পোশাকশ্রমিকদের বেতন নূন্যতম ৩০ হাজার টাকা করার দাবিতে আন্দোলনের আড়ালে নাশকতার পরিকল্পনা ছিল বলে মনে করছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। এ আন্দোলনে নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীদের পাশাপাশি ভাড়াটে লোকজনও অংশ নিয়েছিলেন। তাদের একটি বড় অংশ ছিলেন মিরপুরের বিভিন্ন এলাকা থেকে উচ্ছেদ হওয়া হকার। ঘণ্টা হিসেবে তাদের ভাড়া করে আনা হয়েছিল।
ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি) ও পুলিশের অনুসন্ধানে আন্দোলনে হকারদের সম্পৃক্ততার তথ্য পাওয়া গেছে। তবে বিষয়টি প্রকাশ্যে আনতে চাইছেন না গোয়েন্দা কর্মকর্তারা। এ ঘটনায় এখন পর্যন্ত ৪৫ জনকে গ্রেফতারের তথ্য জানিয়েছে পুলিশ। তাদের মধ্যে ১১ জনের রাজনৈতিক পরিচয় পাওয়া গেছে। তারা নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের কর্মী বলে জানিয়েছে পুলিশ। শ্রমিকের ছদ্মবেশে তারা আন্দোলনে অংশ নিয়েছিলেন বলে গোয়েন্দা সূত্রের দাবি।
গ্রেফতার ব্যক্তিদের জিজ্ঞাসাবাদে আন্দোলনের নেপথ্যে অর্থায়ন, লোকজন সংগ্রহ ও হামলার পরিকল্পনা নিয়ে বিভিন্ন তথ্য পাওয়া যাচ্ছে। গোয়েন্দা কর্মকর্তারা বলছেন, আন্দোলনের আড়ালে কারা অর্থায়ন করেছেন, কারা লোকজন সংগঠিত করেছেন এবং কারা সরাসরি হামলা ও ভাঙচুরে অংশ নিয়েছেন, তা খতিয়ে দেখা হচ্ছে। এ বিষয়ে ডিবির প্রধান ও ঢাকা মহানগর পুলিশের অতিরিক্ত কমিশনার শফিকুল ইসলাম বলেন, এ আন্দোলনে হকাররা অবশ্যই জড়িত ছিলেন। তবে তাদের কারা আন্দোলনে এনেছিলেন, তা খুঁজে বের করার চেষ্টা চলছে।
গত রোববার সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত মিরপুরে পোশাকশ্রমিকদের সঙ্গে পুলিশের দফায় দফায় সংঘর্ষ হয়। এ সময় পুলিশের একটি গাড়িতে আগুন দেওয়ার ঘটনাও ঘটে। পরে গোয়েন্দারা বিষয়টিকে নিছক শ্রমিক আন্দোলন হিসেবে না দেখে নাশকতার উদ্দেশ্যে পরিকল্পিত হামলা কি না, তা খতিয়ে দেখতে শুরু করেন। পুলিশের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের সাবেক সংসদ সদস্য ইলিয়াস মোল্লা ও তার ভাগনে, সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ব্যক্তিগত সহকারী (পিএস) জাহাঙ্গীর ও তার লোকজন এ ঘটনায় নেপথ্যে জড়িত ছিলেন। অর্থ সহায়তা দিয়ে তারা লোকজনকে মাঠে নামিয়েছিলেন বলে অভিযোগ রয়েছে। এই আন্দোলনের নেপথ্যে ছিলেন দুই শতাধিক ব্যক্তি। তাঁদের বেশির ভাগই ঢাকা ও ঢাকার বাইরে অবস্থান করে আন্দোলনে উসকানি দিয়েছেন। এ জন্য বিভিন্ন জেলা থেকে দলভিত্তিক দায়িত্ব দিয়ে লোকজন ঢাকায় আনা হয়েছিল। তাঁদের অধিকাংশই রাজনৈতিক কর্মী।
গোয়েন্দা সূত্রে জানা গেছে, আন্দোলনে পোশাকশ্রমিকদের পাশাপাশি হকাররাও অংশ নিয়েছিলেন। তাদের অনেককে ভাড়া করে আনা হয়েছিল। হকারদের সম্পৃক্ততার তথ্য পাওয়ার পর তাদের শনাক্ত করতে কাজ শুরু করেছে ডিবি ও পুলিশ। একই সঙ্গে এলাকায় ভাড়া থাকা পোশাকশ্রমিকদের নাম, ঠিকানা ও মুঠোফোন নম্বর সংগ্রহ করা হচ্ছে। ডিবির একটি সূত্র জানায়, ভাসমান দোকানিদের কাছ থেকে হকারদের নামের তালিকা সংগ্রহ করা হচ্ছে। সিসিটিভি ক্যামেরার ফুটেজ বিশ্লেষণ করে তাদের শনাক্ত করার পাশাপাশি তাঁরা কোথায় থাকেন, তা জানার চেষ্টা চলছে।
ডিবি সূত্র জানায়, আন্দোলনে অংশ নিতে নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের কর্মীদের বিভিন্ন জেলা থেকে আনা হয়েছিল। তারা রাতে বিভিন্ন বাসাবাড়িতে অবস্থান করতেন। সকালে নেমে পড়তেন মাঠে। অন্যদিকে স্থানীয় হকারদেরও সক্রিয়ভাবে আন্দোলনে যুক্ত করা হয়েছিল। ঘণ্টা হিসেবে তাদের ভাড়া করা হয়। বিভিন্ন দলে ভাগ হয়ে তারা মিরপুরের বিভিন্ন এলাকায় হামলা ও ভাঙচুরে অংশ নেন।
গোয়েন্দা কর্মকর্তারা জানতে পেরেছেন, এসব ব্যক্তিকে এক হাজার থেকে পাঁচ হাজার টাকা পর্যন্ত দেওয়া হয়েছিল। তাদের শর্ত দেওয়া হয়েছিল, আন্দোলনে অংশ নেওয়ার পাশাপাশি হামলার ছবি তুলে নির্দিষ্ট গ্রুপে পাঠাতে হবে। আন্দোলন পরিচালনা ও লোকজনের সঙ্গে যোগাযোগের জন্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম টেলিগ্রাম ও হোয়াটসঅ্যাপে একাধিক গ্রুপ খোলা হয়েছিল। এসব গ্রুপে ছবি পাঠালেই বিকাশের মাধ্যমে টাকা দেওয়া হতো বলে ডিবির সূত্র জানিয়েছে।
ডিবির একটি সূত্র জানায়, হকারদের সংশ্লিষ্টতার তথ্য তারা পেয়েছেন। তবে বিষয়টি সামনে আনছেন না। কারণ, এ তথ্য প্রকাশিত হলে অন্য হকাররাও আন্দোলনে যোগ দিতে পারেন। সম্প্রতি মিরপুরে ফুটপাত থেকে হকার উচ্ছেদ করা হয়েছিল। এতে ক্ষুব্ধ ছিলেন হকাররা। তাদের এই ক্ষোভকে কাজে লাগানো হয়েছে।
ওই সূত্রটি আরও বলেন, আওয়ামী লীগপন্থী হকারদের একটি অংশ তাদের সংগঠিত করেছিল। এই হকারদের অনেকে দীর্ঘদিন ধরে ফুটপাতে দোকান বসানোর পাশাপাশি চাঁদাবাজির সঙ্গে জড়িত ছিলেন। উচ্ছেদের পর তারা বেকার হয়ে পড়েন। এই সুযোগ কাজে লাগায় ষড়যন্ত্রকারী চক্র। স্থানীয় আওয়ামী লীগের নেতারাও এতে জড়িত বলে তথ্য পাওয়া গেছে।
সূত্র আরও জানায়, আন্দোলনে নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের কর্মীদের পাশাপাশি উচ্ছেদ হওয়া ক্ষুব্ধ হকাররাও অংশ নিয়েছিলেন। আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মী ও শ্রমিকদের সঙ্গে মিশে তারা একজোট হয়ে হামলা ও ভাঙচুর চালান। সম্প্রতি মিরপুরের ফুটপাত থেকে হকার উচ্ছেদের পর সেখানে নতুন করে কাউকে বসতে দেয়নি সিটি করপোরেশন। এর মধ্যে আবারও ফুটপাতে দোকান বসানোর চেষ্টা করেছিলেন হকাররা। কিন্তু তাতে সফল হননি।
পরে শনিবার শ্রমিক আন্দোলন শুরু হলে আওয়ামী লীগপন্থী হকারদের একটি অংশ এটিকে সুযোগ হিসেবে নেয়। তাদের মাধ্যমে অন্য হকারদেরও একত্র করে দলভিত্তিকভাবে আন্দোলনে অংশ নেওয়ানো হয়।
ডিবির একজন কর্মকর্তা বলেন, হকাররা মূলত ফুটপাতে বসতে না দেওয়ার প্রতিশোধ নিতে আন্দোলনে অংশ নিয়েছিলেন। তারা ভেবেছিলেন, এভাবে সরকারকে চাপে ফেলা যাবে। তবে সেটি সম্ভব হয়নি। এ আন্দোলনে আওয়ামী লীগপন্থী হকারদের একটি অংশ একজোট হয়েছিল। তাদের নামের তালিকা করে খোঁজ নেওয়া হচ্ছে। সব মিলিয়ে কয়েক শ হকারের সম্পৃক্ততার তথ্য পেয়েছে ডিবি। সিসিটিভি ক্যামেরার ফুটেজ দেখে তাদের শনাক্ত করা হচ্ছে।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









