ব্যবসায়ী নাসির উদ্দিন মাহমুদের করা মারধর, ভাঙচুর ও ভয়ভীতি দেখানোর মামলায় আত্মসমর্পণ করে জামিন নিয়ে বের হওয়ার সময় একজন সাংবাদিকের মোবাইল কেড়ে নিয়ে গালিগালাজ করেছেন চিত্রনায়িকা পরীমনি। সঙ্গে আসা তাঁর নিরাপত্তারক্ষীদের ধাক্কায় মাথাও ফেটেছে আদালতে আসা একজন বিচারপ্রার্থীর। সাংবাদিকদের মারধর, মুঠোফোন কেড়ে নেওয়া এবং আদালতে ঢুকতে বাধা দেওয়ার অভিযোগও উঠেছে ওই দেহরক্ষীদের বিরুদ্ধে।
গতকাল বৃহস্পতিবার ঢাকার চিফ জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে এসব ঘটনা ঘটে। আগের দিন আদালত পরীমনির জামিন বাতিল করে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করেছিলেন। সেজন্যই জামিন নিতে আদালতে আসেন পরীমনি। তবে, তাঁকে ঘিরে নানা বিশৃঙ্খল পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়।
প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, আত্মসমর্পণ করে জামিন নিতে সকাল সাড়ে নয়টার দিকে আদালতে পৌঁছান পরীমনি। ঢাকার চিফ জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালত প্রাঙ্গণে গাড়িতেই বসে ছিলেন পরীমনি। তাঁকে ঘিরে রাখেন তাঁর নিজস্ব নিরাপত্তারক্ষীরা। আশপাশ দিয়ে মানুষের চলাচলও কিছুটা নিয়ন্ত্রণ করেন তাঁরা। কালো পোশাক পরিহিত ১১ জন নিরাপত্তারক্ষী এবং সাধারণ পোশাকে আরো কয়েকজনকে পরীমনিকে ঘিরে রাখতে দেখা গেছে।
ফোন কেড়ে নিয়ে ট্রাইপড ভাঙেন পরীমনি, দাবি সাংবাদিকের
এদিকে, পরীমনি আত্মসমর্পণ করবেন জেনে অনেক সাংবাদিক আদালত প্রাঙ্গণে ভিড় জমান। বেলা ১১টা ৪০ মিনিটের দিকে গাড়ি থেকে নেমে এজলাসের উদ্দেশে রওনা হন পরীমনি। তাঁর নিরাপত্তারক্ষীরা তাকে ঘিরে এজলাসে নিয়ে যান। এ সময় সাংবাদিকরা ছবি ও ভিডিও করতে গেলে ধাক্কাধাক্কি করেন তাঁর নিরাপত্তারক্ষীরা।
সাংবাদিকদের অভিযোগ, লিফটে ওঠার সময় ভিডিও করতে গেলে সমকালের মাল্টিমিডিয়া রিপোর্টার রবিউল হোসাইনের মোবাইল কেড়ে নেন পরীমনি। পরে রবিউল হোসাইন টান দিয়ে মোবাইল ফিরিয়ে নেন। পরে লিফটে উঠে প্রথমে ভুল আদালতকক্ষে ঢোকেন পরীমনি। তাঁর আইনজীবীর সহকারী সেখানে গিয়ে অন্য আদালতে শুনানি হওয়ার কথা জানালে তিনি বিরক্তি প্রকাশ করেন। এরপর আরেকটি আদালতকক্ষে গিয়ে সেখানেও শুনানি হবে না জানতে পেরে একতলা নিচে সংশ্লিষ্ট আদালতে যান। বেলা ১১টা ৫৫ মিনিটে ঢাকার সিনিয়র জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালত-১-এর ভারপ্রাপ্ত বিচারক মাহফুজুর রহমানের আদালতে যান পরীমনি। সেখানে পেছনের বেঞ্চে বসেন তিনি।
এ সময় পরীমনির দেহরক্ষীদের বিরুদ্ধে সাংবাদিক ও কয়েকজন আইনজীবীকে আদালতে ঢুকতে বাধা দেওয়া এবং অসদাচরণের অভিযোগ ওঠে। উপস্থিত আইনজীবী ও সাংবাদিকেরা এর প্রতিবাদ জানান। আদালতকক্ষে অতিরিক্ত ভিড় ও হট্টগোলের মধ্যে জামিন আবেদনের শুনানি হয়। আদালতের বেঞ্চে বসে থাকা পরীমনি আসামির কাঠগড়ায় গিয়ে দাঁড়ান। তাঁর আইনজীবী নীলাঞ্জনা রিফাত সুরভী জামিন চেয়ে শুনানি করেন। তিনি আদালতকে জানান, তাঁর মক্কেল আগের দিন অসুস্থ থাকায় হাজির হতে পারেননি। তিনি আত্মসমর্পণ করে জামিন চাইছেন। শুনানি শেষে আদালত ৫০০ টাকা মুচলেকায় তার জামিনের আদেশ দেন।
‘কত বড় সাহস, গায়ে হাত দেয়’
শুনানির পর আদালত ভবনের নিচেও কয়েকজন সাংবাদিককে মারধর ও তাঁদের মুঠোফোন কেড়ে নেওয়ার অভিযোগ ওঠে পরীমনির দেহরক্ষীদের বিরুদ্ধে। পরে সাংবাদিকেরা মুঠোফোন ফেরত পান। গাড়িতে ওঠার আগে সমকালের মাল্টিমিডিয়া রিপোর্টার রবিউল হোসাইনকে দেখে তেড়ে যান পরীমনি। এ সময় সাংবাদিকদের গালিগালাজ করেন তিনি। এ সময় এক ব্যক্তির বিরুদ্ধে গায়ে হাত দেওয়ার অভিযোগ তুলে ক্ষোভ প্রকাশ করেন তিনি। তাঁকে বলতে শোনা যায়, ‘কত বড় সাহস, গায়ের মধ্যে হাত দেয়।’ মোবাইল ফোন হাতে থাকা ওই ব্যক্তি অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, তিনি ভিডিও করছিলেন। পরীমনির নিরাপত্তারক্ষীরা এ সময়ও আরো অনেক সাংবাদিককে ধাক্কা দিয়েছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। বাগ্বিতণ্ডার একপর্যায়ে পরীমনি গাড়িতে উঠে আদালত প্রাঙ্গণ ছাড়েন।
দেহরক্ষীর বিরুদ্ধে বিচারপ্রার্থীর মাথা ফাটানোর অভিযোগ
এদিকে, জামিন নিয়ে আদালত থেকে বের হওয়ার সময়ও পরীমনিকে ঘিরে রাখেন তাঁর নিরাপত্তারক্ষীরা। সাংবাদিকরা ছবি তুলতে ও ভিডিও করতে গেলে ধাক্কাধাক্কি করেন তাঁরা। তাঁদের ধাক্কায় আদালতের বারান্দায় দাঁড়িয়ে থাকা বিচারপ্রার্থী সুজন চন্দ্র মনি দাসের মাথা ফেটে যায়। তাঁর মাথা থেকে রক্তক্ষরণ হতে দেখা যায়।
আহত সুজন চন্দ্র মনি দাসের ভাই বলেন, ‘আমরা আদালতে এসেছিলাম। এখানে দাঁড়িয়ে ছিলাম। নায়িকা পরীমনির নিরাপত্তারক্ষীরা ধাক্কা দিয়ে আমার ভাইয়ের মাথা ফাটিয়ে দিয়েছেন।’ তিনি তার নাম বলতে চাননি। প্রত্যক্ষদর্শীরাও জানান, পারিবারিক জমিসংক্রান্ত মামলায় আসা দুই ভাই আদালতের সামনে দাঁড়িয়ে ছিলেন। এ সময় পরীমনির দেহরক্ষীরা তাঁদের ধাক্কা দেন এবং সুজনের মাথায় আঘাত করেন। এতে তাঁর মাথা থেকে রক্ত বের হতে থাকে।
সুজনের বড় ভাই আরো বলেন, ‘আমরা দাঁড়িয়ে ছিলাম। হঠাৎ পরীমনির দুজন দেহরক্ষী এসে ধাক্কা দেয় আর মাথায় আঘাত করেন।’ ঘটনার পর উপস্থিত কয়েকজন তাঁদের পাশের হাসপাতালে গিয়ে চিকিৎসা নেওয়ার পরামর্শ দেন।
আইনজীবীর ক্ষোভ
পরীমনির আইনজীবী নীলাঞ্জনা রিফাত বলেছেন, তিনি ঘটনাগুলো দেখেননি। তবে এমন কিছু ঘটে থাকলে তা অনাকাঙ্ক্ষিত। আদালত প্রাঙ্গণে পুলিশের নিরাপত্তাব্যবস্থা আরও জোরদার করা উচিত ছিল বলেও মন্তব্য করেন তিনি। অভিযোগগুলোর বিষয়ে তিনি বলেন, ‘আমি এ ধরনের ঘটনা দেখিনি। যদি সাংবাদিকদের সঙ্গে এমন কিছু ঘটে থাকে, তাহলে এটি অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা। আমি সেখানে ছিলাম না, তাই সরেজমিনে কী ঘটেছে, সে সম্পর্কে মন্তব্য করতে পারছি না।’
দীর্ঘদিন আদালতে আসা–যাওয়ার কারণে সাংবাদিকদের সঙ্গে পরীমনির বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক রয়েছে বলে জানান এই আইনজীবী। তাঁর বক্তব্য, এদিন অনেক ভিড় হয়েছিল। সেই ভিড়ের মধ্যে কী ঘটেছে, তা তিনি নিজে দেখেননি। নিরাপত্তাব্যবস্থা নিয়ে প্রশ্ন তুলে নীলাঞ্জনা রিফাত বলেন, ‘পুলিশ যদি ঠিকমতো নিরাপত্তা দিত, তাহলে আপনাদের সঙ্গে এবং আমার আসামির সঙ্গে যে ঘটনা ঘটেছে, তা ঘটত না। পুলিশের আরও বেশি নিরাপত্তা দেওয়া উচিত ছিল।’
যে মামলায় জামিন
২০২২ সালের ৬ জুলাই আদালতে মামলাটি করেন ব্যবসায়ী নাসির উদ্দিন। আদালত অভিযোগের বিষয়ে তদন্ত করে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনকে (পিবিআই) তদন্তের নির্দেশ দেন। ২০২৩ সালের ১৮ মার্চ মামলার তদন্ত কর্মকর্তা পিবিআইয়ের ঢাকা জেলার পরিদর্শক মনির হোসেন আদালতে পরীমনি ও তাঁর কস্টিউম ডিজাইনার জুনায়েদ বোগদাদী জিমির বিরুদ্ধে প্রতিবেদন দেন। তাঁদের বিরুদ্ধে মারধর ও ভয়ভীতি দেখানোর অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেছে বলে প্রতিবেদনে বলা হয়। ওই বছরের ১৮ এপ্রিল আদালত দুই আসামিকে ২৫ জুন হাজির হতে সমন জারি করেন।
ওই দিন আত্মসমর্পণ করে জামিন পান তাঁরা। গত বছরের ২৬ জানুয়ারি পরীমনি ও জুনায়েদ বোগদাদী জিমির বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠনে বিচার শুরু করেন ঢাকার তৎকালীন জ্যেষ্ঠ বিচারিক হাকিম মো. জুনাইদের আদালত। সেদিন পরীমনি আদালতে হাজির না হওয়ায় তার বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করা হয়। তবে পরোয়ানা জারির পরদিনই আত্মসমর্পণ করে জামিন পান পরীমনি। এরপর ২৭ মার্চ এ মামলায় অভিযোগ গঠনের আদেশ চ্যালেঞ্জ করে রিভিশন দায়ের করেন এ চিত্রনায়িকা। গত বছরের ১২ সেপ্টেম্বর ঢাকার নবম অতিরিক্ত জেলা ও দায়রা জজ সাজ্জাদুর রহমান খানের আদালত আবেদনটি খারিজ করে দিয়ে মামলা চলতে কোনো বাধা নেই বলে আদেশ দেন।


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









