ইসরাইলের বিভিন্ন গণপরিবহনে এখনো শোভা পাচ্ছে প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর নির্বাচনী প্রচারের বড় বড় পোস্টার। এসব পোস্টারে তার সঙ্গে রয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। পাশাপাশি রয়েছে আকাশে উড়ন্ত যুদ্ধবিমানের ছবি।
ইরানে যৌথ হামলার মাধ্যমে দুই নেতার সামরিক সহযোগিতার বিষয়টিও তুলে ধরা হয়েছে এসব প্রচারে। তবে দুই দেশের দীর্ঘদিনের মিত্রতার বর্তমান পরিস্থিতি বোঝাতে এসব পোস্টার এখন আর যথেষ্ট নয়।
ইসরাইলে নেতানিয়াহুর নির্বাচনের এক সপ্তাহ পরও সরকার গঠন নিয়ে অনিশ্চয়তা কাটেনি। অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনে ভোটারদের বড় অংশ ট্রাম্পের দলকে প্রত্যাখ্যান করে ডেমোক্র্যাটদের নেতৃত্বাধীন কংগ্রেস বেছে নিয়েছেন। নতুন কংগ্রেস ইরান, গাজা কিংবা অধিকৃত পশ্চিম তীরে ইসরাইলি বসতি স্থাপনকারীদের সহিংসতার মতো বিষয়ে ইসরাইলের ব্যাপারে আরও কঠোর অবস্থান নিতে চায়।
পরপর দুই দেশের নির্বাচনের ফলাফলকে অনেক পর্যবেক্ষক গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনের ইঙ্গিত হিসেবে দেখছেন। তাদের মতে, বিশ্বের সবচেয়ে ক্ষমতাধর দেশ যুক্তরাষ্ট্রের সমর্থন ও কূটনৈতিক সুরক্ষা ইসরাইল আগের মতো নিশ্চিতভাবে পাবে— এমনটা ধরে নেওয়ার সুযোগ কমে এসেছে।
তেল আবিব বিশ্ববিদ্যালয়ের যুক্তরাষ্ট্রবিষয়ক বিশেষজ্ঞ ইয়াইল স্টার্নহেল বলেন, ‘এটি একটি নতুন যুগের সূচনা। গাজা যুদ্ধ এবং ইরানের সঙ্গে যুদ্ধ— এই দুই সংঘাত মূলধারার মার্কিন জনগণের মধ্যে ইসরাইল সম্পর্কে দৃষ্টিভঙ্গি বদলে দিয়েছে। এমনকি যারা ইসরাইল-ফিলিস্তিন সংঘাত নিয়ে বিশেষভাবে আগ্রহী নন, তাদের মনোভাবেও পরিবর্তন এসেছে।’
যুক্তরাষ্ট্রের নির্বাচনে রিপাবলিকানদের খারাপ ফলাফলের কারণ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স ভোটারদের সমর্থন ফিরে পাওয়ার চারটি উপায়ের কথা বলেছেন। এর মধ্যে রয়েছে ইরান যুদ্ধের অবসান এবং ইসরাইলের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের সম্পর্ক পুনর্বিবেচনা।
ট্রাম্পও এ বিষয়ে ভিন্নমত পোষণ করেননি। মঙ্গলবার ভোটগ্রহণ চলার সময় তিনি জানান, নেতানিয়াহুর সঙ্গে তার সমঝোতা হয়েছে যে, চলতি বছরের শেষ নাগাদ ইসরাইলকে দেওয়া যুক্তরাষ্ট্রের বার্ষিক ৩৮০ কোটি ডলারের সামরিক সহায়তা বন্ধ করা হবে। যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক পরিস্থিতির সঙ্গে এ সিদ্ধান্তের সম্পর্কও স্পষ্টভাবে তুলে ধরেন তিনি।
ইসরাইলের সবচেয়ে দীর্ঘ সময় ধরে দায়িত্ব পালন করা প্রধানমন্ত্রী নেতানিয়াহু প্রায় দুই দশক ধরে বিভিন্ন মেয়াদে ক্ষমতায় রয়েছেন। তিনি বরাবরই ট্রাম্পের সমর্থন পাওয়ার চেষ্টা করেছেন। তবে একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ইসরাইলের ক্রমবর্ধমান বিচ্ছিন্নতার বিষয়টিও স্বীকার করেছেন।
নির্বাচনী প্রচারের শেষ দিকে নেতানিয়াহু ইঙ্গিত দিয়েছিলেন, আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞা আরও কঠোর হলে তা এড়াতে ইসরাইল ক্রিপ্টোকারেন্সির আশ্রয় নিতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্রের নির্বাচন কিংবা সামরিক সহায়তা বন্ধের বিষয়ে ট্রাম্পের বক্তব্য নিয়ে এখনো কোনো মন্তব্য করেননি নেতানিয়াহু।
এদিকে, নেতানিয়াহুর ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত সাংবাদিক আমিত সেগাল সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এক পোস্টে বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্রের রাজনৈতিক পরিস্থিতি ইসরাইলের জন্য একটি ‘বিপর্যয়’।
আইজেনকট কি যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে মিত্রতার সম্পর্ক পুনরুদ্ধার করতে পারবেন?
নেতানিয়াহুকে ক্ষমতা থেকে সরাতে নতুন সরকার গঠনের চেষ্টা করছেন বিরোধী নেতা গাদি আইজেনকট। যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক পুনর্গঠনের সক্ষমতা রয়েছে বলে নিজেকে উপস্থাপন করছেন তিনি।
ইংরেজিতে দেওয়া এক বিবৃতিতে সাবেক এই সামরিক প্রধান বলেন, তিনি ‘উদারনৈতিক মূল্যবোধে’ বিশ্বাস করেন এবং ট্রাম্পের সঙ্গে ‘ঘনিষ্ঠ ও গঠনমূলকভাবে’ কাজ করতে চান।
আইজেনকটের জোটের প্রধান বামপন্থী নেতা ইয়াইর গোলানও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে দুই দলের সমর্থনভিত্তিক সম্পর্ক পুনঃপ্রতিষ্ঠার আহ্বান জানিয়েছেন। তার অভিযোগ, নেতানিয়াহু এই দ্বিদলীয় সম্পর্ক নষ্ট করেছেন। তিনি ইসরাইলের এমন একটি ‘ধ্বংসাত্মক বয়ান’ সামনে এনেছেন, যেখানে চিরস্থায়ী যুদ্ধ ও কর্তৃত্ববাদী শাসনকে গুরুত্ব দেওয়া হয়।
নেতানিয়াহু নির্বাচনী প্রচারে সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামাসহ ডেমোক্র্যাট প্রেসিডেন্টদের বিরুদ্ধেও নিজের কঠোর অবস্থানের কথা তুলে ধরেছেন। অথচ ডেমোক্র্যাটদের অনেকের কাছেই ওবামা এখনো জনপ্রিয় ব্যক্তিত্ব।
প্রায় এক দশক আগে ইরান নিয়ে ওবামা প্রশাসনের কূটনৈতিক উদ্যোগের বিরোধিতা করতে গিয়ে নেতানিয়াহু প্রকাশ্যেই রিপাবলিকানদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা বাড়িয়েছিলেন।
ইয়াইল স্টার্নহেল বলেন, ‘নেতানিয়াহুর আচরণ ডেমোক্র্যাটদের অসন্তুষ্ট করেছে। তাদের কাছ থেকে দূরত্ব তৈরি করতে তিনি প্রায় সব ধরনের চেষ্টাই করেছেন।’
তিনি আরও বলেন, ‘শুধু অপেক্ষাকৃত ভদ্র আচরণ করলেই আইজেনকট নতুন কংগ্রেসের কাছ থেকে নমনীয় আচরণ পাবেন না। এজন্য তাকে নতুন নীতি গ্রহণ করতে হবে।’
স্টার্নহেলের মতে, পশ্চিম তীরে ফিলিস্তিনিদের ওপর হামলা চালানো উগ্রপন্থী ইসরাইলি বসতি স্থাপনকারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার ক্ষেত্রে আইজেনকট ইসরাইলি জনগণের সমর্থন পেতে পারেন।
তবে গাজা যুদ্ধের শুরুতে ব্যাপক জনসমর্থন থাকাসহ বিভিন্ন কারণে ইসরাইলি সমাজের রাজনৈতিক অবস্থান ক্রমেই ডানপন্থার দিকে ঝুঁকেছে।
ইসরাইলের সমালোচনা বাড়ছে যুক্তরাষ্ট্রে: নতুন মার্কিন কংগ্রেসে প্রগতিশীল ডেমোক্র্যাটদের উপস্থিতি আরও বাড়বে। তাদের মধ্যে রয়েছেন আবদুল এল-সায়েদ, যিনি সিনেটে নির্বাচিত প্রথম মুসলিম সদস্য। তিনি গাজায় ধ্বংসযজ্ঞকে গণহত্যা বলে অভিহিত করেছেন। তবে ইসরাইল এ অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেছে।
ফিলিস্তিনিদের সঙ্গে দ্বিরাষ্ট্রভিত্তিক সমাধানের পক্ষে থাকা ইসরাইলি গবেষণাপ্রতিষ্ঠান ইকোনমিক কো-অপারেশন ফাউন্ডেশনের জ্যেষ্ঠ নীতিনির্ধারণী পরিচালক এলি কোওয়াজ বলেন, ‘নেতানিয়াহু শুধু রিপাবলিকানদের ওপর নয়, প্রায় ব্যক্তিগতভাবেই ট্রাম্পের ওপর বাজি ধরেছিলেন।’
তিনি আরও বলেন, ‘নির্বাচনের ফলাফল দেখিয়ে দিয়েছে, সেই বাজিরও একটি মেয়াদ ছিল। আর এবারই প্রথম সত্যিকার অর্থে উপলব্ধি করা হচ্ছে যে, সমস্যাটি শুধু ডেমোক্র্যাটদের সঙ্গে সম্পর্কের নয়, বরং পুরো যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গেই সম্পর্কের।’
ইসরাইলের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের সাবেক গবেষক এহুদ এলিয়ামের মতে, যুক্তরাষ্ট্রের সহায়তা না পেলেও ইসরাইলের নিজস্ব বড় অস্ত্রশিল্প রয়েছে। হামাস ও হিজবুল্লাহর মতো সশস্ত্র গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে লড়াইয়েও দেশটির সামরিক সক্ষমতা রয়েছে।
তবে যুক্তরাষ্ট্রের সহায়তা কমে গেলে ইসরাইলকে তুলনামূলক কম দামি কামানের গোলা ও সাধারণ ধরনের বোমার ওপর বেশি নির্ভর করতে হতে পারে। এতে বেসামরিক মানুষের হতাহতের ঝুঁকি আরও বাড়তে পারে, যা ইতোমধ্যে আন্তর্জাতিক মহলে ক্ষোভের কারণ হয়েছে।
এহুদ এলিয়াম বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক সহায়তার বড় অংশ, এমনকি পুরো সহায়তা হারানোর মতো নতুন কৌশলগত বাস্তবতার সঙ্গে ইসরাইল মানিয়ে নিতে পারবে। তবে কাজটি সহজ হবে না। বড় অঙ্কের ঋণ নেওয়া কিংবা কর বাড়ানোর মতো কঠিন সিদ্ধান্তও দেশটিকে বিবেচনা করতে হতে পারে।’
এলি কোওয়াজ বলেন, ওয়াশিংটনের রাজনৈতিক পরিস্থিতি সম্পর্কে সচেতন আইজেনকট আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা ও কৌশলগত সমঝোতার বিষয়ে নিজের আগ্রহ তুলে ধরার চেষ্টা করছেন। তিনি শুধু ‘অনির্দিষ্টকাল ধরে যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার’ পক্ষে নন— এমন বার্তাও দিতে চাইছেন।
কোওয়াজের ভাষায়, ‘যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ইসরাইলের সম্পর্ক কেমন হওয়া উচিত, সে বিষয়ে আইজেনকট স্পষ্টতই একটি ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরছেন।’
সূত্র: এএফপি


সর্বশেষ খবর পেতে দৈনিক এদিন এর গুগল নিউজ চ্যানেল ফলো করুন









