বিমানবাহিনীর অবসরপ্রাপ্ত ফ্লাইট লেফটেন্যান্ট কেএম তাহসিফ সাউরির মৃত্যুর রহস্য উদ্ঘাটনে তার ‘বন্ধুস্থানীয় ছোট ভাই’ আহমেদ শাহরিয়ার রেজা দীপের রিমান্ডে দেওয়া বক্তব্যের অসঙ্গতি খতিয়ে দেখছে পুলিশ। একই ঘটনায় গ্রেফতার তাহসিফের কথিত বান্ধবী জেরিকা তাসনীম দিশাকেও চার দিনের রিমান্ডে নেওয়া হয়েছে।
তদন্তকারীরা আশা করছেন, দীপের বক্তব্যের সঙ্গে দিশার দেওয়া তথ্য মিলিয়ে দেখলে বা মুখোমুখি জিজ্ঞাসাবাদে ঘটনার গুরুত্বপূর্ণ সূত্র পাওয়া যেতে পারে। তবে এখনো স্পষ্ট হয়নি, মধ্যরাতে টঙ্গীর মাজার বস্তি এলাকায় তাহসিফ ও দীপ কেন গিয়েছিলেন, সেখানে কারা তাদের ধাওয়া করেছিল এবং কী পরিস্থিতিতে তাহসিফ তুরাগ নদে ঝাঁপ দেন। মাদক কারবারিদের ধাওয়া, নাকি পুলিশের অভিযানের মুখে পড়ে তারা সেখানে বিপাকে পড়েছিলেন—এমন প্রশ্নেরও উত্তর মেলেনি।
নিখোঁজের একদিন পর গত বুধবার বিকেলে টঙ্গীতে তুরাগ নদের রাজাবাড়ী ঘাট এলাকা থেকে তাহসিফের মরদেহ উদ্ধার করা হয়। মঙ্গলবার সন্ধ্যা থেকে তিনি নিখোঁজ ছিলেন। নিখোঁজ হওয়ার কিছুক্ষণ আগে ধারণ করা সিসিটিভি ফুটেজে তাহসিফ সাউরিকে এক যুবকের সঙ্গে মোটরসাইকেলে বেরিয়ে যেতে দেখা যায়।
ওই যুবক তাহসিফের ‘জুনিয়র বন্ধু’ দীপ বলে পরিবারের সদস্যরা শনাক্ত জানান, দীপের ডাকেই বাসা থেকে বের হয়ে নিখোঁজ হন তাহসিফ। বৃহস্পতিবার রাতে মোহাম্মদপুরের বাবর রোডের বাসা থেকে দীপকে হেফাজতে নেয় পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)। শুক্রবার গভীর রাতে তাহসিফের বাবা কে এম এনায়েতুল করিম উত্তরখান থানায় অজ্ঞাত আসামিদের বিরুদ্ধে হত্যা মামলা করেন। সেদিন দীপকে নিয়ে ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী।
একপর্যায়ে নম্বরপ্লেটবিহীন মোটরসাইকেল জব্দ করে পিবিআই। এর পর দীপকে গ্রেফতার দেখানো হয়। শনিবার আদালতের মাধ্যমে চারদিনের রিমান্ডে নিয়ে তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করছে পুলিশ।
অন্যদিকে ঘটনার দিন নিহত তাহসিফের সঙ্গে থাকা তরুণী জেরিকা তাসনিম দিশাকে শনিবার দিবাগত রাত দুইটার দিকে ঢাকার কাফরুলের নিজ বাসা থেকে গ্রেফতারের পর রবিবার আদালতের মাধ্যমে চার দিনের রিমান্ডে নেওয়া হয়েছে।
পিবিআই সূত্র জানায়, ঘটনার রাতে অন্য একটি সিসিটিভি ফুটেজে ঘটনার দিন রাত ১০টা ১৭ মিনিটে উত্তরার একটি রেস্টুরেন্টে প্রবেশ করতে দেখা যায় তাহসিফ, দীপ ও তরুণী দিশা। প্রথমে একটি মোটরসাইকেলে সেখানে যান তাহসিফ ও দিশা। কিছুক্ষণ পর আরেকটি মোটরসাইকেলে করে পৌঁছান দীপ। পরে তিনজনকে একসঙ্গে রেস্টুরেন্টে প্রবেশ করতে দেখা যায় ক্যামেরায়।
রেস্টুরেন্টের আরেকটি সিসি ক্যামেরার ফুটেজে দেখা যায়, তাহসিফ ও দিশা লিফটের সামনে অপেক্ষা করছেন। কিছুক্ষণ পর হেলমেট পরা অবস্থায় সেখানে পৌঁছান দীপ। এরপর তিনজন একসঙ্গে লিফটে ওঠেন। প্রায় দেড় ঘণ্টা পর রাত ১১টা ৫১ মিনিটে রেস্টুরেন্ট থেকে বের হতে দেখা যায়। পরে মোটরসাইকেলে করে সেখান থেকে চলে যান তারা। রেস্টুরেন্ট থেকে তারা তিনজন কোথায় গেলেন- সেই তথ্যও এখন হন্যে হয়ে খুঁজছে তদন্তকারী দল।
মামলাটির তদন্তকারী কর্মকর্তা টঙ্গী নৌ-পুলিশ ফাঁড়ির পুলিশ পরিদর্শক ফিরোজ উদ্দিন বলেন, রিমান্ডে জিজ্ঞাসাবাদে দীপ একেক সময় একেক ধরনের বক্তব্য দিচ্ছেন। তার কথায় অনেক অসঙ্গতি পাওয়া যাচ্ছে। এসব তথ্য যাচাই করতেই দিশাকে রিমান্ডে নেওয়া হয়েছে। তদন্তসংশ্লিষ্ট অন্য একজন কর্মকর্তা জানান, প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে, বার থেকে বেরিয়ে আরও ‘রসদ’ সংগ্রহের জন্য তাহসিফ ও দীপ মাজার বস্তি এলাকায় গিয়েছিলেন। এলাকাটি মাদকের অন্যতম বড় স্পট হিসেবে পরিচিত। দীপের মাদক সেবনের লক্ষণও পাওয়া গেছে বলে জানান ওই কর্মকর্তা। তবে তাঁদের সেখানে যাওয়ার প্রকৃত উদ্দেশ্য এখনো নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
নৌপুলিশ ঢাকা অঞ্চলের পুলিশ সুপার আব্দুল্লাহ আল মামুন যুগান্তরকে বলেন, দিশার সঙ্গে তাহসিফের দীর্ঘদিনের পরিচয় ছিল। তাহসিফের মোবাইল ফোনে দিশার সঙ্গে একাধিকবার কথোপকথনের তথ্য পাওয়া গেছে। প্রকৃত ঘটনা উদ্ঘাটনে তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করা জরুরি।
তাহসিফ ও দীপ কেন মাজার বস্তি এলাকায় গিয়েছিলেন এবং কারা তাদের ধাওয়া দিয়েছিল—এমন প্রশ্নে পুলিশ সুপার বলেন, জিজ্ঞাসাবাদে একেক সময় একেক ধরনের বক্তব্য পাওয়া যাচ্ছে। এ কারণে এখনো সঠিক তথ্যে পৌঁছানো সম্ভব হয়নি। বার থেকে বেরিয়ে তাদের আরও কিছু প্রত্যাশা ছিল বলেও দীপ জানিয়েছেন। তবে সত্যিই কেউ তাদের ধাওয়া দিয়েছিল কি না, দিয়ে থাকলে তারা কারা- তাও তদন্ত করে দেখা হচ্ছে।
পিবিআই রবিবার আদালতে দেওয়া রিমান্ডের আবেদনে জানিয়েছে, মামলার তদন্তে তথ্যপ্রযুক্তি ও সিসিটিভি ফুটেজ বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, ঘটনার রাতে নিহত তাহসিফের সঙ্গে উত্তরার ‘নেস্ট বার অ্যান্ড রেস্টুরেন্টে’ যান জেরিকা তাসনিম দিশা। ঘটনার আগে তারা একাধিকবার ‘সিপি ফাইভ স্টার স্ন্যাকস’-এও গিয়েছিলেন। একটি মোটরসাইকেল গ্যারেজে এই মামলার অন্য রিমান্ডপ্রাপ্ত আসামি আহমেদ শাহরিয়ার রেজা দীপের সঙ্গেও দিশাকে একসঙ্গে অবস্থান করতে দেখা গেছে। এতে আরও বলা হয়, এছাড়া ভিকটিম তাহসিফের সঙ্গে দিশা রেস্টুরেন্টে অবস্থানসহ মোটরসাইকেলে বিভিন্ন স্থানে ঘোরাঘুরি করেছিলেন।
নিহত তাহসিফের মোবাইল কললিস্ট (সিডিআর) পর্যালোচনায় দেখা যায়, ঘটনার আগে দিশার সঙ্গে তার একাধিকবার ফোনালাপের প্রমাণ রয়েছে। তদন্তকারী কর্মকর্তা আবেদনে উল্লেখ করেন, প্রাথমিকভাবে তাহসিফ হত্যাকায় দিশারও জড়িত থাকার তথ্যপ্রমাণ পাওয়া গেছে। হত্যার মূল রহস্য উদঘাটন, অন্য অজ্ঞাত আসামিদের শনাক্ত ও গ্রেপ্তার, হত্যার স্থান নির্ধারণ, আলামত উদ্ধার এবং অন্য আসামি দীপের দেওয়া তথ্যের সঙ্গে দিশার বক্তব্য ক্রস-চেক (মুখোমুখি যাচাই) করতে আসামিকে নিবিড়ভাবে জিজ্ঞাসাবাদ করা একান্ত প্রয়োজন।
এদিকে আদালতে রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী শামসুদ্দোহা সুমন বলেন, আগে রিমান্ডে থাকা দীপের বক্তব্যের সঙ্গে দিশার দেওয়া তথ্য মিলিয়ে দেখা প্রয়োজন। মামলার সুষ্ঠু তদন্তের স্বার্থে তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করা জরুরি।
অন্যদিকে দিশার আইনজীবী ইমাম হোসেন জাবেদ দাবি করেছিলেন, ঘটনার সঙ্গে দিশার কোনো সম্পৃক্ততা নেই। সিসিটিভি ফুটেজের ভিত্তিতে তাকে গ্রেফতার করা হয়েছে। রাত ১২টার দিকে তাহসিফ তাকে গাড়িতে করে বাসায় পৌঁছে দেন। এরপর তাদের মধ্যে আর যোগাযোগ হয়নি।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









