যমে ছাড়কৃত টাকার চতুর্থ কিস্তি বাবদ দেশের ৩৩০টি পৌরসভার অনুকূলে মাত্র ৩ কোটি ৭৫ লাখ টাকা বরাদ্দের তথ্য পাওয়া গেছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা, ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন গত পাঁচ অর্থবছরে মশা নিয়ন্ত্রণে প্রায় ৬০৫ কোটি টাকা ব্যয় করেছে। খোঁজ নিয়ে জানা যায়, ডেঙ্গু ও মশা নিয়ন্ত্রণে ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনের জন্য বিপুল পরিমাণ অর্থ বরাদ্দ হলেও সেই তুলনায় বাইরের পৌরসভাগুলোর জন্য বরাদ্দ খুব সামান্য। ২০২৫–২৬ অর্থবছরের বার্ষিক উন্নয়ন বাজেটে পৌরসভার মশক নিধনের কার্যক্রম, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা, প্রচার এবং পৌরসভার নিয়ন্ত্রণাধীন স্থাপনাসমূহের সংস্কার, সম্প্রসারণ ও নির্মাণ বাবদ ৪১ কোটি ২৫ লাখ টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে। এর মধ্যে ডেঙ্গুসহ মশাবাহিত রোগ প্রতিরোধে অর্থ বিভাগের মাধ্যমে ছাড়কৃত টাকার ৪র্থ কিস্তি বাবদ দেশের ৩৩০টি পৌরসভার অনুকূলে মাত্র ৩ কোটি ৭৫ লাখ টাকা বরাদ্দের তথ্য পাওয়া গেছে। কিন্তু এই অর্থ মাঠপর্যায়ে কীভাবে ব্যয় হচ্ছে, কী পরিমাণ কীটনাশক কেনা হচ্ছে, কোথায় মশার প্রজননস্থল ধ্বংস করা হচ্ছে – এসব প্রশ্নের কোনো উত্তর খুঁজে পাওয়া যায় না।
মশা নিয়ন্ত্রণে কীটনাশক ছিটানো, পরিচ্ছন্নতা অভিযান ও প্রজননস্থল ধ্বংসের কর্মসূচি নেওয়া হয়। কিন্তু এসব উদ্যোগে মশার ঘনত্ব কতটা কমছে, কীটনাশক কার্যকর কি না এবং সংক্রমণের ঝুঁকি কতটা হ্রাস পাচ্ছে তার নিয়মিত মূল্যায়ন নেই। ২০২৬–২৭ অর্থবছরে ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশন ৩২২ কোটি ৮৫ লাখ টাকা বরাদ্দ রেখেছে। এর মধ্যে উত্তর সিটি ২০৮ কোটি ৮৫ লাখ এবং দক্ষিণ সিটি ১১৪ কোটি টাকা বরাদ্দ পেয়েছে। এ বিষয়ে জানতে চাইলে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের জনসংযোগ কর্মকর্তা মো. রাসেল রহমান বলেন, আমাদের বরাদ্দের অর্থ যথাযথ ব্যয় হচ্ছে। ফলে এখানে রোগীর সংখ্যা কম। ঢাকার ডেঙ্গু রোগীর একটি অংশ মূলত ঢাকার বাইরে থেকে আসেন। সেটিকে ঢাকার হিসেবে গণ্য করা ঠিক হবে না। তিনি বলেন, আমরা নিয়মিত পরিষ্কার-পরিছন্নতার কাজ করি। এক্ষেত্রে নাগরিকদেও সচেতন হতে হবে। তাছাড়া নিয়ম করেই মশার ওষুধ ছিটানো হয়।
জরুরি পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে সমন্বিত উদ্যোগের তাগিদ
সরকারের উদ্যোগের পরও পরিস্থিতির উন্নতি না হলে কী করা উচিত, জানতে চাইলে মুশতাক হোসেন বলেন, সরকারি উদ্যোগে পরিস্থিতির উন্নতি সম্ভব নয়-বিষয়টি এমন নয়। তবে জনস্বাস্থ্যের জরুরি পরিস্থিতি হিসেবে বিষয়টি বিবেচনা করে পদক্ষেপ নিতে হবে। এ জন্য প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বে আন্তমন্ত্রণালয় টাস্কফোর্স গঠনের পরামর্শ দেন তিনি। তাঁর মতে, এই টাস্কফোর্স প্রতিদিন পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করবে এবং টিকাদান কার্যক্রম যথাযথভাবে হচ্ছে কি না, তা তদারকি করবে। ইপিআইয়ের মতো কোন কোন শিশুকে টিকা দেওয়া হয়েছে, তার তালিকাও তৈরি করতে হবে। হামে আক্রান্ত দরিদ্র পরিবারের শিশুদের হাসপাতালে ভর্তির ব্যবস্থা করার ওপরও গুরুত্ব দেন এই জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ। তবে সব রোগীকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়ার প্রয়োজন নেই বলে মনে করেন তিনি।
তাঁর মতে, মাঝারি মানের হাসপাতালেও এসব শিশুর চিকিৎসা দেওয়া সম্ভব। সেখানে পর্যবেক্ষণে রাখলে প্রায় ৯০ শতাংশ রোগী সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরতে পারবেন। আর যাঁদের আইসিইউ প্রয়োজন, তাঁদেরও যথাযথ চিকিৎসার ব্যবস্থা করা যাবে। এভাবে রোগীর অবস্থা অনুযায়ী স্তরভিত্তিক চিকিৎসাব্যবস্থা গড়ে তোলার পরামর্শ দেন তিনি। ডেঙ্গু মোকাবিলায়ও পরিকল্পিত ও এলাকাভিত্তিক উদ্যোগ নেওয়ার কথা বলেন মুশতাক হোসেন। তাঁর পরামর্শ, যেসব এলাকায় ডেঙ্গুর প্রকোপ বেশি, সেখানে পরীক্ষা বাড়াতে হবে।
পরীক্ষায় ডেঙ্গু শনাক্ত হওয়া রোগীদের ১০ দিন বাড়িতে বিশ্রামে রাখার ব্যবস্থা করতে হবে। যাঁদের বাড়িতে থাকার পর্যাপ্ত জায়গা নেই, তাঁদের জন্য কমিউনিটি সেন্টারে অস্থায়ী ক্যাম্প করা যেতে পারে। মুশতাক হোসেনের মতে, এভাবে পরিকল্পিতভাবে চিকিৎসার ব্যবস্থা করা গেলে মৃত্যুর সংখ্যা কমানো সম্ভব হবে। একই সঙ্গে আইসিইউতে রোগীর চাপও কমবে। ডেঙ্গু ও হাম মোকাবিলায় সমন্বিত পরিকল্পনা এবং স্তরভিত্তিক চিকিৎসাব্যবস্থা গড়ে তোলার ওপর জোর দেন তিনি।
জাতীয় প্রতিষ্ঠান গঠন ও ঝুঁকিভিত্তিক বাজেটের প্রস্তাব
ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে দেশে একটি শক্তিশালী জাতীয় প্রতিষ্ঠান বা কেন্দ্রীয় সমন্বয়ব্যবস্থা থাকা প্রয়োজন বলে মনে করেন জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা। এবিষয়ে কীটতত্ত্ববিদ অধ্যাপক ড. কবিরুল বাশার বলেন, বর্তমানে বিভিন্ন সিটি করপোরেশন ও পৌরসভা নিজ নিজ উদ্যোগে মশা নিয়ন্ত্রণের কাজ করে। কিন্তু সব এলাকায় সমানভাবে অর্থ, জনবল ও কারিগরি সক্ষমতা নেই। একটি জাতীয় প্রতিষ্ঠান থাকলে দেশের সব অঞ্চলের ডেঙ্গু পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ, প্রয়োজন অনুযায়ী বাজেট বণ্টন এবং মশা নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রমের সমন্বয় করা সম্ভব হবে।
আগামীতে ঢাকার বাইরে রোগী আরও বাড়বে জানিয়ে তিনি বলেন, ঢাকায় ২০০০ সাল থেকে ডেঙ্গুর সংক্রমণ শনাক্ত হয়ে আসছে। দীর্ঘদিন ধরে সংক্রমণ চলায় ঢাকার অনেক মানুষ এক বা একাধিকবার আক্রান্ত হয়েছেন, ফলে পুনরায় আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি সাধারণত কমে। অন্যদিকে, যেসব এলাকায় ডেঙ্গুর বিস্তার তুলনামূলক নতুন, সেখানে আগে আক্রান্ত না হওয়া মানুষের সংখ্যা বেশি থাকতে পারে। ফলে নতুন করে সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ার সুযোগও বেশি হতে পারে।
তিনি আরও বলেন, শুধু জনসংখ্যা বা আগের বছরের বরাদ্দের ভিত্তিতে নয়, বরং ডেঙ্গু সংক্রমণের হার, মৃত্যুর ঝুঁকি, মশার ঘনত্ব এবং স্থানীয় প্রতিষ্ঠানের সক্ষমতা বিবেচনায় বাজেট বণ্টন করতে হবে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ন বিষয় ডেঙ্গু নিয়ন্ত্রণে একটি জাতীয় সমন্বয়কারী প্রতিষ্ঠান গঠন করতে হবে, যা স্বাস্থ্য অধিদপ্তর, স্থানীয় সরকারের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ও সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোর কার্যক্রম সমন্বয় করবে।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









